ভ্রমণ

লাদাখ সুন্দরী লাদাখ

তিস্তা রায় বর্মন

পুজো শেষের বিষণ্ণ আবহাওয়া, কালীপুজোর প্রস্তুতি, শীত এসে পড়ার উত্তেজনা শহরটাকে কেমন ঘেঁটে দিয়েছে। কেন জানি না মনে হয় এরকম সময়ে কলকাতাকে খানিক একা থাকতে দেওয়া উচিত। এরকমই সময়ে ঠিক এক বছর আগে আমার উত্তেজনা তখন তেরো নদী পেরোবে পেরোবে করছে। ১৯শে সেপ্টেম্বরের এক সপ্তাহ আগে থেকে গরম জামা কিনে কিনে রুকস্যাক ভর্তি করা হচ্ছে আর সঙ্গে শরীরে অক্সিজেন বাড়ানোর ওষুধও। লোকে বলে এবং লোকের থেকেও বেশি ইন্টারনেট বলে যে লাদাখে অক্সিজেন কম। শুনে অবাক লেগেছিল আমার। এত এত লোক যে থাকে সেখানে, তারা রোজ কষ্ট করেই নি:‌শ্বাস নেয়?‌ যদি এত কষ্টই হয়, তাহলে ছেড়ে চলে আসেনা কেন?‌ এর উত্তরটা আমি লাদাখে গিয়ে পেয়েছি।
১৯শে সেপ্টেম্বর রওনা দিলাম ডায়মক্স ওষুধের কোর্স করে নিয়ে। লে এয়ার্পোর্টে নামতেই বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল। উপদেশমত একটা গোটা দিন হোটেলে বিশ্রাম নিলাম। যাকে বলে আ্যাক্লামাটাইজড হওয়া, তারই প্রয়োজনে এত সব আয়োজন। পরদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ মোটরেবল রাস্তা খারদুংলা পাস পেরিয়ে শোক নদীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া। সেদিন শুধু ডায়মক্স নয়, তার সঙ্গে কোকা ৩০, কর্পূর, পপকর্ন, ইত্যাদি তালিকায় যোগ হতে থাকল। এগুলো সেই সব অক্সিজেন বাড়ানোর ওষুধ এবং টোটকা যা আমার মা–মাসিরা সারাজীবন ধরে কারো না কারোর মুখ থেকে শুনেছে। এ ছাড়াও রয়েছে ৩ লিটারের অক্সিজেন সিলিন্ডার। আমরাও গপাগপ সেসব মুখে পুরলাম বা শুঁকতে লাগলাম। খারদুংলা পাসের উচ্চ্তা ১৮,৮৩০ ফুট। উচ্চতা শুনেই আমি আগে ভাগে তিন চারটে জ্যাকেট, গ্লাভস, দুটো মোজা, টুপি পরে তৈরি। সাবধানের মার নেই, সবাই জানেন। কাজেই নেইমারের মতন পপাত চ যাতে না হতে হয় তার বন্দোবস্ত করা রইল। পৌঁছলাম খারদুংলা। মনে হচ্ছিল আমার আশেপাশে আর কিচ্ছু কোথাও নেই। সব আমার নিচে। “আজ ম্যায় উপর, আসমা নীচে” জাতীয় একটা অহমিকা বোধ করছি তখন। আমি যেন সর্বজ্ঞ দর্শক। পৃথিবীর সমস্তকিছু ছাড়িয়ে উর্ধ্বে উঠে গেছি।
আমার এসব আগডুম বাগডুম কল্পনার মাঝেই আচমকা হইহই রইরই কান্ড। আমার মাসতুতো দিদি পৃথিবীর উচ্চ্তম রাস্তায় সেলফি তুলবে বলে জ্যাকেট না পরেই নেমে পড়েছে। হাঁসফাঁস করতে করতে দুটো সেলফি কোনমতে তুলে ঠোঁট নীল করে সে গাড়িতে ফিরল। তড়িঘড়ি করে তাকে অক্সিজেন মাস্ক পরাতে হল। সেলফির কোটা তখনও পূর্ণ হয়নি বলে অক্সিজেন মাস্ক পরার পরেও ঝট করে আরও দুটো সেলফি তুলতে সে যখন ব্যস্ত তখন আমাদের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। যতই হোক, বাঙালি ট্যুরিস্ট। সে যতই ভূপর্যটক মন্দার বোস আমাদের পূর্বপুরুষ হোন, আমাদের এত অকুতোভয় হলে চলেনা।
সবাই যে যার মতন ছড়িয়েছিটিয়ে গেছে গাড়ি থামতেই। বিষয়টা যে দার্জিলিং যাওয়ার পথে কার্শিয়াং-এ দাঁড়ানো নয় তা কে বোঝাবে?১৮,৮৩০ ফুট উচ্চতায় একে ওকে ডাকার জন্য বেশ দৌড়াদৌড়িই করে ফেলেছিলাম। তার খানিক পরে ভেবে দেখেছি, ঐ উচ্চতায় ঐ পরিমাণ এদিক ওদিক করলাম, কই? হাওয়ায় হাড় হিম হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও কষ্ট তো তেমন হয়নি। না কি এখন কিছুই টের পাচ্ছিনা, সময়মতন হাড়ে হাড়ে বুঝব?
তার দুদিন পরে প্যাংগং লেক যাওয়া। যাওয়ার পথে একটি দোকানে খেতে নামলাম। দোকানের মালিকের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বেশ কিছু মিথ ভাঙল। সেই কথোপকথনের খানিক অংশ এখানে তুলে দিলাম—
আমি:‌ ভাইয়া জী, আজ হমলোগ প্যাংগং যা রেহে হ্যায়। হমারে সাথ এক ক্যানসার পেশেন্ট ভী হ্যায়। হমনে সুনা থা কি লেক মে রাত গুজারনে সে ব্রিদিং ট্রাবল হোতা হ্যায়।
ভদ্রলোক:‌ আপ কাহাঁ সে হো?‌
আমি:‌ কলকাত্তা।
ভদ্রলোক: আপ যাহাঁ রেহেতে হো, ওয়াহা কি পলিউশন মে সাঁস লে পাতে হো?‌ হম আগার ওয়াহা রেহেতে তো সাঁস নেহি লে পাতে। ইয়াহা তো খুলা আসমান হ্যায়। লিজিয়ে সাঁস।
এমন সপাট উত্তরের পর আর কিছুই বলা যায়না। আমি অবশ্য তাকে বলিনি যে হালের বাংলা সিনেমায় এভারেস্টের চুড়োয় একটা নাকতলা উদয়ন সংঘর প্যান্ডেলমার্কা গম্বুজের ভেতর চরিত্ররা দিব্যি ডায়লগবাজি করে কাটিয়ে দিতে পারে এবং ইয়েতির সঙ্গে টুকি খেলতে পারে।
তবে এসব ইয়ার্কি ছেড়ে অপ্রিয় সত্যটা বলে ফেলা যাক। আমরা বাঙালি পর্যটকরা ইয়েতির ভয় না পেলেও বেশি বৃষ্টির ভয় পাই, বেশি শীতকেও ভয় পাই আবার বেশি নিস্তব্ধতাকেও ভয় করি। অথচ এই তিনটে না থাকলে পাহাড় বলে তাকে মানতেই চাই না।
কত কত যুগ যে প্যাংগং এভাবেই স্থির হয়ে রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ‌যতই চীন আর ভারত ঢিল ছুঁড়ে ছুঁড়ে লড়াই করুক, প্যাংগং যেন নার্সিসিস্টের মত নিজেকেই সাজিয়ে গেছে। এক ফুল দো মালি। মালিদের ঝগড়ায় ফুলের কোনও ক্ষতি হয়নি। প্যাংগং–‌এ অনেকেই গেছেন, রাতেও থেকেছেন, ধামাকাদার বলিউড সিনেমার শুটিংও হয়েছে।
কিন্তু আমি ঘটনাক্রমে একটা অন্য রূপ দেখে ফেলেছিলাম প্যাংগং–‌এর। লেকের আশপাশের সমস্ত জায়গায় রাত ১০টার পর বৈদ্যুতিক উৎস বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমি অবশ্য অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম। তাই অন্ধকারের গাঢ়ত্বটা টের যখন পেলাম তখন আমি একফোঁটাও প্রস্তুত ছিলাম না। ঘুমটা ভাঙে সজোরে দরজা ধাক্কা দেওয়ার আওয়াজে। ঘুমের ঘোরে সেই আওয়াজটা শোনার দরুণ মনে হল কোনো হলিউডি হররের দৃশ্য। বুকটা ধড়াস করে উঠল আচমকাই।
অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুললাম। এই মুহূর্তে ভয় পাওয়ার কথা। সিনেমা হলে অস্তরশস্তর মজুত রেখে তারপর দরজা খোলা হত। আমি এমনকি টর্চ জ্বালানোর কথাও ভুলে গেলাম।‌ দরজা খুলে মনে হল চোখের সামনে ম্যাজিক হয়ে চলেছে। আমার মনে হল কেউ যেন দরজা ধাক্কা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙালো। আমায় দরজার বাইরে নিয়ে এল। তারপর তো চোখ আপনা আপনিই ম্যাজিসিয়ানের ম্যাজিকের দিকে চলে যাবে। প্যাংগং–এ সমস্ত হোটেল এবং তাঁবু লেকের ঢালে বানানো। যার ফলে হোটেলের ঘর বা তাঁবুর থেকে বেরোলেই বিশাল প্যাংগং। পাশের পাহাড়গুলো কালো হয়ে রয়েছে। আর আমার মাথার উপর বিশাল কালো আকাশ। তাতে ফুটে রয়েছে অসংখ্য অগুন্তি ঝলমলে তারা। শুধু সাদা নয়, লাল, গোলাপী, বেগুনী, খয়েরি, নানা রঙের। ভীষন জ্যান্ত তারাগুলি। অনেক অনেক কথা বলছে। আমার যেন হুট করে মনে হল যে অক্সিজেন কমে আসছে। আমার বুক ধক উঠল। ঠান্ডায় সমস্ত শরীর ভিতর থেকে কাঁপছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন দমবন্ধ হয়ে এল। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। গলা ভারী হয়ে এল। আবারও ভয় হতে লাগল। ভয়টাই আমার সবচেয়ে প্রকট অনুভূতি। আর কিছু না ভেবে আমি দরজাটা বন্ধ করে ঘরে ঢুকে পরলাম। আমি জানিনা ঐ ছবিটা আমি কাউকে এক বিন্দুও দেখাতে পারলাম কিনা। হয়ত পারলাম না। তার থেকেও বড় কথা আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে অনেক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ঐ অপার্থিব সৌন্দর্যটাকে উপভোগ করত। কিন্তু আমি ঐ কয়েকটা মুহূর্তের জন্যই বাকরূদ্ধ হলাম। আজও ঐ ভয়ঙ্কর অস্বাভাবিক সৌন্দর্য আমার চোখের সামনে এলে কেমন জানি হু হু করে, খালি খালি লাগে আর দমবন্ধ হয়ে আসে। এই শূন্যতার ভাবটা গোটা লাদাখের অনেক জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ করে চলে আসবে। নগ্ন পাহাড়গুলো, রাস্তাগুলো, নদীগুলো, নদীর পাশের পাড়গুলো, লেকগুলো— সব যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের।
কলকাতায় ফিরে এসে বুঝলাম নিঃশ্বাসের কষ্ট নিয়ে যা যা শুনেছিলাম তা মিথ্যে নয়। কিন্তু তার কারণ অক্সিজেনের অভাব নয়, সৌন্দর্য। ঐ ভয়ঙ্করী রূপের সামনে দমবন্ধ হয়ে যায়। তাই এত ব্যবস্থা। লোকে বোঝে না এর কারণ, ভয় পায়। আমি বুঝেছি, ভয় পেয়েছি, কিন্তু নেশার মত আবার সেখানে ছুটে যাওয়ার জন্য ছটফট করে চলেছি।
(‌বিশেষ বিজ্ঞপ্তিঃ স্বল্প পোশাকে খারদুংলা পাসে লাফাবেন না বা লাদাখের নানা অংশে সলমন খান কায়দায় ফুঁকে বেড়াবেন না, মারা পড়তে পারেন।)‌
তিস্তা রায় বর্মন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে আপাতত ‘আজকাল’ -এ কর্মরত। ভ্রমণপিয়াসী। পাহাড়প্রেমিক।
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami