আন্তর্জাতিকশিল্প ও সাহিত্য

যে ভাষার জন্যে এমন হন্যে, এমন আকুল হলাম

প্রিয়ক মিত্র

ভাষাদিবস‌, ভাষার জন্য লড়াই, প্রাণপণ লড়াই, রক্তঝরা একুশে এসবই আমাদের একবিংশ শতাব্দীর চেতনায় রয়েছে, তবে চেতনাকে তা কতটা নাড়া দেয় বলা শক্ত। তবে একবিংশ শতাব্দী আমাদের শিখিয়েছে প্রযুক্তি, প্রগতি। আমাদের গতিশীল করে তোলা এই শতাব্দীতে ভাষাও কি গতিশীল হয়ে উঠছে?

মালয়ালমে প্রকাশিত একটি বই ‘মুজরিসিলোদে’ ভারতবর্ষের প্রথম বই যা অগমেন্টেড রিয়ালিটি নামক একটি প্রযুক্তিকে ধারণ করেছে তার শরীরে। সে বইতে ছাপা ছবি একটি নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে স্ক্যান করে দেখা যাবে ভিডিও। একটি ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় এমন একটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব তো ঘটে গেছে। এমনকি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নির্মিত ভারতের প্রথম রোবট পুলিশ, যা তৈরি হয়েছে কেরালায়, তাও মালয়ালম ভাষাতেই কথা বলছে।

সংস্কৃতকে টেক্কা দিয়ে ভাষার প্রাচীনত্ব ভারতবর্ষের যে ভাষাটি দাবি করতে পারে, তা হল তামিল। সেই তামিল ভাষার জন্য নির্মিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চেন্নাইয়ের ‘ইনস্টিটিউট অফ তামিল স্টাডিজ’‌। প্রসঙ্গত, এই প্রতিষ্ঠানটির নির্মাতাদের একজন আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক সেলভাকুমার বলছিলেন, “প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে ভাষার ব্যবহারের জন্য ভাষাকে আরও সাবলীল তো হতেই হবে। সবথেকে বড় কথা সহজ  পরিভাষা তৈরি করা।”

তামিলনাড়ুতে বহুকাল যাবৎ মাতৃভাষা নিয়ে সংগ্রাম চলেছে। স্বাধীন ভারতের প্রথমভাগে কামরাজের হস্তক্ষেপে আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক রাজ্য যদি না তৈরি হত, তাহলে হিন্দি আগ্রাসন বোধহয় আজ আরও সহজ হত। সেলভাকুমার বলেন, “সংসদে একটিমাত্র ভোটের তফাৎ-এর দরুণ আমাদের জাতীয় যোগাযোগের ভাষা ইংরেজি হলনা, হল হিন্দি।”

তবে সেলভাকুমারের স্পষ্ট দাবি, “তামিলকে বিশ্বায়িত হতেই হবে।”

আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ঘটে গেছে একটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা। জাপানি কিছু ছাত্রছাত্রী যারা এসেছেন ‘টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ ফরেন স্টাডিজ’ থেকে বাংলা শিখতে, তারা সমবেতভাবে গেয়েছেন, ‘আমি বাংলায় গান গাই’, গানটি তারা অনুবাদও করেছেন জাপানিতে।বিভাগের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহা বলছিলেন, “বাংলা ভাষাকে যদি সত্যিই আন্তর্জাতিক হতে হয় তাহলে ভাষাশিক্ষাতেও বদল আনা দরকার।” তিনি এও বলছিলেন, আজ হিটাচি মিৎসুবিশি প্রভৃতি বহুজাতিক সংস্থা বাংলায় রয়েছে, এই জাপানি ছাত্রছাত্রীরা ছত্রিশটি দেশের ছত্রিশটি ভাষা শিখে ছড়িয়ে যাবেন এই সংস্থাগুলিতে। একথার সূত্র ধরেই বলা যায়, বাংলাও অংশ হবে এই বহুজাতিক প্রগতির। ভাষার সঙ্গে জুড়ে যাবে বিশ্বায়িত শ্রম।

প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গেই ভাষা নিজেকে গড়েপিঠে নেবে, আঞ্চলিক ভাষা ধারণ করবে বিশ্বায়নকে। এভাবে যদি অন্তত এই নয়া উদারনীতিবাদের যুগে মাতৃভাষা তার রাস্তা করে নেয়, তাহলে তা ভাষার অগ্রগতির পক্ষে নিশ্চয় মঙ্গলজনক।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami