চলচ্চিত্র

একটি মহাদেশের জন্য

আদিদেব মুখোপাধ্যায়

ঋত্বিক ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছবিটি ভারতবর্ষে অভিনব। স্বাধীন রাজনৈতিক নিরীক্ষামূলক আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র-এই গোত্রে ছবিটিকে যদি ফেলি তবে দেখা যাবে যে ছবিটি কার্যত নিঃসঙ্গ। ঋত্বিক, বস্তুত, চলচ্চিত্র মাধ্যমটির সীমা কতটা প্রসারিত হতে পারে তা নিয়েই একটি প্ররোচনামূলক পরীক্ষা করে দেখেছেন। অতি কম উপাদান, অতি নগণ্য একটি গল্প, নিজেরই প্যারোডি চরিত্র- ছবিটি প্রায় নিঃসম্বলভাবে যাত্রা শুরু করে। ন্যারেটিভে তিনটি মুখ্য স্তর আমরা লক্ষ করেছি- এক/ দেশের চাষি নিরন্ন অবস্থায় বসে আছেন, দুই/ দেশে ভূতের নৃত্য চলছে- বোঝাতে একটি প্রায়-পরাবাস্তব দৃশ্যের পুনরাবর্তন, তিন/ মুল কাহিনী, নীলকণ্ঠ বাগচীর কাহিনি। এই তিনটি স্তরে চলা ছবিটি পেয়ে যায় সাংগীতিক গঠন, তর্ক-প্রতিতর্কের অপরূপ জাল বুনে ওঠে, ছবি হয়ে যায় চিত্রায়িত প্রবন্ধ ও আরো বেশি কিছু।

ছবিটিতে প্রথম থেকেই বোঝানো হতে থাকে যে এটি একটি ছবিই আসলে। দর্শককে আবেগের দিক থেকে জড়িয়ে না ফেলে মননের দিক থেকে এনগেজ করা শুরু হয়। নীলকন্ঠ বাগচীর স্ত্রী দুর্গা (তৃপ্তি মিত্র) যখন ছেলেকে নিয়ে গৃহত্যাগ করবেন তখন ঋত্বিক খুলে রাখা চশমাটি একবার পরে নেন- একটি বিগ ক্লোজ আপে আমরা দেখি, তিনি চশমাটি পরে নিচ্ছেন। তৃপ্তিরা চলে যাওয়ার পর নিঃসঙ্গ ঋত্বিক বসে আছেন, চশমাটি খুলে, খাঁ খাঁ দুপুরে। এসময় বঙ্গবালা ঘরে ঢোকেন অতর্কিতে। ঋত্বিক চশমা পরে নেন আবার- খেয়াল করলে আমরা দেখব, ঐ একই শট, আগের বিগ ক্লোজ আপ, এখানে রিপিট করে দেওয়া হয়। বাস্তববাদকে ক্রমাগত এড়িয়ে যেতে যেতে ছবিটি নিজের মধ্যে এইভাবে সচেতন কিছু বিপর্যয় রেখে দেয়- যা পরিচালকের মেধার ঔজ্জ্বল্যে চিকচিক করে।

ছবিটির গল্প লাফিয়ে লাফিয়ে চলে- গল্পের আঙ্গিকে বেড়ে উঠতে থাকে যুক্তি-তক্কের আলপনা। ছৌ নৃত্য শিল্পীর বাড়িতে বিজন ভট্টাচার্য ও ছৌ শিল্পী যে তর্কে জড়িয়ে পড়েন তার বিষয় হল মাতৃ সম্বোধন। সংস্কৃত পণ্ডিত বিজন কেবলই ব্রাহ্মণ্য ধর্মের অনুসরণে অলঙ্কার পূর্ণ ভাষায় মা-কে ডাকতে থাকেন (জগজ্জননী ইত্যাদি), অনার্য সংস্কৃতির ছৌ নৃত্য শিল্পী নিজের হাজার বছরের ইতিহাসের অনুসরণে মাকে শুধু ‘মা’ সম্বোধন করার পক্ষে কথা বলেন। এখানে সুনিপুণভাবে একটি প্রায়-মঞ্চায়িত নাট্যমুহুর্তের আড়ালে পরিচালক আমাদের দেশীয় ধর্মের অন্তর্গত তর্ক-প্রতিতর্কটি উপস্থিত করেন। তর্কের কারণ ও কেন্দ্রবিন্দু বঙ্গবালা (শাঁওলি মিত্র) দুজনকেই ধমক দিয়ে বসান দাওয়াতে- ‘আরো কাছে ঘনাইয়া বসো!’ আদেশে পন্ডিত ও ছৌ শিল্পী দুজনেই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসেন। থিসিস ও অ্যান্টিথিসিস একটি চলচ্চিত্রের সৌজন্যে যেন সংশ্লেষিত রূপ পেয়ে যায়- পরিচালক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় একটি চালু তর্কের আপাত-মীমাংসা ঘটিয়ে দেন ফিকশনে। ছবিটি আবারও নিজের প্রবন্ধধর্মিতার উৎকর্ষবিন্দুটি ছুঁয়ে ফেলে।
জঙ্গলের মধ্যে অনন্য রায়কে যে নাতিদীর্ঘ লেকচারটি নীলকণ্ঠ দেন সেখানে আলোচিত হয় মার্ক্স থেকে উপনিষদ, হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার চিন্তন থেকে চে গুয়েভারার সাম্প্রতিক বিপ্লবী উত্থান। শট কাটা হয় এখানে দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতিতে, আইজেনস্টাইনীয় উত্তরাধিকার স্বীকার করে, এমনকি শব্দেও খুলে যায় দ্বন্দ্বমূলক ভাবনা-বিশ্ব। অনন্য ঋত্বিককে প্রায় এক কথায় তারুণ্যের উপযুক্ত সিনিসিজম নিয়ে অস্বীকার করলে (‘এটাও পোজ’) ঋত্বিক অবলীলায় মেনে নেন (‘ছোঁড়া ধরে ফেলেসে!’)। এই তর্কের মধ্যে মধ্যে কাটিং-এ দেখিয়ে দেওয়া হয় গাছতলায় বসে থাকা বঙ্গবালা ও নচিকেতাকে- তর্ক চলার সময়ে বোরড হয়ে হাই তোলে বঙ্গবালা- ঋত্বিকের ভাষায় যে কিনা বাংলাদেশের আত্মা। সময় যার কাছে স্থির- যে আগামী বাংলাদেশের নাগরিক- সেই যুবক নচিকেতা বসে থাকে চিন্তিত মুখে। শব্দে বাজতে থাকে অপূর্ব সেতার, আসলে যেন সেতারের তারগুলি ঠিক করে নিচ্ছেন যন্ত্রী- অবিশ্বাস্য বিরোধাভাস তৈরী হয়। একদিকে সিরিয়াস তর্ক, অন্যদিকে আনন্দের সেতার- এই অলৌকিক মুহুর্তকে যেন সময় সমর্থন করছে, ইতিহাস সমর্থন করছে; এই মানুষগুলি আর বাস্তববাদের আঙ্গিকে নিছক চরিত্র নয়, জীবন্ত আইডিয়ায় বদলে গেছে। এই তর্ক যখন থেমে গেছে, যখন ঘোলাটে লেন্সের ওপারে ঋত্বিক জানাচ্ছেন ‘জীবন জীবিতের ধর্ম, বহতা, দুর্নিবার’ তখন প্রকৃতির বুক থেকে উঠে আসছে সঙ্গমের ধ্বনি- প্রতিটি মূহূর্তের জন্য দর্শকের জেগে থাকা ও সচেতন অংশগ্রহণ দাবি করে যায় অতএব এই ছবি।

যে জালটি বোনা শুরু হয়ে ছিল দেশের চাষিকে নিরন্ন অবস্থায় বসে থাকতে দেখিয়ে, ভূতের নৃত্য দেখিয়ে; সেই জালটি এবার তার সমস্ত আঁকবাঁক পূর্ণ করে আনে, নীলকণ্ঠ মারা যান মানিক বাবুর গল্প বলতে বলতে, কমিউনিস্ট সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার স্মরণ করিয়ে দিয়ে; নতুন বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যায় দলটি এক আশ্চর্য শোভাযাত্রার আবহে- মৃত নকশাল যুবকদের থেকে বিদায় নিয়ে তারা একে একে ফিরে আসতে থাকে- দুর্গা, সত্যবান, নচিকেতা, বঙ্গবালা, পুলিশের দল, মৃত নীলকণ্ঠ- শোনা যায় উলুধ্বনি, বধূবরণের ধরণে দুর্গা নিজের ঘোমটা টেনে নেন। আবার চলে আসে ভূতের নাচের স্তরটি, আবার চলে আসে নিরন্ন চাষির শাশ্বত ইমেজ- ছবিটি তার নিজস্ব ফর্মের বৃত্ত শেষ করে ফেলে।

এই ছবিটি দেখে তাঁর প্রতি প্রথম সাবালক প্রণয়। তখন ২০১২। আজ, ছ বছর পরে লিখলাম।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami