চলচ্চিত্র

জোনাকি : অন্ধজনে দিলো না আলো, মৃতজনে দিলো না প্রাণ

মেঘদূত রুদ্র

জোনাকি : অন্ধজনে দিলো না আলো, মৃতজনে দিলো না প্রাণ

পরিচালক- আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত

অভিনয়- ললিতা চট্টোপাধ্যায়, জিম সর্ব, রত্নাবলী ভট্টাচার্য, সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ষষ্ঠ দিন নন্দনে দুপুর ১টায় দেখানো হল ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ খ্যাত পরিচালক আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্তের নতুন ছবি ‘জোনাকি’। ছবিটা দেখানো নিয়ে ফেস্টিভ্যালের শুরু থেকেই নানান টালবাহানা চলছিল। শিডিউলে লেখা ছিল ছবিটা দেখানো হবে রবীন্দ্র সদনে । কিন্তু আদিত্য চাইছিলেন ছবিটা নন্দনে দেখাতে। নাহলে ফেস্টিভ্যাল থেকে ছবি তুলে নেবেন- এমনটাও বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত নন্দন-১ এই ছবিটা দেখানো হল। ছবিটার প্রিমিয়ার হয়েছিল মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। সেখানে ছবিটা ‘সেকেন্ড অক্সফ্যাম স্পেশাল জুরি মেনশন ফর জেন্ডার ইকুইলিটি’ নামক একটি জটিল পুরষ্কার পেয়েছে। এছাড়া ছবিটি রটেরডাম ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও নির্বাচিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই সবার খুবই আগ্রহ ছিল ছবিটি নিয়ে। ‘আসা যাওয়ার মাঝে’ তো মুক্তির সময় বিভিন্ন কারণে টক অব দ্য টাউন ছিল। সেগুলোতে পরে আসছি। সবাই আসলে দেখতে চাইছিলেন প্রথম ছবি বানিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পরিচালক তার দ্বিতীয় ছবিতে কি করেন। হলে উপচে পড়া ভিড় হয়েছিল। বাংলার তাবড় তাবড় কিছু চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা ছবিটা দেখতে এসেছিলেন। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু ছবিটা দেখার স্মৃতি আমার কাছে একটা বিশাল বড় ডিজাস্টার হয়ে রয়ে গেল।

এই কথাটা বলার জন্য আমি কিছু লোকের হাতে খুনও হয়ে যেতে পারি। কারণ ফেসবুকে দেখলাম অনেকেই ছবিটাকে মাস্টারপিস, ওয়ার্ক অফ আর্ট, বাংলা ছবির দিশা বদলকারী ছবি ইত্যাদি বলছেন। কেন বলছেন তাই নিয়ে খুব বেশি যুক্তি এখনও চোখে পড়েনি। তবে এটা ঠিক যে বলার পেছনে স্নেহ, ভালবাসা, আবেগ আছে। সেই আবেগ কোথা থেকে আসছে আমি বলতে পারবোনা। কিন্তু তার ছিটেফোঁটা আমার মধ্যে এলে আমি খুশিই হতাম। কারণ আদিত্যর আগের ছবি আমার ভাল লেগেছিল। ছবিটা নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল বটে। যেমন ছবিটা যে আসলে  লেখক ইটালো ক্যালভিনোর ‘অ্যাডভেঞ্চার অফ অ্যা ম্যারেড কাপল’ গল্পের সিনেম্যাটিক অ্যাডাপ্টেশন সেই কথাটা ছবির টাইটেল কার্ডে লেখা ছিলনা। অর্থাৎ ঘটনাটা বেমালুম চেপে গিয়ে নিজের গল্প বলে চালিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিপন্ন হয়েছিল, এই নিয়ে ঘোটালাও কম হয়নি। এছাড়া ছবিটির স্ট্রাকচারের সঙ্গে একই গল্প নিয়ে (ঋণ স্বীকার করা) করা একই নামের কেওয়ান কারিমি পরিচালিত একটি ইরানিয়ান শর্ট ফিল্মের সঙ্গে এই ছবিটির আশ্চর্যজনক মিল পাওয়া গেছিল। যেটা কাকতালীয় হতে পারে কি না তা ঈশ্বরই বলবেন। এসব নিয়ে সেসময় বিস্তর লেখালিখিও হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়াতে। এছাড়া সংলাপ বিহীন এই ছবিতে কিছু কিছু জায়গায় খুব জোর করে চরিত্রদের দিয়ে সংলাপ না বলিয়ে ছবির সংলাপ বিহীনতাকে অক্ষুণ্ণ রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি আমার সমস্যাজনক লেগেছিল। তা সত্ত্বেও ছবিটা ভাল লেগেছিল। কারণ তাতে প্রবল যত্ন ছিল। এমন কিছু ছিল যেটা এখনকার বাকি ছবি করিয়েদের মধ্যে অধিকাংশরা কোনো ভাবেই করতে পারবেনা। কিন্তু ‘জোনাকি’ আমায় খুবই হতাশ করল।

 

ছবিটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ঘরানার। সেটা নিয়ে সমস্যা নেই। কিন্তু সমস্যা হল ছবিটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে খুবই শিশুসুলভ অ্যাবস্ট্রাক্ট এবং অংশবিশেষে খুবই চালাক ও প্রিটেনশাস অ্যাবস্ট্রাক্ট। সেই চালাকির কিছু নমুনা আমরা আগের ছবিতে পেয়েছিলাম। যেগুলো লিখলাম। ছবির খুব ডিটেইল্ড সমালোচনায় হয়তো যাবনা। সেটার খুব একটা প্রয়োজন বোধ করছিনা। ছবিটা আসলে নস্টালজিয়াকে নিয়ে খেলেছে। যেটা দর্শকের খুবই দুর্বল জায়গা। এই খেলার ফাঁদে পরে তাবড় তাবড় মানুষ বোকা হয়ে যায়। ছবির বিষয়বস্তু ও স্ট্রাকচার খুবই দুর্বল। কিন্তু ছবির মাধ্যমে খুবই সুচারু ভাবে মানুষকে এই নস্টালজিয়ার ট্র্যাপে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ললিতা চট্টোপাধ্যায়। অতীতের এক বিস্মৃত প্রায় অভিনেত্রী। যিনি উত্তম কুমারের নায়িকাও বটে। পুরনো বাংলা সিনেমার দর্শকরা তাকে চিনবেন। নতুনরাও কেউ কেউ জানে। এটা হল প্রথম ট্র্যাপ। এছাড়া আছে কিছু টুকরো টুকরো মুহূর্ত ও বস্তু। যেমন কমলালেবুর খোসার রস বেড় করার দৃশ্য। যেটা ছোট বেলায় সবাই করেছে। উত্তম কুমারের ছবির রেফারেন্স, পুরনো একটা বাড়ি, রেকর্ড প্লেয়ারে রবীন্দ্র সঙ্গীত, রাবীন্দ্রিক লুকের বাবা, ঝুলনের সেপাই, পুরনো কালো টেলিফোন ইত্যাদি। এগুলো খুবই যত্ন সহকারে মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্য ছবির বিভিন্ন খাপে প্লেস করা হয়েছে ছবির বাকি দুর্বলতা গুলোকে ঢাকার উদ্দেশ্যে। ছবিতে ৮০ বছর বয়সী ললিতা চট্টোপাধ্যায় ১৯ বছর বয়েসী মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। কেন করেছেন বিবেচনায় আমি যাবনা। পরিচালকের ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যপার। কিন্তু অভিনয়টা একেবারেই দাঁড়ায়নি। তিনি ৮০ বছর বয়সের অভিব্যক্তি দেবেন না ১৯ বছর বয়সের দেবেন সেই দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতেই ছবি শেষ হয়ে যায়। উনি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু সত্যি কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্যি। তবে এতে ওনার বিশেষ কোন দোষ ছিলনা। ওনাকে কী করতে হবে সেটাই যদি ওনাকে না বলা হয় তাহলে উনি করবেনটা কী। বাকিদের মধ্যে রত্নাবলী ভট্টাচার্যকে কিছুটা হলেও প্রেজেন্টেবল লেগেছে। অন্যদের অভিনয় ও স্ক্রিন প্রেজেন্স প্যাথেটিক। বিশেষ করে সংলাপ বলার দৃশ্য গুলো চূড়ান্ত শিশুসুলভ। আগের ছবিতে সংলাপ না থাকায় এবং ঋত্বিক চক্রবর্তীর মত ব্রিলিয়ান্ট অভিনেতা থাকায় ব্যাপারটা মানুষের নজর এড়িয়ে গেছে। এই ছবিতে সংলাপ লেখা এবং সেটা বলানোর দুর্বলতার বিষয়টার হাটে হাঁড়ি ভেঙে গেছে। ছবিতে কিছু কিছু ওয়েল ডিজাইন্ড শট আছে। খুবই ওয়েল ক্রাফটেড। দেখতে খুবই ভাল লাগে। কিছু দৃশ্য গুলোয় প্রাণ নেই। ছবির ক্যামেরা, সাউন্ড, মিউজিক ইত্যাদি যাবতীয় জিনিস করা হয়  চিত্রনাট্যের চাহিদা অনুযায়ী। মানে স্বতন্ত্রভাবে ব্রিলিয়ান্ট ক্যামেরার কাজ বা একটা দারুণ গান যেটা কিনা ছবির বিষয়ের সঙ্গে যাচ্ছেনা সেটা ক্যামেরার কাজ বা গান হিসেবে ব্যর্থ। আর এখানে অধিকাংশ জায়গাতেই এগুলো আগে ভেবে তারপর চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে। ফলে কোনোটাই সিনেম্যাটিক হয়নি। এটা করার জন্যই কি ছবির ক্যামেরা, এডিট, সাউন্ড সবই আদিত্যর যুগ্মভাবে করা?

ছবিতে জোনাকি অর্থাৎ ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের বাবা একজন বিজ্ঞানী যিনি কোনো এক জটিল বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে। সেই গবেষণার উপর কারুর বিশ্বাস নেই। জোনাকি একজন যুবকের সাথে প্রেম করে কিন্তু বাড়ি থেকে তার বিয়ে অন্য একজনের সাথে ঠিক করা হয়েছে। তার মা তাকে ওই যুবকের সাথে মিশতে বারণ করে। এবং একটা পয়েন্টে বাড়ির ঠিক করা লোকটির সাথেই জোনাকির বিয়ে হয়। একটা দম বন্ধ করা পরিস্থিতিতে সে পরে। তারপর ওই প্রেমিক যুবকের সাথে ওর যৌন সম্পর্ক হয় এবং ও সন্তান সম্ভবা হয়। তারপর ওর মিসক্যারেজ হয়। তারপর ও অসুস্থ হয়ে পরে। এই হল ছবির গল্প। গল্প এরকম হতেই পারে বা দুই লাইনেরও হতে পারে বা গল্প নাইই থাকতে পারে। কিন্তু তাকে সিনেমা হয়ে উঠতে হবে তো। এটা একটা ওয়েল মেড ইন্সটলেশন আর্ট বা ভিস্যুয়াল আর্ট। সেই জগতে তার গুরুত্ব থাকতেই পারে কিন্তু সিনেমা হিসেবে এটা আমার কাছে অন্তত সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

ছবিতে কিছু সিম্বলিক বিষয় ব্যবহার করা হয়েছে। চরিত্রের দমবন্ধ অবস্থা দেখাতে তাকে অক্সিজেন মাস্ক পড়ানো অবস্থায় দেখানো হয়েছে, জোনাকির স্বামী মানসিক ভাবে ওর সঙ্গে নেই সেটা বোঝাতে ওর স্বামীকে দিয়ে বার্থডে কেকে ওর মুখ গুঁজে দেওয়া দেখানো হয়েছে, মা তার সমব্যথী তা বোঝাতে মা কে দিয়ে সেই কেক মুখ থেকে চেটে চেটে খাওয়া দেখানো হয়েছে, এছাড়াও জোনাকির বাবা গবেষণায় ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করার দৃশ্য এবং তারপরই মায়ের মাথায় মশারি খুলে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য এগুলোর প্রত্যেকটাই সুদৃশ্য অথচ পীড়াদায়ক।

সব শেষে অনেকগুলো বাচ্চা মেয়ে হঠাৎ স্পেশাল এফেক্টে জোনাকি হয়ে গেল। এরকম অর্থহীন দৃশ্য এবং সিম্বলের খারাপ ব্যবহার খুব কম দেখেছি। দৃশ্যটা দেখার পর আশেপাশের অনেক লোক হাততালি দিয়ে উঠেছিল। তার মধ্যে অধিকাংশই বোধহয় হাততালি দিয়েছিল এই ভেবে যে যন্ত্রণাটা বোধহয় এবার শেষ হল। কিন্তু তারপরেও ছবি শেষ হয়না। ছবির প্রথম অর্ধটা নিয়ে নেওয়া যায়। কিছু মুহূর্ত কিছুটা হলেও তৈরি হয়েছে। যেমন কমলালেবুর খোসার রস বের করার দৃশ্য, উত্তম কুমারের ছবি দেখতে দেখতে দুজনের কাছে আসার দৃশ্য ইত্যাদি। কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধ নেওয়াটা প্রায় অসম্ভব। এখানে এসে ছবিটা পুরো ঘেঁটে ঘ হয়ে যায়। হয়ে দাঁড়ায় একধরণের ইউরোপীয় আর্ট সিনেমার ব্যর্থ অনুকরণ। যে জিনিস বহু আগে ওইসব ছবিতে অনেক ভালভাবে করা হয়ে গেছে। বাংলায় হয়ত করা হয়নি। কিন্তু যখন একটা ছবি দেখা হয় তখন সেটা বাংলা ছবি এটা মাথায় দেখে তো দেখা হয়না। এটাও মাথায় রেখে দেখা হয়না যে এর আগে বাংলায় এসব হয়নি। এবং এটাও মাথায় রেখে দেখা হয়না যে যেহেতু আগে হয়নি সেহেতু অনেক দুর্বলতা ক্ষমা করে দিতে হবে।

ছবিটা ঠিক কোন সময়কালের সেটা স্পষ্ট নয়। তাহলেও উত্তম কুমারের ছবি, টেলিগ্রাম ইত্যাদি দিয়ে কিছুটা হলেও বোঝা যায় ছবিটা হয়ত ৫০-৬০ এর দশককে ধরছে। তার সঙ্গে বর্তমান সময়কেও ধরেছে। দুটো সময়ের এই খেলাটা খারাপ না। কিন্তু স্পেস নিয়ে কোন রেফারেন্স নেই। জায়গাটা কলকাতা নয় এটা ছবি থেকে জানা যায়। কিন্তু সেটা কোথায় তা জানা যায়না। পশ্চিমবঙ্গও হতে পারে অথবা কাশ্মীর বা সুইজারল্যান্ড ও হতে পারে। আসলে ওটা আদিত্য ল্যান্ড। বাস্তবে এগজিস্ট করেনা। এখানেও একটা চালাকি আছে। ছবির শুরুর আগে স্বাগত ভাষণে খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে বলানো হয়েছে যে শুটিং-এর জারগাটা কার্শিয়াং। ফলে ব্যপারটা দর্শকের মাথায় রয়ে গেছে। কিন্তু ছবিতে যে কোনো রেফারেন্স নেই সেটা অনেক মানুষের মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে বেমালুম। সেই ভাষণে আরেকটা জিনিস করানো হয়েছে। বলানো হয়েছে নন অ্যাক্টরদের দিয়ে অ্যাক্টিং করানোটা খুবই দুরুহ কাজ এবং এই বিষয়ে আদিত্য খুবই প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে। এর ফলে নন অ্যাক্টরদের খারাপ অভিনয়টাও ছবি দেখার আগেই দর্শকদের মাথায় কিছুটা জাস্টিফায়েড হয়ে গেছে। ছবিতে একজন বয়স্ক মানুষ যিনি কিনা বর্তমান সময়ে বিলং করেন তিনি গোটা ছবি জুড়ে বিভিন্ন সময় কিছু একটা খুঁজছেন। সেখানেও সংলাপ বলার পরিস্থিতি থাকলেও জোর করে সংলাপগুলো দর্শকদের শোনানো হয়নি। গোটাটাই আরোপিত। সংলাপ শোনালে সমস্যা হয়ে যেত। কারণ তিনি কে এবং কী খুঁজছেন সেটা দর্শককে জানানো যাবেনা। জানালে ছবির স্ট্রাকচার ভেঙে পরবে। এটা করা হয়েছে কারণ সংলাপও থাকবে কিন্তু দর্শক আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারবেনা এরকম স্ত্রিপ্ট লিখতে গেলে যে মুনশিয়ানা লাগে সেটা পরিচালকের নেই।

রিভিউ লিখতে লিখতে আমার মনে হল যে ছবিটা একটা এক্সট্রিম ছবি। যার ভাল লাগবে তার খুব ভাল লাগবে আর যার খারাপ লাগবে তার খুবই খারাপ লাগবে। মাঝামাঝি কিছু হবেনা। একটা দৃশ্য যেটা আমার খারাপ লাগছে সেই একই দৃশ্য অন্য একজনের খুব ভাল লাগতে পারে। এর কোন ব্যাখ্যা নেই। একজন মানুষ কেন আরেকজন মানুষের প্রেমে পড়ে আর কেন আরেকজনের প্রেমে পড়েনা তার যেমন কোন ব্যাখ্যা হয়না, এখানেও ব্যপারটা অনেকটা সেরকম। কিন্তু যেহেতু এটা একটা ছবি সেহেতু তাতে যুক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা, সততা, বাস্তবতা এগুলো থাকতে হয়। যেগুলো এই ছবিতে অনুপস্থিত। উপস্থিত আছে একমাত্র এক ধরণের ক্রাফটসম্যানশিপের মুনশিয়ানা। যেটা বাংলা ছবিতে আর কেউ করতে পারেনা-তবে এই যুক্তিতে সিনেমাটাকে ভাল বলতে পারলাম না।

আসলে দোষটা পুরোটা পরিচালকেরও নয়। একটা ছবি বানানোর পরেই তাকে যেভাবে বাংলা ছবির পরিত্রাতা বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই চাপটা হ্যান্ডেল করা সহজ না। তার জন্য তাকে আশ্চর্য কিছু করতেই হত। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে এরকম ভাবে মুখ থুবড়ে পড়াটা আশা করা যায়নি। ছবিতে ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের গা স্পঞ্জ করার নগ্ন দৃশ্য অনেকক্ষণ ধরে দেখানো হয়ছে। অথচ যৌন মিলন দৃশ্যটায় নগ্নতা নেই।  সস্তা চমক কেন? আর কি বলব। আমরা বাঙালিরা সবসময় একজন মসিহা খুঁজি। কোন একটা বটবৃক্ষের তলায় নিশ্চিন্তে আশ্রয় নিতে ভালোবাসি। সেরকমই আদিত্যকে আমরা আমাদের মসিহা বানিয়েছিলাম। কিন্তু সেই মসিহার আলখাল্লা তার দ্বিতীয় ছবিতেই বেদনাদায়ক ভাবে খসে পরল। এতেও আমাদের শিক্ষা হবেনা। আবার কাউকে পরের মসিহা বানাবো। প্রখ্যাত ব্রাজিলিয়ান চলচ্চিত্রকার গ্লোবের রোচা তার ‘ব্ল্যাক গড হোয়াইট ডেভিল’ ছবিতে দেখিয়েছিলেন যে কোন একজন মেসায়ানিক কাল্ট বা কোন একজন রেভোলিউশনারি একটা জাতিকে উদ্ধার করতে পারেনা। জাতির শিরদাঁড়া শক্ত হয় বহু মানুষের প্রচেষ্টায়। বাংলা সিনেমা আজ মৃতপ্রায়। কেউ একা তাকে বাঁচাতে পারবেনা। তার জন্য দরকার গণ মুভমেন্ট।

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami