বিনোদন

“এখন বৃহস্পতিবারের টিআরপি-র ওপরেই সব নির্ভরশীল, আমাদের আর কোনো স্বাধীনতা নেই”

- কথোপকথনে অনুজা চট্টোপাধ্যায়

জোছন দস্তিদারের ‘তেরো পার্বণ’ , ‘সেই সময়’, পরবর্তীর ‘কুয়াশা যখন’, ‘জননী’ প্রায় কিংবদন্তী। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাহান্ন এপিসোড’ ও ভুলে যাননি অনেকেই। অস্তে গেলা দূরদর্শন, স্যাটেলাইট চ্যানেল জাঁকিয়ে বসল। সৌরভ শচীন দ্রাবিড় যুগও একসময় ফুরোল, বিশ্বায়নের ধাক্কায় একে একে নিভেছে দেউটি। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, মেগাও বদলেছে, আগ্রাসী হয়েছে। নীচুতলার দর্শকের পছন্দের ঝুটো দোহাই দিয়ে চ্যানেল উৎপাদন করে চলেছে ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক সব জঞ্জাল। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ হইহই রব। মেগার নটে গাছটি বোধহয় মুড়োল। রবি ওঝা যীশু দাশগুপ্তদের তৈরি করা সাম্রাজ্যের পতাকা বোধহয় অবনমিত। কিন্তু সেসব বিতর্কে জল ঢাললেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কল্পতরু হয়ে ফিরিয়ে দিলেন মেগা সিরিয়ালের সাম্রাজ্য। বেঁচে গেল একটা ইন্ডাস্ট্রি, একটা অসংগঠিত শ্রমক্ষেত্র। গালভরা টেকনিশিয়ান নামের বহু দিন আনি দিন খাই শ্রমিক ফিরে পেল কাজ। কিন্তু মেগার কনটেন্ট কি হয়ে উঠল সংবেদনশীল? সে গুড়ে বালি। অনুজা চট্টোপাধ্যায়, দুদশক ধরে যাবতীয় জনপ্রিয় অথচ সুস্থ ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য লিখে চলেছেন। এই ভজকট পরিস্থিতিতে তিনি ফিরে দেখলেন মেগার সেকাল একাল, জানালেন সিরিয়ালের হাঁড়ির খবর, কালচারাল ইকোনমির অলিগলির সংবাদ, আগামীকালের সঙ্গে একান্ত কথোপকথনে। 
আগামীকাল:- আপনি সিরিয়াল লিখছেন কবে    থেকে?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- প্রায় কুড়ি বছর।
আগামীকাল:- তার মানে প্রায় দুটো দশক। আপনার চোখে মেগাসিরিয়াল একটু একটু করে বদলেছে কীভাবে?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- কুড়ি বছর আগে যে সিরিয়ালটা দিয়ে চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেছিলাম, সেটার নাম ‘এক আকাশের নীচে’। সেটা দিয়ে আমার চিত্রনাট্য লেখার কাজ শুরু। তার আগে আমি একটা সরকারি স্কুলে চাকরি করতাম। চাকরি করতে করতেই আমি চিত্রনাট্য লেখা শুরু করি। এই ধারাবাহিক, ‘এক আকাশের নীচে’, অলটাইম হিট। এতটাই জনপ্রিয় হল এই সিরিয়াল , যে এই সিরিয়ালটার টি আর পি এক একটা চ্যানেলের সামগ্রিক জি আর পি-কে ছাপিয়ে গেল। তখন জি বা‌ংলা ছিল আলফা বাংলা। এই সিরিয়ালটা হত আলফা বাংলায়, আকাশ বাংলা-র তখন সব শো মিলিয়ে যা জি আর পি ছিল, তার থেকে ‘এক আকাশ’-এর টি আর পি ছিল বেশি! সিরিয়ালটা চলেছিল টানা পাঁচবছর। এই পাঁচবছরই আমি চিত্রনাট্য লিখেছিলাম সিরিয়ালটার। তারপর চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি লেখালিখি শুরু করলাম। কারণ অনেক কাজের অফার আসছিল, চাকরি করে যেটা করা সম্ভব ছিল না। তখন সিনারিওটা ছিল অন্যরকম। সবে স্যাটেলাইট চ্যানেল এসেছে; মানে দূরদর্শন চলছে, তার পাশাপাশি স্যাটেলাইট আসতে শুরু করেছে। তখন কম্পিটিশনটা এই স্তরের ছিল না, এখন যেমন দাঁতনখ বের করা কম্পিটিশন, সেটা তখন ছিল না। এখন অবস্থাটা হয়েছে এরকম, আমার চ্যানেলে একটা শো যখন চলছে, তখন অন্য চ্যানেলে যে শো চলছে; তাকে কী করে টেক্কা দিতে হবে, প্রতিমুহুর্তে আমার কজন দর্শক ওই শো দেখছে, ওই শো এর কজন দর্শক আমার শো দেখছে, আমার দর্শক কত মিনিট দেখছে, অন্য চ্যানেলের কোন ট্র্যাকটা কাজে দিচ্ছে, তাহলে আমায় একটা প্যারালাল পাওয়ারফুল ট্র্যাক ওপেন করতে হবে-এইসব ক্যালকুলেশনের ভিত্তিতে কম্পিটিশন চলে। তখন এরকম ছিল না, কারণ তখন স্যাটেলাইট চ্যানেল খুব কম, আর দূরদর্শন পড়তির দিকে। ফলে তখন লেখালিখি অন্যরকম ছিল। যেমন ‘এক আকাশের নীচে’-তেই আমরা কোনোরকম মেলোড্রামা করতাম না, কোনোরকম মেসেজ ‘এক আকাশের নীচে’-র মাধ্যমে সম্প্রচারিত হয়নি, যা সমাজের জন্য ক্ষতিকারক মনে হতে পারে, বা প্রচন্ড স্ট্রং ইমোশনাল ড্রামা সেসবও কিছু ছিলনা। ভীষণ সাধারণ একটা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির কয়েকটা চরিত্র, তাদের রোজকার যাপনের যাবতীয় খুঁটিনাটি, যাবতীয় সমস্যা; সেটা কাজের লোক না আসা নিয়ে সমস্যাও হতে পারে, থার্মোমিটার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সে সংক্রান্ত সমস্যাও হতে পারে, বাড়ির মেয়ে তার প্রাইভেট টিউটরের সঙ্গে প্রেম করছে সেই সমস্যাও হতে পারে-ছোটখাটো যেসমস্ত খুচরো সমস্যা নিয়ে মধ্যবিত্ত জীবন চলে, সেইসমস্ত কিছু নিয়ে এপিসোড তৈরি হত। বিশাল কোনো স্টোরিলাইন, বিরাট ড্রামা, চড়া দাগের নেগেটিভ চরিত্র, খলনায়ক, খলনায়িকা ওসব কিছুই ছিলনা। সেগুলোর সঙ্গে লোকে রিলেট করত, সেগুলোই লোকে দেখত। আস্তে আস্তে সিনারিওটা বদলাল। এখন যদি ‘এক আকাশের নীচে’ হয় কেউ দেখবে বলে মনে হয় না। তার একটা বড় কারণ , আমার মনে হয়, স্যাটেলাইট চ্যানেলের সংখ্যা বাড়া। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, নেটওয়ার্কের পরিধি ব্যাপকভাবে বাড়ল, আগে শহুরে তথাকথিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মধ্যবিত্ত মানুষ টেলিভিশন দেখত, তারাই টার্গেট অডিয়েন্স ছিল। তারপরে যেটা হল, নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে গেল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষও টিভি দেখতে শুরু করল। একটা আদিবাসী গ্রামের মানুষজন, যাদের অক্ষরপরিচয় নেই, তারা টিভির সামনে বসছে, স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখছে।
আগামীকাল:- সেটা তো ভালো। এরাও তো বিনোদনের উপভোক্তা!  
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- না আমি এদের রুচিকে ছোট করছি না, কিন্তু এরা সেটাই দেখতে চাইল যা এরা বুঝতে পারে। শহুরে প্রবলেম, শহুরে কালচার এসব এরা দেখতে চাইছে না।
আগামীকাল:- সেটাই তো স্বাভাবিক!
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- হ্যাঁ, এবার যা ঘটল, এরা হয়ে উঠল টার্গেট অডিয়েন্স। আমরা এখন রুরাল দর্শকের জন্যই কনটেন্ট বানাই‌। আরবান দর্শককে  বাদের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। রুরাল দর্শকের মধ্যেও রুরাল ফিমেল-মানে আমাদের নানানরকম ভাগ আছে তো; শহর-গ্রাম, পুরুষ-নারী,  ফিফটিন প্লাস, থার্টি প্লাস- বয়সের বিভিন্ন ভাগ, অর্থনৈতিক বিভাজন‌; আমাদের টি আর পি-র হিসেবও এসবের ওপর নির্ভর করে। ধরুন দশটা জিনিস, বাড়ি গাড়ি ফ্রিজ টিভি মাইক্রোওভেন এরকম দশটা জিনিস কার আছে সেটা দেখা হয়। যার দশটা জিনিসই আছে সে হচ্ছে এ বা এ প্লাস। যার পাঁচটা আছে সে বি বা বি প্লাস, যার তিনটে আছে সে সি প্লাস-এভাবে ক্যাটেগরি ভাগ হয়। এখন সি ডি ই-কনটেন্ট তৈরি হয় এসমস্ত ক্যাটেগরির জন্য। এদের অনেকেরই শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাশ-তার থেকে বেশি নয়।  তাহলে বুঝতেই পারছেন, এদের জন্য যে কনটেন্ট তৈরি হবে, আর শহরের তথাকথিত শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের জন্য, যারা ফেসবুক করে, তাদের জন্য যে কনটেন্ট তৈরি হবে এই দুটোর মধ্যে কিন্তু পার্থক্য আছে। শহর থেকে গ্রামের দিকে টার্গেট অডিয়েন্স শিফট করছে, কনটেন্টও বদলাচ্ছে।
আগামীকাল:- কীরকম পার্থক্য?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- ধরুন এখনকার যাত্রাতে যে বিষয়গুলো ডিল করা হয়, চড়া দাগের পারিবারিক ড্রামা, চড়া দাগের ভিলেন, তাদের বিভিন্ন কুকর্ম, সাদাকালোর পরিষ্কার বিভাজন, যার মধ্যে কোনো ধূসরতা নেই; ভালোখারাপের দ্বন্দ্ব চলছে সর্বক্ষণ। ভালো হচ্ছে এখনও সেই বাড়ির বউ, যে একফোঁটা সিঁদুরের জন্য লড়াই করে চলেছে, শ্বশুরবাড়িতে টিকে থাকার জন্য লড়াই করে চলেছে। যত বউ অত্যাচারিত হচ্ছে তত রেটিং বাড়ছে। আর যেই সেই নায়িকা নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে, শিক্ষিত, স্বাবলম্বী হচ্ছে ওমনি ঝপ করে রেটিং কমে যাচ্ছে।
আগামীকাল:- আর একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে, শিক্ষিত স্বাবলম্বী মহিলাদের ভিলেন বানানোর একটা প্রবণতা রয়েছে।
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- একেবারেই! এইসব জিনিস হচ্ছে, এখন আমি এগুলোর মধ্যে ঢুকব কি না, ‘এক আকাশের নীচে’, ‘এখানে আকাশ নীল’, ‘গানের ওপারে’-র চিত্রনাট্যকার হয়ে, সেগুলো আমার সিদ্ধান্ত। আমি এখন একটা রূপকথার গল্পনির্ভর ধারাবাহিক লিখি, ‘সাত ভাই চম্পা’। রূপকথার সঙ্গে তো মানুষের দৈনন্দিন জীবন জড়িয়ে নেই, রাজারাণীর গল্প হিসেবেই সেগুলো লোকে দেখে। কিন্তু প্রচন্ড রিগ্রেসিভ কিছু, যেগুলোর সমাজে ক্ষতিকারক দিক অবশ্যই আছে বলে আমি মনে করি, সেগুলো এড়ানোর জন্য আমায় রূপকথা লিখতে হচ্ছে। কিছুদিন পর হয়তো এটাও ছেড়ে দেব, আজ কুড়িবছর ধরে এত হিট সিরিয়ালের চিত্রনাট্য লেখার পর এই আমার উপলব্ধি। আমি চেষ্টা করি বেছে নিতে, কারণ আমার সেই অর্থনৈতিক প্রিভিলেজ রয়েছে। কিন্তু সকলের সেটা থাকে না, তাদের রুটিরুজির জন্য রিগ্রেসিভ জেনেও চিত্রনাট্য লিখতে হয়। আমি প্রতিদিন একটা করে কাজ রিফিউজ করি, শেষে একটা বাছি, সবার সেই অপশন থাকে না। প্রতি বৃহস্পতিবার করে যখন টি আর পি আসে, তখন যদি দেখা যায় আমার অমুক ট্র্যাক কাজ করছে না, আমার টি আর পি পয়েন্ট টু নেমে গেছে, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী চ্যানেলের টি আর পি পয়েন্ট টু বেড়েছে, সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকটা রাখা হয় রাইটারের ঘাড়ে, এবং যেহেতু এটা একটা অসংগঠিত সেক্টর, আমাদের কোনো ইউনিয়ন নেই, সেহেতু বাড়ির কাজের লোক বা অন্য অসংগঠিত শ্রমিককে যেভাবে বলা হয় কাল থেকে আর আসতে হবে না, আমাদেরকেও তেমন বলা হয়। ফলত ‘এক আকাশের নীচে’-র সময় যেভাবে চিত্রনাট্য লিখতাম, খুব রিল্যাক্স করে, একটা ক্রিয়েটিভ কাজ করছি ভেবে, সেদিন গেছে, সেদিন আর নেই। এখন বৃহস্পতিবারের টি আর পি-র ওপরেই সব নির্ভরশীল, আমাদের আর কোনো স্বাধীনতা নেই।
আগামীকাল:- ‘এক আকাশের নীচে’ ২০০২-২০০৩ সাল নাগাদ, তার আট বছর পর, যখন চিত্রটা অনেকটাই বদলেছে, মানে ধরা যাক আগে চ্যানেলে অন্য অনুষ্ঠানও হত সিরিয়ালের পাশাপাশি, মায় খবর পড়াও হত, সেসবের বদলে যখন টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন সিরিয়াল দেখানো শুরু হচ্ছে তখন, রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষে ‘গানের ওপারে’ হল, যার মাথায় ঋতুপর্ণ ঘোষ, ‘বাহান্ন এপিসোড’-এর সময় তখন আর নেই। তখন এই অবিশ্বাস্য ঘটনাটা ঘটল কীভাবে? কারা দেখল ‘গানের ওপারে’?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- ‘গানের ওপারে’ চ্যানেলের একটা সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল, একটা ব্র্যান্ডিং-এর জন্য। সেই সময় স্টার জলসা কর্তৃপক্ষের স্লোগান ছিল ‘চলো পাল্টাই’, সেই পাল্টানোর স্লোগান শেষমেষ টিকল না। কিন্তু কিছু মানুষ মালিকপক্ষের সঙ্গে বিবাদ করে সিদ্ধান্ত নিল যে একটা স্লট অন্তত থাকবে যা এই ‘চলো পাল্টাই’ ট্যাগের সঙ্গে মানানসই হবে। যেটা চিরাচরিত টি আর পি-র দৌড়ে থাকবে না। তখন জলসার প্রচন্ড টি আর পি, সব শো রমরমিয়ে চলছে, একটা শো যাতে এই অঙ্কের বাইরে থাকে সেদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টা করা হল। একটা এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা করা হল, ব্র্যান্ডিং-এর জন্য, যা চলছে, সেইসব গতে বাঁধা সিরিয়ালের মধ্যে একটু অন্যরকম কিছু করছে জলসা-এই ব্র্যান্ডিংটা যাতে তৈরি হয় সেই চেষ্টা করা হল। এবং তাই হল, ‘গানের ওপারে’ রেটিং-এর অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটা শো, কিন্তু জলসা বলতে লোকে এখনও ‘গানের ওপারে’-র কথা বলে, এটা এমন একটা কিছু যেটা করার সাহস অন্য চ্যানেল দেখায় নি। সাহস বলতে টি আর পি-র পরোয়া না করা। তখন ঋতুদাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, ঋতুদার মাথায় একটা কনসেপ্ট আসে, যে রবীন্দ্রনাথ কতটা জনগণের, কতটা ইন্টেলেকচুয়াল ক্লাসের, এই টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে যদি একটা প্রেমের গল্প হয়; যেখানে একজন হবে মাসের প্রতিনিধি, আরেকজন অভিজাত রাবীন্দ্রিক শ্রেণির প্রতিনিধি, তাদের মধ্যে যদি একটা প্রেম হয়। এই কনসেপ্টটাকে মাথায় নিয়ে ঋতুদা চোদ্দটা এপিসোড লিখলেন, যেটার টি আর পি কিছুতেই হচ্ছে না, মানে টি আর পি বলে কোনো বস্তুই নেই। যেখানে অন্যরা দশ বারো চোদ্দ , তখন ‘গানের ওপারে’ পয়েন্ট টু তে আটকে, একেও পৌঁছচ্ছে না। তখন চ্যানেল দেখল প্রাইম টাইমে এরকম চলতে থাকলে কোটি কোটি টাকা লস। ভাবার সময় যতই বড় বড় ভাবনাচিন্তা করা হোক না কেন, আসল সময় চ্যানেল ধৈর্য হারাল। ঋতুদা যেভাবে লিখছিলেন তাতে কোনো প্রপার স্টোরিলাইন ছিল না, কোনো গোল গল্প ছিল না, ওই বিতর্কটাকে কেন্দ্র করে কিছু দৃশ্য পরপর সাজানো হচ্ছিল। চ্যানেল বলল গল্প চাই, একটা কী হয় কী হয় উত্তেজনা চাই। শুধু থিয়োরি কপচানো লোকে দেখবে না। ঋতুদা কোনো কম্প্রোমাইজ করতেন না, ঋতুদা রাজি হলেন না সেটা করতে। ঋতুদার  মেগাসিরিয়াল লেখার মতন সময় ছিল না এমনিতেই, উনি অনেক ছবির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখন আমি স্টার জলসায় অন্যান্য কাজ করি, আমায় বলা হল ঋতুদাকে উপদেষ্টা হিসেবে রেখে তুমি লেখো চিত্রনাট্য। কারণ তুমি অনেকবছর ধরে লিখছ, তুমি জানো কীভাবে মেগা লিখতে হয়। ঋতুদা সেটা জানলেও ওভাবে কখনোই লিখবেন না। ঋতুদাও আমাকে দায়িত্ব দিলেন। বুম্বাদা মানে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ও চট করে ছাড়তে চাইলেন না ঋতুদাকে। কারণ ঋতুপর্ণ ঘোষ নিজেই একজন ব্র্যান্ড। উনি গল্প, চিত্রনাট্য, সেট, কস্টিউম এসব দেখভাল করছিলেন, এবং সেভাবেই উনি শেষ অবধি ছিলেন। আমার ওপর একবছর ধরে ননস্টপ প্রেসার এসেছে, আরও রেটিং বাড়াও। কাজেই ওইরকম গল্প, ওইরকম চরিত্রকেও আমায় কমার্শিয়ালাইজ করতে হয়েছে। তার ফলও পেয়েছি হাতেনাতে। চার পাঁচ অবধি রেটিং তুলেছিলাম আমি, সেট অভিনয় অ্যাম্বিয়েন্স উচ্চকিত না করেই। একবছর বাদে কর্তৃপক্ষ বদলাল, তারা বলল, অনেক শিল্প হয়েছে আর নয়। তখন মা ঝিলিক ইত্যাদি রমরমিয়ে চলছে। একমাস সময়সীমা আমায় বেঁধে দেওয়া হল গল্প শেষ করবার জন্য। ঋতুদা হাল ছেড়ে দিলেন। আমরা দুজনে অনেক কিছু ভেবে রেখেছিলাম, সেসব আর হল না।
আগামীকাল:- কিন্তু দর্শকদের প্রবল অনুরোধ উপরোধে ‘গানের ওপারে’ হটস্টারে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল। আবার শোনা যাচ্ছে ‘গানের ওপারে’-র দ্বিতীয় ভাগ আসছে, এসব নিয়ে চ্যানেল কর্তৃপক্ষের ভাবনাটা কী? 
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- এখন যেটা ঘটেছে, স্টার জলসার টি আর পি-র অবস্থা খুব খারাপ। জি এর সঙ্গে যে লড়াই তাতে স্টার জলসা বহুদিন অবধি একনম্বর ছিল, এখন দু নম্বরে। একটা গোল্ডেন লাইন হচ্ছে, ওই একই শাশুড়ি বউ দেখতে দেখতে মানুষ কিছুটা হলেও ক্লান্ত। আমি একদম রিসেন্ট পাস্টের কথা বলছি, গত ছমাস ধরে এমনটা হচ্ছে। ঐসব সিরিয়ালগুলোর রেটি‌ং নামছে। অন্যদিকে জি -এর কিছু সিরিয়াল, যেমন ‘রাণী রাসমণি’-র রেটি‌ং বাড়ছে। অনেক গাঁজাখুরি, অনেক জল মেশানো, তবু ঐতিহাসিক বলে মানুষ দেখছে। আমার ‘সাত ভাই চম্পা’-র রেটিং খুব ভাল। লোকে শাশুড়ি বউ দেখছে না, রূপকথা দেখছে। এরপর জি নেতাজী নিয়ে একটা মেগা করছে, সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় প্রযোজক হিসেবে ভাবছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ নিয়ে‌, কনটেন্টের চাহিদা খানিক হলেও বদলাচ্ছে। জি-এর রেটিং বাড়তে বাড়তে একনম্বর হয়ে উঠল জি। স্টার অনেকটা পিছিয়ে গেল, স্টার লঞ্চ করার পর যেটা প্রথম ঘটল। এবার স্টার ভাবল ওদের লয়্যাল অডিয়েন্সকে নিয়ে, সেটা কারা? শহুরে যে অডিয়েন্স ‘গানের ওপারে’ দেখেছে , ‘এখানে আকাশ নীল’ দেখেছে, তারা। এখন এই ধারাবাহিকগুলো আমার লেখা। তাই আমার ডাক পড়ল এগুলো ফিরিয়ে আনার জন্য। কিন্তু চ্যানেলে যেকোনো প্রজেক্ট নামানোর আগে লম্বা রিসার্চ হয়। গোটা পশ্চিমবঙ্গ ঘুরে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করা হয় মানুষ কী চাইছে। এখন মনে করা হচ্ছে এক্ষুনি আবার ‘গানের ওপারে’-র জন্য মানুষ তৈরি নয়। আমি গল্প লিখতে শুরু করেছিলাম, কাস্ট আগে যা ছিল তাই, ঠিক হল ডিরেকশন দেবে সৃজিৎ মূখার্জী। কিন্তু এখন এটা নিয়ে অন্যরকম ভাবনাচিন্তা হচ্ছে, এটা হবে কি না আমি জানি না।
আগামীকাল:- কিন্তু কনটেন্ট নিয়ে এত তর্কের পরিসরটাই তো থাকবে না যদি শুটি‌ং না হয়। আর এই সাম্প্রতিক বিতর্কটার সঙ্গে কনটেন্টের কোনো সম্পর্কও তো নেই ?  
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- বিন্দুমাত্র নেই। এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ফিনান্সিয়াল সমস্যা। এই যে ফেসবুকজুড়ে লোকে নৃত্য করছে, এই যে খারাপ জিনিস বন্ধ হয়ে গেল বলে উল্লাস, এটা হাস্যকর। খারাপ জিনিস যা ছিল তাই থাকবে, শুটিং শুরু হলে যা দেখানো হচ্ছিল আবার তাই দেখানো হবে। কনটেন্ট নিয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথা নেই, না চ্যানেলের, না নির্মাতাদের, না দর্শকের, না অভিনেতা অভিনেত্রীর। অভিনেতা অভিনেত্রীরা পয়সা পেলে প্রযোজক তাদের ক্যামেরার সামনে যা করতে বলবে তারা তাই করবেন। চ্যানেল টাকা দিলে প্রযোজককে যা করতে বলা হবে প্রযোজক তাই করবেন, আর রিসার্চ যা বলবে চ্যানেল তাই অন্ধভাবে ফলো করবে। মানে কোনো কালচারাল ডেভেলপমেন্ট, সমাজে ভালো মেসেজ পাঠানো এসব নিয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথা নেই।
আগামীকাল:- এই বিতর্কটা নিয়ে কিছু বলুন। প্রযোজকদের ভূমিকা নিয়ে কী বক্তব্য আপনার?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- একটা অনিয়মিত টাকাপয়সার সমস্যা তো আছেই। সব প্রযোজক না হলেও কিছু প্রযোজক সময়মতন টেকনিশিয়ান, অভিনেতা অভিনেত্রীদের টাকা দেন না। এটা নিয়ে একটা ক্ষোভ আছে। দ্বিতীয়ত এরা ওভারটাইম চাইছেন। একটা অমানুষিক ওয়ার্ক শিডিউলে কাজ করতে হয় সিরিয়ালের লোকজনদের। আগে ছিল সপ্তাহে পাঁচদিন , পরে হল ছদিন, এখন যেটা হয়েছে সেটা হল হপ্তায় সাতদিন। কোনো ছুটি নেই। সারাদিন কাজ করেও এপিসোড ভরানো যাচ্ছেনা। অথচ নির্দিষ্ট সময়ে এপিসোড ডেলিভার করতে হবে। এপিসোড ডেলিভার করার জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয় আমাদের। সেটা বাইরের লোকের পক্ষে বোঝা শক্ত। অভিনেতা অভিনেত্রীদের কথা বলছি না, প্রতিটি টেকনিশিয়ানকে প্রচন্ড খাটতে হয়। ফলত এরা ন্যায্য কারণেই ওভারটাইম চাইছেন।
আগামীকাল:- আর অভিনেতা অভিনেত্রীরা?
অনুজা চট্টোপাধ্যায়:- অভিনেতা অভিনেত্রীদের ওভারটাইমের দাবি আমি আবার সমর্থন করিনা। কারণ এরা, প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা অভিনেত্রীরা আর কি, একসঙ্গে দু তিনজনকে ডেট দেন। ফলে যখন প্রোগ্রামার ডেট চাইতে যাচ্ছে, তখন তারা বলছেন অমুক জায়গায় তো ডেট দিয়ে দিয়েছি। আসলে হয়তো দেন নি, মিথ্যে কথা। আবার অন্যদেরকেও একই কথা বলেন, এই খেলাটা চলতে থাকে। তখন নন টেলিকাস্টের ভয় হয় প্রোডিউসারের, এবার নন টেলিকাস্ট একটা ভয়ঙ্কর বিষয়, প্রোডিউসারের কেরিয়ারের পক্ষেও ক্ষতিকর। ব্ল্যাক মার্ক পড়ে যাবে সেই প্রোডিউসারের গায়ে, যে এর এপিসোড নন টেলিকাস্ট হয়েছে, এবং অভাবনীয় রকমের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ফলত প্রোগ্রামার হাতেপায়ে ধরে। তখন অভিনেতা অভিনেত্রীরা যেটা করেন ফার্স্ট হাফটা দিলেন একজনকে, সেকেন্ড হাফটা আরেকজনকে। দিনে যদি তার দশহাজার টাকা বরাদ্দ হয়, সেটা দশ ঘন্টার জন্য। কিন্তু দশ ঘন্টা কাজ না করেও তারা দুজায়গা থেকেই দশহাজার টাকা নিচ্ছেন। ওভারটাইমের দাবিটা তখনই মানা যেত যদি এরা কমসময় দেওয়ার দরুণ কম টাকা নিতেন, যেটাতে আবার এরা রাজি নন। ফলে প্রোডিউসাররাও একেবারে বেঁকে বসেছেন, আবার আর্টিস্ট ফোরামও পয়েন্ট অফ নো রিটার্ণ, ফলে দু পক্ষ যুযুধান হয়ে রয়েছে। কিন্তু এটা চলতে পারে না, এটার সঙ্গে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা জড়িয়ে। চ্যানেলগুলোও চুপচাপ বসে থাকবে না। আর যেখানে নো ওয়ার্ক নো পে, সেখানে কাজ থেমে থাকার তো কোনো প্রশ্নই নেই। টেকনিশিয়ান দের হাঁড়ি চড়া অলরেডি বন্ধ। আমাদের এতটা ক্রাইসিস নয়; আমরা, রাইটাররা তো সবথেকে হাইলি পেড টেকনিশিয়ান। আর আমরা মান্থলি স্যালারি পাই। জুনিয়র টেকনিশিয়ানরা অতি অল্প মাইনে পান, তাও দৈনিক। কাজেই এই অচলাবস্থা কাটবে। মমতা ব্যানার্জী হয়তো হস্তক্ষেপ করবেন, কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। তাতে এই সমস্যাটা মিটবে। কিন্তু কনটেন্ট যে তিমিরে সেই তিমিরেই রয়ে যাবে।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami