Uncategorizedরাজনীতি

অঘোষিত জরুরি অবস্থা: ধ্বংসের মুখোমুখি?

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী

 

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার আগেই ভারতরাষ্ট্র সব দুইলপ্তে বেশ কিছু স্ব-স্ব-ক্ষেত্রে খ্যাতনামা ও যশস্বী আইনজীবি, অধ্যাপক, কবি, শিল্পী, সামাজিক কার্য্যকর্তাসহ দশজন মানুষকে অ্যারেস্ট করে। প্রথম লপ্তে, ৬ই জুন অধ্যাপিকা তথা নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান সোমা সেন, নাগপুরের প্রখ্যাত আইনজীবি সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, মারাঠী ভাষার পত্রিকা ‘বিদ্রোহী’র সম্পাদক এবং দলিত সংগঠন ‘রিপাব্লিকান প্যান্থারস’ এর প্রতিষ্ঠাতা সুধীর ধাওয়ালে, মানবাধিকার কর্মী তথা ‘কমিটি ফর রিলিজ অফ পলিটিকাল প্রিসনারস’ (সি-আর-পি-পি)র সম্পাদক রোনা উইলসন, জল-জঙ্গল-জমিনের অধিকার নিয়ে গড়চিরৌলী জেলার গ্রাম সভা স্তরে কর্মরত সমাজকর্মী তথা প্রাক্তন ‘প্রাইম মিনিস্টারস রুরাল ডেভেলপমেণ্ট’ স্নাতক মহেশ রাউতকে গ্রেফতার করে মহারাষ্ট্র পুলিশ। তারপর, ৮ই অগাস্ট ২০১৮ তারিখে সেই একই মহারাষ্ট্র পুলিশ ভারতের বিভিন্ন স্থান থেকে আরো পাঁচজন বিশিষ্ট সমাজসেবী তথা মানবাধিকার-কর্মীকে গ্রেফতার করে। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রথিতযশা আইনজীবি তথা ছত্তিসগড় মুক্তি মোর্চা (ভিলাই), পীপলস ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবারটিস’, ছত্তিসগঢ় বাঁচাও আন্দোলন প্রভৃতি গোষ্ঠির সাথে তিন দশক ধরে নিরন্তর কাজ করে চলা সুধা ভরদ্বাজ, প্রতিবাদী কার্টুন-এঁকে রাষ্ট্রের কুনজরে পরে “মাওবাদী” এই ভুয়ো তকমায় এর আগেও বহু বছর আণ্ডার-ট্রায়াল অবস্থায় জেল খাটা, বর্তমানে আইনজীবি, অরুণ ফেরেইরা, অন্ধ্র-তেলঙ্গনা সহ সমস্ত দেশের বহু মানুষের সমীহ পাওয়া প্রবীণ লেখক ভরাভর রাও, মহারাষ্ট্রে বহুদিন ধরে নিরন্তর মানবাধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত থেকে কাজ করে যাওয়া ভারনন গনজালভেস, দিল্লি-নিবাসী নাগরিক-অধিকার মূলক নানান বিষয়ের সাথে কাজ করে চলা গৌতম নওলাখ্যা। এছাড়াও, ঝাড়খণ্ডনিবাসী আদিবাসী অধিকার-কর্মী স্ট্যান স্বামী, দলিত প্যান্থার সংগঠনের সদস্য হর্ষিত পোটদার এবং কবির কলা মঞ্চ নামক গানের দল – যাদের বিভিন্ন সদস্য এর আগেই রাষ্ট্রের কুনজরে পড়ে জেল-হাজত সহ নানান লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের আবার এই বছর, একই ঘটনার জের টেনে, মহারাষ্ট্র পুলিশের মাধ্যমে পুনঃপুনঃ লাঞ্ছিত করা হয়।

উপরের তালিকার নামগুলো দেখে বোঝা যায়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বিশিষ্ট এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তথা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে নিশানায় আনছে ভারতরাষ্ট্র। এর কারণ কি তা আলোচনা করার আগে আর একটা বিষয়ে জেনে নেওয়া প্রয়োজন –

এঁদের প্রত্যেককেই একই ঘটনার জের টেনে, একই ধরণের অভিযোগ ও ধারার ভিত্তিতে গ্রেফতার করেছে মহারাষ্ট্র পুলিশ– আইনের ভাষায় বললে, একই ঘটনায় যোগসাজশের অভিযোগে এঁদের বিরুদ্ধে আনল্যফুল অ্যাক্টিভিটিস (প্রিভেনশন) অ্যাকট (ইউ-এ-পি-এ) এবং দণ্ডবিধি সংহিতার একই ধরণের ধারার মাধ্যমে চার্জশীট আঁকছে পুলিশ। কি সেই ঘটনা?

গত ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৭তে পুনের শান্তিওয়াড়া অঞ্চলে ‘ভীমা কোরেগাঁও শৌর্য্য দিবস প্রেরণা অভিযান’ নামে অনুষ্ঠানের ডাক দেয় এলগার পরিষদ নামের সংগঠন। অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিলো এক ঐতিহাসিক উদযাপন। কি সেই উদযাপন?

১৮১৭ সাল। অ্যাংলো-মারাঠা যুদ্ধ-অভিযান তখন তুঙ্গে। সেই সময় মারাঠার শাসক তথা পেশওয়া-গোষ্ঠী ছিলো গোঁড়া রকমের ব্রাহ্মণ্যবাদী। তাদের বিরুদ্ধে ইংরেজ যখন সামরিক অভিযান চালায়, তখন ইংরেজবাহিনীর হয়ে লড়াই করতো দলে দলে দলিত-আদিবাসী সম্প্রদায়ের সিপাহী-সালার। এইরকম এক বাহিনী, যার সৈনিকদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মাহার সম্প্রদায়ভুক্ত দলিত মানুষ, তাঁদের হাতে, অসম যুদ্ধে, নাগপুরের নিকটবর্তী ভীমা কোরেগাঁওএর পাহাড়-জঙ্গলের ঘেরা উপত্যকায়, পরাভূত হয় পেশোয়া-বাহিনী। পেশোয়া বাহিনী দলে ও অস্ত্রে প্রভূতভাবে ভারি ছিলো মাহার-বাহিনীর তুলনায়। এই ঐতিহাসিক জয়ের দ্বিশত-বৎসর উদযাপনে ঐদিন, অর্থাৎ গত বছরের শেষ দিন, এলগার পরিষদের ডাকে জমায়েত হয় অসংখ্য আদিবাসী-দলিত-ও-বি-সি-মুসলমান মানুষ – ব্রাহ্মণ্যবাদী তথা হিন্দুত্ববাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বজ্রকঠিন অঙ্গীকারে অনুপ্রেরিত হয়ে।

আর তখনই, তাঁদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে যৌথবাহিনী – গেরুয়া ঝাণ্ডা হাতে হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন সংগঠনের ‘কার্য্যকর্তা’বৃন্দ এবং ব্যাটন হাতে পুলিশপুঙ্গবগণ। স্বভাবতঃই, ঘটনার জের চলে আরো কিছু দিন। ৩রা জানুয়ারি ২০১৮ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন দলিত, ও-বি-সি, মুসলিম এমনকি মারাঠাবাদী দল ও গোষ্ঠী আদিবাসী-দলিত-মুসলমান মানুষের উপর এই পুলিশ-গৈরিকবৃন্দ যৌথ আক্রমণের প্রতিবাদে বন্ধ ঘোষণা করে। গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের নেতৃত্বে এগিয়ে আসেন প্রকাশ আম্বেদকর – ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের প্রপৌত্র তথা ‘ভারিপা বহুজন মহাসঙ্ঘের নেতা। ঐদিন আবার পুলিশি তাণ্ডব নেমে আসে অসংখ্য মানুষের উপর। সারা দিনে পাঁচ হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হন মহারাষ্ট্র পুলিশের হাতে। ‘রেইড’ এবং ‘সার্চ অপারেশন’-এর নামে ভাঙচুর করা হয় বাড়িঘর, নষ্ট করা হয় নানান সম্পত্তি ও সামগ্রী।

তারপর, ঐ ঘটনার মাওবাদী অনুপ্রেরণা যোগানোর দায় শুরু হয় সেই অলীক কুনাট্য রঙ্গ, যার ফলশ্রুতি হিসেবে আজ ভারতের দশজন খ্যাতনামা ও বহু মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করবার আন্দোলনের পথিকৃৎ ভুয়ো চার্জে জেলবন্দী। এঁদের কারুর বিরুদ্ধে অদ্যবধি কোনো প্রত্যক্ষপ্রমাণ দায়ের করতে পারে নি পুলিশ। অথচ ইউ-এ-পি-এ, দেশদ্রোহের মতো চার্জ এনে গিয়েছে একের পর এক। উদাহারণস্বরূপ – প্রথম লপ্তে অ্যাডভোকেট সুরেন্দ্র গ্যাডলিং সহ বাকিদের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ এমন এক চিঠি পেশ করা যার লেখক আজও অজ্ঞাতপরিচয়। সেই চিঠিতে নাকি নরেন্দ্র মোদিকে হত্যা করবার জল্পনা রয়েছে – ‘ইন্দিরা গান্ধী স্টাইল’। অপর উদাহারণ- সুধা ভরদ্বাজকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে রিপাব্লিক টিভির এক শো-এ অর্ণব গোস্বামী-কৃত আস্ফালনের ভিত্তিতে। সেই আস্ফালন ছিলো এই মর্মে যে তাঁর কাছে সুধা ভরদ্বাজের মাওবাদী যোগসাজশ সাব্যস্ত করতে পারে এমন এক চিঠি। তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মোকদ্দমাও রুজু করেছিলান সুধাজ্বী। এই ধরণের আধখ্যাঁচড়া ভিত্তিসমূহের উপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র আর তার পেটোয়া সংবাদদাতামহল – এই বিষয়ে কোনো জজমেণ্ট তো দূরস্ত, কোনো ট্রায়াল প্রক্রিয়া পর্যন্ত চালু হওয়ার আগেই – ঘোষণা করে দিচ্ছে – এঁরা সকলেই মাওবাদীদের ‘আর্বান ফ্রণ্ট’-এর সদস্য!

এবার আসুন, অপরপক্ষের দিকে চোখ বুলিয়ে নি। সেই সকল হিন্দুত্ব তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী নেতা ও তাঁদের দলগুলি – যারা সেই ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৭র এলগার পরিষদ আহুত জমায়েতে পুলিশিবাহিনীর সঙ্গে হিংসায় হিংসা মিলিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো উপস্থিত আদিবাসী-দলিত-ওবিসি-মুসলমান জনতার উপর –

এই হামলার মূল পাণ্ডা, ‘শিব প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান’ এর নেতা শাম্ভাজি ভিড়ে। সঙ্গে ছিলেন হিন্দু একতা আগহাদির মিলিন্দ একবোটের সহ বেশ কিছু সংঘ পরিবারের প্রসাদে পুষ্ট রাজনৈতিক দল ও ‘কার্য্যকর্তা’বৃন্দ। এই দ্বিতীয় ‘হিন্দুবীর’কে নামমাত্র গ্রেফতার করা হয় এবং কিছু দিনের মধ্যেই বেল মারফৎ সগৌরবে মুক্তি দেওয়া হয়। অথচ বেল পান না সুরেন্দ্র গ্যাডলিং, সুধা ভরদ্বাজের মতো প্রথিতযশা আইনজীবিরা। এই গৈরিক সন্ত্রাসবাদী দলগুলো, এদের নেতারা – আজও বিভিন্ন ‘কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছে, প্রকাশ্য দিবালোকে, ক্ষমতাসীন পুলিশ-প্রশাসনের অনুমোদনে।

ঘটনাবলী যে ভাবে ও যে দিকে এগিয়েছে তাতে একটা বিষয় পরিস্কার। ঘটনার একদিকে রয়েছে সংঘ-শাসিত দেশের পরিচালন-কাঠামো, আবার সেই দিকেই রয়েছে মিলিন্দ একবোটে, অর্ণব গোস্বামীর মতো পেটোয়া লোকজন। রয়েছে সেই সকল অনলাইন ট্রোলবাহিনী, যাঁরা টাইমস অফ ইণ্ডিয়ার বৈদ্যুতিন পোর্টালে সুধা ভরদ্বাজ-ভরাভর রাওদের অ্যারেস্টের খবর আসতেই কি ধরণের কমেণ্ট করতে আরম্ভ করেন তার একটা স্ন্যাপশট-নমুনা পেশ করা হলো এই লেখার সাথে –

রাষ্ট্রব্যবস্থা যুগের পর যুগ ধরে এই প্রথম পক্ষের সাথেই হাত মিলিয়ে নিজের অস্তিত্ব বিকশিত করে। যেমন করে ‘বিশুদ্ধ রক্ত’র গর্বে গরীয়ান সমাজের উচ্চ্ব ও মধ্যকোটিতে বিচরণকারী অধিকাংশ। অর্থাৎ, যারা জেল বানায়, আইন বানায়।

আর অপর পক্ষে রয়েছেন যাঁরা মানুষের আইনি অধিকার, সাম্য, মৈত্রী, ইমান, সম্প্রীতি, এবং, সর্বোপরি বেঁচে থাকার অধিকারের দাবীতে মানুষকে যুথবদ্ধ হতে ডাক দেন, এককে বহুর কাছে নিয়ে আসেন, এবং, প্রয়োজনে ও সময়ে, সেই জেলগুলোতেই বন্দী হন।রয়েছেন সেই তাঁরা যারা শাসক তথা হিন্দুত্ববাদী তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে আহ্বান ও আওয়াজ তুলেছেন, তুলেছেন ক্ষুরধার যুক্তি ও শুভবুদ্ধির কথা, গণতান্ত্রিক তথা মানবিক অধিকারের কথা। রয়েছেন তাঁরা যারা রাষ্ট্র যখন আদিবাসী-দলিত সম্প্রদায়ের আইনি অধিকার কমিয়ে দিতে চায় অ্যামেণ্ডমেণ্ট এনে, যখন ঝাড়খণ্ড-ছোটনাগপুরের মানুষের জমিনি হক কেড়ে নিতে চায় মাইনিং কোম্পানীদের স্বার্থে, তখন প্রতিবাদের ঝড় তোলেন, পথে নামেন। রয়েছেন ভীম আর্মির নেতা চন্দ্রশেখর “রাবণ” যাঁকে বিনা বিচারে মাসের পর মাস ‘ন্যাশানাল সিকিউরিটি অ্যাকট’এর মত প্রকট আইনের আওতায় ফেলে জেলে পুরে রাখে রাষ্ট্র, রয়েছেন গড়চিরৌলীতে জমিন কামড়ে বছরের পর বছর ধরে রয়েডস মাইনিং কোম্পানীর হাতে স্থানীয় আদিবাসীদের জল জঙ্গল জমিন চলে যাওয়ার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা  মহেশ রাউতের মতো মানুষ। সর্বোপরি, রয়েছে দেশ তথা উপমহাদেশের অগণন মানুষ – যারা যুগের পর যুগ ধরে বর্ণাশ্রমধর্মের হিংস্র গর্জনের সামনে দাঁড়িয়ে গেয়ে চলেছে আবহমান যাপনের, লোকায়ত প্রজ্ঞার জয়গান।

অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তী লেখক এব‌ং রাজনৈতিক কর্মী। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের ভাবনা পৌঁছে দিচ্ছেন পাঠকের কাছে।

 

 

Show More

Related Articles

One Comment

  1. There is a little typo, in the first paragraph it should be 24th August and not 8th August, 2018. That aside, it indeed is an extremely courageous and much needed article.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami