জীবনযাপনশিল্প ও সাহিত্যসম্পাদকের মন্তব্য

রবীন্দ্রনাথ, মৃত্যুচেতনা: আনাড়ির আলাপ

প্রিয়ক মিত্র

“মৃত্যোঃ স মৃত্যুমাপ্নোতি য ইহ নানেব পশ্যতি”-উপনিষদের এই শ্লোক রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুচেতনায় প্রোথিত ছিল। অর্থাৎ মৃত্যুকে অতিক্রম করে তবেই মৃত্যুর স্বরূপের মুখোমুখি দাঁড়ানো সম্ভব। “দেহমনের সুদূরপারে/হারিয়ে ফেলি আপনারে”-এই বোধই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুবোধের অভিজ্ঞান। গীতায় জীর্ণ বস্ত্রের মতন জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করে আত্মার নতুন দেহ ধারণ করার যে শ্লোক তা থেকে নির্যাস নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যু, মানবজীবনের একমাত্র নিশ্চল সত্য, অবধারিত নিয়তি। তাকে অভিজ্ঞতায় এবং অভিজ্ঞতাসঞ্জাত বোধে জীবনজুড়ে পেয়েছেন তিনি। রবীন্দ্রমনন কে পাঠ করতে গেলে মৃত্যু আবশ্যিক হয়ে ওঠে তাই। ইঙ্গমার বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেন্থ সিল’ চলচ্চিত্রে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলার যে দৃশ্য দেখি, তা যেন খুঁজে পাই রবীন্দ্রগানের পংক্তিতে-“রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে/ তোমায় আমায় দেখা হল সেই মোহনার ধারে”। কোনো এক অখন্ড চরাচরে কবি বারংবার মিলিত হয়েছেন মৃত্যুর সঙ্গে, প্রশ্নের ডালি নিয়ে। সেই প্রশ্নে কখনও নিহিত থেকেছে বেদনা, কখনও ক্ষোভ, কখনও গভীর প্রশান্তি এবং কখনও নেতির হতাশা।
“ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনোদিন প্রত্যক্ষ করি নাই। মার যখন মৃত্যু হয় তখন আমার বয়স অল্প…প্রভাতে উঠিয়া যখন মার মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনো সে কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম, তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না; সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না।”-জীবনস্মৃতির এই অংশে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের মৃত্যু সম্পর্কে বলতে গিয়ে মৃত্যু সম্পর্কে  তাঁর চেতনায় যে প্রথম প্রতিবিম্ব নির্মিত হয়েছিল তা উল্লেখ করেছেন। “জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে/বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে”-এই পংক্তির যে দর্শন, তাই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শারীরিক উপস্থিতির উর্ধ্বে তাঁর কাছে সত্য ‘মা’ নামক বোধটি। কবি জয় গোস্বামী লিখেছিলেন, “নাম লিখেছি একটি তৃণে/আমার মায়ের মৃত্যুদিনে”। তৃণ মাটির সঙ্গে সংলগ্ন। মায়ের শরীর আমাদের অস্তিত্বের উৎস। সেই শরীরের অনুপস্থিতি কবিকে আসলে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মাটির কাছে, প্রাণের উৎস যেখানে। তামাম বিশ্বকে অন্তরালে রেখে তাই তিনি শুধু একটি তৃণকে জানান দিচ্ছেন তাঁর নাম, যা আদতে নিজের মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মা-এর সান্নিধ্য সেভাবে পাননি। মায়ের মৃত্যুর দুবছর আগে হিমালয় ভ্রমণে গিয়ে সেই দূরত্ব খানিক মোছে। “মায়ের ঘরের সভায় খুব একটা বড় আসন দখল করিলাম”-এই কথাও তিনি লিখছেন। মায়ের মৃত্যুর পর মৃত্যুকে তিনি প্রথম দেখছেন স্বচক্ষে। মৃত্যু কে তিনি বিচ্ছিন্নই করতে পারছেন না জীবনপ্রবাহ থেকে। প্রকৃতি থেকে। মায়ের অস্তিত্ব তার চারপাশকে ঘিরে রেখেছে। ওই “বড় আসন”-এর দরুণ কোনো অভাববোধই তাই যেন তাঁর জাগছে না মায়ের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে।
কিন্তু মৃত্যুর প্রথম প্রবল অভিঘাত কবি অনুভব করলেন এর কিছুবছর পর। ১৮৮৪ সালের ২১শে এপ্রিল। আকস্মিক মৃত্যু হল কবির নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর। কবি লিখেছেন, “চারিদিকে গাছপালা মাটিজল চন্দ্রসূর্য গ্রহতারা তেমনি নিশ্চিত সত্যেরই মত বিরাজ করিতেছে, অথচ তাহাদেরই মাঝখানে তাহাদেরই মত যাহা নিশ্চিত সত্য ছিল, এমনকি দেহপ্রাণ হৃদয় মনের সহস্রবিধ স্পর্শের দ্বারা যাহাকে তাহাদের সকলের চেয়েই বেশি সত্য করিয়াই অনুভব করিতাম সেই নিকটের মানুষ যখন এত সহজে এক নিমেষে স্বপ্নের মত মিলাইয়া গেল তখন সমস্ত জগতের দিকে চাহিয়া মনে হইতে লাগিল এ কী অদ্ভুত আত্মখন্ডন”। এই ‘আত্মখন্ডন’ কবির সত্তায় নাড়া দিয়েছিল। কবিকে চিনতে শিখিয়েছিল জীবনবিচ্ছিন্নতার স্বরূপ। জীবনবোধে ‘নিশ্চিত সত্য’ বলে যাকে জানতেন তার থেকে এই প্রথম একপ্রকার বিচ্যুতির আঁচ পেলেন কবি।
এর বহু পরে, মারা গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শমীন্দ্রনাথ দেহেমনে রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে উঠছেন এমনটা মনে করতেন অনেকেই। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘রবিঠাকুর’-এর মতন ‘শমীঠাকুর’ বলে ডাকতেন তাঁর আদরের পুত্রকে। ৭ই অগ্রহায়ণ ১৩১৪, ১৪ই নভেম্বর ১৯০৭ সালে মাত্র এগারো বছর বয়সে শমীন্দ্রনাথ চলে গেলেন। এই ৭ই অগ্রহায়ণ তারিখেই এর থেকে পাঁচ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী। তখন সদ্য আশ্রমে তাঁকে কর্মসঙ্গিণী রূপে পেতে শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেছেন কন্যা রেণুকা এবং পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে মারা গেছেন কন্যা মাধুরীলতা, রবীন্দ্রনাথ যার সম্পর্কে লিখলেন, “তার মত সুন্দর দেখতে মেয়ে পৃথিবীতে খুব অল্প দেখা যায়”। এই বাক্য অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু আদতে মৃত্যুই কবির কাছে তাঁর কন্যার অস্তিত্বকে এত বৃহৎ, এত বাস্তবোত্তীর্ণ করে তুলেছে।  কিন্তু এইসমস্ত মৃত্যুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু। কারণ এই মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের শোক কে এক অন্য স্তরে উন্নীত করেছিল। এই মৃত্যুর পরে রবীন্দ্রনাথের যে ব্যাকুলতা তা ‘বিসর্জন’-এ জয়সিংহের মৃত্যুর পরে রঘুপতির বিলাপ নয়, বরং ‘ডাকঘর’-এ অমলের মৃত্যুলগ্নে তার শিয়রে বসে থাকা রাজকবিরাজের সংলাপ-“এই বার তোমরা সকলে স্থির হও। এল, এল ওর ঘুম এল। আমি বালকের শিয়রের কাছে বসব-প্রদীপের আলো নিবিয়ে দাও, এখন আকাশের তারাটি থেকে আলো আসুক”। এই মৃত্যুর পঁচিশ বছর পর রবীন্দ্রনাথ মীরা দেবীকে একটি চিঠিতে লিখছেন, “শমী যে রাত্রে গেল তার পরের রাত্রে রেলে আসতে আসতে দেখলুম জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথাও কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। মন বললে কম পড়েনি-সমস্তর মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে”। কাদম্বরীর মৃত্যুর পরে যে চারপাশের ‘নিশ্চিত সত্য’-এর ভেতরকার ফাঁক নিয়ে উদ্বেল হয়েছিলেন তিনি, এখন যেন তার ব্যাখ্যা পেলেন মনের গভীরে কোনোখানে। আসলে সব সত্যই নিশ্চল শুধু একটি প্রাণের অনস্তিত্ব বাদে-এই উপলব্ধিতে অবশেষে এসে পৌঁছলেন কবি তাঁর প্রিয়তম পুত্রের মৃত্যুর পর।
কাদম্বরীর মৃত্যু জীবনের নানান অধ্যায়ে কবির বেদনার প্রাসাদে এসে দাঁড়িয়েছে। “আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে/বসন্তের বাতাসটুকুর মত/সে যে ছুঁয়ে গেল নুয়ে গেল/ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত/সে যে চলে গেল বলে গেল না”-এই অনুভব, এই আর্তি তাঁর কাদম্বরীর মৃত্যুশোকের বীজমন্ত্র। জীবনানন্দ বলেছিলেন “আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে”। রবীন্দ্রনাথের নানান কবিতায় নানান গানে বারংবার কাদম্বরী ফিরে এসেছেন। এই মৃত্যুর প্রবল শোকই বোধহয় রবীন্দ্রনাথকে পৌঁছে দিয়েছিল এক কাঙ্খিত নির্লিপ্তিতে। যে নির্লিপ্তি জীবন এবং মৃত্যুর বোধকে কোনো ভিন্ন অবস্থানবিন্দু থেকে দেখতে শেখায়। কিন্তু এই নির্লিপ্তি আবার ভেঙে গিয়েছিল। শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর কন্যা মীরাকে লেখা যে পত্রটির কথা উল্লেখ করা হল সেটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্য একটি মৃত্যুর অনুষঙ্গ। সেই মৃত্যু তার দৌহিত্র নীতিন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের। কন্যা মীরার পুত্র সে। মুদ্রণযন্ত্র ও প্রকাশন শিল্প বিষয়ক পড়াশোনা করতে নীতিন্দ্রনাথ জার্মানিতে যান ১৯৩১ সালে। ৭ই অগস্ট ,১৯৩২ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হল। রবীন্দ্রনাথ তখন বরানগরে প্রশান্তচন্দ্র মহালানবীশ-এর বাড়িতে। কন্যা মীরা দেবী তখন জার্মানিতেই। মৃত্যুসংবাদ যখন পৌঁছল তখন রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘মাতা’ নামক একটি কবিতা যা ‘বীথিকা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই মৃত্যুশোক শুধু একান্তভাবেই তাঁর নয়। মীরা দেবীর পুত্রবিয়োগের শোকও তাঁরই ওপর বর্তাচ্ছে। তাই মীরা দেবীর ভাষ্যই যেন উঠে এসেছে এই কবিতায়। এইসময় ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটিও লেখা চলছে। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন ‘বিশ্বশোক’ নামক একটি কবিতা। “দুঃখের দিনে লেখনীকে বলি/লজ্জা দিয়ো না/সকলের নয় যে আঘাত/ধোরো না সবার চোখে”। এই পংক্তি যে ভাবনা থেকে লিখছেন সেই ভাবনা থেকেই সকলের অনুরোধ সত্ত্বেও ‘বর্ষামঙ্গল’-এর অনুষ্ঠান বন্ধ করছেন না। বলছেন, “সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে”।
কিন্তু নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যুর সম্ভাবনা কবিমনে দাগ কাটছিল। নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যুর ঠিক আগের দিন কবি লিখলেন ‘বীথিকা’-র ‘দুর্ভাগিনী’ কবিতাটি। “তোমার সম্মুখে এসে, দুর্ভাগিনী, দাঁড়াই যখন/নত হয় মন/যেন ভয় লাগে/ প্রলয়ের আরম্ভতে স্তব্ধতার আগে”। স্তব্ধতা প্রলয়ের বার্তা বহন করে। স্তব্ধতা তাই আতঙ্ক উদ্রেককারী। মীরা দেবীর বিড়ম্বিত বৈবাহিক জীবন, তাঁর একমাত্র পুত্রের অসুখ এইসমস্ত বিপর্যয়ের কারণে মীরা দেবীকে ‘দুর্ভাগিনী’ বলে অভিহিত করা চলে। কিন্তু শুধু মীরা দেবী নয়, রবীন্দ্রনাথ ‘দুর্ভাগিনী’ বলছেন যেন এক থমথমে সময়কে। যে সময়ের শঙ্কিত মূর্তি পীড়া দিচ্ছে কবি কে। কবি বলছেন, “এ কী দুঃখভার/কী বিপুল বিষাদের স্তম্ভিত নীরন্ধ্র অন্ধকার/ব্যপ্ত করে আছে তব সমস্ত জগৎ”। এই দুঃখভার কবির অন্তরেরও বটে। কিন্তু তিনি নিজের কথা বলছেন না। বলছেন হয়তো ওঁর মেয়ের কথা, অথবা পীড়িত সময়ের কথা, জরাভারাতুর বসুন্ধরার দিকে তাকিয়ে। বলছেন, “সব সান্ত্বনার শেষে পথ একেবারে মিলেছে শূন্যের অন্ধকারে”। ভয়াবহ এক নাস্তি। পাঠক স্তম্ভিত হতে পারেন। এত নাস্তি রবীন্দ্রচেতনায় সচরাচর মেলে কি? “চিরচেনা ছিল চোখে চোখে/অকস্মাৎ মিলাল অপরিচিত লোকে/দেবতা যেখানে ছিল সেথা জ্বালাইতে গেলে ধূপ/সেখানে বিদ্রুপ”। নীতিন্দ্রনাথের মৃত্যু তখন নিশ্চিত। তাই সেই অভাবের বোধ রয়েছে এই পংক্তিতে। তার সঙ্গে রয়েছে এই চৈতন্য যে আশার দেবালোক নির্বাপিত। “সর্বশূন্যতার ধারে/জীবনের পোড়ো ঘরে/অবরুদ্ধ দ্বারে/দাও নাড়া”। এ এক প্রবল নৈরাশ্যের ক্লান্তি। ‘সর্বশূন্যতা’-র মতন নিষ্ঠুর শব্দ যেজন্য অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। “ভাঙা বিশ্বে পড়ে আছে ভেঙে পড়া বিপুল বিশ্বাস/তার কাছে নত হয় শির/চরম বেদনাশৈলে উর্ধ্বচূড় যাহার মন্দির”। সেই তিনি ঈশ্বর হতে পারেন, মৃত্যুদেবতা হতে পারেন কিন্তু তার কাছে কোনো বিশ্বাসের আর্তি নেই, ভরসার মুষ্টিভিক্ষা নেই। বরং “ভাঙা বিশ্বে ভেঙে পড়া বিপুল বিশ্বাস”-এর ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে শুধুই। এই ধ্বংসাবশেষে দাঁড়িয়েই কবি গাঢ় যন্ত্রণায় “বেদনার মহেশ্বরী”-র সঙ্গে সংলাপ চালান। “তুমি স্থির সীমাহীন নৈরাশ্যের তীরে/নির্বাক অপার নির্বাসনে”-সেই তুমি-র দিকে আর্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, “কেন ওগো কেন?”
এই বিপুল নৈরাশ্যের সাম্রাজ্য যেন এক পরাজিত বিষন্ন রাজার। ঈশ্বরের দিকে যে হুঙ্কার রবীন্দ্রনাথ ছুঁড়ে দেন তীব্রভাবে, “যত বড় হও/তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড় নও”-সেই হুঙ্কার মেলেনা এমন গভীর বিষন্ন উচ্চারণের সঙ্গে। এখানে ক্ষোভ কোথায়? শুধুই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া, যে প্রশ্নের উত্তরে নিস্তব্ধ থাকে, মূক হয়ে থাকে ধোঁয়াধূসর জগৎ। কিন্তু এই প্রশ্নের আড়ালে যে গভীর নাস্তি তা এল কোথা থেকে।
রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন বিশ্বাস করে এসেছেন, “আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে”। এই বিপুল বিশ্বাস ভেঙে যেতে পারে? এই বিশ্বাসকে সম্বল করেই তো রবীন্দ্রনাথ কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর পরের প্রবল শোককে সামলে উঠেছেন কবি। “হে জগতের বিস্মৃত, আমার চিরস্মৃত, আগে তোমাকে যেমন গান শুনাইতাম, এখন তোমাকে তেমন শুনাইতে পারি না কেন”-এই করুণ আকুতি যেমন ছিল তেমন তো তিনি এও লিখেছেন ‘জীবনস্মৃতি’-তে, “আমি নির্লিপ্ত হইয়া দাঁড়াইয়া মরণের বৃহৎ পটভূমিকার উপর সংসারের ছবিটি দেখিলাম এবং জানলাম তাহা বড়ো মনোহর”। এই মনোহর সংসারের দৃশ্যকে পেয়েছেন বলেই মৃত্যুকে জীবনের গভীরে দর্শনের অঙ্গীভূত করে তুলেছেন। ‘ছবি’ কবিতা লেখা হয়েছিল এলাহাবাদে। প্রশান্তচন্দ্র মহালানবীশ প্রমুখ ধরে নিয়েছেন কাদম্বরী দেবীর একটি ছবি ছিল এই কবিতার অনুপ্রেরণা। এই মত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সমর্থনও করেছেন। এই কবিতায় কবি লিখেছেন, “নয়ন সম্মুখে তুমি নাই/নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই”। এই একই দর্শনে লেখা “নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে”। এই আশাবাদের জোরেই স্ত্রী-র মৃত্যুর পরে যখন ‘স্মরণ’ কাব্যগ্রন্থ লেখেন তখন তা শোকোচ্ছ্বাসের জোয়ারে ভেসে যায় না, মৃত্যুর মাধুর্য্যে পূর্ণ হয়ে থাকে। অসুস্থ রেণুকাকে অদ্ভুত ঋজুতা নিয়ে শোনাতেন উপনিষদ। রেণুকার মৃত্যুর দিন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বিষয়ক আলোচনায় অবিচল ছিলেন, কাউকে জানতে দেন নি মেয়ের মৃত্যুসংবাদ। এইসময় বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে চিঠিতে লেখেন সংসারের শিকলের কথা, “এই শিকলগুলো না থাকলে নৌকাডুবি হতে পারত”। এমন শক্তিশালী দৃঢ়তায় অটল থেকে যিনি মোকাবিলা করেন মৃত্যুর সঙ্গে তিনি কী করে এই নৈরাশ্যের গহিনে প্রবেশ করেন? মৃত্যুকে তিনি চিনতে শিখেছেন দার্শনিকতার এক অন্য মার্গে যেখানে “নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু পাছে পাছে”। এই ছন্দোময় গতি রবীন্দ্রনাথকে   আন্দোলিত করে, তার ঈশ্বরচেতনাতেও মৃত্যু রাজার মতন আসে। দীনেশচন্দ্র সেনকে চিঠিতে লেখেন ঈশ্বর ‘মৃত্যুর দ্বারা’ তার ‘জীবনের অবশিষ্ট কালকে সার্থক’ করবেন। রবীন্দ্রগানের ছত্রে ছত্রে রয়েছে মৃত্যুকে স্বীকার করে নিয়ে জীবনের অনন্ত প্রাণের কেন্দ্রের কাছে গিয়ে দাঁড়ানো। “আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনই লীলা তব/ফুরায়ে ফেলি আবার ভরেছ জীবন নব নব”-এহেন সোচ্চার ঘোষণা অমরত্বের নয়, বরং এক ‘মৃত্যুহীন প্রাণ’-এর। যে মৃত্যুহীন প্রাণের ভরসায় তিনি বলতে পারেন, “আরো আঘাত সইবে আমার সইবে”। তাহলে এই নেতির কারণ কী?
কারণ রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরচেতনা। যে ঈশ্বরচেতনায় আলোকিত হন তিনি, বলেন, “তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে” বা “ওই আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব”। সেই ঈশ্বর তাঁর কাছে “নিভৃত প্রাণের দেবতা”। যে দেবতা একা জাগেন কোনো এক মন্দিরপ্রাঙ্গণে। কবিকে তিনিই আশ্রয় দিয়েছেন বারবার। এই ঈশ্বরচেতনা পরিণতিলাভ করেনি অস্তিতে, বা গভীর বিশ্বাসে। পরম মঙ্গলময়ের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়বাদ কবির মনে দানা বাঁধছিল বিশ শতকের গোড়া থেকেই। তাঁর অধ্যাত্মচেতনা নানান ব্যক্তিগত শোককে, স্বপ্নভঙ্গকে মোকাবিলা করতে শেখাচ্ছে বটে, কিন্তু বিশ শতক কবির সংবেদনশীল মননকে ক্ষতবিক্ষত করছিলই। এর মধ্যে ঘটে গেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। হিংসার উতরোল আবহে মেতেছে তামাম দুনিয়া। এইসময় এক যোদ্ধা কবি রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’-কে সম্বল করে যুদ্ধে গিয়েছিলেন , যার নাম উইলফ্রেড আওয়েন। তাঁর লেখা একটি কবিতার নাম ‘ফিউটিলিটি’। এই ‘ফিউটিলিটি’-ই রবীন্দ্রনাথের ‘সর্বশূন্যতা’। ভাবলে আশ্চর্য হতে হয় যে কবির কাব্যে ভরসা করে আওয়েন মৃত্যুমুখে পা বাড়াতেও দ্বিধাবোধ করেন নি, সেই কবি আর এক দশক পেরোতে না পেরোতেই একইরকম হতাশার দিকে ধাবিত হচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ নানান কারণে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের গতিবিধি নিয়েও হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। ইতিমধ্যে জালিয়ানওয়ালাবাগ-এর ভয়াবহ হত্যাকান্ড ঘটে গেছে, রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করেছেন। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে বেশ কিছু সাম্প্রদায়িক অশান্তির মুখোমুখি হতে হল ভারতবর্ষকে। ১৯৩১ সালে হিজলী জেলে একটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড সম্পন্ন হয়। এই ঘটনা কবিমনে প্রবল নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ূ, নিভাইছে তব আলো/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো?” এই রাগত অসহায় প্রশ্ন এসময়েরই ফসল। এই কবিতাতেই কবি বলেছেন, “কন্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা/অমাবস্যার কারা/লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে”।
‘ভেঙে পড়া বিপুল বিশ্বাস’-এর প্রেক্ষিত রচিত হচ্ছে এভাবেই। শুধু ব্যক্তিজীবনের শোক নয়, যার জেরে কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠিতে একবার আত্মহননেচ্ছার কথাও লিখেছিলেন। এই শোক সর্বাঙ্গীণ। কিন্তু একটি দার্শনিক প্রশ্নও এক্ষেত্রে রয়েছে। কবির ঈশ্বর যে সংশয়ের সেতুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার মধ্যে আদতে নিহিত ছিল এক ‘আমি’-র সন্ধান। “আসব যাব চিরদিনের সেই আমি”-এই পংক্তিতে চিরদিনের আমি-র প্রতি কবির বিশ্বাস অটুট। “এই যে আমি ওই আমি নই/ আপন মাঝে আপনি যে রই/যাই নে ভেসে মরণধারা বেয়ে”-এই মরণোত্তীর্ণ আমি কে  কবি খুঁজে পেলেন না শেষমেষ। তাই ‘প্রথম দিনের সূর্য’ ‘সত্তার নূতন আবির্ভাবে’ এবং শেষবেলায় ‘পশ্চিমসাগরতীরে নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়’ দাঁড়িয়ে যে গভীর প্রশ্ন করে, “কে তুমি?”-তার উত্তর মেলেনা। তাই শেষ লিখিত কবিতা ‘তোমার সৃষ্টির পথ’-এ কবি তাঁর ভগ্নবিশ্বাসের সমস্ত ক্লেদ তীব্রভাবে প্রকাশ করেন, “মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে/সরল জীবনে”-এই নাস্তিতেই কবির লেখনী স্তব্ধ হয়ে যায়।
সত্যজিৎ রায়ের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ উৎপল দত্ত অভিনীত চরিত্রটি একটি সংলাপে প্রশ্ন করে “কে দেবে আলো?, কে দেবে প্রাণ?”। এই নাস্তি রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এসেছিল, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মানুষের ওপরে তার বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানোকে ‘পাপ’ বলেছেন। আর মৃত্যুকেও রবীন্দ্রনাথ জয় করেছেন মনে। “আমারে যে জাগতে হবে/কী জানি সে আসবে কবে/যদি আমায় পড়ে তাহার মনে”-এই বিশ্বাস রেখেছেন মনে। টি এস এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ড’-এর শৈত্যদীর্ণ মৃত্যুচেতনা নয় তা, ব্যোদলেয়ার-এর বিষণ্ণ মৃত্যুমুখী ‘ভয়েজ’ও নয়। ঈশ্বরের সঙ্গে তিনি সংলাপে গেছেন, তাকে কেবল অর্চনা করেন নি। তাঁর অবিশ্বাসও আসলে ঈশ্বরের সঙ্গে তার যোগস্থাপন। তাই তিনি আর্তি করতে পারেন, “অধনেরও হও ধন/অনাথেরও নাথ হও হে/ জরাভারাতুরে নবীন কর হে সুধাসাগর”।
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami