চলচ্চিত্র

মায়েস্ত্রো সেকশন: ‘দ্য হাউস দ্যাট জ্যাক বিল্ট’-অরূপরতন সমাজদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৮

পরিচালক লার্স ভন ত্রিয়ার ইদানীংকালের বিশ্বচলচ্চিত্রের সবথকে বিতর্কিত নাম। তাঁর শিল্পীস্বত্ত্বার উন্মাদনা বারংবার দর্শকের ভাবনা, অনুভূতি ও চেতনাকে চ্যালেঞ্জ করে গেছে এবং সিনেমাপ্রেমীদের ত্রস্ত মুগ্ধতায় বেঁধে রেখেছে ‘ডগভিল’, ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ অথবা ‘মেলাঙ্কোলিয়া’-র মতো একের পর এক ছবির মাধ্যমে। লার্সের এই বছরের ছবি ‘দ্য হাউস দ্যাট জ্যাক বিল্ট’ এখন অবধি তৈরি তাঁর সবথেকে উন্মাদনাবিহীন ছবি; ছবির বিষয়বস্তু বা নির্মাণের আগাগোড়া জুড়ে আছে সুপরিকল্পিত নিটোল ভাবনার ছাপ। সেই ভাবনায় দেখা মেলে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুঁজির আনুকূল্যে তৈরি হওয়া ঔদ্ধত্যের। ছবির অজুহাতে আদতে নিজের ব্যক্তিস্বত্ত্বা  ও শিল্পীস্বত্ত্বাকে আপন খেয়ালে এক করে দেওয়া এক পুরুষ শিল্পীর আস্ফালন, যিনি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিবিধ রাজনৈতিক অভিযোগের দিকে অবলীলাক্রমে মধ্যমা প্রদর্শন করে পার পেয়ে যান। কারণ এই ছবির দার্শনিক জগৎ-এ, যার সাথে যুগ যুগ ধরে চলে আসা শিল্প চর্চার সত্যিই আশ্চর্যরকমের মিল, যেকোন নিখুঁত কাজই শিল্প ও শিল্প তথা শিল্পী সবকিছুর উর্দ্ধে। সেই হিসাবে এতটা টাকা-শ্রম-সময় ব্যায় করে তৈরি করা ছবিটি অকল্পনীয়রকমের জুভেনাইল; খেলনা ভেঙ্গে শাস্তি পাওয়া বাচ্চার “যা-করেছি-বেশ-করেছি-আবার করব” গোছের উচ্চারণের সামিল।

টুকরো টুকরো ঘটনা দিয়ে সাজানো ন্যারেটিভ বাঁধা রয়েছে জ্যাক এবং ভার্জিলের কথোপকথনে। উইম ওয়ান্ডার্সের ‘উইংস অফ ডিসায়ার’ ছবিত দেবদূতের ভূমিকায় অভিনয় করা জার্মান চিত্রতারকা ব্রুনো গানজ এখানে ভার্জিলের ভূমিকায়; দান্তের ইনফার্নোর পথপ্রদর্শক ভার্জিল। অন্যদিকে ম্যাট ডিলন অভিনীত সিরিয়াল কিলার জ্যাক সাক্ষাৎ অশুভের প্রতীক যার মধ্যে কোনকিছুর প্রতি কোন সহমর্মিতার লেশমাত্র নেই। সে তার জবানীতে একের পর এক নারকীয় হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিতে থাকে এবং অন্য দুটি সুত্রে চলতে থাকে তার বাড়ি বানানোর স্বপ্ন আর শিল্প সভ্যতার ইতিহাস তথা প্রকৃতিবিজ্ঞানের নানা উপমা জুড়ে তৈরি এক বিকৃত সন্দর্ভ। আগাগোড়াই মনে হতে থাকে ছবির উদ্দেশ্যই যেন নারীর শরীর, শিশুর শরীর, কৃষ্ণাঙ্গ শরীর বা এশীয় শরীরকে নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করে স্পেকটাকল এবং এই প্রতিটি আচরণের মুহুর্ত নিয়ে ঠাট্টা করে হাসির খোরাক তৈরি করা। বিগত কয়েক বছরে লার্স ভন ত্রিয়ারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে যার মধ্যে শিরোনামে আছে নাৎসীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে লঘু কুরুচিকর মন্তব্য এবং গায়িকা-অভিনেত্রী বিয়োর্ককে যৌন হেনস্থার ঘটনা। ‘দ্য হাউস দ্যাট জ্যাক বিল্ট’ সচেতনভাবে প্রতিটি ঘটনাকে ন্যারেটিভের অন্তর্গত করে নিয়ে এগোতে থাকে এবং পরিশেষে বিকৃত দৈবিক যুক্তিতে নরকপথগামী শিল্পীর প্রতিটি আচরণকে বৈধতা দেয়, শিল্পের নামে।

লার্স ভন ত্রিয়ারের অন্যান্য ছবির মতোই এই ছবিটি নিয়েও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়েছে; বহু জায়গাতেই প্রদর্শনীর মাঝে দর্শক উঠে চলে গেছেন। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে পরিচালকের অন্যান্য ছবির মতো এখানে প্রশ্ন স্রেফ প্রচলিত রুচি-অশ্লীলতার ধারণা এবং সেই জায়গা থেকে একধরণের রক্ষণশীল মূল্যবোধ আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার নয়। সযত্নে সাজানো যুক্তিক্রমে এই ছবি শিল্পীকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি এক্তিয়ারের উর্দ্ধে স্থান দেয়। আউশভিৎসের ইহুদীনিধন বা আবু ঘ্রাইবের বন্দীশালার পাশবিক নির্যাতনকে পরিচালক নিজেরই অন্যান্য ছবির সাথে একই নিঃশ্বাসে কোটেশনের মতো ব্যবহার করেন। এবং সব ঘৃণ্যকাজই বৈধ কারণ ছবির শেষাঙ্কে শিল্পীর নরকদর্শন যে ‘বিধাতা’ লিখে গেছেন; বিধাতা ব্যতীত শিল্পী কারোর কাছে উত্তরসাধ্য নন। প্রথম থেকে লক্ষ্যে অবিচল থেকে ছবিটি এমন এক চরম নিষ্পত্তির দিকে যায়, যেখানে আর কোন ভাবনা, তর্ক, ইত্যাদির জায়গা নেই। নিজের শিল্পকর্মের উপর শিল্পী নিজেই চূড়ান্ত অর্থের সীলমোহর লাগিয়ে দিয়েছেন। সিনেমার ইতিহাসে এইরকম ন্যক্কারজনক ও ফ্যাসিস্ট ছবি পাওয়া কঠিন। থার্ড রাইখের সিনেমার কলঙ্কিত ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে লেনি রাইফেনস্টালের নাম। কিন্তু তিনিও কখনো নিজের কাজের মধ্যে নিজের ব্যক্তিস্বত্ত্বাকে এভাবে জড়িয়ে ফেলে শিল্প ও শিল্পীর মাহাত্ম্যের প্রমাণ রাখেননি। কিন্তু এই ছবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৌদ্ধিক পুরুষের নিপীড়নের কথা বলে এবং পরমুহুর্তেই ‘স্থুলবুদ্ধি’ নারীর নগ্ন শরীর থেকে স্তনযুগল কেটে নেওয়ার দৃশ্যের জন্ম হয়। ‘দ্য হাউস দ্যাট জ্যাক বিল্ট’ শুধু শিল্পের ইতিহাসের কলঙ্ক নয়, সকল লিঙ্গ, জাতি ও বর্ণের যারা শোষিত মানুষের কাছে লার্স ভন ত্রিয়ারের অপরাধ ক্ষমাহীন।

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami