Uncategorized

শিবা থেকে অবনী: একটি ব্যাঘ্রযাপন

সোহম দাস

( আজ অরণ্যের এক প্রাচীন বাসিন্দাকে নিয়ে কিছু কথা। একটা ইংরেজি শিরোনামে চোখ আটকাল-‘ইন্ডিয়া রিসিভস টপ মার্কস ফর টাইগার কনজারভেশন’। গ্লোবাল টাইগার ফোরামের রেজাল্ট। অতঃপর…)

শৈশব। শীতকাল। আর এই শৈশব-শীতকালের যুগলবন্দীর পাশে হাজির থাকত আরও এক তালব্য শ। শিবা। বদলে যাওয়ার নব্বই। নব্বই মানে জরাজীর্ণ শতাব্দীর বার্ধক্যের বারাণসী। সেই নব্বইয়ের শীতে কাঁপুনি থাকত। খাবারদাবার বাঁধাছাঁদা চলত যত্ন নিয়ে। লুচি, আলুরদম মাস্ট। সঙ্গে মিষ্টি হয়ত। কেউ কেউ কেক-বিস্কুটে খুশি। বিস্কুট খেতে খেতে রেলিংয়ে উঠে বাচ্চারা শিবাকে দেখত। উন্মুক্ত বন্দীশালার কন্ট্রাডিকশন। শিবার উজ্জ্বল শরীরে শীতের নরম রোদে ঠিকরে বেরনো রাজকীয় বাঙালি গর্ব। বিষণ্ণতাও থাকত, হয়ত। আমরা ওসব ঠাহর করতে পারিনি, সে চোখ আমাদের ছিল না। আমরা শুধু বিকৃতস্বরে ‘ঘেঁয়াও’ আর মাঝে মাঝে ‘শিবা, এ শিবা’ বলে রেলিং দাপাতাম। ওসব কনজারভেশনের শিলান্যাস ধারণার অতীত।

আমাদের শৈশব, শিবার বার্ধক্য। অনেকটা ওই টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরিরই সমান। পনেরো পেরিয়েছে। বন্দী অবস্থায় পরমায়ু ওই ছ-সাতবছর এমনিতেই বাড়ে। সেই হিসেবে তখন বেশ বৃদ্ধ। তাও বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখিয়ে নিজের ব্যাঘ্রত্বের প্রমাণ দিয়েছিল। সেটা ছিল ১৯৯৬। বছর শুরুর দিন। বাঘবরণ। শিবার কামড়ে একজন অক্কা, আরেকজনের কোনওরকমে বেঁচে ফেরা। নিকৃষ্ট কুসংস্কারের গালে থাপ্পড়টা জুতসই হয়েছিল বটে। মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়েছিল শিবা। জঙ্গলে থাকলে নরখাদক হতো কি?

চিরাচরিত নীরব অধ্যায়। নব্বইয়ের সূর্য তখন ঢলছে পশ্চিমে। শিবারও দৃষ্টি ঝাপসা হচ্ছিল। সেই ঘটনার পর আর মাত্র চারবছর বেঁচেছিল শিবা। সাতদিনের জন্য হলেও ক্ষীণ চোখে দেখে গিয়েছিল নতুন শতাব্দীর সূর্য। দীর্ঘায়ু শার্দূলের মৃত্যুতে হেডলাইন হয়েছিল কাগজে। ফাঁকা রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হল বব। শিবার ছেলে। রাজত্বের প্রথম বছরেই জানিয়ে দিয়েছিল দু’পেয়ে দুবলা জীবের স্পর্ধাকে রেয়াত সে-ও করবে না। বাবার যোগ্য উত্তরসূরি। ঘাড়ে কামড় বসিয়ে শেষ করে দিয়েছিল মদ্যপ লোকটাকে। দু’খানা রেলিং, পরিখা টপকে লড়তে এসেছিল ব্যাটা!

শীতকালে আরও এক জায়গায় তেনাদের দেখা মিলত। জীবনের প্রথম ও একমাত্র দেখা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। অজন্তা সার্কাসের তাঁবু পড়ত পার্ক সার্কাস ময়দানে। গলায় রশি বেঁধে খোলা রিংয়ে বাবাজিকে বার করার আগে সার্কাস কর্তৃপক্ষের ঘোষণা-‘ভয়ের কোনও কারণ নেই’। হিংস্র জীবকে বিশ্বাস নেই যে! তখনও ন্যাট জিও বা এনজিসি বলতে শিখিনি, কষ্ট করে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল। কখনও অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট। কখনও ডিসকভারি। ওই তিন চ্যানেলেই জঙ্গলের জার্নাল থাকে যে। আফ্রিকার উন্মুক্ত সম্পদের কাছে প্রাইভেসি মেনটেন করা ভারতীয় প্রাণীকুল পাত্তা পেত না। ডিগডিগে চিতা কিংবা ‘হুউউঃ’ ডাকের হায়নার দলরাই তখন আসত বেশি। ফিলিপ্সের উজ্জ্বল পর্দায়, কখনও স্বপ্নেও। সিংহীদের প্রমীলা বাহিনীর কর্মনৈপুণ্যেও ছিল মুগ্ধতা। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। সাহেবি ইংরিজি ধারাভাষ্যে কোথাও থাকতেন না বাদাবনের দক্ষিণরায়।

তারপর উপেন্দ্রকিশোরকে সরিয়ে বুদ্ধদেব এলেন। টাগের ভয়ে গুটিয়ে যাওয়ার সরল হাস্যরস বা কচুবনে ঢুকে কচু খেয়ে মুখ ফুলিয়ে মরার ফ্যান্টাসিকে সরিয়ে সেখানে জায়গা নিচ্ছেন ঋজুদারা। সেখানে ম্যানলিখার শ্যুনারের গর্জন মাসুল দিতে বাধ্য করত অবাধ্যদের। অবাধ্য, কারণ তারা মানুষের নিয়ম ভেঙেছিল। কিন্তু এসবের বাইরেও সে জগতে অপার্থিব আকর্ষণ ছিল। ফাঁকা টাঁড়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ানো টাঁড়বাঘোয়ারা ছিল। একে অন্যের হত্যাকারী হয়েও পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিল বুড়ো শিকারী আর চির-অপরাজেয় বুড়হা বাঘা। শেষ মুহূর্তে বুড়হা বাঘার ফাজিল সূর্যকে আকাশ থেকে ছিঁড়ে নামানোর মৃত্যুচেতনায় ভরপুর রোমান্টিসিজম। ল্যাংড়া পাহান ছিল সেখানে। কখনও মানুষের ক্ষতি না করা ল্যাংড়া পাহানের মানুষখেকো হয়ে যাওয়ার দ্যোতনাময়তা, হেভি বোরের বুলেটও যার মৃত্যু পরোয়ানা লিখতে অক্ষম।

বুড়হা বাঘা, ল্যাংড়া পাহানদের বিদেশিনী ভগিনী। সেও নিয়ম ভেঙেছিল। একবিংশ শতকের বাস্তবে। সান ফ্রান্সিস্কো। পশ্চিমা আগ্রাসনের মাটিতে দাঁড়িয়ে জেলখানার বারো ফুট উঁচু পাঁচিল টপকে চলে এসেছিল সে। স্পর্ধা দেখিয়েছিল বটে বীরাঙ্গনা তুষারকন্যেটি। একজনের মৃত্যু। পাহানের দৈব তার ছিল না। আইন রক্ষার বুলেট। অন্তিম মুহূর্তে স্বর্গত শিবার আশীর্বাদ কি পেয়েছিল সাইবেরিয়ান তাতিয়ানা?

গভীর সমুদ্রে তরুণ পাইয়ের একাকী সঙ্গী রিচার্ড পার্কারের কাহিনী আমাকে টানেনি। কুমার আর সঙ্গার দুই ভাইয়ের ক্যারিশমাও নয়। আমায় বরং টেনেছিল কুমার-সঙ্গার দুঃখিনী মা। নির্মম দুনিয়ার ক্যালেইডোস্কোপ। জাঁ জাকুয়েস আনোউয়ের নিখুঁত চিত্রনাট্য। ফরাসি-শাসিত কম্বোডিয়া। প্রাচীন ইতিহাসের ছায়ার নিরাপদ আশ্রয়। বাবা-মা আর দুই শিশুপুত্রের পরিবার। ছোট্ট কুমারের নিষ্পাপ চোখ দেখল, সভ্যতার বিষে কী সহজেই চিরনিদ্রায় শায়িত হল তার বাবা। সেই রক্তাক্ত শীতল মৃতদেহটার উষ্ণ আরামে লুকোতে চাইছিল সে। ভাই সঙ্গাকে নিয়ে মা পালাতে পেরেছিল সেদিন। তবুও বাবার হত্যাকারীকে কুমার বন্ধু মেনেছিল, হানি ড্রপ খেতে চাইত শৈশবস্বাচ্ছন্দ্যে। সার্কাসের গাড়ির পেছনের দমবন্ধ বাক্সের একচিলতে ফুটো। কুমার দেখছিল, তাকে বাঁচাতে সারাটা রাস্তা দৌড়ে আসছে মা। বন্দী কুমার এ-ও দেখেছিল, মা পারেনি ওদের শৃঙ্খলা ভাঙতে। কুমারের চলে যাওয়াটা দেখতে দেখতে হাঁপাতে থাকা মা সঙ্গার দিকে তাকিয়েই বাঁচতে চেয়েছিল বোধহয়।

অপদার্থ রাজকুমারের আনাড়ি হাতের ফায়ারিংয়ে ভুল কানে গুলি খেয়ে সাময়িক সংজ্ঞা-হারানো। শুধু একঝলক আলোর দরকার ছিল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। নির্বোধ অসহায়তাকে এক ঝটকায় ছিটকে ফেলে দিয়ে ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে কি যন্ত্রসভ্যতার দিকে মিডফিঙ্গারটা দেখায়নি অরণ্য-সম্রাজ্ঞী, একবারও? লড়াইয়ের আঙিনায় দুই ভাই একে-অপরকে চিনে ফেলল। উথলে ওঠা ভ্রাতৃপ্রেম। ড্রামাটিক হ্যাপি এন্ডিং। কিন্তু সঙ্গীহীনা সিঙ্গল মাদারের অপেক্ষার গল্প, ওটা ছিল না।
পাওয়ালগড়ের চিরকুমার একটাও মানুষ মারেনি। অসীম ধৈর্য্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চম্পাবত-রুদ্রপ্রয়াগের মানুষদের বাঁচিয়েছিলেন আপনি, দশ ফুট সাত ইঞ্চির শার্দূলকে মেরে এই ট্রফির ইঁদুরদৌড়ে সামিল হওয়াটা আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশিত ছিল না, মাননীয় এডওয়ার্ড জেমস করবেট।

লালগড়ে আসা পথভোলা পথিকটি শুধু নতুন দেশ দেখে বেড়াচ্ছিল। পেটের জ্বালায় মাঝে মাঝে বাছুর। পুরস্কার হিসেবে মুখে গেঁথে যাওয়া বর্শার ফলা। কাপুরুষ জীবের অস্ত্রে মৃত্যুই কি তবে নিয়তি?

পলিটিক্যাল নেক্সাস। ডেথ সেন্টেন্স। ভোটব্যাঙ্ক। প্রতিপক্ষের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ১৩টা মৃত্যুর অভিযোগ। অবনী, ক্ষমা করো, পারলে।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami