খেলা
Trending

লালমাটির দেওয়াল দানি আলভেজ

শোভন মজুমদার

গোলে চিলাভার্টের সঙ্গে রাইট ব্যাকে দানি আলভেজ। ডিফেন্সের এমন মজবুত পাঁচিল ভাঙার মতো স্ট্রাইকার কে হতে পারে ? সে সব না হয় পরে ভাববেন। এবেলা বিশ্ব একাদশের ডিফেন্সের সেই এই দুর্ভেদ্য দেওয়ালের সঙ্গে পরিচিত হোন। গোলের নিচে দাঁড়ানোর আগে চিলভার্টকে কতগুলো হার্ডল পেরোতে হয়েছিল তার গল্প সারা হয়েছে। এবার রইল এক ব্রাজিলিয়ানের লড়াইয়ের ডায়েরি, লাল মাটির প্রদেশ থেকে বয়ে বেড়ানো স্বপ্ন যিনি ফেরি করেছেন বিশ্ব ফুটবলে। গল্প শুনুন মেসির এক সময়কার সহযোদ্ধা দানি আলভেজের।

বিস্তর রাঙামাটির জমির মাঝে মাঝে ছোট ছোট গাছ। উত্তর থেকে দক্ষিণ সর্বত্র পাথরের ছোট বড় টিলায় ভরা। ফাঁকে ফাঁকে কাঠের ক্রস লাগানো। সকালের দিকে ওগুলোর নিচেই প্রার্থনা চলে। আশেপাশে অজস্র মাটির বাড়ি এদিক ওদিক ছড়ানো। বেলা গড়ালেই উঠোনে ছাগলের দল চড়তে বের হয়। ব্রাজিলের ছোট্ট গ্রাম জুয়াজেইরোতে প্রাকৃতিক শোভা ঠিক এমনই। সে ভাল। ‘আদর্শ গ্রাম’ ক্যাটেগরিতে সেরা বাছাই হতে পারে জুয়াজেইরো। কিন্তু যদি বলা হয়, ঠিক এমন সোনায় মোড়া প্রাকৃতিক পরিবেশে কোনও বিশ্বসেরা ফুটবলারের জন্ম, এটাই ছিল তাঁর ফুটবল পায়ে বিচরণক্ষেত্র ! মানতে অসুবিধা হবে না তো?

চলতি বছরেই হাজারে টালবাহানার পর দানি আলভেজ দা সিলভাকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধাম্ত নেয় জুভেন্তাস। ব্রিটিশ মিডিয়া অনেক আগেই দাবি করে, ব্রাজিলিয়ান রাইট ব্যাক এবার ম্যান সিটিত সই করবেন। খবর মেলেনি। ম্যান ইউয়ের অফার ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দেন দানি। ফার্স্ট ট্রেনিং সেশনে যোগ দেওয়ার আগে কিছুদিনের জন্য জুয়াজইরোতে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। মিয়ামি বা ইবিজার বিচের হাতছানি উপেক্ষা করে ঘরের ছেলে ঘরে।

আলভেজের পিছু পিছু মিডিয়ার একাংশও রওনা দিল জুয়াজেইরোর দিকে। ভোরবেলায় উঠে আলভেজ তরমুজ তুলতে যান। বেলায় বাবার ট্রাক্টর নিয়ে বের হন। বিকেলের দিকে পাড়ার ছোকরাদের সঙ্গে ফুটবল খেলেন। অবাক হন সাংবাদিকরা। দিন সাতেক ধরে সবই খবরের শিরোনামে জায়গা করে নেয়। আলভেজ এসব জেনে একদিন সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। সাংবাদিকদের জমায়েতে প্রশ্ন করেন, এসব কী? তাঁর তরমুজ তুলতে যাওয়া বা পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলা কেন রোজ খেলার পাতার হেডলাইনে জায়গা পাচ্ছে? ফের অবাক হয়ে যায় সাংবাদিককুল। উত্তর আসে, বার্সেলোনা, জুভেন্তাসের মতো বিশ্বের প্রথম সারির ক্লাবে খেলা একজন পাড়ার মাঠে খালি পায়ে খেলতে নেমে পড়লে খবর হবেই, এটা স্বাভাবিক। হেসে কুটোপাটি খান দানি। বলেন, “এটা তো আমার শিকড়। এখানে ছোট থেকে আমি এসবই করেছি। এখন করলে খবর?” ঠিক সেদিনই মিডিয়ার মাধ্যমে তিনি মেসি, নেমারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ পাঠান। দানি বলেন, “বার্নাব্যু বা ন্যু ক্যাম্পে মেসি, নেমারের পায়ের জাদু অনেক দেখেছি। ওদের বলব, আমার গ্রামের এই লাল মাটিতে এসে একটা ম্যাচ খেলুক। আমার দলের বিরুদ্ধে। মাত্র দু’টো গোল করে দেখাক। এটা আমার গুহা। এখানে আমিই রাজা। ওদের বলে বলে হারাব”। মেসি বা নেমারের মধ্যে কেউই শেষ পর্যন্ত তাঁর এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেননি। ব্যস্ততার বাধা ! নাকি বারসার মিলিয়নিয়র তারকারা বুঝতে পেরেছিলেন, লাল মাটির ওরকম সারফেসে খেলে ফুটবল মহীরুহ হয়ে ওঠার গল্প সাজানো ছেলে ভোলানো কথা নয়?

বিবিসির ইন্টারভিউয়ে বসেছিলেন থিয়েরি অঁরি। ব্রাজিল ফুটবল নিয়ে দু’চার কথা তাঁকে বলতে বলেন সঞ্চালক। অঁরি বলেন, “ব্রাজিলে ফুটবল শুরু হয় সকাল আটটায়। শেষ হতে হতে ওই সন্ধ্যা ছ’টা। ছোটবেলায় এই অনেকটা সময় আমি স্কুল, প্রাইভেট টিউশন, আঁকার ক্লাসে অপচয় করেছি। দশ ঘন্টা ফুটবল খেললে হয়তো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের লেভেলে যেতাম”। সকাল আটটা নয়। দানির ফুটবল শুরু হয়ে যেত ভোর ছ’টার মধ্যে। বাবা—মায়ের পঞ্চম সন্তান আলভেজ ভোর পাঁচটায় বাবার সঙ্গে ক্ষেতে যেতেন লাঙল কাঁধে নিয়ে। বিষয় সম্পত্তি বলতে কয়েক বিঘা জমি। তবে তা প্রচণ্ড শুষ্ক। চাষবাস হওয়ার অনুপযুক্ত। ডমিনিগো আলভেজ সিলভার এর থেকে বেশি কিছু ছিল না। মরশুমের একটা সময় প্রচুর তরমুজ হত সেই জমিতে। সেই তরমুজ রপ্তানি হওয়ার পর যা টাকা আসত তা দিয়ে চলত গোটা বছর। পাঁচ—ছয় বছর বয়স থেকে সকাল পাঁচটায় নিয়ম করে মাঠে বাবার সঙ্গে তরমুজ তুলতে যেত ছোট্ট দানি। তার পর সেখান থেকে সোজা মাঠে। ব্রাজিলের উত্তর—পূর্ব অংশের বাহিয়া প্রদেশে গরম প্রচণ্ড। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সূর্য যেন রুদ্ররূপ দেখানো শুরু করে। কিন্তু গরম বা অন্য প্রাকৃতিক বাধা দানি আলভেজের কখনও টেনশন বাড়ায়নি। তীব্র গরমেই চলত ফুটবল। তখনও অবশ্য নিয়মমাফিক ফুটবল প্র্যাকটিসে ভর্তি হননি ব্রাজিলিয়ান তারকা। পাড়ায় বা দূরের গ্রামে কোনও ফুটবল টুর্নামেন্ট হলেই ডাক পড়ত তাঁর। এইসব ছোটখাটো টুর্নামেন্ট থেকেই তাঁর স্কিলের বিচ্ছুরন শুরু। তারপর সেই আলোকে আলোকিত ব্রাজিলের ফুটবল কৌলিন্য।

বাড়ি বলতে দু’কামরার মাথা গোঁজার জায়গা। সংসারের সাত প্রাণী তাতেই কোনওক্রমে দিন গুজরান করে দিত। কিন্তু এক ঘরের চার দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গায় লেখা থাকত দানি আলভেজ…দানি আলভেজ। কোনওটা ব্রাজিলিয়ান অক্ষরে। কোনওটা আবার শুদ্ধ ইংরেজি হরফে। একেকটা একেক কায়দায় লেখা। সব ক’টাই যেন অটোগ্রাফের আদলে। পরে দানির মা জানিয়েছিলেন, “অনেক ছোট থেকে ও দেওয়ালে নিজের অটোগ্রাফ দিত। দেওয়াল নোংরা করার জন্য আমরা ওকে প্রচণ্ড বকাবকি করতাম। কিন্তু দানি বলত, ও নাকি অটোগ্রাফ দেওয়া প্র্যাকটিস করছে। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন ওর অনেক ছোট বয়স থেকে। দানি বলত, একদিন তারকা হয়ে গেলে ওকে তো অটোগ্রাফ বিলোতে হবে। তার জন্য নাকি আগে থেকে প্র্যাকটিস করে রাখছে।” এই স্বপ্ন কিন্তু কখনও দানির চোখ থেকে হারায়নি। কৈশোরে হোটেলে বা দোকানে কাজ করার সময়ও না।

দানির মা’ই আক্ষেপ করে আবার বলছিলেন, স্টার হওয়ার পর জুনেজেইরোতে ছেলে আসে কম। তবে তাঁরা নাকি এই ব্যাপারটা মানিয়ে নিয়েছেন। কারণ একটা সময় তাঁদের ছেলে বলেছিল, “নিজের আর বাবা—মার জীবনটা পাল্টাতে চাই। এভাবে তরমুজ তুলে জীবন কাটাতে চাই না। ঈশ্বর নিশ্চয়ই আমার জন্য অন্য কিছু তুলে রেখেছে।” জীবন পাল্টেছে দানির। সঙ্গে শিকর আঁকড়ে থাকা দানির বাবা—মায়েরও।

এসপোর্তে ক্লাব বাহিয়ার হয়ে কেরিয়ার শুরু দানি আলভেজের। ২০০১—এ স্থানীয় লিগে পারানা ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচে তিন গোলে জেতে দানির দল। সেই ম্যাচে দু’টি গোলে অ্যাসিস্ট করেছিলেন দানি। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে একটি পেনাল্টিও আদায় করে নেন। ব্যস, ফুটবল জীবন যেন সেখান থেকেই অন্য দিশায় বাঁক নয়। ওই ম্যাচে ওরকম দারুণ পারফরম্যান্সের পর কোচ এবারিস্তো দি মাকেডো দানিকে প্রতি ম্যাচে প্রথম এগারোয় রাখতেন। দানিও পারফর্ম করছিলেন ধারাবাহিকভাবে। অবশেষে স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়া থেকে ডাক আসে। কিন্তু আলভেজকে ছাড়তে রাজি ছিল না ক্লাব বাহিয়া। শেষ পর্যন্ত লোনে সেভিয়াতে সই করেন আলভেজ। ২০০৩ ফিফা ইউথ ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে ব্রাজিল। সেই দলে ছিলেন দানি। শুধু ছিলেনই না। টুর্নামেন্টের তৃতীয় সেরা ফুটবলার হয়েছিলেন তিনি। এর পর ক্লাব স্তরে পর পর দু’বার চেলসি, লিভারপুলে যাওয়ার কথা হলেও শেষমেশ নানা কারণে যেতে পারেননি ব্রাজিলিয়ান লেফট ব্যাক। ২০০৮—এ বার্সেলোনায় যোগ দেন। সেখানেই লিওনেল মেসির সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। দানি আলভেজের বার্সা ছাড়ার দিন মেসি বলেছিলেন, “ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। মাঠের বাইরেও সম্পর্ক থাকবে। বার্সেলোনায় প্রথম জয়েন করার পর আমি রাইট উইংয়ে খেলতাম। ওর থেকে তখন যা যা পাস পেতাম সেগুলো কোনওদিন ভোলার নয়। রাইট ব্যাক থেকে গোটা মাঠ অপারেট করতে পারে দানি। এটা ওর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা। স্কিলের পর এটা বাড়তি পাওনা।” রাইট ব্যাক পজিশনটা কিন্তু শুরু থেকে দানির ছিল না। মিস্টার ডমিনিগো আলভেজ সিলভা পেশায় তরমুজ চাষী হলেও ফুটবল ভাল বুঝতেন। খেলতেনও স্থানীয় ক্লাবে। দানি আলভেজ শুরুতে খেলতেন উইঙ্গার হিসাবে। দশ বছর বয়সে দানির বাবা প্রথম বুঝতে পারেন, ওই পজিশনে ছেলে ঠিকঠাক মানিয়ে নিতে পারছে না। তিনিই তার পর দানিকে রাইট ব্যাক হিসাবে খেলতে বলেন। সেই দশ বছর বয়স থেকে রাইট ফুল ব্যাক হিসাবে দানির জার্নি শুরু যা ২০১৭ তে এসে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে এসেও থামেনি।

 

হোমব্রে কোন এস্তিলো। বারসার ড্রেসিংরুমে এটাই ছিল দানির ডাক নাম। যার অর্থ স্টাইলিশ ম্যান। ছোট থেকে আটচালা ঘরে বাস। পরনের জামাকাপড় বলতে লজ্জানিবারণের বেশি নয়। তাতে আতিশয্যের জায়গা ছিল না। ফলে পাঁচ ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চির বিশ্ব কাঁপানো ডিফেন্ডার উপার্জনের প্রথম দিন থেকেই নিজেকে সাজাতে কার্পণ্য করেননি। এমনিতে কম কথা বলা মানুষ তিনি। তাই হয়তো মনের ভাব প্রকাশের সেরা উপায় তাঁর কাছে ট্যাটু। দু’হাতে ক্যাথলিক ছবির ছড়াছড়ি। সঙ্গে পরিবারের সঙ্গে তাঁর নিবিড়তার আভাসও রয়েছে হাতের কিছু ট্যাটুতে। প্রাক্তন স্ত্রী দিনার নামও উল্কিতে রেখেছিলেন একটা সময়। তবে আসল মাস্টারপিস লুকিয়ে তাঁর বুকে। গোটা বুক জুড়ে এক সুবিশাল স্ক্রিপ্টে লেখা তাঁর ছেলের কথা। এর পর সারা শরীরে জুড়়েছে ফুটবল সংক্রান্ত বিভিন্ন ইতিবৃত্ত। দানি আলভেজের গল্প যেন এইসব উল্কি থেকেই অনেকটা বলা হয়ে যায়। ব্রাজিলিয়ান তারকাকে নিয়ে রিসার্চ করতে হলে তাঁর সারা শরীরে ছড়ানো এই উল্কির প্রাচুর্যের কথা উপেক্ষা করা যায় না।

দানি আলভেজের সেই ‘কলা কান্ড’র কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? ২০১৪—য় বারসা—ভিলারেল ম্যাচের সময় গ্যালারি থেকে কোনও এক ভিলারেল সমর্থক দানির দিকে একখানা কলা ছুঁড়েছিলেন। ভরা স্টেডিয়ামে এমন কাণ্ড তাঁকে একটুও বিচলিত করতে পারেনি। বরং সাইড লাইন থেকে সেই কলা কুড়িয়ে চোকলা ছাড়িয়ে সটান মুখে পুরে দেন দানি। এমন কাণ্ড অবশ্য আলভেজের সঙ্গে প্রথম নয়। ২০১৪ কোপার ফাইনালে রিয়ালের কাছে হারের পর মাঠ ছাড়ার সময় দানিকে ঘিরে বার্সার একদল সমর্থক বাঁদরের ডাকার শব্দ জুড়েছিলেন। হাসতে হাসতে সেদিন সমর্থকদের পাশ কাটিয়ে স্টেডিয়াম ছেড়েছিলেন দানি। বরাবর এমনভাবেই বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রাঞ্জল হাসি ছুঁড়ে দিয়েছেন ব্রাজিল তারকা। এই গুণটা অবশ্য তাঁর বাবার থেকেই পাওয়া। কলাকান্ড’র পর এক দল মিডিয়াকর্মী ডমিনিগো আলভেজ সিলভার প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। দানির বাবাও হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘ছেলে কলা খেতে ভালবাসে। এবার খেতে তরমুজের সঙ্গে কলা চাষেরও ব্যবস্থা করতে হবে।” কথায় বলে বাপকা বেটা, সিপাহী কা ঘোড়া।

…………………………………………………………………………………………………………………………….

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami