চলচ্চিত্র

রেস্টোর্ড ক্লাসিক সেকশন : সিনেমা সংরক্ষণ, বড় পর্দায় ‘পথের পাঁচালী’ ও আমরা- মেঘদূত রুদ্র

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ২

২৪ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিনে রবীন্দ্র সদনে দুপুর ৩.১৫ এ দেখানো হল সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালি’ ছবিটি। দ্য ক্রাইটেরিয়ান কালেকশন নামক আমেরিকান কোম্পানিটি অনেক বছর ধরেই তাদের প্রোগ্রামের অংশ হিশেবে বিভিন্ন ক্লাসিক ছবির প্রিন্ট সংগ্রহ করে তাদের পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণ করে আসছে। ভারতীয় ছবির মধ্যে তারা সত্যজিৎ রায়ের ‘অপু ট্রিলজি’ অর্থাৎ ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ আর ‘অপুর সংসার’ ছবি তিনটি রেস্টোর করেছে। ‘পথের পাঁচালী’-র সেই রেস্টোর্ড ভার্সনই এবারের উৎসবে দেখানো হল। এবারে ‘রেস্টোর্ড ক্লাসিকস’ সেকশনে ‘পথের পাঁচালী’ ছাড়া ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, উদয় শঙ্করের ‘কল্পনা’ ফেদেরিকো ফেলিনির ‘আমারকর্ড’, মিকেলয়াঞ্জেলো আন্তোনিওনির ‘ ব্লো আপ’, অরসন ওয়েলসের ‘দ্য ম্যাগ্নিফিসেন্ট অ্যাম্বেরসনস’ ও ভিত্তরিও ডেসিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’ ছবিগুলি দেখানো হবে। নিঃসন্দেহে সাধু উদ্যোগ। ভারতীয় চিত্র পরিচালক শিবেন্দ্র সিং দুঙ্গারপুর অনেকদিন ধরেই ছবি রেস্টোরেশনের কাজ করছেন। সম্প্রতি তার সংস্থা ফিল্ম হেরিটেজ ফাউন্ডেশন মার্টিন স্করসিসের সংস্থা ওয়ার্ল্ড সিনেমা ফাউন্ডেশনের সাথে যুগ্ম ভাবে ছবি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। তাদের উদ্যোগেই ‘কল্পনা’ ছবিটি রেস্টোর করা হয়েছে। ফেস্টিভ্যালের প্রথম দিন রবীন্দ্র সদনে ‘পথের পাঁচালী’ দেখানোর আগে উপস্থিত থেকে দুঙ্গারপুর কথা বললেন তার কাজের বিষয়ে। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক, জয়া বচ্চন। এরা প্রত্যেকেই সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে বিভিন্ন সময় কাজ করেছেন। উপস্থিত ছিলেন ফেস্টিভ্যালের চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। উপস্থিত ছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত; যিনি সম্প্রতি দুঙ্গারপুরের কাজের সাথে যুক্ত হয়ে উত্তম কুমারের কিছু ছবি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছেন।

সিনেমা আমাদের ইতিহাসকে ধরে রাখে। এবছর বাংলা সিনেমার ১০০ বছর পূর্ণ হল। আজ থেকে একশো বছর আগে আমাদের সমাজ সভ্যতা কেমন ছিল তা সিনেমার মাধ্যমে যতটা ভাল করে উঠে এসেছে অন্য কোন মাধ্যমে অতটা ভাল করে উঠে আসেনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে সেই সময়কার যাবতীয় বাংলা ছবি যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র ১৯৩১ সালে কালিপদ দাসের তৈরি ‘জামাইবাবু’ ছবিটি দৈবিক কৃপায় বেঁচে আছে। ফলে আজ থেকে ১০০ বছর পর যাতে এখনকার ছবিগুলি নষ্ট না হয়ে যায় তার জন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। দুঙ্গারপুররা ঠিক এই কাজটাই করছেন। এই উদ্যোগের সাথে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুক্ত হওয়াটা খুবই ভাল ব্যাপার। আশা করা যায় এর ফলে অনেক ছবিই নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলে কম বেশি একই কথা বললেন।

এবার আসি ‘পথের পাঁচালী’-র প্রসঙ্গে। এটি যে মহান ছবি সেটা বলার জন্য এই লেখাটা লিখতে বসিনি। এটা সকল চলচ্চিত্র প্রিয় মানুষরাই জানেন। আমি শুধু বাঙালি বা ভারতীয় বললাম না ইচ্ছে করেই। কারণ আজ পর্যন্ত যত বিদেশি চিত্র পরিচালকরা এই ফেস্টিভ্যালে এসেছেন তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ‘পথের পাঁচালীর’ কথা বলেছেন। ফলে বোঝা যায় যে গোটা বিশ্বে যেখানেই সিনেমা পড়ানো হয়, সিনেমা চর্চা হয় সেখানে এই ছবি দেখানো হয়। কিন্তু গোটা বিশ্বে কটা মানুষ আছেন যারা ‘পথের পাঁচালী’ বড় পর্দায় দেখেছেন? খুব কম। ফেস্টিভ্যালের প্রথম দিন আমরা শ পাঁচেক মানুষ এই বিরল ঘটনার সাক্ষী হলাম। পরিচালকরা ছবি বানান বড় পর্দায় সেটা দেখা হবে এই ভেবেই। ফলে বড় পর্দায় ছবির যে ইমপ্যাক্ট পাওয়া যায় তা ছোটো পর্দায় পাওয়া অসম্ভব। আর পার্থক্যটা কী সেটা একই ছবি একবার সিনেমা হলে আর একবার ল্যাপটপে দেখলেই বোঝা যায়। ‘পথের পাঁচালী’ আমি বহুবার দেখেছি। কিন্তু এদিনের দেখাটা আমার পুরো দৃষ্টিভঙ্গিই পালটে দিল। দেখার পর মনে হল এরপর নির্বাসনে পাঠিয়ে দিলেও জীবনে আফসোস থাকবেনা। অপু-দুর্গার ট্রেন দেখার দৃশ্য ; যেখানে ফ্রেমে একইসাথে সাদা কাশবন, অন্য প্রান্তে ট্রেনের কালো ধোঁয়া আর মাঝে দুটি বাচ্চা এই মিলে দৃশ্যটির যে ব্যঞ্জনা তৈরি হয়েছে সেটা অবর্ণনীয়। গোটা জীবনে খুব কমবার একজন মানুষের কাছে এরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার সুযোগ আসে। এরপর গোটা ছবি জুড়ে নিশিন্দিপুর গ্রামের যে সাউন্ডস্কেপ সাউন্ড ডিজাইনার তৈরি করেছেন সেটার পুরোটা ছোটো পর্দায় কিছুতেই পাওয়া যায়না। অনেক শব্দই মিস হয়ে যায়। দেখতে দেখতে একটা কথাই ভাবছিলাম যে একটা ছবি এতটা নিখুঁত হয় কীভাবে? আর এত নিখুঁত বলেই বোধহয় নির্মাণের প্রায় ৭০ বছর পরেও এই ছবির ম্যাজিক অমলিন। যেই ম্যাজিক এখনও ছুটির দিন দুপুর বেলা ৫০০ লোককে সিনেমা হলে টেনে নিয়ে যায়। ছবিতে বছরের প্রথম বর্ষায় দুর্গার একটা ভেজার দৃশ্য আছে। দৃশ্যটা সুব্রত মিত্র এমন ভাবে শুট করেছিলেন যাতে কোনরকম ইরোটিসিজম ছাড়া দুর্গার শরীরে যে যৌবন আসছে সেটা চিত্রায়িত হয়। আমাদের চলচ্চিত্র শিক্ষক অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় অনেকবারই এই দৃশ্যটার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমি এই ফিলটা পাইনি। মনে হয়েছিল এটা তো নিষ্পাপ শিশুদের একটা মায়ার গ্রামের গল্প। এতে যৌনতা থাকবে কীভাবে! বড় পর্দায় দেখার পর কিন্তু আমার এই ভুলটা ভেঙ্গে গেল। এরকম আরও অনেক কিছু নতুন ভাবে উপলব্ধি হল যা আগে ছিলনা। সবকিছু তো আর লিখে প্রকাশ করা যায়না। লেখা পড়ে পাঠকরা সেই অনুভবটাও পায়না। ফলে যেখানেই সুযোগ পাবেন ছবিটা বড় পর্দায় দেখে নেবেন।

আমি মোবাইল, ল্যাপটপে ছবি দেখার বিরোধী নই। কোন সভ্যতাই স্ট্যাটিক থাকেনা। ফলে বিভিন্ন আধুনিক গেজেটকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। এভাবেই সভ্যতা এগিয়ে চলবে। কিন্তু তার সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যাতে আমাদের সিনেমা দেখার আসল ঐতিহ্যকে আমরা ভুলে না যাই।  ধরে রাখতে হবে আমাদের সিনেমা এবং প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখার অভ্যাসকে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami