চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্র, মানুষ ও একটি চলচ্চিত্র উৎসব

মেঘদূত রুদ্র

২৪ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব এসে গেল। ১০ই নভেম্বর ফেস্টিভ্যালের ইনোগোরেশন হল। ১১ তারিখ থেকে জনসাধারণের জন্য ফেস্টিভ্যালের দরজা খুলে যাবে। চলবে ১৭ তারিখ অবধি। আগে এমন একটা সময় ছিল যখন দেশে-বিদেশের ভাল ভাল ছবি দেখার একমাত্র উপায় ছিল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। তারপরে এলো পাইরেটেড সিডি, ডিভিডির যুগ। যার মাধ্যমে গোদার, ত্রুফো, ফেলিনি, বার্গম্যান, আন্তোনিওনি এদের ছবি অনেকটাই বাঙালির হাতের কাছে চলে এলো। তারপর আসে টোরেন্টের যুগ যেখানে যেকোনো ছবি দেখতে ইচ্ছে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে বসে সেটা ডাউনলোড করে দেখে ফেলাটা চা খেতে ইচ্ছে করলে বানিয়ে খেয়ে ফেলার মত সহজ হয়ে গেল। এখন একটু টালমাটাল যুগ। যাবতীয় টোরেন্ট সাইট ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। যদিও তারপরেও প্রক্সি সাইটে সবই মোটামুটি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে মানুষের ছবি দেখার ইচ্ছে আর ধৈর্যই অনেকটা কমে গেছে। সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার অবস্থা তো খুবই শোচনীয়। যার ফলে একের পর এক সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটারগুলি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাল্টিপ্লেক্সগুলো দামি খাবার আর কিছু মশলা বলিউড ছবি বেচে টিকে আছে। বাংলা ছবির অবস্থা তো আরও খারাপ। চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে প্রভাবিত হয়ে বাঙালি অনেকদিন বাংলা ছবি দেখতে যেতো। যেতো এবং প্রতারিত হত। ফলে এখন আর তারা বাংলা ছবি দেখছেন না। হলিউড ছবির একটা স্টেডি দর্শক বরাবরই ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু সংখ্যাটা সীমিত। কিন্তু বাঙালি কি দেখছেন? হিন্দি ছবি মুক্তি পাওয়ার কিছুদিন পরেই তার পাইরেটেড কপি টোরেন্টে চলে আসে। একটা অংশের মানুষ সেটা ডাউনলোড করে মোবাইল, ল্যাপটপে দেখে নিচ্ছেন। আর যারা তথাকথিত অন্যরকম ছবি দেখেন, যে সংখ্যাটাও সীমিত, তারাও ডাউনলোড করে ছবি দেখে নিচ্ছেন। আর প্রচুর সংখ্যক মানুষ দেখছেন ওয়েব সিরিজ। ৪০-৬০ মিনিটের একেকটা এপিসোড। এরকম ৮-১০টা এপিসোড নিয়ে একেকটা সিরিজ। সব ধরনের দর্শকদের জন্য সব রকম কন্টেন্ট নিয়ে এগুলো তৈরি হচ্ছে। ২-৩ ঘণ্টার ছবি দেখার মত সময় আর ধৈর্য আর মানুষের নেই। সেই দিক থেকে ভাল-খারাপ যাই হোক না কেন ওয়েব সিরিজই এখন ট্রেন্ডিং। তার ওপর এতে সেন্সরের কাঁচি চলেনা। ফলে ভারতীয় সিরিজগুলোতেও ‘অ্যাডাল্ট’ কন্টেন্টের ছড়াছড়ি। যেই কন্টেন্ট এই সিরিজগুলির জনপ্রিয়তা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে।

http://www.kiff.in/official-selection/competition-on-indian-languages-films
এমত অবস্থায় একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের কি আদৌ কোন গুরুত্ব আছে? থাকলে সেটা কি? প্রশ্নটার উত্তর দেওয়া কঠিন। মন বলে গুরুত্ব আছে কিন্তু মাথা বলে আর গুরুত্ব নেই। মাথার কথা আগে কিছুটা লিখলাম। এবার স্পেসিফিকালি ফেস্টিভ্যাল নিয়ে লিখি। ফেস্টিভ্যালে প্রচুর বয়স্ক মানুষের ভিড় থাকে। লেখক, জার্নালিস্ট, শিল্পী, চলচ্চিত্র কর্মী ইত্যাদি প্রফেশনালদের বাদ দিলে এরা অধিকাংশই বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির মেম্বার। এছাড়া সরকারি কর্মচারীরাও আছেন যারা শখের চলচ্চিত্র চর্চা করে থাকেন। এরা ভিড় করেন কেননা এদের অধিকাংশরাই টোরেন্টে ডাউনলোড করে ছবি দেখতে পারেন না। আগে ফিল্ম সোসাইটিগুলি নিজেরাই সারাবছর ছবি দেখাতেন। এখন দেখায় কিনা জানা নেই। হয়তো কেউ কেউ দেখান। কিন্তু এটা সত্যি যে ফিল্ম সোসাইটিগুলির আগের দাপট আর গুরুত্ব এখন আর একেবারেই নেই। তার জন্য মেম্বারদের নাক উঁচু আর এলিটপনাই অনেকটা দায়ী। তারাই একমাত্র ছবি বোঝেন বাকি কেউ বোঝেনা, তারা যেই ছবিকে ভাল বলছেন একমাত্র সেই ছবিটাই ভাল বা তারা যেটাকে খারাপ বলছেন সেটা কোনভাবেই ভাল হতে পারেনা এরকম মানসিকতা ফিল্ম সোসাইটিগুলির পতন ডেকে এনেছে। কোন ইয়ং ছেলে-মেয়ে এখন আর সোসাইটির মেম্বার হয়না। বয়স্কদের নিয়েই টিম টিম করে এগুলি বেঁচে আছে। এদের মধ্যে অবশ্যই কিছু সিরিয়াস ও প্রকৃত চলচ্চিত্র রসিক মানুষ আছেন। তারা নমস্য ব্যক্তি।
অধিকাংশই আনসেন্সার্ড পানু ছবি দেখার ধান্দায় ফেস্টিভ্যাল চত্বরে ঘুরে বেড়ান। ফলে এদের দিয়ে দেশের সিনেমার কিছু হবেনা। এরপর থাকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। এখন অনেক কলেজেই ফিল্ম স্টাডিজ, মিডিয়া স্টাডিজ, অডিও ভিজুয়াল মিডিয়া ইত্যাদি পড়ানো হয় যাদের সিলেবাসে সিনেমা আছে। ফলে তারা ফেস্টিভ্যালে ছবি দেখতে আসেন। এবং এদের মধ্যে প্রায় ৮০% মানুষ তাদের কোর্সটা চলাকালীনই ফেস্টিভ্যালে আসেন। কোর্স শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাদের আর দেখা পাওয়া যায়না। মানে আমি বলতে চাইছি অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানগুলোই তাদের স্টুডেন্টদের মধ্যে চলচ্চিত্র চেতনা ব্যপারটা জাগ্রত করতে পারে না। কোর্স চলছে তাই বাধ্য হয়ে আসা। কোর্স শেষ সিনেমা চর্চাও শেষ। এবার চাকরিবাকরি ইত্যাদি করতে হবে। এদের দোষ দেওয়া যায়না। কেনই বা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তারা তাড়াবেন। কিন্তু কেন শিল্প চর্চা করতে হয়, শিল্প চর্চা করলে কীভাবে উন্নততর মানুষ হওয়া যায় এগুলি তাদের শিক্ষকদের বোঝানোর কথা। যেকোনো কারণেই হোক তারা সেটা স্টুডেন্টদের বোঝাতে পারছেন না। কিছু মানুষ পারছেন। তারা ব্যতিক্রম। বাকিরা কাজ পাওয়ার আশায় সিনেমা পড়েন আর তাদের শিক্ষকরাও তাদের চাকরি বাঁচানোর জন্য সিনেমা পড়ান। এদের দিয়েও দেশের সিনেমার কিছু হবেনা। এরপর থাকে টালিগঞ্জ স্টুডিয়ো পাড়ার কিছু লোকজন। এদের মধ্যে অধিকাংশই বিচিত্র জীব। এরা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে আসেন। প্রচুর বকবক করেন। ছবি দেখার চাইতে ড্রেস-পোশাক, মেকআপ ইত্যাদি বিষয়ে তাদের মনোযোগ বেশি থাকে। ছবি হয়তো কিছু দেখেন, কিন্তু হৃদয়ঙ্গম করেন কি না বলা মুশকিল। কারণ এদের অধিকাংশেরই কাজে এইসব সিনেমার কোন রিফ্লেকশন দেখা যায়না। টিভি চ্যানেলে ফেস্টিভ্যাল নিয়ে কিছু গম্ভীর বক্তব্য, খবরের কাগজে ছবি ইত্যাদি নিয়ে তারা ভালই আছেন। এদের দিয়েও কিছু হবেনা। এছাড়া আসেন কিছু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার মস্কোতে বরফ পরলে কলকাতায় হ্যাট ও লং কোট পরেন। এরা প্রচণ্ড গম্ভীর। এদের অকারণ গাম্ভীর্যই একটা গোটা জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সিনেমা সম্পর্কে এদের মানসিকতা এখনও ৭০-৮০ বছর পিছিয়ে আছে। এরা মনে করেন সিনেমার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ বামপন্থার প্রচার করা। সিনেমার স্বাধীনতা এবং বহুমুখিনতার ব্যপারটায় তারা বিশ্বাস করেন না। বাকিদের দিয়ে তাও বা যদি কিছু হয়, এদের দিয়ে একেবারেই কিছু হবেনা। এখন কথা হচ্ছে কাদের দিয়ে হবে? আর হবেটাই বা কি?

এই হওয়া বিষয়টা বায়বীয়। বাতাস দিলে বাড়ে। আরও বেশি বাতাস দিলে ঝড়ে পরিণত হয়। একটা জাতিকে শিকড় থেকে নাড়া দেয়। ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর এই বাতাস দেওয়ার কাজটাই সিনেমা করে থাকে। মানুষের মন একটা বদ্ধ থমথমে জঙ্গলের মত। নিজের স্বার্থের বাইরে তারা কিছু ভাবতে পারেনা। সেই জঙ্গলে একটা ঝড় এসে যখন আছড়ায় তখন জঙ্গলে আলোড়ন তৈরি হয়। সিনেমা, সেরকমই মানুষের মনে আলোড়ন তৈরি করে। সিনেমা এটুকুই করতে পারে। শিল্পের কাজই তাই। শিল্প রাতারাতি সমাজ বদলাতে পারেনা। বিপ্লব আনতে পারেনা। কিন্তু এই কাজটা পারে। আর সিনেমা সবথেকে বেশি করে পারে। ফলে একটা সমাজে সিনেমার প্রয়োজন আছে। এইকারণেই ফেস্টিভ্যালেরও প্রয়োজন আছে। সাধারণ মানুষ যত বেশি করে বিভিন্ন রকম ছবি দেখবে ততই তার মন বড় হবে। আলোকপ্রাপ্ত হবে তার হৃদয়। হিন্দি সিনেমা আর মেগা সিরিয়ালের বাইরেও যে অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যম আছে সেটা সাধারণ মানুষকে জানাতে হবে। তারা সিনেমা দেখতে না আসলে তাদের দরজায় সিনেমাকে নিয়ে যেতে হবে। একটা সময় এসেছিল যখন বাংলাদেশে মানুষ বই পড়ছিলেন না। লাইব্রেরি গুলো মাছি মারত। তখন বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৯৮ সালে ঢাকায় ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। যারা পাঠকের দরজায় দরজায় গিয়ে বই দিয়ে আসতো। পরবর্তীকালে এই কার্যক্রমটি বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয় হয় এবং এখনও সাকসেসফুলি চলে আসছে। সিনেমার ক্ষেত্রেও এরকম করার প্রয়োজন এসে গেছে। যার কিছুটা কলকাতা ফিল্ম ফেস্ট করেছে। আগে ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ছিল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের জন্য। ওই যাদের কথা আগে লিখেছিলাম। সাধারণ মানুষকে সযত্নে এই টেরিটোরির বাইরে রাখা হত। বলা হত ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সবার জন্য নয়। আর সাধারণ মানুষও মনে করত ওটা দাড়িওয়ালা আর ফ্যাব ইন্ডিয়ার শাড়ি পরা আঁতেলদের জায়গা। কিন্তু বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই এই আমরা ওরা-র দেওয়ালটা ভেঙে দিয়েছে। ফেস্টিভ্যালে কার্ড পাওয়া অনেকটা সহজ হয়েছে। কার্ড ছাড়াও ফেস্টিভ্যালের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। নন্দন চত্বরের ঘেরাটোপের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষ টিকিট কেটে কিম্বা ফ্রি পাস নিয়ে ছবি দেখতে পারেন। ইনোগোরেশন হয় নেতাজী ইন্ডোরে। যেখানে অতিথিদের সঙ্গে অনেক বেশি সংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন। এতে অবশ্য অনেকের গাল ভারি হয়। বলা হয় ফেস্টিভ্যালকে বাজারি করা হচ্ছে। কিন্তু আসল ব্যাপার অন্য। যারা ফেস্টিভ্যালকে বহুদিন ধরে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে আসছিল, আজ সম্পত্তির অনেক ভাগীদার এসে যাওয়ায় তাদের আঁতে ঘা লাগছে। কিন্তু আজকের দিনে চলচ্চিত্র উৎসবকে উন্মুক্ত হতেই হবে। তাকে হতে হবে সবার জন্য। নইলে সিনেমা হলের মত এটাও বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য। কদিন আগেই লস অ্যাঞ্জেলেস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফান্ডিং-এর অভাবে বন্ধ হয়ে গেল। আমেরিকার মত ক্যাপিটালিস্ট মহাদেশে যদি ফেস্টিভ্যাল টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে তাহলে ভারতবর্ষ তো কোন ছাড়। এজন্যই কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ তাদের গোটা ব্যপারটাকে একটা ফিল্ম ট্যুরিজমের আকার দিয়েছে। যেখানে উৎসবকে কেন্দ্র পৃথিবীর সমস্ত যায়গা থেকে বিভিন্ন ধরণের মানুষ ওই সময় ফ্রান্সে ঘুরতে আসতে পারে। কলকাতাকেও সেটাই করতে হবে। তাছাড়া সারা বছর ধরে বিভিন্ন ইভেন্ট করে যত বেশি সম্ভব মানুষকে ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করাটাও জরুরি। তাদের মধ্যে সিরিয়াস সিনেমা নিয়ে আগ্রহ তৈরি করতে হবে। আমাদের দেশে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ নেই। ফলে দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে। জনপ্রিয় করে তুলতে হবে ফেস্টিভ্যালকে। জনপ্রিয় মানেই সেটা বাজারি নয়। চার্লি চ্যাপলিনের সব ছবিই জনপ্রিয়। কিন্তু কেউ বলেনা যে চ্যাপলিন বাজারি বা চ্যাপলিন খারাপ।

http://www.kiff.in/official-selection/100-years-of-bengali-cinema
এবার কথা হচ্ছে কাদের হবে। যারা ভালবেসে ছবি দেখেন তাদেরই হবে। ছবি দেখার জন্য লাকা-ফুকো-দেরিদা চর্চা করতে হয়না, বামপন্থার পাঠ নিতে হয়না, বার্গম্যান-গোদার-ত্রুফোর নাম জানতেই হবে এরকম কোন বাধ্যবাধকতাও নেই। ছবিকে ভালবাসলেই ছবি দেখার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। আর ছবি দেখার নিরন্তর অভ্যাস ও যাপনের মাধ্যমে উন্নততর দর্শক ও উন্নততর মানুষ হওয়া যায়। আমাদের দেশে ভাল ছবি কম তৈরি হয়। ভাল ছবির জন্য ভাল দর্শক দরকার। এই কথাটা কিছুটা সত্যি। ফলে ভাল দর্শক তৈরি করাটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এছাড়া যারা চলচ্চিত্র নিয়ে সিরিয়াস জ্ঞান বা সারস্বত চর্চা করেন এবং ফেস্টিভ্যালে ছবি দেখতে আসেন তাদের হবে। এদের কেউ কেউ সিনেমা নিয়ে গবেষণা করেন বা ভবিষ্যতে করবেন। কলেজে বা বিভিন্ন ফিল্ম ইন্সটিটিউটের পড়ান বা পড়াবেন। ভাল ভাল ছাত্রছাত্রী তৈরি করবেন। পরবর্তী প্রজন্মের চলচ্চিত্র বোধ এদের হাতেই তৈরি হবে। এছাড়া বিভিন্ন অন্যান্য শিল্প মাধ্যম যেমন চারুকলা, সংগীত, নাটক প্রভৃতির সিরিয়াস মানুষেরা আছেন যারা ফেস্টিভ্যালের গুরুত্বপূর্ণ দর্শক। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষেরা হলেন চলচ্চিত্রের ছাত্রছাত্রী যারা পরবর্তীকালে ছবি তৈরি করতে চান। কেউ ক্যামেরা, কেউ এডিট, কেউ সাউন্ড বা কেউ পরিচালনা ইত্যাদি। তাদের জন্য ফেস্টিভ্যাল একটা আদর্শ জায়গা। এখানে ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরণের মানুষের সাথে ছবি নিয়ে আলোচনা করার একটা পরিবেশ থাকে। যা একজন মানুষের চলচ্চিত্র পাঠকে একটা অন্য স্তরে নিয়ে যেতে পারে। এরা যদি এই অভ্যাস কন্টিনিউ করেন তাহলে বছর দশেক পর তারা অবশ্যই ভাল ছবি তৈরি করবেন বলে আমার ধারণা। কিন্তু কোন রকম পাকামি বা সবজান্তা ভাবকে শিল্প প্রশ্রয় দেয়না। আমি একটা শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি বা আমি ছবি নিয়ে পত্রিকায় লিখি অতএব আমি একজন মহান চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব, ছাত্রছাত্রীদের এই ধরণের মানসিকতা পরবর্তীকালে তাদের ভাল ছবি করা বা উন্নতমানের চলচ্চিত্র চর্চা করার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ছবি দেখতে হয় সরল শিশুর মত। ছবিকে অনুভব করতে হয়। অবাক হতে হয়, হাসতে হয়, কাঁদতে হয়।

http://www.kiff.in/official-selection/centenary-tribute-ernst-ingmar-bergman
এবারের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ছবির কালেকশন মোটামুটি ভাল। মায়েস্ত্রো সেকশনে প্রচুর বিদেশি ভাল ভাল পরিচালকের ছবি এসেছে। কিম কি ডুক, লার্স ভন ট্রায়ার, জাফর পানাহি, চেলান, জিয়া জাঙ্কে, লাভ ডিয়াস প্রভৃতি নামকরা পরিচালকদের নতুন ছবিগুলি এসেছে। এবারের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাম দি’অর পাওয়া জাপানিও ছবি ‘সপলিফটারস’ দেখানো হচ্ছে। এবং লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট শেষ জীবিত গ্রেট মাস্টার, বাঙালির শেষ শাহজাহান জ্যঁ লুক গোদারের নতুন ছবি ‘দ্যা ইমেজ বুক’ এসেছে। এছাড়া ক্লাসিক ছবির কালেকশনটাও বেশ ভাল। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, বিমল রায়, তপন সিংহ, অজয় কর, রাজেন তরফদার, তরুণ মজুমদার প্রভৃতি বাঙালি পরিচালকদের ছবির সঙ্গে মহান বিদেশি পরিচালকদের ছবিও এবার দেখানো হচ্ছে। ভিত্তরিও ডেসিকার কাল্ট ক্লাসিক ছবি ‘বাইসাইকেল থিভস’, অরসন ওয়েলসের ‘দি ম্যাগ্নিফিসেন্ট অ্যাম্বেরসন’, ফেলিনির ‘আমারকর্ড’, আন্তোনিওনির ‘ব্লো আপ’ দেখানো হচ্ছে। এছাড়া এবার সেন্টেনারি ট্রিবিউট সেকশনে বার্গম্যানের ৭টি ছবি দেখানো হচ্ছে। বড় পর্দায় বার্গম্যানের ছবি দেখা হল লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স। সেগুলো দেখার পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও আফসোস থাকবেনা। এছাড়া ইরানের বিখ্যাত পরিচালক মাজিদ মাজিদি এবং অস্ট্রেলিয়ান পরিচালক ফিলিপ নয়েসের রেট্রোস্পেক্টিভ হচ্ছে। এছাড়া কয়েক বছর হল ‘ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজ’ বলে একটি কম্পিটিটিভ সেকশন ফেস্টিভ্যালে রাখা হয়েছে। যার পুরষ্কার মূল্য ৫১ লক্ষ টাকা। এত টাকা আর কোন ফেস্টিভ্যাল দেয়না। তবে এই সেকশনে ছবির সিলেকশন নিয়ে অভিযোগ থাকে। এছাড়া অভিযোগ থাকে ভারতীয় ছবির কম্পিটিশন সেকশন নিয়েও। অনেক দুর্বল ছবিই এই জায়গাগুলোতে কোন এক অজ্ঞাত কারণে সিলেক্ট হয়ে যায়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ভারতীয় ছবি, বিশেষ করে বাংলা ছবির সিলেকশন নিয়ে সত্যিই সমস্যা আছে। মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল যেভাবে সারা বছর ধরে কিউরেট করে ভাল ভাল ভারতীয় ছবি তাদের ফেস্টিভ্যালে দেখানোর জন্য নিয়ে আসে, এখানে সেরকম হয়না। বড় বড় ফেস্টিভ্যালে সিলেক্ট হওয়া বা পুরষ্কার পাওয়া বিদেশি ছবির খবর আমরা পেয়েই থাকি। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কী কী নতুন ভাল ছবি তৈরি হয়েছে সেগুলোর খবর সহজে পাওয়া যায়না। দেখার সুযোগও সেভাবে পাওয়া যায়না। ফেস্টিভ্যালে না দেখালে দেখার উপায় নেই। ফলে মুম্বাই যেটা পারে আমরা কেন সেটা পারিনা সেটা খুঁজে বের করতে হবে এবং শোধরানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া এই ফেস্টিভ্যালে চিল্ড্রেন’স স্ক্রিনিং বলে একটা সেকশন আছে। এছাড়া আছে ভারতীয় শর্ট ফিল্ম ও ডকুমেন্টারির কম্পিটিশন। আমাদের দেশে ডকুমেন্টারি ফিল্ম জিনিসটা খুবই নেগলেক্টটেড একটা বিষয়। ফলে তাকে ফেস্টিভ্যালের অন্তর্ভুক্ত করা এবং পুরষ্কার দেওয়াটা সাধু উদ্যোগ। এবার অস্ট্রেলিয়ার একগুচ্ছ আইকনিক ছবি দেখানো হচ্ছে আর কান্ট্রি ফোকাস হচ্ছে তিউনিসিয়া। এই দেশের খুব একটা বেশি ছবি দেখার সুযোগ পাওয়া যায়না। ফলে নতুন ধরণের ছবি দেখার সুযোগ থাকছে। ছবি দেখানো হচ্ছে নন্দন-১, নন্দন-২, নন্দন-৩, রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ, নবীনা, মিত্রা, স্টার, ই.জেড.সি.সি, নজরুল তীর্থ ইত্যাদি জায়গায়।

ফলে ভাল বেশি খারাপ কম মিলিয়ে এবারের ফেস্টিভ্যাল বেশ জমজমাট। উদ্দীপনাও প্রচুর। মোবাইলে ছবি দেখা ব্যপারটা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য কিন্তু একথা বলতেই হয় যে ছবি দেখার আদর্শ জায়গা হচ্ছে বড় পর্দা। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে ভিড়ের মাঝেও একা হয়ে যাওয়ার যে মজা, কোনরকম পিছু ডাক ছাড়া একান্ত চিত্তে ছবি দেখার যে অনুভূতি তা অন্য কোথাও পাওয়া যায়না। এবার ‘সপ্তপদী’ দেখানো হচ্ছে। বড় পর্দায় সুচিত্রা সেনের যে লাবণ্য, উত্তম কুমারের যে ক্যারিশমা ফুটে বেরোয় তা কিছুতেই ছোট পর্দায় পাওয়া যায়না। ফলে আসুন ছবি দেখুন। সিনেমাকে উপভোগ করুন। শুধু দয়া করে সঙ্গের মোবাইলটা সাইলেন্ট মোডে রাখবেন। ছবিতে গভীর প্রেমের দৃশ্য চলাকালীন যদি মোবাইল বেজে ওঠে তাহলে সিনেমার দেবতা অভিশাপ দেয়।

Picture courtesy – Aditya Bhattacharya –  https://www.facebook.com/photo.php?fbid=257739541563427&set=pcb.257740458230002&type=3&theater

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami