বিনোদন

“এই গীটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে যদি ভয় দেখাও”!

প্রিয়ক মিত্র

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন আমরা লাট্টু ঘুরতে দেখেছি, নিজেরা ঘোরাইনি। ঘুড়ি উড়তে দেখেছি আকাশে। খেলা থেকে বাদ পড়তে পড়তে আমরা বড় হলাম। ঘুড়ি, লেত্তি সব লোপাট হল। ট্রানজিস্টার নিখোঁজ হল। যেসব ক্যাসেটে আমরা পেনসিল দিয়ে রিল ঘোরাতাম রিওয়াইন্ড করার জন্য সেসব ক্যাসেট হারিয়ে গেল। সব পাল্টাচ্ছিল, ঝাঁ চকচকে হচ্ছিল, আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম একটা গলা, জেহাদি গলায় ভয় ধরানো প্রশ্ন, “ওস্তাদ, রক্তে আমার কীসের প্রতিধ্বনি”! সোজাসাপটা কলম বলছিল, “এই গীটারটা বন্দুক হয়ে যেতে পারে যদি ভয় দেখাও”! প্রেমে চোট খেয়ে শুনছিলাম, “কারণ, ক্ষতি হলে হত ভলক্যানোরই দোষ”! এই পারমাণবিক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে সপাটে বলছিলেন শিলাজিৎ, “আমাকে তুমি অসুখ দিও বসুন্ধরা, আমি ঘুমোব”! আমাদের আখড়া ছিলনা, জলে মাছ ছিল না, আশনাই ছিলনা, খোঁয়ারি কাটিয়ে ঝোপ বুঝে কোপ ছিলনা, ছিল মনের ভেতর লুকোনো পিস্তল, মনকেমনের বাঁশি আর শিলাজিৎ-এর তৈরি করে দেওয়া বেশ কিছু শব্দ, অন্য সব শব্দের পাশাপাশি। সেইসব শব্দের সুলুকসন্ধান চলুক খানিক।
খবর খবর খবর! বিশেষ বিশেষ সংবাদ! প্রচন্ড ক্যাওসের মধ্যে খবর পড়া শুরু হয়। যাবতীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রানুষঙ্গ বেজে চলেছে পশ্চাৎপটে। শিলাজিৎ-এর গলা খবর পড়ে চলেছে যান্ত্রিক স্বরে। শিলাজিৎ-এরই গলা বিধ্বস্ত হয়ে চেপে বসছে সংবাদপাঠক শিলাজিৎ-এর ওপর। ক্লান্ত গলা ডাকছে, ‘বসুন্ধরা!’ ‘তোমার অপরিপাটি খোঁপা’, ‘শ্যামলা শ্যামলা ঘাড়’, ‘ভাঁজে ভাঁজে ভাঁজে ভাঁজে’, ‘মাংসল পিঠ’-এই বিলাপের মাঝে খবর পড়া বন্ধ হয়ে গেছে, পেছনে বেজে চলা সুরের মনোটনি, অস্বস্তি। আচমকা ভয় পাওয়ানো স্তব্ধতা, সুর সঙ্গে সঙ্গে চলে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার, ‘হৃৎপিন্ড সব ভুলে রক্ত পাঠায় ওয়ান ওয়ে রাস্তায়!’ শিলাজিৎ যখন বলেন ‘ঘুমোবো’, তখন প্রতিধ্বনি হয়। ‘তার ভেতর আরও ভেতর আরও ভেতর’, গলা গাঢ় হয়, যখন ‘ঠান্ডা ঠান্ডা ঠান্ডা ঠান্ডা প্যাথোস’-এ এসে দাঁড়ায় গান, তখন শব্দও শীতল।

‘বসুন্ধরা’ গানটাকেই প্রথমে বেছে নেওয়ার কারণ, শব্দ শব্দ শব্দ শব্দ দিয়ে রাসায়নিক শৃঙ্খল তৈরি হচ্ছে এই গানের শরীর জুড়ে। শব্দ বিষয়টাকে নিয়ে একটু কথা বলা যাক। ‘ইলিউসন অ্যান্ড রিয়েলিটি’ বইতে ক্রিস্টোফার কডওয়েল লিখেছিলেন আদিমযুগ থেকে আধুনিক যুগে এসে শব্দ যখন লিখিত হল; তক্ষুনি সে তার উচ্চতা হারিয়ে ফেলল। শব্দ এই উচ্চতা পায় সুরের সান্নিধ্যে। এই উচ্চতাকে একজন সুরকার কীভাবে ব্যবহার করবেন তার ওপরে নির্ভর করছে শ্রবণের উত্থানপতন! শিলাজিৎ-এর আরেকটা গানের দিকে নজর দেওয়া যাক, ‘প্রেম যেন ওয়েসিস, তাকলামাকানে’- গানটিতে শিলাজিৎ বিজাতীয় কিছু শব্দ ব্যবহার করেন মাঝেমধ্যেই। একটা অদ্ভুত হালকা, ভাসিয়ে দেওয়ার গানে এরকম জিবারিশ শব্দ খানিক ঘেঁটে দেয়। শব্দ অচেনা হলেই আমাদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিলাজিৎ সেই অস্বস্তি দেন। যত্ন করে।

শব্দ ব্রহ্ম না ছাই গুলিয়ে যায় ‘মাণিকতলার মোড়’ গানটা শুনলে। চিকারাক দুমদুম-এর যে শব্দবিন্যাস দিয়ে গান শুরু হয় তা চমৎকৃত করে দিতে পারে। ‘জলে মাছ নেই’ গানটিতে জলের লাবডুব শব্দ গানের সমান্তরাল ভাষ্য তৈরি করে। শব্দ শিলাজিৎ-এর অন্যতম হাতিয়ার। এই হাতিয়ারই সাম্প্রতিকের গান থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে শিলাজিৎ-এর গানকে। শিলাজিৎ আমাদের উপহার দিয়েছেন সাউন্ডস্কেপের, শব্দের চমৎকার খেলা! সেই খেলাতে আমরা মজে রয়েছি, থাকবও।
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami