বিনোদন

গানের ভাষার কাউন্টারপয়েন্ট: প্রসঙ্গ সলিল চৌধুরী

প্রিয়ক মিত্র

গানের ভাষার কাউন্টারপয়েন্ট: প্রসঙ্গ সলিল চৌধুরী

“এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না”

সুর যখন জোয়ার তুলছে, তখন একাগ্রভাবে শিল্পীর দিকে তাকালে তার ভেতরের ওঠানামাগুলো চোখে পড়ে কি? একবারও কি বোঝা যায় যে নিশ্চুপ স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গের ফাঁকে হারমোনি এবং কাউন্টারপয়েন্টের খেলা চলছে অমন সোচ্চারে? একটি ডিসক্লেমার এই সুযোগে দিয়ে রাখা ভাল, আমি সংগীত বিষয়ে ক-অক্ষর। কাজেই একজন আপাদমস্তক সাংগীতিক ব্যক্তিত্বের বিষয়ে কথা বলার সময় আমি অপারগ সংগীতের শরীর নিয়ে, সুরের দোলাচল এবং নোটেশনের সঠিক অঙ্ক নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে। যেটুকু পারি, তা শুধুই নিবিষ্ট শ্রোতা হিসেবে একান্ত কিছু উপলব্ধির কথা বলতে। সেই উপলব্ধি অবশ্যই নিজস্ব। নীটশে যখন একা ছিলেন, তখন পাতার বহ্ন্যুৎসব ঘটাতেন নিজে। তারপর সেই আগুনে ঠায় তাকিয়ে কাটিয়ে দিতেন একক নির্জন সন্ধ্যেগুলো। কামু চেয়েছিলেন তার সমকালের শিল্পীরা হাত রাখুক সেই আগুনে, যাতে আভাস পাওয়া যায় নীটশের নিঃসঙ্গতার। কিন্তু ওভাবে একজন শিল্পীর অন্তরে কতটুকু পৌঁছোনো যায়? বা, আদৌ যায় কি?

যাদেরকে আমাদের,মানে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক বৃত্তে কিংবদন্তীতে পরিণত করা হয়, তাদের সম্পর্কে অর্থহীন ভাবাবেগ এবং অহেতুক সংবেদনশীলতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না আমাদের, দুর্ভাগ্যবশত। তাদের কাজকে অনুধাবন করার ধক আমবাঙালির নেই। তারা শুধু দুর্গসংস্কৃতি আর যুদ্ধসাজটুকু বোঝে। কোথাও একটু আঁচড় লাগলেই চালাও পানসি বেলঘরিয়া। এ নিছকই আমাদের সাংস্কৃতিক অভ্যাসের দৈন্য। সাংস্কৃতিক বোধ আর মৌলবাদকে আলাদা করে চিনতে শিখিনি আমরা। আর এর ফাঁকেই যা হয়েছে তা হল সিলেকটিভ অ্যামনেশিয়ার কল্যাণে শিল্পসাহিত্যের চর্চায় কিছু মানুষের স্রেফ বেপাত্তা হয়ে যাওয়া। তাদের নিয়ে অলটারনেটিভে চর্চা হয় কেবল, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষই তাদের জানে, বোঝে। বাকিদের দায় থাকে না। এখন ‘বাকিদের’ বলতে যদি ‘মাস’-কে বোঝানো হয়, তাহলে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, তাদের কাছে পৌঁছনোর দায় নিয়ে আদৌ মহৎ শিল্প হতে পারে কি? বা মহৎ শিল্পের নির্বিচারে সকলের কাছে পৌঁছনোর দায় আদৌ আছে কি? যেজন্য ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা নিয়ে ভাবনার পরিসর সীমাবদ্ধ, যেজন্য অনন্য রায় হয়ে থাকেন নবারুণের ভাষায় ‘অপমানিত বালক’, যেজন্য কমলকুমার বা সন্দীপনকে বা সুবিমল মিশ্রকে চিরকাল দাঁড়াতে হয় স্রোতের বিপ্রতীপে। বিনয় মজুমদারকে চুপিসাড়ে হাসপাতালের ঘরের দেওয়ালজুড়ে গাণিতিক সমীকরণ এঁকে যেতে হয়। তাদের ‘কাউন্টার’ করতে হয় সংস্কৃতির বয়ে চলা মূলধারাকে। তাদের হাঁটতে হয় সমান্তরালে। তাদের হয়ে উঠতে হয় ‘অ্যান্টি’। আরও এরকম উপেক্ষিত, অনুচ্চারিত কত নাম থেকে যায়। তবে প্রশ্ন হল জনপ্রিয়তা নামক নোশনটির বৃহৎ ছাতার তলায় যে সমস্ত সত্যিকারের প্রতিভারা ঠাঁই পেয়ে গেছেন ইতিমধ্যে, যারা মোটামুটি আলোকবর্তিকার মধ্যে অবস্থান করছেন, তাদের গজদন্তমিনারে তুলে রাখা, অনালোচিত কোনো স্পর্শকাতরতার মোড়কে মুড়ে রাখা, এছাড়া আমরা আর কতদূর কী করতে পেরেছি, বা চেয়েছি করতে?

আমরা কথা বলব একজন সাঙ্গীতিক জিনিয়াসকে নিয়ে; সলিল চৌধুরী। সলিল চৌধুরীকে নিয়ে বাংলা পরিসরে নানাবিধ চর্চা হয়েছে-একথা অস্বীকার্য নয়। সলিল চৌধুরীর রচনাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে; একজন সঙ্গীতকার হিসেবেই শুধু তাকে বিচার করার চেষ্টা হয়নি। তার গল্প চিত্রনাট্য ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। সঙ্গীত এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা, তার রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তার নিজস্ব মূল্যায়ন, তার ক্ষোভ খেদ রাগ যন্ত্রণা সবকিছুই কোথাও না কোথাও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু খবরের কাগজের সাপ্লিমেন্টারি হোক বা টিভিচ্যানেলের অনুষ্ঠান, মেনস্ট্রিমের সর্বত্রই সলিল সম্পর্কে শুধুই কিছু অজানা তথ্য জানা গেছে এবং অবিমিশ্র মুগ্ধতা ব্যক্ত করা হয়েছে; তাকে শ্রোতামানস থেকে বোঝার চেষ্টা হয়েছে সামান্যই। আমি, আবারও বলছি, শুধুই
শ্রোতা হিসেবে আমার কিছু চিন্তাভাবনা জানাতে চাইছি, যা হয়তো তারই বলা কথা, সাক্ষাৎকার বা ওইজাতীয় কিছু তথ্যের ওপর নির্ভর করে, এবং অবশ্যই ওঁর গানের ওপর নির্ভর করে।

সলিল তার শৈশবে আসামের চা বাগানে তার বাবার সঙ্গে যৌথভাবে যখন চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে নাটক করেছেন এবং সেই নাটকের জন্য গান তৈরি করেছেন তখনও কোনো মার্কসীয় তাত্ত্বিক দীক্ষা তার হয়নি। কিন্তু ছোটবেলার সেই জনসংযোগ অন্তত তাকে শিল্পী হিসেবে জনবিচ্ছিন্ন হতে দেয়নি কোনোদিন। নিজেই জানিয়েছেন, “আমি ড্রইংরুম পলিটিকস করিনি”। ফলে মানুষের সঙ্গে থাকা, জীবনপ্রবাহে সম্পৃক্ত থাকা তার সাঙ্গীতিক জীবনের অভিজ্ঞান। যদিও তার স্বদেশের ‘মুখে মুখে ফেরা মানুষের গান’ বা ভারতীয় লোকসঙ্গীতের সঙ্গে ওর যোগাযোগ তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি, যেমনটা ঘটেছিল পীট সীগারের ক্ষেত্রে। বাবার সূত্রে এবং দেশবিদেশ ঘুরতে ঘুরতে লোকগানের নিজস্ব ভাষা খুঁজে পান তিনি। পীটের কাছে লোকগানের সংজ্ঞাও সীমায়িত বলে মনে হয়েছিল। প্রসঙ্গে ফেরা যাক, সলিলের মূলত পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক ছিল। বিঠোফেন বাখ মোৎজার্টের পাশাপাশি পল রোবসনের প্রতিরোধের গানও শুনতেন তিনি। পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন অনেক কমবয়স থেকেই। তার ছোড়দা নিখিল চৌধুরীর সূত্রে তার পাশ্চাত্য সঙ্গীতের বোধ আরও জোরদার হয়। কাজেই যখন আই পি টি এ বা ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’-এর হয়ে কাজ করছেন সলিল; এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা গুরুদাস পালের সূত্রে পরিচিত হচ্ছেন ভারতীয় লোকগানের সঙ্গে, তখন সেই এনকাউন্টার থেকে উনি খুঁজে নিচ্ছেন মানুষের গানের নিজস্ব ভাষা, যার সুরের আঙ্গিক পাশ্চাত্য, কিন্তু যে মানুষের আন্দোলনের গান তৈরি করছেন সলিল, সেই মানুষের কাছে পৌঁছোনোর মোকাম তার অজানা নয়। তার গানকে তিনি পৌঁছে দিতে পারেন সঠিক নিশানায়, যেখানে পৌঁছোনোর দায় ছিল তার সমকালের।

কেন এই সমকালের কথা উঠল হঠাৎ? চল্লিশের দশক; একটা প্রবল ক্রান্তিকাল। বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব এসে পড়ছে বঙ্গজীবনে, মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষ ধ্বংসের আলেখ্য তৈরি করছে। তারপরে থাকছে স্বাধীনতা পরবর্তী নারকীয় দাঙ্গা এবং দেশভাগ। মধ্যবিত্ত নামক একটি শ্রেণির ব্যাপক বিনির্মাণ ঘটে যাচ্ছে এই দশকে। বাঙালি মধ্যবিত্তের নিরাপদ জীবন নড়েচড়ে বসছে। তাদের চিরাচরিত মূল্যবোধে ওলটপালট ঘটছে। আক্রান্ত হচ্ছে তথাকথিত ভালো থাকার সন্দর্ভ। এরকম সময় তৈরি হচ্ছে ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ, যার মাধ্যমে সলিলের যাত্রা শুরু। এসময়ের সাহিত্য শিল্প সঙ্গীত সবকিছুই এইসময়ের দর্পণ হয়ে উঠছিল। আঁধার সময়ে গান হবে এবং তা আঁধার সময়েরই গান, ব্রেখটের এই বিখ্যাত এবং বহুব্যবহৃত উক্তিকে মাথায় রাখা যেতে পারে। এসময়ের সব শব্দ সব গান এই আঁধার সময়কে লক্ষ্য করে। মানুষের বানানো দুর্ভিক্ষের যে কঙ্কালসার চেহারা গ্রাম থেকে শহরের ফুটপাথে ফুটপাথে উঠে এসেছে তা দেখতে হচ্ছে বিবেকী শিল্পীদের। সোমনাথ লাহিড়ীর একটি লেখায় তিনি দেখাচ্ছেন কীভাবে একটি সৎ চাষীর পরিবার শহরের রাস্তায় উঠে এসে প্রায় অনাহারে শবে পরিণত হচ্ছে। বিজন ভট্টাচার্যর ‘নবান্ন’ উঠে আসছে এই প্রেক্ষাপট থেকে। বিজন জানাচ্ছেন কীভাবে রোজকার যাতায়াতের রাস্তায় মৃতদেহ দেখে দেখে চোখ সয়ে যাচ্ছে তাঁর। তৃপ্তি মিত্রর স্মৃতিচারণে তাঁর কোলের উপর শুয়ে একটি মেয়ের মৃত্যুর কথা লিখছেন তিনি। ‘ফ্যান দাও’-এর আর্তনাদ শলাকার মতন এসে বিঁধছে শিল্পীদের কানে। তারা দেখছেন মা তার শিশুর থেকে কেড়ে খাচ্ছেন খাবার। এহেন সমকাল, যা স্বাভাবিক সুস্থ মানবিক মূল্যবোধকে খুন করছে নিষ্ঠুরভাবে, সেখানে দাঁড়িয়ে শুধুই কি শিল্পীরা বাস্তববাদকে তুলে ধরবে? মার্কসীয় নন্দনতত্ত্বে এই প্রতর্ক বহুকাল ধরে বর্তমান। ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত লেখক সংঘের কংগ্রেসে গোর্কির ভাষণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই কংগ্রেস থেকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার তত্ত্বের মূল সূত্রগুলো উঠে আসে। গ্যাব্রিয়েল পেরীর একটি উক্তি ছিল, “কমিউনিজম আনবে গীতিময় আগামীকাল”। এহেন ‘গীতিময় আগামীকাল’-কে তুলে ধরার চেষ্টা হবে মার্কসীয় শিল্পে-এই ছিল সেই কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত। গোর্কি ‘বিপ্লবী রোমান্টিকতা’-র কথা বললেন। ‘আর্ট অ্যান্ড সোশ্যাল লাইফ’ বইতে প্লেখানভ বলেছিলেন আগেই, শিল্পী এবং শিল্পগ্রাহক এই দুপক্ষই যখন সমাজ পরিবেশে আশা করার মতন কিছু খুঁজে পায়না তখন শিল্পের জন্য শিল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিল্পের জন্য শিল্প তার মতে বিষয়হীন, আর এই বিষয়হীনতা যে সমস্যার সৃষ্টি করছে তার সমাধান করতে গেলে ব্যবহার করতে হবে উপযোগী শিল্পকে যার নিয়ন্তা এক বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ। সেই রাজনৈতিক আদর্শের দায়বদ্ধতা থেকেই একটি সুন্দর আগামীকালের স্বপ্ন দেখাতে হবে শিল্পের গ্রহীতাকে-এমনটাই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা চায়। বালজাকদের ‘রোমান্টিকতাহীন’ বাস্তবতা তা নয়। পরবর্তীতে লুকাচ এই মতবাদকে মান্যতা দেন। ফ্লোবেয়র-এর সাহিত্যকে ‘নভেল অফ ডিসিলিউশনমেন্ট’ বলা হয়। লুকাচ সে প্রসঙ্গে বলেন, ফ্লোবেয়র যে পুঁজিবাদী সমাজ নিয়ে হতাশ তা থেকে তিনি কোনোভাবেই পরিত্রাণের আশা দেখেন না। তাই তার সাহিত্য কোথাও পৌঁছোয় না। বাংলার শিল্পীরা কিন্তু চল্লিশের দশকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করেছিলেন তাদের সময়ের প্রেক্ষিতেই। ‘নবান্ন’ নাটকের শেষে যেমন দয়াল চিৎকার করে প্রধানকে বলে, “জোর, জোর প্রতিরোধ প্রধান এবার”। আকাশে তখন সূর্যকে সরিয়ে দুর্যোগের মেঘ দানা বাঁধছে। বিপদের মুখে এমন অকুতোভয় উচ্চারণ আসলে ওই আশার আলোর দিকেই আঙুল দেখায়। নবান্নের উৎসব চলছে সেইমুহূর্তে। গোর্কি মার্কসের গ্রিকশিল্প বিষয়ক একটি প্রবন্ধের ওপর নির্ভর করে মিথ, রিচ্যুয়াল এবং ম্যাজিকের গুরুত্ব স্বীকার করেছিলেন। ফ্রয়েড আরও একটু জটিল মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা থেকে মানবীয় আকাঙ্খার প্রক্ষেপ বলে মেনে নিয়েছেন পুরাকথা এবং ব্রতাচারকে। ইয়ুঙ যাকে ‘কালেকটিভ আনকনশাস’ বলছে, তার আকাঙ্খাকে সমাজের আদি অভ্যাস, লোকাচার এবং রিচ্যুয়ালের মধ্যে দিয়ে খুঁজে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে এই শিল্পে। সেখানে রয়েছে এক নিম্নবর্গীয় চেতনাও। ঋত্বিক পরবর্তীতে ইয়ুঙের ওপর নির্ভর করেছেন, স্মর্তব্য। মাণিক ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বকে বেছে নিয়েছেন তার সাহিত্যে। এই সমাজমানসের অন্ধকার গলিঘুঁজি দিয়ে আদিকল্পকে ছুঁয়ে এক স্বপ্নিল বাস্তবতায় পৌঁছোনো আসলে একরকমের শক থেকে উদ্ভুত হচ্ছে। যে শক সেই সময় দিচ্ছে। একরকমের প্রবল হতাশাব্যঞ্জক এবং অমানবিক বাস্তবতা, মূল্যবোধের ভেঙে পড়া, তা শূন্যসর্বস্বতার জন্ম দিচ্ছে কোথাও শিল্পীমনে, সেই শূন্য স্পেস থেকেই এই পুরাণের কাছে ফেরা বা অন্য বাস্তবতার দিকে এগিয়ে চলা শুরু। গোপাল হালদারের ‘একদা’ , নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মন্দ্রমুখর’, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হারাণের নাতজামাই’ বা ‘চিহ্ন’ সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাকে আশ্রয় করে লিখিত উপন্যাস। সব অন্ধকারের পরেও যেখানে আশার আলো উজ্জ্বল হয়ে ফুটে থাকে। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র এইসময় লিখছেন ‘নবজীবনের অপেরা’, ‘এসো মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার’। ১৯৪৩ সালে তৎকালীন বোম্বাইতে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এবং প্রগতি লেখক সংঘের প্রকাশ্য সম্মেলন থেকে কমিউনিস্ট পার্টিলালিত  ভারতীয় গণনাট্য সংঘ, সংক্ষেপে আই পি টি এ তৈরি হওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। চিত্তপ্রসাদ, যার তুলিতে ওই বুভুক্ষু সময় ধরা পড়েছিল নির্মমভাবে, তিনি লোগো তৈরি করলেন আই পি টি এ-র। ছেচল্লিশ নম্বর ধর্মতলা হয়ে উঠল নতুন শিল্পের আঁতুড়ঘর। সলিলের সাঙ্গীতিক অভিযাত্রা শুরু হল এবার।

ইংরেজ শাসনের শেষের দিকে যখন বন্দীমুক্তি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা’ প্রবল জনপ্রিয় হচ্ছে তখন সলিল ছাত্র রাজনীতির একটা অধ্যায় পেরিয়ে এসেছেন। বিদ্যেধরী নদীতে বাঁধ দেওয়া নিয়ে আন্দোলন হচ্ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার পাঁচঘড়াতে। সলিল লিখলেন, “দেশ ভেসেছে বানের জলে ধান গিয়েছে মরে/ কেমনে বলিব বন্ধু প্রাণের কথা তোরে”। অর্থাৎ প্রাণের কথা বলার অবকাশ নেই এমন একটি দুর্দশাক্লিষ্ট সময়রেখায় দাঁড়িয়ে আমরা। কিন্তু প্রাণের কথা বলতে চাওয়ার আকাঙ্খাও এই গানে অনুপস্থিত নয়। এই গান কিন্তু পাশ্চাত্যের সুরের আঙ্গিকে নয়। ভাটিয়ালি সুরে এই গানটি বাঁধা হয়েছে। অথচ শেষের কোরাসে গিয়ে সুর ভেঙে যায় স্লোগানে,সেখানে ঘোষণা থাকে, “মানব না বিধান”। শ্রমজীবী কৃষকদের জন্য তৈরি এই গান। এখন পাশ্চাত্য সঙ্গীতে দীক্ষিত সলিল এই লোকজ সুরকে ধারণ করলেন কীভাবে? সলিল নিজেই বলেছেন, আসামের চা বাগান ছিল ‘ছোটখাটো ভারতবর্ষ’। সেখানে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে দেখেছেন তিনি, তাদের লোকসঙ্গীতকে ধারণ করেছেন অবচেতনে। এছাড়া গণনাট্য সংঘের বিভিন্ন সম্মেলনে ঘুরতে ঘুরতেও তিনি বহু লোকসংগীত কে গ্রহণ করেছেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানে ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিমায় ক্যাবিনেট মিশন, তেল সংকট ইত্যাদি নানান বিষয়কে দেশজ সুরে এবং আঙ্গিকে ধরা হয়েছিল। ‘ও ভাই চাষি খেতের মজুর’ জাতীয় গানে সেই আঙ্গিককে ধরার চেষ্টা করেছিলেন সলিলও। কিন্তু হেমাঙ্গ বিশ্বাস বা সলিলের এই প্রচেষ্টা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন খালেদ চৌধুরী। হ্যানস আইসলার নির্দেশিত পদ্ধতিতে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে লোকজ সুরে গান গাইলে তা গ্রামের মানুষ সর্বতোভাবে গ্রহণ করেনা এহেন অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য থেকেই তার এই সংশয় জন্ম নিয়েছিল। তাই ফোকে আটকে না থেকে সলিল চৌধুরীরও চেষ্টা ছিল সবরকম মানুষের কাছে পৌঁছোনোর জন্য মাস সং তৈরির। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে আই পি টি এ-র বম্বে কনফারেন্সে এই নিয়ে তর্ক হয় সলিলের। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেন, পাশ্চাত্যের প্রভাবে ভারতীয় সংস্কৃতি বিকৃত হচ্ছে। সলিল তার উত্তরে জানান পেন্টিং এ থ্রি ডাইমেনশন থেকে সাহিত্যে সনেট, সবকিছুই পাশ্চাত্যের অবদান। সলিল বলেন, “আপনার এতই যদি স্বদেশপ্রীতি, তাহলে প্যান্ট শার্ট পড়ে প্লেনে চড়ে বম্বে না এসে তো তিনমাস আগে গোরুর গাড়িতে স্টার্ট করতে পারতেন”। শ্লেষের আড়ালেও একটি সত্য এই কথার মধ্যে ছিল, কারণ গুরুদাস পালের মতন একজন বিড়িমজুরের গান যতটা সফলভাবে মাটির কাছাকাছি ছিল, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান মৌলিকতায় তাকে ছুঁতে পারেনি।

সলিল তৈরি করেছেন রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলির অন্য ভার্সন যা শুনলে মনে হয় দুর্ভিক্ষের পরে একরকম অনিবার্যতা থেকেই এই গান লেখা হয়েছে। নৌবিদ্রোহের সময় লিখলেন ‘ঢেউ উঠছে কারা টুটছে’। ‘মরা বন্দরে আজ জোয়ার জাগানো ঢেউ/ তরণী ভাসানো ঢেউ উঠছে’- কর্ড প্রোগ্রেসনের খেলা চলছে সুরের আঙিনায়, সুর নিয়ে যারা চর্চা করেন তারা কথা বলবেন তাই নিয়ে। আর উত্তাল সময় এবং সফল হরতালের জয়ধ্বনিকে ধারণ করেছে এই গান সুর নিয়ে খেলার ফাঁকেই। সলিল পাশ্চাত্য হারমোনিক প্রোগ্রেসনের ভারতীয়করণ করছেন। তার মাঝেই আন্দোলনের ভাষা পৌঁছে দিচ্ছেন মানুষের কাছে। ‘মরা বন্দর’-এর নিরাশা, মৃতবৎ আঁধারকে ভোকাল অর্কেস্ট্রার জোয়ার জাগানো ঢেউ এ ভাসিয়ে দিয়েছেন সলিল। ‘মানব না বন্ধনে, মানব না এ শৃঙ্খলে’- দৃপ্ত উচ্চারণ, তেমনই দৃপ্ত সুর। ‘মানব না’- এই স্টেটমেন্টকে সজোরে সপাটে ছুঁড়ে দেওয়া। বিশ্বযুদ্ধ ততদিনে শেষ। দাঙ্গা, স্বাধীনতা এবং প্রবঞ্চনা একদিকে, আরেকদিকে বিশ্বজুড়ে, সলিলেরই ভাষায়, “হিউম্যানিটির একটা আপসার্জ”। বিশ্বের এক তৃতীয়াংশে সমাজতন্ত্র চলে এসেছে, অতএব আর দৈন্য থাকবে না, দুঃখ থাকবে না–এজাতীয় একটা আশায় বুক বাঁধা শুরু হয়েছে। তাই স্বাধীনতার পরে “নাকের বদলে নরুণ পেলাম” জাতীয় হতাশ বিদ্রুপের পাশাপাশি সলিল তৈরি করছেন “ও আলোর পথযাত্রী”। গানটির সুরে এক অদ্ভুত ঝিম ধরানো আবহ খেলে বেড়ায় প্রাথমিকভাবে। সেখানে বলা হচ্ছে ” এ যে রাত্রি/ এখানে থেমোনা”। এই রাত্রিতে এখনও হাঁটছে একদল মানুষ, যতক্ষণ সুর এই পরিসরে রয়েছে। “আমি ক্লান্ত যে/এই হাত ধরো”-জার্নি চলছে একটা। বলা হচ্ছে “এ বালুর চরে আশা তরণী তোমার যেন বেঁধোনা”। অর্থাৎ এই আশার ব্যপ্তি সামান্য নয়, বিশাল; তাকে এগিয়ে যেতে দিতে হবে দিগন্তে। “আর কতদূর/সেই মোহনা”- রিক্ত সুরে প্রশ্ন ভেসে ওঠে। সুরের মোড় ঘুরল আচমকাই। “আহ্বান শোনো আহ্বান/আসে মাঠ ঘাট বন পেরিয়ে”-ওপার থেকে হাত ধরবে বলে প্রস্তুত কেউ। কোরাসের স্বর হঠাৎই দৃপ্ত। অর্থাৎ আর অন্ধকার নয়, এবার আলোর দিকে হাঁটতে হবে। আর সুরের এই মোকামেই সলিল এক স্বপ্নসন্ধানী, এক আলোপিয়াসী মননকে সাড়া দেন। “মাঠপাথার গ্রামনগর বন্দরে তৈরি হও/ কার ঘরে জ্বলেনি দ্বীপ, চির আঁধার তৈরি হও” – আঁধারকে তৈরি হতে বলা আসলে আলোর নিশানা দেখতে পেয়েই। আশাবাদই এই উচ্চারণের জোগান দিচ্ছে। একটি মাইলস্টোনসমান গান হল, “হেই সামালো”-তেভাগার প্রেক্ষাপটে। “আর দেব না, আর দেব না রক্তে বোনা ধান মোদের ধান গো”-এই সুরে কোথাও কোনো বেদনা নেই। রয়েছে অপরিসীম উচ্ছ্বাস। সে উচ্ছ্বাস প্রতিরোধের। সুকান্তর কবিতায় সুর দেওয়ার জন্য সঙ্গীতের ইতিহাস তাকে মনে রাখতে বাধ্য, কারণ সেসব গানের সুরের চলন কবিতাকে নতুন করে ভাষা দিয়েছিল। “অবাক পৃথিবী সেলাম তোমাকে সেলাম”-গানের এই অংশ অবধি শোষিতর আর্তিটুকুই রয়েছে শুধু। তারপরেই “বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে”-তে এসে সুর হয়ে উঠছে রাগী, তার তেজ কবিতার মেজাজকে ব্যক্ত করছে। ‘রানার’ গানটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কবীর সুমন দেখিয়েছিলেন কীভাবে পাশ্চাত্য সুরের শরীরে এসে মিশছে ভৈরবী রাগ। সেই ভৈরবী ভোরের লালের দিকে তাকায়, যা রানারের কাছে বিপজ্জনক, আবার একইসঙ্গে সে এমন একটি ভোরে পৌঁছতে চায়, যেখানে বয়ে আনতে হবে নতুন খবর। সুরের ওঠানামা, কাউন্টারপয়েন্ট ছুঁয়ে কর্ড প্রোগ্রেসন পাল্টে ফেলা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যে গতি প্রকাশিত হচ্ছে এই গানে তা অর্ডেন রচিত ‘নাইটমেল’-এর ছন্দকে মনে করিয়ে দিতে পারে। “রাত নির্জন পথে কত ভয় তবুও রানার ছোটে”-র ছোটার স্বাভাবিক গতি হঠাৎই পাল্টে যায়, “ঘরেতে অভাব, পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া”তে এসে।  ছুটতে ছুটতে আচমকা ক্লান্ত হয়ে পড়া রানার যেভাবে ভাবছে তার নিজের কথা, ছন্দও সেইভাবে চলে। এইভাবে কবিতার ভাষ্য উঠে আসে সুরে। তবে যে গানটি নিয়ে কথা বলতেই হয় এক্ষেত্রে, সেই গানটির প্রসঙ্গ উঠলেই তাল খানিক কাটবে। ছন্দের খানিক অমিল হবে। সেই গানটি হল, “গাঁয়ের বধূ”।

আখমাতোভার মতন কবি সোভিয়েত লেখক সংঘ থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন কারণ তার মনে হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা আসলে কোথাও বিকৃত করছে আসল সমাজসত্যকে। সলিলের এই গানটি শেষ হয় আশার বাণী দিয়ে নয়। এই গানের শেষে রয়েছে গাঁয়ের বধূর “আশা স্বপ্নের সমাধি”। কোন আশা কোন স্বপ্ন তার আলেখ্য গোটা গানজুড়ে তৈরি হয়েছে। এই সমাধি তৈরি হওয়ার কারণ কী তাও জানানো হয়েছে গানে। আর সেই অংশটিতে যে ভায়োলেন্স রয়েছে তার ভাষায় বা সুরের গতিবিধিতে, তা সলিলের সারাজীবনের আর অন্য কোনো কাজে নেই।

আপত্তি উঠল এই গান নিয়ে। বলা হল দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কৃষক রমণীরা লড়াই করছে পুলিশের সঙ্গে, লঙ্কার গুঁড়োকে হাতিয়ার করে। সেখানে “আশা স্বপ্নের সমাধি” কীকরে হতে পারে? সলিল জানালেন, হতে পারে কারণ তিনি নিজের চোখে সেটা হতে দেখেছেন। পাঁচঘড়ায় নাইট স্কুল চালাতে গিয়ে নিজের চোখে কঙ্কালের পাহাড় দেখার অভিজ্ঞতা পার্টির কালচারাল ফ্রন্ট থেকে সেদিন যারা “গাঁয়ের বধূ” নিয়ে আপত্তি করেছিলেন,তাদের হয়েছিল কি না জানা নেই।

‘লিও টলস্টয় অ্যাজ দ্য মিরর অফ রাশিয়ান রেভোলিউশন’ গ্রন্থে টলস্টয়ের বাস্তবতাকে লেনিন স্ববিরোধী বলেছিলেন কারণ টলস্টয় প্রবল বাস্তবানুগ হয়েও খ্রিস্টের প্রতি অনুগত। তাই তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না শ্রমিকশ্রেণির ক্রোধের ভাষাকে। যদিও লেনিন এওও বলেছিলেন যে এই বৈপরীত্য বিপ্লবীমননেও উপস্থিত ছিল। তাই লেনিন ‘পার্টিজান’ কথাটিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন সাহিত্য কে হতে হবে পার্টি সাহিত্য। এখন বিশ শতকের গোড়ার দিকের রাশিয়াতে এই মতবাদের উদ্ভব। কিন্তু বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদী অনুপ্রেরণায় যে শিল্পচর্চা চলেছে পরবর্তীতে, সর্বত্র এই নন্দনতাত্ত্বিক বেড়াজালকে কি বজায় রাখা গেছে? সলিল একটি গান বেঁধেছিলেন; “আমরা গান গাই কেন না গান গাই”। গানটি লেখা হচ্ছে ১৯৪৯ সালে। দুর্ভিক্ষ বিশ্বযুদ্ধ দেশভাগ তেভাগা পেরিয়ে আসার পর। এই গানে লেনিনের পার্টিজানের শর্তকে কোথাও খানিক অস্বীকারের ঘোষণা রয়েছে। ‘আমরা গান গাই কাজেই গান গাই/ যুক্তি তর্কের সকল সীমা পেরিয়ে এলাম এই দেশে’ -এইরকম স্পর্ধা দেখানো ঘোষণা কি শিল্পের সমাজবিচ্ছিন্নতা বা জীবনবিচ্ছিন্নতার পক্ষে? সলিল কিন্তু তা বলছেন না। তিনি এও বলছেন যে আর্ট অ্যাবস্ট্রাক্ট কোনো ফর্ম নয়। যে ফর্মে বক্তব্য খুব জোরালোভাবে ফুটবে সেই ফর্মই আর্ট হয়ে উঠবে। তার গণসঙ্গীতগুলিও তাই আর্ট, কিন্তু তা সময়ের দাবি মেনেই তৈরি। এবার একটু বুঝে নেওয়া যাক, যে এই পার্টিজানের শর্তকে আমাদের এখানে পার্টিতন্ত্রের অনুশাসনে পরিণত করা হল কীভাবে। বিজন ভট্টাচার্য। ‘নবান্ন’ কোনো পার্টির মতাদর্শে অনুপ্রাণিত নয়, একথাটা তিনি অন্তর থেকে বলেছিলেন। তার এই আন্তরিক স্বীকারোক্তিকে মিথ্যাচার বলতে দ্বিধা করেননি সুধী প্রধানের মতন ডগম্যাটিক নেতা, যারা বোঝেনই নি শিল্পীর ব্যক্তিগত সংবেদনকে। বিজন ভট্টাচার্য শেষের দিকে কুড়ি টাকার জন্য মঞ্চে উঠতেন। সেই মঞ্চের পেছনের অন্ধকারে সলিল চৌধুরীর কাছে ব্যক্তিগতভাবে ভেঙে পড়েছিলেন একবার। ঋত্বিক ঘটককে কোণঠাসা করা হয়েছে পার্টির কালচারাল ফ্রন্টে। উৎপল দত্তকে সি আই এ-র এজেন্ট বলে দাগিয়ে দেওয়ার ঘটনাও কথিত আছে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতন কবির মোহভঙ্গ হওয়ার পর চরম উপেক্ষাতে শেষ জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। যদি ভারতের দিকে তাকাই, এস এ ডাঙ্গে ভারতের গোর্কি বলে চিহ্নিত করেছিলেন যাকে, সেই জাতীয় পুরষ্কারপ্রাপ্ত মারাঠি সাহিত্যিক আন্নাভাই সাঠেকে একটি একচালা ঘরে ধেনো মদ খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে, উদাসীন অবহেলায়। বলরাজ সাহানী সরে গেছেন নিশ্চুপে।

সলিলের “আয় বৃষ্টি ঝেঁপে” গানে “বিধি” শব্দটি কেন ব্যবহার করা হয়েছে আপত্তি উঠেছিল তা নিয়েও। বাহান্ন সালে সলিল সরে এলেন পার্টি থেকে। বিমল রায়ের ডাকে ‘দো বিঘা জমিন’-এর জন্য আরবসাগরের পারে পাড়ি দেওয়া এর পরেই। সেই ‘দো বিঘা জমিন’-এর চিত্রনাট্য সলিলেরই। এক রিকশাওয়ালার জীবনকাহিনী। এই সিনেমার পোস্টার এঁকেছিলেন চিত্তপ্রসাদ। কিন্তু সেই বিচ্ছেদের আঘাত বেজেছে আজীবন। তাই অভিমানী সলিল বলেছেন বারবার, “আই ডোন্ট বিলং টু এনি পার্টি নাও”। একটা বড় স্বপ্নভঙ্গ তাড়া করেছে তাকে। তিনি এবং তার কমরেডরা এককালে বিপ্লবকে মোড়ের মাথায় দেখতে পেতেন, “রাউন্ড দ্য কর্ণার”- সলিলের ভাষায়। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর এক সন্ধ্যায় পুরনো সাথীদের বুকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন সে কথা মনে করে। এই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা বুকে নিয়েই সলিল নস্যাৎ করেছেন নস্টালজিয়াকে। নির্মোহ হতে চেয়েছেন তাদের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে। বলেছেন ডিসিলিউশনের কথা। আর সেই ডিসিলিউশনের ফলে শিল্পের সর্বনাশ হয়েছে-এমনটাও দাবি করেছেন।

কবীর সুমনকে একটি সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে সলিল বলেছিলেন তিনি পেশাদার সঙ্গীতকার হতে চাননি কখনো। কিন্তু এই পেশাদারিত্বের ওপর নির্ভর করেই সলিল পাড়ি দিলেন বাণিজ্যনগরীতে। এবার সলিল যে পথে হাঁটলেন সেটা সম্পূর্ণ তার একার রাস্তা। সলিল, আধুনিক বাংলা গানের জগতে সমাদৃত হয়েও একজন ‘আউটসাইডার’ হয়ে রয়ে গেছেন। কারণ তার নিরীক্ষামূলক মানসিকতা। এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে বাংলার শিল্পবাজারে স্বস্তি কোনোদিন ছিল না। তাই ‘সুরের এই ঝর ঝর ঝরণা’-র মতন হারমোনিক প্রোগ্রেসন নিয়ে খেলা বাংলায় মেনে নিতে পারলেন না অনেকেই। হারমোনিকে বেসুর বলেও চালিয়ে দিল অনেকেই। কিন্তু সলিল সরে আসেননি তার সাঙ্গীতিক ভুবন থেকে। নিরন্তর একরকম সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন তার নিজের সাঙ্গীতিক বৃত্তে থেকেই। অর্কেস্ট্রেশন, হারমোনি প্রভৃতিকে বাংলা গানে আনা যাবেনা-এহেন প্রাচীনপন্থার বিরুদ্ধে চালিয়েছেন সংগ্রাম। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারও দিয়েছেন এ বিষয়ে। চেষ্টা করেছেন সঙ্গীতশিক্ষায় বদল আনতে। কম্পোজিশনের গ্রামার শেখাতে চেয়েছেন সঙ্গীতশিক্ষার্থীদের।

আই পি টি এ থেকে বেরিয়ে আসা সলিলকে বিপথগামী হিসেবেই গণ্য করেছিল পার্টির কালচারাল ফ্রন্ট। কিন্তু সেইসময়ের গানগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার ভাবনা থেকে সলিল সরে আসেননি। আকাশবাণীতে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল গণনাট্য সংঘের। এমনকি গ্রামোফোন কোম্পানিও ব্রাত্য করে রেখেছিল তাদের। ফলে গানগুলোকে সম্মেলনের মাধ্যমে মুখে মুখে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল একমাত্র উপায়। ছেচল্লিশ নম্বর ধর্মতলা থেকে বেরিয়ে আসার পর রেকর্ড কোম্পানির রাস্তা সুগম হল সলিলের কাছে । সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে গানগুলো নতুন করে রেকর্ড করালেন সলিল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় -এর কন্ঠে ‘রানার’ আর ‘গাঁয়ের বধূ’-র রেকর্ড জনপ্রিয় হল। রেডিওতেও সম্প্রচারিত হয়েছে সেই গান। একে সলিল আপোষ হিসেবে দেখেন নি। বরং লেনিনের কথার সূত্র ধরে বলেছেন যে ‘মোস্ট পাওয়ারফুল মিডিয়াম’- এর মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছনো জরুরি। তাই বলেছেন সিনেমাকে ব্যবহার করার কথা। বিপ্লবোত্তর রাশিয়াতে অ্যাজিট ট্রেনে সিনেমা দেখানোর কৌশলকেই হয়তো কিছুটা ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ১৬ মিলিমিটারে সিনেমা বানানোর কথা ভেবেছিলেন তিনি। এমনকি পরবর্তীতে বামফ্রন্ট সরকার আসার পরে তৎকালীন তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর কাছে দরবার করেছিলেন এবিষয়ে। পরে অত্যন্ত খেদের সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন যে যেহেতু তিনি পার্টির ছত্রছায়ায় নেই, তাই তার কথা শোনা হয়নি। আনন্দবাজার গোষ্ঠী তাকে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য ‘ব্ল্যাকআউট’ করবে এঘটনা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ‘স্বাধীনতা’ গোষ্ঠীও একই ভূমিকা নিয়েছিল তার বিষয়ে। সলিল বলেছিলেন, যে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ফলা হয়ে থাকাটা শিল্পের পক্ষে রীতিমত ক্ষতিকর। শুধু মুখেই তথাকথিত ‘অপসংস্কৃতি’-র নিন্দে করা এবং প্রগতিশীলতার মুখোশ পড়ে থাকার ভন্ডামিকে চিহ্নিত করেছেন। যোগ্য অলটারনেটিভ তৈরি করে তবেই শিল্পের উৎকর্ষের পক্ষে দাঁড়ানো যাবে-এমনটাই ভেবেছিলেন সলিল।

“আমি একেলা, চলেছি নিরুদ্দেশ যাত্রী”

রবীন্দ্রনাথকে তখন পেরিয়ে এসেছে আধুনিক বাংলা গান। পেরিয়ে এসেছে হিমাংশু দত্তকেও। সলিল তৈরি করার চেষ্টা করছেন গানের নতুন ভাষা। পঞ্চাশের দশক থেকে অন্তত সত্তরের গোড়া অবধি বাংলা সংগীতচর্যার এক অসামান্য অধ্যায় চলেছে। নচিকেতা ঘোষ, সুধীন দাশগুপ্ত, মোহিনী চৌধুরীরা সুর করেছেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি সুর করেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা শ্যামল মিত্রও। সলিল স্বতন্ত্র হয়ে উঠলেন এদের সকলের থেকে তার সঙ্গীতচেতনায়। সলিল জোর দিলেন লিরিকেও। সলিল যে স্বপ্ন এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের ধুলোবালিতে বাস করছিলেন, তা তার গানে উঠে এসেছে বারবার  । ‘শ্যামলবরণী ওগো কন্যা’-অর্কেস্ট্রেশনকে সম্বল করে এই গান তৈরি হচ্ছে। গাইছেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়। “তোমারে দেখেছি আজি গৃহহারা পথে পথে/কাঁদিয়া ফিরিছ/ঘরে ঘরে সব সন্তানদের জাগাতে”-‘সেই মেয়ে’ বা ‘গাঁয়ের বধূ’-র সময় থেকে সরে এলে এমন গান তৈরি হয়না, এবং এই অংশের সুরেও রয়েছে এক অদ্ভুত উদযাপন। সলিল আসলে একটা মুক্ত ব্যপ্ত দিগন্তহীন মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সংকীর্ণ কোনো কক্ষপথে আবর্তিত হননি শুধুই। ‘প্রান্তরের গান আমার’-এ “আমি তো চাহিনি কিছুই/শুধু আপন নীড়ের ছায়া”- এই লাইনে কথা এবং সুরে যে বেদনা প্রকাশিত হয় তাতে ‘গাঁয়ের বধূ’-র হিংস্রতা নেই ঠিকই, কিন্তু তা কতদূরে সেই মেয়েটির থেকে, যাকে কলকাতার রাস্তায় শবে পরিণত হতে হয়েছে চল্লিশের দশকে? “বউ কথা কও বলে পাখি আর ডাকিসনা” গানটি নেহাতই মিষ্টি সুরে একজন গৃহবধূর জেহাদ ঘোষণা পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে, যেখানে বাংলা গানে সাধারণত বউ কথা কও পাখিকে ব্যবহার করা হত কুমারী মেয়ের বিবাহাকাঙ্খার টোটেম হিসেবে। ‘পথে এবার নামো সাথী’-র ঘোষণা নেই আর তার গানে, কিন্তু তার গানে যখন বলছেন “এই জীবন এমনি করে আর তো সয়না”-তখন কোথাও বিচ্ছিন্নতার যন্ত্রণা রয়েছে। আর সেই যন্ত্রণা তে থেমেও থাকছেন না। মুহূর্তের মধ্যে সুর উঠছে অন্য স্কেলে। সেখানে ঘোষণা করা হচ্ছে, “যাই হারিয়ে মিলে মিশে এবার/হই আবার/জনসমুদ্রে একজনা”। আর একার বৃত্তে আটকে না থেকে এবার একটা ছড়িয়ে পড়ার ভাবনা এসে পড়ছে। সেই ছড়িয়ে পড়াতেও সলিল একা। আর তিনি সংগঠনের আওতায় নেই। সমষ্টিতে নেই। ‘আমি চলতে চলতে থেমে গেছি’-গানটির দিকে তাকানো যাক। “আমি সপ্তসিন্ধু পার হয়ে” লাইনটিতে সুর যেভাবে তরঙ্গিত হয় তেমনভাবেই যেন স্তিমিত হয়ে পড়ে পরের লাইনটিতে পৌঁছে, “গোষ্পদে বাঁধা পড়ে গেছি”। মুক্তিকামিতা এবং ব্যর্থতা। স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ। উদ্বেল আনন্দ, সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণা।   “পথ হারাব বলেই এবার পথে নেমেছি/ খোলা পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি”- বিভ্রান্তি এসে দানা বাঁধছে গানের শরীরে। সলিলের প্রেমের গানেও রয়েছে এই একই উদযাপন। ‘যদি কিছু আমারে শুধাও’-না হয়ে ওঠা প্রেমের গান। যন্ত্রণার গান। “ওই আকাশ নত/ যুগে যুগে সংযত/নীরবতায় অবিরত”-গানের এই অংশ যখন চলছে তখন অদ্ভুত বিষাদ ঘিরে থাকে। তারপর দ্বিতীয় স্ট্যানজায় যেন বিষণ্ণ নতশির সুর সটান উঠে আসে ওপরের স্তরে, “যদি কোনো মন্তরে/বোবা এ প্রাণের ব্যথা বোঝানো যেত গো তারে” পেরিয়ে শেষে এসে উপসংহার টানা হচ্ছে “কিছু নয় তার কাছে এটুকু বুঝিয়া লও”। অর্থাৎ অব্যক্ত থেকে যাওয়া অনুভব। কিন্তু তার সুরে রয়েছে সেলিব্রেশন। প্রসঙ্গত, দেবব্রত বিশ্বাসের কন্ঠে এই গানটিতে কিন্তু সুরের এই চলাচল সমতলে। সেখানে এই চড়াই উৎরাই নেই। ‘শোনো কোনো একদিন’ গানটিতে যখন “মনে হল মোরে পিছে ফেলে/যেদিন তুমি চলে গেলে” তখন সুরের মধ্যে উৎসব চলে। একটি প্রেম ব্যর্থ হওয়ার আখ্যানে যখন অসফল প্রেমিক বলে, “সেদিন আমার সজল হৃদয় দুপায়ে গিয়েছে মাড়িয়ে”-তখন সেই সুরে কান্না কোথায়? কী আনন্দময় সুরের এই অভিব্যক্তি! তাই কোরাসে “যাক যা গেছে তা যাক”-এ হারানোর শোকের বদলে উচ্ছ্বাস ধ্বনিত হয়। এও যেন সর্বহারার স্বর। ঋত্বিক ঘটক একবার সলিল চৌধুরীকে একটি প্রেমের গান তৈরির নিদান দিয়েছিলেন, যে প্রেম হবে সপাট, সদর্প- এমনটাই আবদার ছিল ঋত্বিকের। তৈরি হল ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা’। নিজের ব্যর্থতাকে সঁপে দেওয়া যেন আগামীর ঝড়ের কাছে। “ওগো ঝরা পাতা/ যদি আবার কখনো ডাকো… আমি আবার কাঁদব হাসব/ এই জীবনজোয়ারে ভাসব”- স্বপ্নগুলো মৃত নয় তার কাছে। ঝরা পাতাকে বাতিলের খাতায় রাখছেন না তিনি। সেজন্য তার গানে তিনি প্রেমিকাকে বলেন, “ঝরাফুলে পল্লবে/এ মালা গাঁথো তবে”। যেভাবে রবীন্দ্রনাথ বসন্তে শুধুই ফোটা ফুলের মেলা দেখতে চান না, শুকনো পাতা ঝরাফুলকেও খুঁজে নেন আড়াল থেকে।  সলিলের গানে “জীবনবৃন্তের থেকে ঝরে/ কত না স্বপ্ন গেছে মরে”- এ কথা করুণ সুরে বেজে ওঠে না। তাই ‘তবু’ দিয়ে শুরু হয় পরের বাক্য। পথচলা ফুরোয়নি তার কাছে। তাই প্রেমের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “আজ তবে এইটুকু থাক/ বাকি কথা পরে হবে/ধূসর ধূলির পথ/ঝরে পড়ে আছে রথ/বহুদূর দূর যেতে হবে”। ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষের ওপর দিয়েও নতুন কোনো দিকে হেঁটে চলা।

দেশভাগের পরে উদ্বাস্তু সমস্যা, গান্ধী হত্যা, কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়া, ধীরে ধীরে খাদ্য আন্দোলন, নেহরুর মৃত্যু, চীন ভারত যুদ্ধ, কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে যাওয়া, ভারত পাক যুদ্ধ প্রভৃতি নানাবিধ সংকট মধ্যবিত্তের যাপনকে পাল্টে দিয়েছিল। কলকাতা এখন আর উনিশ শতকের মতন উজ্জ্বল নয়, মলিন। বাবুবিলাস, রঙিন জীবনচর্যার বৈভব আর নেই। এখন কলকারখানার ভোঁ, শহুরে ধুলো, অভাব, দারিদ্র্য আরও স্পষ্ট। স্বাধীনতা পরবর্তী এই ওঠানামাগুলোকে সামলাতে সামলাতে ততদিনে সংস্কৃতিতে সে খুঁজে নিয়েছে এস্কেপ রুট। উত্তমকুমার হয়ে উঠেছেন ফেনোমেনন। আকাশবাণী হয়ে উঠেছে নাগরিক বঙ্গমানসের আশ্রয়। বাংলা গানে ‘বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা’ বা ‘নিশিরাত বাঁকাচাঁদ’-এর মতন অসম্ভব ভালো মেলোডি তৈরি হয়েছে, যে গানে রয়েছে পরম সুখ, পরম স্বস্তি। বাঙালি  মজে ছিল সেই গানেই। “এ জীবনে যতটুকু চেয়েছি, মন বলে তারও বেশি পেয়েছি”-একেই দীর্ঘস্থায়ী প্রলেপ বলে ধরে নিয়েছিল বাঙালি।  এমন সময়, ষাটের দশকের শেষের দিকে মধ্যবিত্ত বেঁচে থাকা আরও বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হল। নকশাল আন্দোলন শহরের অন্ধকারকে সামনে নিয়ে এল। আশা,  আকাঙ্খা, সংশয়, আতঙ্ক সব জমা হচ্ছে মানুষের মনে। থমথমে হয়ে উঠছে চারপাশ। সংস্কৃতিতে খুব হেলদোল নেই। সাহিত্য বা সিনেমা এই নতুন রাগী তরুণ সমাজের কথা বলছে বিক্ষিপ্তভাবে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র শেষ দৃশ্যে চেয়ারটেবিল ভাঙচুরের দৃশ্য বা বন্দুক হাতে নিয়ে সিদ্ধার্থের প্রতিমূর্তি তখনকার তরুণদের এবং তাদের রাগের প্রতিনিধি। হারবার্ট মার্কুইজ কথিত ‘গ্রেট রিফিউজাল’ তখনকার তরুণের ধর্ম। বিনয় ঘোষের মতে, বিপ্লবের থেকেও বেশি জরুরি তখন দ্রোহ। এহেন পরিস্থিতিতে তৈরি হচ্ছে ‘কে তুমি নন্দিনী’-র মতন গান। সেই গানের চিরন্তনতা অস্বীকার না করেই বলা যায়, সেই গানে সময়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে না। এই গানের বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই সেসময়। দীপক মজুমদার বলছেন, “আমরা যে শহরে বাস করি, তার সমকালীন সঙ্গীত বলে কিছু নেই”। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘ছেলে গেছে বনে’-ই এইসময়ের ভাষ্য। তার ভাষাতেই বলা যায়, “প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা// চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য/কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া”। এইসময়ের গর্ভে জন্মেছে অনন্য রায়ের কবিতা। তুষার রায়ের ; “পুলিশ ওরে পুলিশ/ কবির সামনে আসার আগে টুপিটা তোর খুলিস”-লব্জতে পরিণত হয়েছে সেসময়। এরকম সময়ে, ১৯৬৯ সালে সলিল তৈরি করলেন, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’। এই সুদূরের ধ্রুবতারাটির কাছে পৌঁছনোর মতন নির্লিপ্তিতেই অবস্থান করছেন তখন সলিল। বলছেন, “কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বলেছিল/সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল”। কাদের শ্লেষে বিঁধছেন সলিল? আলো জ্বালানোর কথা ছিল এমন কোনো কর্তৃপক্ষকে? “নিজের ছায়ার পিছে/ঘুরে ঘুরে মরি মিছে”-যে ডিসিলিউশনের কথা বলেছিলেন সলিল তেমনই কিছুকে নিয়ে আসছেন গানের কথায়। “আমি পথ খুঁজি না তো/পথ মোরে খোঁজে”-তাকে বিপথগামী বলেছিল যারা, তাদের কথা বলছেন? “আমার চতুর্পাশে/সবকিছু যায় আসে/আমি এক তুষারিত গতিহীন ধারা”- এক প্রবল সন্ধিক্ষণে এমন নিরাশ উচ্চারণ। মজার বিষয়, তার কিছুদিন পরেই সলিল তৈরি করছেন, ‘এমনি চিরদিন তো কভু যায়না’-র মতন গান। “এই যে সর্বনাশা/চারিদিকে এই নিরাশা/কিনারা মন পায় না”-এই সংলাপ তো আসলে নিজের সঙ্গেই। “আলেয়ার আলোয় মেতে/ভাবলে আঁধার গেল কেটে”-সুর যেন নিশান দেখাচ্ছে সংশয়মুক্তির। “দু পায়ে হয়ে খাড়া/একবার ফিরে রুখে দাঁড়া”-সুরের দৃঢ়তা চমকে দেবে। এই গান তৈরি হওয়ার সময় নকশাল অভ্যুত্থান হয়ে গেছে। এইসময় কিন্তু সলিল বলিউডের সঙ্গীত পরিচালনাও করে চলেছেন। যে কলকাতায় সেসময় ‘ব্ল্যাকআউট’ হয়েছে প্রতিবেশী দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলার জন্য, যে মহানগরীর রাস্তায় তখন চাপ চাপ রক্ত জমে, যে কলকাতা তখন একটা প্রজন্মকে লাশ হয়ে যেতে দেখছে সেই ভয়াবহ কারফিউর কলকাতা শহরের বুধবারের বিকেল গোধূলি সন্ধ্যে কিন্তু কেটেছে রেডিও তে ‘বিনাখা গীতমালা’-র অপেক্ষায়। সলিল এইসময় বম্বের উজ্জ্বল তারকা সঙ্গীত পরিচালক। শচীন দেব বর্মন নৌশাদ ও পি নায়ার শঙ্কর জয়কিষেণ মদনমোহনদের সঙ্গে বম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি পাল্লা দিয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন, এবং সেটা ইন্ডাস্ট্রির শর্ত মেনেই। যে গানগুলোর কথা বলা হল সেগুলো গেয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুবীর সেন, সাগর সেন, পিন্টু ভট্টাচার্যরা। আবার , “আমি চলতে চলতে থেমে গেছি”-র মতন গান পিন্টু ভট্টাচার্যের পাশাপাশি লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠেও শোনা গেছে। লতা মঙ্গেশকর সেসময়ের বাণিজ্যসফল গায়িকা, গগনচুম্বী খ্যাতি তার। এই লতা মঙ্গেশকরকে দিয়েই সলিল গাইয়েছেন আরও একটি উল্লেখযোগ্য গান- ‘আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের’। জরুরি অবস্থা পেরিয়ে তখন সদ্য বামশাসন শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সময়ের উদ্দামতা খানিক কমেছে। সত্তর থেকে বাংলা গানের মোড়ও ঘুরে গেছে। তথাকথিত ‘স্বর্ণযুগ’ শেষ। সুরের ধাঁচে আর সেই সুখী মিষ্টত্ব বা এক অর্থে ঈষৎ ন্যাকামি নেই। সুর অনেক বেশি চটুল হয়ে উঠছে, কথাও আর মোলায়েম থাকছেনা এবং সামান্যতম কাব্যগুণটুকুও বজায় থাকছেনা। বিতর্ক থাকতেই পারে এই বক্তব্য নিয়ে। তবে সেই বিতর্কে আমরা ঢুকব না। এটুকু বলা যেতে পারে সলিল এইসময়ের সুরের ধাঁচ বুঝতে পেরেছিলেন। সেই সুরের ধাঁচেই লতার গাওয়া এই গানটি কম্পোজ করা। এই গানের কথাগুলোর দিকে তাকাই, “চাঁদ ফুল জোছনার গান আর নয়/ ওগো প্রিয় মন/ খোলো বাহুডোর/ পৃথিবী তোমাকে যে চায়” , “আর নয় নিষ্ফল ক্রন্দন/শুধু নিজের স্বার্থের বন্ধন/ খুলে দাও জানালা আসুক/সারা বিশ্বের বেদনার স্পন্দন”। সরাসরি নস্যাৎ করছেন আধুনিক বাংলা গানের চিরাচরিত বিরহ প্রকাশের ধারাকে। প্রেমের চাঁদ ফুল জোছনার মোটিফ বাংলা গানে যেভাবে উপস্থিত তাকেও অস্বীকার করছেন তিনি। অনেক মুক্ত করে দিচ্ছেন সেই পরিসরকে। “কার ঘরে প্রদীপ জ্বলেনি”- এই পংক্তি একলহমায় মনে করিয়ে দেবে “কার ঘরে জ্বলেনি দ্বীপ” এই লাইনটিকে। সলিল সেইসময়ের চেতনা থেকে আদৌ সরে আসেননি। কিন্তু সুরের ধাঁচ সময়ের দাবি মেনেই। গানটি গাইছেন লতা মঙ্গেশকর, যার গলাতেই মূলধারার জনপ্রিয় গানগুলো শোনা যায়। ‘গাঁয়ের বধূ’, ‘রানার’ , ‘পাল্কি চলে’-র রেকর্ড গ্রামাফোন কোম্পানির থেকে বেরনো নিয়ে আপত্তি তুলেছিল পার্টি এককালে। সলিল তখন বলেছিলেন তারা মানুষের থেকে ‘আইসোলেটেড’। সলিল তা নন, তাই সমকালীন মূলধারার সঙ্গীতকে ব্যবহার করেও তিনি তার কথা পৌঁছে দিতে চাইছেন মানুষের কাছে। এ কাজে তিনি একা। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার কাজ আরও শক্ত।

এই সত্তরেই ওই রাগী তরুণ সমাজের ভেতরেই কিন্তু গোপন ইস্তেহারের মতন, গেরিলাযুদ্ধের মতন ঘটে গিয়েছে ‘সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক’ নামক একটি ঘটনা। ‘বিটলস’ নামক একটি ঝড়কে সম্বল করে বাংলা গানে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটাচ্ছিলেন একদল তরুণ। তাদের দায় বাংলা গানের প্রতি ততটা ছিল না, যতটা ছিল একটি বিশেষ রাজনীতির প্রতি, একটা বিশেষ সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা অবশ্যই ছিল তাদের। কথা হচ্ছে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-কে নিয়ে। তাদের প্রধান ঘোড়সওয়ার একজন ক্ষণজন্মা, সত্যিকারের বিদ্রোহী একজন মানুষ, গৌতম চট্টোপাধ্যায়। তাদের এক্সটেন্ডেড প্লে আর পি এম রেকর্ডে বেজেছে “রানওয়ে জুড়ে পড়ে আছে শুধু কেউ নেই শূন্যতা”। আকাশে যখন ঝড় উঠে যাবে বলে মেঘ থমকিয়ে থাকে তখন তারা যেন ব্যোদলেয়ারের বিষাদের ভয়েজে পাড়ি দেয়। জীবনানন্দের বিষণ্ণতার উত্তরাধিকার বহন করে তারা। “হায় ভালবাসি”-তে তারা আহ্বান জানাচ্ছে “সেদিন কাছে এসো/ভালবাসি একসাথে এই সবকিছু”। এই “সেদিন” নগরে বন্দরে কাজ করে চলা বহু মানুষকে ঘিরে জমে থাকা আশার বিস্ফোরণের দিন। বাউল সংস্কৃতিকে তারা মনে করতে চায়। জ্যাজ বা পপ থেকে উঠে আসা জীবনাদর্শ, যাপন এবং সাংস্কৃতিক পরিসরই তাদের উপজীব্য। তারা আবহমানের বাংলা গানের নয়। তারা বাংলা সংস্কৃতিতে বহিরাগত, পরিত্যক্ত। সলিল যেখানে মূলস্রোতে মিশেছিলেন সেখানে তারা নেই। তারা নতুন শ্রোতা তৈরি করছে। তারা সলিলের থেকে অনেক বেশি প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয়েছেন। সলিলকে বেশ কিছু অংশে সুরে ধারণ করেছেন তারা। শুধু সলিলের উদযাপন এখানে বিষাদ। কিন্তু তারাও আশার আলো দেখেন। সলিলের গাঁয়ের বধূ বা সেই মেয়ে তাদের গানে “রাবেয়া কি রুকসানা” হয়ে শহরের বাগানে ফুল হয়ে ফুটেছেন। তাদের ‘ফিরে আসব মাগো কেঁদোনা’-তে বিষাদ সত্ত্বেও প্রত্যয় রয়েছে ফিরে আসার। শক্তির “আমায় তুই আনলি কেন/ফিরিয়ে নে”-র উচ্চারণ নয় তা। গৃহহারা উদ্বাস্তুদের শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তারা ‘ঘরে ফেরার গান’ তৈরি করছেন। এই রক্তাক্ত তরুণদের বাংলা গানের থেকে সলিলকে ছাড়া আর কাউকে পাওয়ার ছিল না। সলিলের গানই ছিল সাংস্কৃতিকভাবে প্রতিকূল এই পরিবেশে তাদের কাছে একমাত্র সলিডারিটি। কিন্তু “পঞ্চাশে লাখ প্রাণ দিছি/মা বোনেদের মান দিছি/জান কবুল আর মান কবুল”-এই উচ্চারণ নেই তাদের গানে। “ধিতান ধিতান বোলে”-র ছন্দে “এ দেশ তোমার আমার/আর আমরা গড়ি খামার” এই ঘোষণা নেই। তাদের গানে আছে চৈত্রের কাফন, অনেক বেশি নাগরিক, অনেক বেশি বোহেমিয়ান। এখানে মানবমুক্তির স্বপ্ন “কিঞ্চিৎ সুখী পাখি”-দের মতন একান্ত সংলাপে  ঘোরে। এই গানের কথাকে তারা পৌঁছে দিতে চান না একজন কৃষকের কাছে, অথবা একজন সাধারণ বাংলা গানের শ্রোতার কাছে। বরং এতদিনের শুনে আসাকেই তারা শক দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে মহীন একটা বিশেষ যাপন, একটি সময়ের উচ্ছৃঙ্খলতার, নিয়মভাঙা সাহসের প্রতিনিধিত্ব করছে তারা। ‘কৌরব’ গোষ্ঠীর কবিতাযাপন, স্বদেশ সেন বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের বোহেমিয়ানিজমের সঙ্গে সেখানে মিশেছিল সময়ের রাগ।

মহীনকেও পেরিয়ে যাই। আধুনিক বাংলা গানের বয়ে চলা আর খরস্রোতা নয়। যেন দীর্ঘ চড়া পড়ে যাওয়ার মধ্যে বসবাস করছে তা। এইরকমভাবে এসে পড়ল নব্বইয়ের দশক।  প্রবাসফেরত এক বাঙালি, উপস্থিতিতে যে আগন্তুক অনেকাংশেই, তেমন এক খোঁচা খোঁচা দাড়িওলা, আপাতভাবে শান্ত অথচ ভেতরে প্রবল রাগ চেপে রাখা ভদ্রলোক বাংলা গানের ধ্বংসাবশেষে গিটার কাঁধে এসে দাঁড়ালেন সদম্ভে। সে একক, সে কোনো প্রতিষ্ঠানের দখলে নেই। কোনো সরকারের কাছে সে দায়বদ্ধ নয়। মুক্তির নতুন আলেখ্য তৈরি করল সে তার বাংলা গানে। আর আধুনিক বাংলা গান এবার সততই বাঁক নিল।  আবহমানের ইতিহাস, বাংলার পদাবলী কীর্তন তার মস্তিষ্কে, মননে। লালনকে সে লালন করে অন্তরে। তেমনই বব ডিলান, পীট সিগার, হলফ্ বিয়ারম্যান, লেওনার্ড কোহেনদের গানকেও অভিজ্ঞতায় নিয়েছেন তিনি। এমন একজন সাঙ্গীতিক বাঙালি নতুন বাংলা গান তৈরি করলেন। যে গান লিরিকে অনন্য। ভাষায় আনকোরা। অবশ্যই তার নাম কবীর সুমন। কবীর সুমন কোনো সুপারম্যান নন, শুধু সেইসময়ে সঙ্গীতের যে সর্বাধিক জরুরি কাজটা ছিল, সুমন তাই ঘটালেন। তিনি অন্তত বেশ কয়েকটা প্রজন্মকে রাস্তা বাতলালেন। সুমন দৃপ্তকন্ঠে বললেন, “আগামী দিনগুলোকে সামনে রেখে সমঝে চলো বন্ধুরা”। প্রেমের স্টেটমেন্টে এল অদ্ভুত জোর, সরাসরি ঘোষণা রইল, “শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই”। নাগরিক ভাষ্যে বলা হল “আমাদের জন্যই ভোরের আকাশ/লালচে পুবের কোণে আসে আশ্বাস”, বলা হল, “আমরাই কলকাতা আজ আগামীর/আমরাই গান গাই আমির তুমির”। সেই গানেরই শেষে বলা হচ্ছে, “আমার জীবন থেকে উঠে আসা সুর/তোমাকে শুনিয়ে আমি যাব বহুদূর”। সুমন বলছেন, “ভরসা থাকুক”। বলছেন, “ইচ্ছে হল একধরনের স্বপ্ন আমার/মরব দেখে বিশ্বজুড়ে যৌথখামার” অথবা, “ইচ্ছে করে অন্য একটা আকাশ দেখি/একই মাটির ওপর অন্য দিগদিগন্ত”, এইগানে বলছেন, “শস্য এবং ফুলের জন্য গান গেয়ে যাই”। বলেছেন, “বোমা নয় সব্বাই যেন খেতে পায়”। প্রতিটা ঘটনার নিজস্ব প্রতিক্রিয়াকে তিনি ভাবনায় নিয়ে এসেছেন, সমভাবুক করে তুলতে পেরেছেন অন্য নাগরিককে। এই নাগরিক মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিমান। সুমন একজন ইন্ডিভিজুয়াল হিসেবে তার অনুভবকে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। আবার নাগরিক আত্মমুখিনতাকে তার গানের মাধ্যমে সন্ত্রাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। তাই তার গানে রিকশাচালক বালক “মুক্তির ঘুড়ি”-র খবর পায় নাগরিক বঞ্চনাকে উপেক্ষা করে, ঠেলাভ্যান চালক বাঁশুরিয়া “নকল ভন্ড কৃষ্টি” কে আহত করে।

সুমন সলিলের সংস্রবে ছিলেন। তার ভাবনার শরিক হতে পেরেছিলেন। নব্বইয়ের গোড়ায় তার আত্মপ্রকাশের আগে ‘নাগরিক’ বলে তার একটি স্বল্পশ্রুত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করতে হয়। ‘নাগরিক’-এর গানে বলা হচ্ছে, “হারিয়ে যেও না/রক্তকিংশুক দিনের আশা”, বলা হচ্ছে “এখনো কিছু হাত হতাশা রুখছে”। এক সম্ভাবনাকে লালন করছে এই গান। ‘নাগরিক’-এর রেকর্ডিং এ ‘আমাদের জন্য’ বা ‘তোমাকে অভিবাদন’ এর কোরাস শুনলে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে যে সলিল আদতে উপস্থিত এই সঙ্গীতচেতনাতেও। ‘সহসা এলে কি’-গানে সলিলের প্রভাব যেন অনিবার্য। নতুনের কথা ‘নাগরিক’-এর গানে উজ্জ্বল, “অন্য কথা অন্য গান শোনো এবার কলকাতা”। এই অন্য গানের তালিম সময়ই দিয়েছে। সলিল একা হয়েও সমষ্টির চেতনা থেকে কোনদিন বেরোতে পারেন নি। এই গানে ব্যক্তির ভাবনা প্রবল। “কত জানলার কাছে কাতারে কাতার/ মানুষ জমেছে দাবি গরাদ ভাঙার/ ভাঙে যেন জানলার গরাদ সবার”-এখানে সমষ্টির চেতনা আসছে ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে। তাই এই গানেই বলা হয়, “কত জানলার কাছে একলা মানুষ/একলা পৃথিবী তার যেন মহাকাল/কত জানলায় আসে একার সকাল”। এখানে সলিলকে অতিক্রম করছে এই গান, এবং একইসঙ্গে এত দশকের বাংলা গানকেও।

উত্তরাধিকার বড় কঠিন বিষয়। বাংলা গান তার উৎকর্ষ থেকে এখন কতদূর সরে এসেছে তা কম্পোজিশনে মৌলিকতার দারিদ্র্য দেখে বোঝা যায়। কিন্তু তাও ভাঙচুর এখনও করে চলেছেন কেউ না কেউ, কোনো না কোনো ভাবে। সলিল চলে গেছেন। সাঙ্গীতিক জীবনের শেষের দিকে এসে সলিল তৈরি করেছিলেন একটি গান, “এই রোকো/ পৃথিবীর গাড়িটা থামাও/ আমি নেমে যাব/ আমার টিকিট কাটা অনেক দূরের/ এ গাড়ি যাবেনা/ আমি অন্য গাড়ি নেব”। যথারীতি এই সুরেও আনন্দ পরিষ্কার। কোনো যবনিকা পতনের বিষাদ নেই সেখানে। বার্গম্যানের নাইটের মতন মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলার ইমেজারি ভেসে ওঠে যেন। সলিলকে কতটা বুঝল তার সমসময়, এই প্রশ্ন থেকেই যাবে। যেভাবে মেলোডিক গ্যাপ মিলিয়ে দেয় কাউন্টারপয়েন্ট, তেমনই একটি সাংস্কৃতিক দূরত্বের মাঝে একটি বিন্দুতে আধুনিক বাংলা গানের কাউন্টারপয়েন্ট হয়ে রয়ে যাবেন সলিল।

Show More

Related Articles

One Comment

  1. “প্রসঙ্গ সলিল”, যখন, তখন তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তো কোনো বক্তব্য থাকতেই পারে না, তবে, ভাবনা, research, এবং লেখনীর বাঁধন এর আন্তরিক প্রশংসা করছি. “আগামীকাল” কুর্নিশ রইলো..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami