রাজনীতি

৪০ লক্ষ রাষ্ট্রহীন?

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার

কিছুদিন আগেও এই দেশের মানুষ বোধহয় জানতেনই না যে দেশের একটি অঙ্গরাজ্যে এক কলমের খোঁচায় ৪০ লক্ষ মানুষের ওপর নেমে আসতে পারে রাষ্ট্রহীন হওয়ার আতঙ্ক। কোথায় ঘটেছে এই ঘটনা এ বোধহয় এখন আর জানার কারো বাকি নেই। তবে কেন হয়েছে তার বিন্দুবিসর্গ জানেন না বেশিরভাগ ভারতীয়। জাতীয় নাগরিক পঞ্জী নামে যে একটি দলিল ১৯৫১ সালে প্রস্তুত হয়েছিল এ দেশে তা ক’জন জানেন? অথচ আসামে গত প্রায় অর্ধ শতকের রাজনীতি উত্তাল এই দলিল নিয়ে। বারবার আলোচিত হচ্ছে এর কথা। এই দলিলেই নাকি রয়েছে আসাম রাজ‍্য ও অসমীয়াভাষী মানুষের জিয়নকাঠি। দলিলটির পুনর্নবীকরণ করলেই নাকি সুরক্ষিত হয়ে যাবে অসমীয়া সমাজ ও তার ভাষা সংস্কৃতি। প্রায় ৫০,০০০ কর্মী নিয়োগ করে ১,১২০.৯৩ কোটি টাকা ব‍্যয় করে ৩.২৯ কোটি আবেদনকারী মানুষের নাগরিকত্বের দাবি যাচাই হয়েছে ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই অবধি। এত বড় কর্মযজ্ঞ শুধুমাত্র একটি অঙ্গরাজ‍্যের একটি ছাত্র সংগঠনের আন্দোলনের দাবিকে সম্মান দিতে। কোনো আন্দোলনের দাবিকে ভারতীয় রাষ্ট্র এভাবে মান‍্যতা দিয়েছে এত বড় ব‍্যয়ভার গ্রহণ করে, তার সমদৃষ্টান্ত নেই।

 

যে খসড়াটি প্রকাশিত হয়েছে তাও আবার মোটেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন নয়। এটি চূড়ান্ত খসড়া। সুপ্রিম কোর্টের আদেশের আর কোনো পরিবর্তন না হলে আর কোনো খসড়া বেরোবে না। এই খসড়াতে বাদ পরা ৪০ লক্ষের পুনঃ অন্তর্ভুক্তির আবেদন শেষবার বিবেচনা করে আবার একদফা সংযোজন ও বিয়োজনের পর সরাসরি প্রকাশিত হবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এমন কোনো সময়সীমা দেয় নি। এই গোটা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ব‍্যয় নির্বাহের বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবধি। সেই হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের শেষ সময়সীমা ৩১ ডিসেম্বর। এই ৪০ লক্ষ মানুষ এই খসড়া প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকারিভাবে রাষ্ট্রহীন হয়ে গেছেন বললে সত‍্যের অপলাপ হবে। তবে তাঁদের মাথার ওপর যে রাষ্ট্রহীনতার খড়্গ ঝুলছে এ সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ নেই। তার চেয়েও বড় কথা যে রাজনৈতিক শক্তির চাপে আসামে এই বিশাল ব‍্যয়ের রাষ্ট্রীয় উদ‍্যোগ নেওয়া হয়েছিল তাঁরা কী চোখে দেখছেন এই ৪০ লক্ষ মানুষকে? কারণ আসামে শান্তি অশান্তির অনেকটাই নির্ভর করে এই শক্তিগুলির উপর। আমাদের দুশ্চিন্তা এখানেই। গত শতকের তথাকথিত বিদেশি নাগরিক বহিষ্কারের আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীরা দাবি করেছিলেন আসামে ৪০ লক্ষ বিদেশি নাগরিক অনুপ্রবেশ করেছে। অন‍্য কেউ কেউ বলতেন ৬০ লক্ষ। আবার কেউ বলতেন ১ কোটি। এই হিসেবগুলো কীভাবে পাওয়া গেল তার কেউ কখনো বলে নি। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের দাবি উত্থাপন করার সময় যুক্তিতর্কের ধার না-ধারাটাই আসামের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। শুধু আসামের ভেতরের রাজনীতির খেলোয়াড়রাই নয়, আসাম নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দায়িত্বশীল সাংবিধানিক পদে থাকা বিশিষ্ট জনেরা ও কখনো যুক্তির ধার ধারেন নি। আসামের এক সময়ের রাজ‍্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস,কে সিনহা কেন্দ্রকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলেছিলেন আসামে ৫০ লক্ষ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। এর সূত্র ধরে একই কথা সংসদে বলেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। এই সংখ‍্যাটির হিসেব হল কীভাবে, এবং কোন কোন অঞ্চলকে মূলত এই বিদেশি অনুপ্রবেশকারীর বসবাসস্থল বলা হচ্ছে তাও নির্দিষ্ট করেন নি কেউ।

আসামের অসমীয়া জাতীয়তাবাদী নেতারা বিষয়টাকে মূলত ভাষিক কোণ থেকে দেখেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালি মুসলিমদের বৃহত্তম অংশ যেহেতু ১৯৫১ সালের জনগণনায় নানা রাজনৈতিক ঘটনার আবর্তে নিজেদের অসমীয়াভাষী হিসেবে নথিভুক্ত করেছিলেন, ফলে এই মানুষরা বঙ্গীয় মূলের হলেও এদের নিয়ে অসমীয়া জাতীয়তাবাদের কোনো আপত্তি নেই। যদিও এরা বাড়িতে এখনও ময়মনসিংহের উপভাষাতেই কথা বলে। অন‍্যদিকে, উত্তর ভারতীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বদ্ধমূল ধারণা বাংলাভাষী মুসলমান মানেই বাংলাদেশী। সারাদেশে বাংলাদেশী সন্দেহে যে পেশাজীবী মানুষরা হেনস্থার শিকার হয়ে থাকেন, তাদের প্রায় সবাই পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলার মানুষ। তাদের ভাষার সাথে ধর্মকে যোগ করে তাদের বাংলাদেশী বলে অভিযুক্ত করা হয়। এই একই মানসিকতারই বারবার প্রতিফলন হয়েছে আর্যাবর্তের রাজনৈতিক নেতা ও সাংবিধানিক পদে থাকা মানুষদের দায়িত্বজ্ঞানহীন উচ্চারণে। এন-আর-সি-র চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হওয়ার পর আসামের জাতীয়তাবাদী নেতা থেকে শুরু করে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতির প্রতিক্রিয়া দেখে এটাই বোঝা যাচ্ছে, আইন যাই বলুক, তাদের চোখে এই বাদ পরা ৪০ লক্ষ বিদেশি-ই।  আসামের তথাকথিত বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলনের সেসময়ের নেতা এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল মোহন্ত বলেছেন, আমি তো অনেক আগেই বলেছি বিদেশির সংখ‍্যা ৪০ লক্ষ। এই দেখুন আমার অনুমান সত‍্য হল। প্রফুল্ল মোহন্তর উত্তরসূরী আসামের দোর্দণ্ডপ্রতাপ ছাত্রনেতা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য আবার রেগে গেছেন। তার বক্তব্য, স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আসামে ৫০ লক্ষ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। সংখ‍্যাটা ১০ লক্ষ কমে গেল কেন? তার মানে প্রফুল্ল মোহন্ত ও সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্যের চোখে এই ৪০ লক্ষ সন্দেহাতীতভাবে বিদেশি। তাদের এই ধারণা আসামের রাজনীতিতে বড় ছায়া ফেলার শঙ্কা রয়েছে। তবে বিষয়টি এখন আর শুধু শঙ্কা আর প্রফুল্ল-সমুজ্জ্বলে সীমাবদ্ধ নেই। এই ৪০ লক্ষ মানুষকে বিদেশি ঠাউরে জাতিবিদ্বেষের বিষ আবার ছড়িয়ে পড়ছে উত্তর পূর্বের প্রতিবেশী রাজ‍্যগুলিতেও। মেঘালয়ে বাস থেকে নামিয়ে বঙ্গভাষীদের এন-আর-সি-র নথি দেখানোর দাবি করে শারীরিক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। মণিপুর সীমান্তে পুলিশ প্রহরা বাড়ানোর নাম করে সাধারণ বঙ্গভাষীদের হেনস্থা করছে। অরুণাচল প্রদেশে সেখানকার ছাত্র সংগঠন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, পনেরো দিনের মধ‍্যে বঙ্গভাষী মানুষকে অরুণাচল প্রদেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। আশ্চর্যজনকভাবে হলেও সত‍্য এই হেনস্থাকারীদের দলে সর্বাগ্রে নাম লিখিয়েছেন বলা যায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও। তিনি এন-আর-সি-র খসড়া প্রকাশ হওয়ার আগেই পুলিশকে সতর্ক করে বলেছেন এন-আর-সি ছুট পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে চাইলে তাদের যেন পুশব‍্যাক করা হয়। এই যে বাদ পরা মানুষ নিয়ে এত ভয়, এত চীৎকার, এমনকী কারোর ক্ষেত্রে এত আত্মপ্রসাদও- এরা কারা? এদের জাতিগত পরিচয় এখনও স্পষ্ট নয়। সিংহভাগ বাঙালি সন্দেহ নেই। আসামের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হল সংখ‍্যা। সংখ‍্যার কম বেশির প্রেক্ষিতেই আসামের রাজনীতির একটি অংশ জয় পরাজয়ের হিসেব করেন। আসামের বঙ্গভাষী মানুষকে ‘বিদেশি’ সন্দেহ করে রাষ্ট্রের তরফে হেনস্থা ও অমানবিক নির্যাতন চলছে কয়েক দশক ধরেই। ভিত্তিহীন অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচ লক্ষ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বিসর্জন দিয়ে মাথায় এঁটে দেওয়া হয়েছে সন্দেহভাজনের শিরোপা, ডি-ভোটার পরিচয়। একতরফা বিচারের প্রহসনের উপর ভর করে পরবর্তী ধাপে হাজার হাজার মানুষকে নিক্ষেপ করা হয়েছে ডিটেনশন ক‍্যাম্পে; যেখানে একটি সাধারণ কারাগারে ভয়ঙ্কর খুনী অপরাধীও যেটুকু মানবিক অধিকার পায়, তাও নেই।

 

এখন প্রশ্ন উঠবে এমনটা কেন হচ্ছে এবং হচ্ছে যখন তখন শুধু আসামেই হচ্ছে কেন? এটার জন‍্যে আসামের ইতিহাস জানা জরুরি, আসামের রাজনীতির বিশেষ কিছু আলাদা ব‍্যাপার রয়েছে সে সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। মোদ্দা কথা, আসামের ইতিহাস ও রাজনীতিকে আলাদা করে নয়, একটিকে অপরটির সাথে সম্পৃক্ত করেই জানতে হবে। আজকের এন-আর-সি নবীকরণের উৎসে রয়েছে ১৯৭৮ সালের আসামের একটি রাজনৈতিক পর্ব ও তার পরবর্তী সময়ে। যদিও ওই সময়পর্বের ঘটনাবলীও নাড়ীর সম্পর্কে যুক্ত হয়ে আছে উনবিংশ শতকের রাজনীতির সঙ্গে। আবার সেই রাজনীতির শাখাপ্রশাখা ছড়িয়েছে স্বাধীনতা উত্তর আসামের রাজনীতি অবধি। ১৯৭৮ সাল দিয়েই শুরু করা যাক। ১৯৭৮ সালের আসাম বিধানসভার নির্বাচনে সবাইকে চমকে দিয়ে ১২৬ আসনের মধ‍্যে ২৫টি আসনে বামপন্থীরা জয়ী হন। অনেকেই ভাবলেন পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, ত্রিপুরার পর আসামেও হয়ত বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসবে। এই চমকের মধ‍্যে আরো বিস্ময়কর চমক দিয়ে হঠাৎ করেই আনন্দবাজার পত্রিকায়, তাদের বৃহস্পতিবারের  নিয়মিত কলাম ‘রাজ‍্য রাজনীতি’ তে লেখা হল আসামে সিপিএম’র বিজয় বাঙালিদের আধিপত্য বৃদ্ধির প্রতীক। এই লেখা আসামে দাবানলের সৃষ্টি করল। রাজ‍্যের দিকে দিকে আনন্দবাজার পত্রিকার বহ্নুৎসব করল আসামের জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন আসু। আসামের শতাব্দীপ্রাচীন বাঙালি বিদ্বেষের রাজনীতি পুনর্জন্ম নিতে শুরু করল। এবার এর সাথে নতুন করে যুক্ত হল বামপন্থী বিদ্বেষ। দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা হতে থাকল ‘সিপিএম এর নামে বৃহত্তর বাঙালি রাজ‍্য প্রতিষ্ঠা চলবে না’, ‘ঘরে একটি বিষধর সাপ ও একজন বামপন্থী ঢুকলে, আগে বামপন্থীটিকে হত‍্যা কর’। ওই সময়েই আসামের একজন সাংসদের মৃত্যুতে উপনির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। আসু, পূর্বাঞ্চলীয় লোক পরিষদ সহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী সংগঠন আবদার করে বলল, ভোট করা যাবে না। ভোটার তালিকায় হাজার হাজার বাংলাদেশীদের নাম রয়েছে। কোথা থেকে তারা হিসেব পেলেন তার জবাবদিহির কোনো প্রয়োজন থাকল না। একটা আবদারকে দাবির রূপ দিয়ে সারা রাজ‍্যে অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠল। বছরের পর বছর শিক্ষাব্যবস্থা স্তব্ধ। দোকান বাজার স্কুল কলেজ অনিশ্চিত হয়ে গেল লাগাতর বন্ধ্, হরতাল আর অসহযোগ আন্দোলনের ফলে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল ১৯৫১ সালের পর পূর্ববঙ্গ থেকে যারাই এসেছে আসামে তাদের বাংলাদেশে ফেরৎ পাঠাতে হবে। হত‍্যার ঘটনা ঘটল অজস্র। একের পর এক সংগঠিত পরিকল্পিত গণহত‍্যার ঘটনায় প্রাণ হারালেন যারা মাতৃভাষা ত‍্যাগ করে সরকারিভাবে নিজেদের অসমীয়াভাষী ঘোষণা করেছিলেন সেই ময়মনসিংহ মূলের বাঙালি মুসলমানেরা। ব‍্যক্তিহত‍্যার শিকার হলেন বাংলাভাষী মানুষ। অসমীয়াভাষী বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীরা খুন হলেন। প্রায় ষাটজন বামপন্থী কর্মীর হত‍্যার পাশাপাশি হাজার হাজার বামপন্থী কর্মীদের সামাজিক বয়কট করা হল। তাঁরা নিজেদের এলাকা থেকে বিতাড়িত হলেন। বছরের পর বছর চলতে থাকল আন্দোলন।

 

অচলাবস্থায় মানুষ যখন বিরক্ত ও ক্লান্ত হয়ে উঠেছে তখন ১৯৮৫ সালে তৎকালীন অত‍্যুৎসাহী প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী রণক্লান্ত আন্দোলনের নেতৃত্বের সাথে চুক্তি করে তাদের পুনর্জীবন দিলেন। নিজেদের পুরোনো জেদ ছেড়ে ওরা বললেন ১৯৫১ নয়, ১৯৭১ সালের পর যারা বাংলাদেশ থেকে আসামে এসেছে তাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ঘোষণা করে বহিষ্কার করা হোক। আসামের জনগনের অন‍্যান‍্য অংশের সাথে আলোচনা করার প্রয়োজনই মনে করলেন না কেন্দ্রীয় সরকার। একতরফা এই চুক্তির হাওয়ায় বিজয়ীর শিরোপা মাথায় নিয়ে রাজ‍্যে সরকার গঠন করলেন আন্দোলনকারীরা। সরকারে এসে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন কিছুতেই সংখ‍্যাটা ৪০/৫০ লক্ষে পৌঁছচ্ছে না। একতরফা অভিযোগ এনে পাঁচ লক্ষ মানুষকে সন্দেহজনক ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করলেন। আইন ও ন‍্যায়বিচারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েও ‘প্রকৃত বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করলেন কয়েক হাজার মানুষকে মাত্র। ৪০/৫০ লক্ষ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী তত্ত্বের ফানুশ ফেটে গেল। আসামের রাজনীতি যেহেতু সংখ‍্যার কল্পিত তত্ত্বে আবর্তিত হয়, তাই এবারে বলা হতে থাকল বিদেশি চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াতে ত্রুটি রয়েছে। অন‍্যদিকে আসামের ভাষিক বিদ্বেষের রাজনীতিতে আরএসএস এর শক্তিবৃদ্ধির ফলে ভাষিক বিদ্বেষের সাথে ধর্মীয় বিদ্বেষের মাত্রাও যুক্ত হতে থাকল। প্রকৃতপক্ষে ভাষান্তরিত বঙ্গভাষী মুসলমানদের গণহত‍্যার ঘটনা আরএসএস-এর যোগসাজশেরই ফল ছিল। আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সাথে হিন্দুত্বের প্রাথমিক প্রণয়ের পর্ব সেরে এখন পুরোদস্তুর বিবাহের প্রাক আয়োজন। এখন রাজ‍্যে বিজেপি সরকার থাকলেও বিগত কংগ্রেস সরকারের সময়েই সিদ্ধান্ত হল সব সন্দেহ দূর করার জন‍্যে ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকে নবীকরণ করার। প্রকৃতপক্ষে, এটার প্রয়োজন ছিল না। আসাম চুক্তির বিভিন্ন ধারাগুলির কঠোর মান‍্যতার মধ‍্য দিয়েই তৈরি হয়েছিল ২০১৪ সালের ভোটার তালিকা। সেই ভোটার তালিকাকে ভিত্তি করেই হতে পারত এন-আর-সি’র নবীকরণ। সেটা করলে যেহেতু উগ্র অসমীয়া জাতীয়তাবাদকে সন্তুষ্ট করার মত রাশিতে পৌঁছয় না বিদেশি নাগরিকের সংখ‍্যা, তাই তাদের মন রাখতে এই বিপুল ব‍্যয়ের দুঃসাধ্য কর্মযজ্ঞে হাত দেওয়া হল। আবেদনকারীদের ও ব‍্যবস্থার অন্তর্নিহিত যান্ত্রিক ত্রুটি ও এর সাথে প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দুর্নীতির বলি হয়ে আজ ৪০ লক্ষ মানুষের মাথার ওপর অ-ভারতীয়ত্বের খাঁড়া। পুনর্বিবেচনার পর কত লক্ষ লোকের নাম বাদ পড়বে কেউ জানে না। চূড়ান্ত তালিকায় যে ভাষাভিত্তিক বা ধর্মীয় পক্ষপাত থাকবে না তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না। ভাষিক পক্ষপাত থাকবেই। যেহেতু মূল উদ্দেশ্যই অবৈধ বাংলাদেশী চিহ্নিতকরণ, ফলে অবাঙালিদের নথিতে গোলমাল থাকলেও তাঁদের নাম নথিভুক্ত হবে। কারণ একজন অসমীয়া বা পাঞ্জাবী বা মনিপুরীকে তো সরকার বাংলাদেশী বলে চিহ্নিত করবে না। যদিও বাংলাদেশে সংখ‍্যায় খুব কম হলেও এই তিনটি জনগোষ্ঠীরই মানুষ আছেন। সেক্ষেত্রেও আতঙ্কটা ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর যেটার ভয় ঘোষিত ভাবেই তারা বাঙালিদের তরফ থেকেই আছে বলে মনে করা হয়। সুতরাং চূড়ান্ত তালিকা ত্রুটিহীন হওয়া ও আসামে ভাষিক সংঘাতের অবসান করবে এমনটা ভাবার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

জাতিবিদ্বেষের ঢেউ নতুন করে যেভাবে জেগে উঠেছে তাতে বিপদ এই মুহূর্তের চেয়েও আরো বড় আকারে আস্তে পারে। অনেকেই ভয় পাচ্ছেন, দেশভাগের চেয়েও বড় বিপর্যয় হয়ত আসছে এই দেশে।

শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রশাসনিক পদে কর্মরত। ইতিপূর্বে আসামে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত ছিলেন। বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী এবং রাজনৈতিক কর্মী। আসামের নাগরিক হিসেবে বর্তমান সমস্যায় আলোকপাত করলেন।
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami