ক্রিয়েটিভ ক্যুজিন
Trending

শহর সেরা বিফ জয়েন্টের ঠিকানা

সুমন বিশ্বাস

শহর সেরা বিফ জয়েন্টের ঠিকানা

সুমন বিশ্বাস

2০১৫ র ডিসেম্বর মাস। বছর শেষে ভারতের তাবড় ব্যক্তিত্বরা অপেক্ষায় উদগ্রীব। কার মাথায় উঠবে সেই সম্মান! প্রতিযোগিতায় রয়েছে নরেন্দ্র মোদী, সানি লিওন, অমিতাভ বচ্চনের মতো হেভিওয়েট নাম। ফল বেরোলো। ইয়াহু কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলেন, ২০১৫ সালের ‘পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ার’ আর কেউ নয়, এক এবং একমাত্র – গরু। অন্তর্জালের দুনিয়া থেকে শুরু করে টিভির পর্দা, খবরের কাগজের নিউজপ্রিন্ট, সংসদের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত গরম কক্ষ, চায়ের বেঞ্চ থেকে বাংলা মদের ঠেক – বিগত কয়েক বছর তিনিই তো সর্বঘটের কাঁঠালি কলা। গোমাতা, গো মাংস, গো রক্ষক – কত কত শব্দ তো তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়ে চলেছে দিনের পর দিন। একশো কুড়ি কোটির একটা দেশ আড়াআড়ি ভাবে ভাগ শুধু তো ওই একটা প্রাণীকে ঘিরেই – গরু। তাকে রক্ষা করা আর তাকে জবাই করা, এই দুইয়ের মধ্যেই তো দুলে চলেছে একটা গোটা ভূখণ্ড। দাদরির মহম্মদ ইকলাখই হোক বা কাশ্মীরের যাযাবর নাবালিকা – প্রাণ খোয়াতে হয়েছে তার নামেই। একজন ন্যায়াধীশ বলছেন, তাকেই করা হোক জাতীয় পশু, আরেক বিচারওয়ালা বলছেন, গোহত্যার সাজা তবে হোক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ কোর্ট জবাব চাইছে রাষ্ট্রের কাছে।দিকে দিকে বন্ধ হচ্ছে গোশালা, ধুঁকছে চর্মশিল্প। কিন্তু এত তর্ক বিতর্কের ধার এড়িয়ে যে সরল প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় পথে ঘাটে, তা হল গরু খেতে কেমন? যারা খান বা খেয়েছেন, তারা এর প্রেমিক। ধর্মীয় বেড়াজাল সেখানে নিতান্তই ঠুনকো, অপাংক্তেয়। তাই গরুর মাংসকে শুধুমাত্র মুসলমানের সঙ্গে একত্রে জড়িয়ে দেওয়ার যে প্রবনতা জারি রয়েছে, তাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে বহু হিন্দু মননও।

beef-politics.jpg

গরুই যখন রাষ্ট্রের প্রধানতম ইস্যু, তখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বন্ধ হতে বসেছে বিখ্যাত সব ‘বিফ জংশন’। লখনউ এর বিশ্ববন্দিত টুণ্ডে কাবাবের দোকান কার্যত ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পথে এগোচ্ছে। আর আমাদের কলকাতা? গো মাতার ভক্তদের বিষদাঁত এখনও পর্যন্ত সেভাবে বসেনি তিলোত্তমার বুকে। তাই এ রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৮.৬৬% বিফ ভক্তদের জন্য শহরের আনাচে কানাচে দাঁড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু ডেষ্টিনেশান, যা বাকি নেশান এর কোথাও হয়তো পাওয়া যাবে না। এগোনো যাক তবে। ফুটপাত ধরে হাঁটুন, জিভের জল সামলে চলুন।

গলি তস্য গলির প্রবীণ বড়বাজার আর প্রায় দেড়শো বছরের নাখোদা মসজিদকে সাক্ষী রেখে এখনও বহমান জাকারিয়া ষ্ট্রিট। যে জাকারিয়া দেখেনি, সে কলকাতাই দেখেনি। এই জাকারিয়াই হল কলকাতার সবচেয়ে বড় বিফ আস্তানা। রামজানের সময়ে এই অঞ্চল তো খাদ্যরসিক, সর্বোপরি বিফ রসিকদের কাছে স্বর্গরাজ্যই বলা চলে।

zakaria street.jpg

জাকারিয়া স্ট্রিট

সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে কলুটলা ষ্ট্রীট ধরে একটু এগিয়ে পাবেন ‘ইসলামিয়া’। জাকারিয়ার এক অন্যতম ল্যান্ডমার্ক। রামজান মাসে ইসলামিয়ার ‘বিফ হালিম’ খেতে ছুটে আসেন বরানগর থেকে বনগাঁ – কত দূর দূরান্তের মানুষ। ৩২ রকমের মশলা, ১৩ রকমের ডাল, আর ছোট ছোট বিফের টুকরোর সমন্বয়ে তৈরি ইসলামিয়ার হালিম এখনও অদ্বিতীয়। ১১০ টাকার সেই অমৃত জিভের স্বাদ গ্রন্থিতে সুনামি আনে নিঃসন্দেহে। এই রমজানের সময়ে ৪০ বছর ধরে জাকারিয়াতেই ঠেলা গাড়িতে হালিম বিক্রি করেন বিহারের আদি বাসিন্দা আলতাফ হোসেন। তাঁর ২৫ টাকার স্পেশাল আরবি হালিম পাল্লা দিতে পারে যে কোনও বড় রেস্টুরেন্টকেও। islamia halim.jpg

ইসলামিয়ার হালিম

শীতের ভোরে কলকাতায় যাদের ঘুম ভাঙে, তাদের মধ্যে প্রকৃত খাদ্যরসিকরা অনেককেই গুটিগুটি পায়ে ভীড় জমায় ‘সুফিয়া’র সামনে। নাখোদার ঠিক পাশেই এই রেস্টুরেন্টের ‘নিহারী’র জন্য লাইন পড়ে ভোর চারটের সময়। কিছুক্ষনের মধ্যেই অবশ্য খেল খতম। সুফিয়ার গরম নিহারী আর ধোঁয়া ওঠা পুরি দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেছেন, আর স্বাদ ভুলে গেছেন, ভূ-ভারতেএমন মানুষ বিরল। তাছাড়াও শুক্রবার করে সুফিয়ার বিফ খিচরির জন্য অগ্রিম টাকা দিয়ে রাখেন অনেকেই।

nihari__Sufia.JPG

সুফিয়ার নিহারী

নাখোদা থেকেই ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে প্রায় নব্বই বছর ধরে ক্যারিশমা দেখাচ্ছে ‘বোম্বে হোটেল’। এদের তন্দুরি রুটি আর বিফ চাপের অনন্য মেলবন্ধন আসল বোম্বেতেও পাবেন না। সামান্য কালচে রঙের ৫৫ টাকার এই বিফ চাপের প্রেমে পড়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় জমায় কত যে মানুষ, তার হিসেব রাখা মুশকিল।

জাকারিয়ার অদূরেই ফিয়ার্স লেন। কলকাতার এই বিখ্যাত রাস্তাতেই পাবেন, ‘অ্যাডামস্ কাবাব শপ’। বছরের পর বছর নানান কাবাবের সম্ভার নিয়ে বিফ প্রেমীদের সমৃদ্ধ করে চলেছে অ্যাডামস্। সরু সরু শিকের মধ্যে ঢোকানো তাদের ‘সুতলি কাবাব’ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে নিঃসন্দেহে।

Sutli kabab__adams.jpg

অ্যাডামসের সুতলি কাবাব

অ্যাডামস্ থেকে একটু এগিয়ে যান। গোলাপি রঙের শাটার লাগানো দোকান – ‘দিলশপ কাবাবওয়ালা’। কোনটা খাবেন? বিফ মালাই কাবাব? এই কাবাব ওয়ালার ‘ক্ষিরি কাবাব’ মিস করাটা আবার অপরাধের সামিল। গরুর বাঁটের মাংস দিয়ে তৈরি হয় বলে বেশ নরম হয় ক্ষিরি কাবাব। স্বাদ? না খেলে তো লোপ্পা ক্যাচ মিস্।

হগ মার্কেটের সামনে সেই কোন্ কাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে ‘নিজাম ‘। বিফ কাঠি কাবাব রোলের উদ্ভাবক। এখন অবশ্য আর মেলে না। সেই ঐতিহাসিক কষ্ট শহরের বহু বিফ প্রেমীর বুকে আজও দগদগে ক্ষতের মতো। তবে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে হাজির ‘ইউপি বিহার’। নিজামের পাশেই এই দোকানের বিশেষত্ব কোফতা। তাদের বিফ নার্গিস কোফতা আর বিফ কোফতা আলুর রহস্য কোকাকলার ফর্মুলার মতোই গোপনীয়। কারণ এ স্বাদের রেসিপি হাতছাড়া হওয়া মানে ব্যবসার মূল ‘ধন’ – টাই হাতছাড়া হয়ে যাওয়া।

যদি মনে অভিপ্রিয় থাকে একটা বিফ সপ্তাহ পালনের, সে বন্দোবস্তও আছে রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের ‘নিউ আরাফত’ এ। প্রতিদিন ভিন্ন মেনু। সোমবার পালক গোস্ত হলে মঙ্গলবার কাড্ডু গোস্ত, বুধে মটর গোস্ত, বৃহস্পতিতে আবার টমেটো ষ্টু, শুক্রে বিফ খিচরি, শনিতে পাসিন্দা চাপ, আর ছুটির দিনে মোটামুটি সবই। তবে হাতে একটু সময় নিয়ে যাবেন, কারণ একটা ঠাসা ভিড় আপনাকে সহ্য করতেই হবে।

ওখান থেকে পার্ক ষ্ট্রীট আর কত দূরই বা! দেশের স্বাধীনতার বছরে জন্ম নেওয়া অলিম্পিয়া সেই কবে হয়ে গেছে ‘অলি পাব’। আগুনে পুড়েছে, আবার উঠে দাঁড়িয়েছে সাহেবিয়ানার ঝলক বয়ে বেড়ানো অলিপাব। কলেজ পড়ুয়া তন্বী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার – অলিপাবে বসে বিয়ার সহযোগে ‘বিফস্টেক’ সাবাড় করেছে কত না মুখ! দীর্ঘদিন ধরে একই শেফের হাতে লালিত পালিত হওয়া বিফস্টেককে শুধু সুস্বাদু শব্দ দিয়ে বেঁধে দিলে তা বিশেষণের অপমান হিসেবে ধরে নিতে হবে। আসলে এই বিফস্টেকের বিকল্প হয় না, হতে পারেও না।

অলিপাব থেকে একটু হেঁটে এসে পার্ক সার্কাসের দিকের অটো নিন। মল্লিকবাজার থেকে একটু এগিয়েই নেমে পরুন ‘নাফিল’ এ। দেখবেন, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে কত মানুষ সপরিবারে খাচ্ছেন ‘বিফ মাগাজ’, ‘বিফ ওয়াইট ষ্টু’। পকেটের রেস্ত পঞ্চাশ টাকাই যথেষ্ট। নাফিলে একবার এলে বারবার আসবেন।

সব হচ্ছে। কিন্তু তাতেও যেন মন ভরছে না। একটা চেনা গন্ধ, একটা আহ্লাদি স্বাদ এখনও যেন বাকি থেকে গেছে – বিরিয়ানি। কলকাতার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত – বিফ বিরিয়ানির পসরা সাজিয়ে রেখেছে একাধিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট। উত্তরের দিকে বেলগাছিয়ার ‘জাহাঙ্গির বিরিয়ানি হাউস’ বা রাজাবাজারের ‘হাফিজ হোটেল’ যেমন রয়েছে, তেমনি মধ্য কলকাতার রিপন ষ্ট্রীট ধরে ওয়াইট হাউস বরাবর একটু এগোলেই পাবেন ‘জামজাম’। সাধু, সাধু! সকাল হোক বা রাত, এর আশেপাশের চত্বর মঁ মঁ করে বিরিয়ানির সুবাসে।

Afreen biriyani.jpg

জমজমের বিফ বিরিয়ানি

বালিগঞ্জে রয়েছে ‘আদিল বিরিয়ানি সেন্টার’। খিদিরপুরে যান? ‘আলবেলা’র বিরিয়ানি চাখেন নি এখনও! এ সমাজ আপনাকে মেনে নেবে তো? আরও এগিয়ে যান। মেটিয়াব্রুজ– কলকাত্তাইয়া বিরিয়ানির আঁতুড়ঘর। লখনউ থেকে এসে ওয়াজিদ আলি শাহ এই মেটিয়াব্রুজেই থাকতে শুরু করেন। সঙ্গে করে আনেন জিভের প্রেমিক বিরিয়ানিকে। এ মহল্লার বেশিরভাগ হোটেলেই বিরিয়ানিতে ডালডার নো এন্ট্রি, অনলি ঘি। তেমনই এক ঠেক হল ‘আফরিন’। স্বাদে গন্ধে আফরিনের বিরিয়ানিকে আপনি লেটার মার্কস না দিয়ে পারবেন না। ৪০০ টাকা প্লেট বিরিয়ানিতে অভ্যস্ত হতে চলা কলকাতা শহরের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই বিরিয়ানির ঠিকানাগুলোই যেন সৃষ্টি করে দিয়েছে এক নতুন ঘরানা, এক নতুন প্যাটার্ন।

তবে হাতে একটু সময় থাকলে কোনদিন চলে যেতে পারেন বারুইপুর স্টেশনের ‘আজমা’-য়। দলে দলে মানুষ এসে সাবাড় করে যাচ্ছে এক স্বর্গীয় স্বাদের ‘বিফ ভুনা ‘। বিকেলের পর গেলে অবশ্য রিস্ক আপনার। কারণ আজমার বেশিরভাগ খাবারই শেষ হয়ে যায় উসেইন বোল্টের গতিতে।

কিন্তু, বিফ মানেই কি শুধু তেল ঝাল মশলার সমারোহ? নাহলে কি তার বীরত্ব প্রকাশ পায় না? ভুল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রি স্কুল ষ্ট্রীটে দোকান খোলেন কালম্যান কোহারি। হাঙ্গেরিয়ান এই সাহেব একসময় সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা দেখাতেন। এ শহরে তারই উদ্ভাবিত কোল্ডকাটের মাংস নিঃসন্দেহে ঐতিহ্যের এক নাম। ‘কালম্যান কোল্ড স্টোরেজ’ -এর ওই ঘুপচি ঘর সকাল সাতটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত এখনও (বৃহস্পতিবার বন্ধ, রবিবার দুপুর বারোটা পর্যন্ত খোলা) গমগম করে মানুষের আনাগোনায়, হ্যাঁ এত বছর পরও। কালম্যান সাহেবের মৃত্যুর পর এই দোকান পান তার অনুগত বিষ্ণুপদ ধর। এখন তাঁর বংশধররাই চালান কালম্যান। কোল্ডকাটের মাংস আসলে অনেকটা মোরব্বার মতো, অর্থাৎ মাংসের মোরব্বা। হাত পাল্টেছে, কিন্তু কালম্যানের ধারাবাহিকতা এতটুকুও চিড় ধরেনি। মন চাইলে চেখে দেখতে পারেন ‘বিফ কলার’। গরুর পাঁজরের নীচের অঞ্চলের হাড় বিহীন মাংস দিয়ে তৈরি এই পদের স্বাদ সারা ব্রহ্মাণ্ডে আর কোথায় পাবেন? শুধু কি তাই, কালম্যানের সসেজ, সালামি, পিগ রোষ্ট – এই সব কিছুই যেন ঐতিহ্যকে সাক্ষী রেখে বর্তমানের সাথে পথ চলা। ঠিকঠাক ম্যারিনেশানের জন্য মাংসের গায়ে বঁটিছুড়ি দিয়ে খোঁচাখুঁচি করে পিকল্ড ওয়াটার বা মশলা জলে ডুবিয়ে রাখা – কালম্যান একটাই হয়, কালম্যান আসলে অদ্বিতীয়ই।

kalman.jpg

কালম্যানের সসেজ

বিফ পরিক্রমা আপাতত শেষের পথে বাকি রয়ে গেল হয়তো কত কিছুরকথা। হয়তো জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন সব ঠিকানা। আসলে কলকাতা মানে যেমন হাওড়া ব্রিজ – ভিক্টোরিয়া – গড়ের মাঠ, কলকাতা মানে যেমন মমতা – সূর্যকান্ত – দিলীপ ঘোষ, শ্যামবাজার, সোনাগাছি, নন্দন – গঙ্গার ঘাট নিয়েই যেমন কলকাতা, একটা ধুঁকতে থাকা ট্রামের পাশ দিয়ে একটা হাতে টানা রিক্সা বেরিয়ে যাওয়ার চিত্রটা যেমন কলকাতা, তেমনি কলকাতা মানে ইসলামিয়া, অ্যাডামস্, নাফিল, আফরিন, কালম্যানের মতো কিছু নামও। হয়তো অনেকের কাছে কলকাতা মানে শুধু এটাই। হয়তো। হয়তো বা। খুশির ঈদ পেরোলেই চেখে দেখুন এইসব বেহেস্তের নজরানা।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami