বিনোদন
Trending

মেয়ারহোল্ড

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়

গোয়েন্দারা আমার উপর, একজন অসুস্থ পঁয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধের ওপর, বলপ্রয়োগ ও অত্যাচার শুরু করল। উপুর করে শুইয়ে রাবারের চাবুক দিয়ে আমার পায়ের নীচে এবং মেরুদণ্ডে প্রহার করা শুরু হল, নীল-কালো-হলুদ-কালশিটে চাকা রক্ত জমাট বাঁধা, আমার শরীরের উপর প্রতিদিন এই অত্যাচার চলত। অসহ্য যন্ত্রণা, মনে হত যেন ফুটন্ত গরম জল ঢালা হচ্ছে – যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করতাম। আঠারো ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদের পর বিধ্বস্ত শরীরে পড়ে থাকতাম – জ্ঞান হারানোর সীমা থেকে ফিরে আসতাম নিজেরই গোঙানির শব্দে – সমস্ত শরীর মরনাক্রান্ত টাইফাস (টাইফয়েড) রোগীর শেষ অবস্থার মতো ছিটকে ছিটকে উঠত অবর্ণনীয় যন্ত্রণায়।

উপরে বর্ণিত এই নারকীয় অত্যাচারের কাহিনী মৃত্যুর আগে লিখিত একটি চিঠির ছিন্নাংশ। এই হাড় হিম করা জীবন মৃত্যুর মধ্যবর্তী অবস্থানে পত্র লেখককে থাকতে হয় টানা আট মাস। এরপর তাঁকে বাধ্য করে কবুল করানো হয় যে তিনি ব্রিটিশ ও জাপানীদের গুপ্তচর। এরপর রাত পোহালেই একতরফা বিচারে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয় পৃথিবী বিখ্যাত নাট্যাচার্যকে। যাঁর নাম সেভেলদ এমিলেভিচ মেয়ারহোল্ড। এই চিঠির প্রাপক স্তালিন জমানার প্রবল পরাক্রান্ত মন্ত্রী মলোটভ (যার নামে মলোটভ ককটেল)। বিশে জুন উনিশশো উনচল্লিশ সালে গ্রেফতার করা হয় মেয়ার হোল্ডকে আর পনেরোই জুলাই মস্কোয় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে কুপিয়ে খুন করা হয় তাঁর স্ত্রী প্রখ্যাত অভিনেত্রী জিনাইদা রাইখকে। এর দেড় দশক পর সোভিয়েত রাশিয়া ঘোষণা করে যে মেয়ারহোল্ড নির্দোষ এবং তাঁর ওপর ন্যস্ত অভিযোগগুলি ছিল ভিত্তিহীন। ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

ডিসেম্বরের কনকনে শীতে মস্কোয় মেয়ারহোল্ড থিয়েটারের ফয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথম ভাবতে শুরু করি যে, কেন এই নির্মম অত্যাচারের শেষে মেয়ারহোল্ডকে খুন হতে হল। ঋষিতুল্য এই নাট্যতাত্ত্বিককে কেন রাষ্ট্রের কাছে এতটা বিপদজনক মনে হল যে তাঁর গোটা পরিবারকে নিকেশ করতে যুক্তি, সাক্ষ্য, বিচারের তোয়াক্কা করা হল না। এক কথায় মেয়ারহোল্ডের নাট্যভাবনাকে নিশ্চিহ্ন করা হল গোটা সোভিয়েত রাশিয়ায়। এখানে মনে রাখতে হবে যে, রুশ বিপ্লবে মেয়ারহোল্ডের ভূমিকা ছিল তর্কাতীত। যাঁর অভিনয় রীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মন্তাজের জনক চলচ্চিত্রকার সের্গেই আইজেনস্টাইন তৈরী করেছিলেন ‘স্ট্রাইক’ চলচ্চিত্রটি, ঘোর দুর্দিনে স্তালিস্লাভস্কি যাঁকে নিজের থিয়েটারে আমন্ত্রণ জানান স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য, যার ঘনিষ্ঠতম সুহৃদ ছিলেন কবি ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি। যে মায়াকভস্কির একটার পর একটা নাটক প্রযোজনা করেছেন মেয়ারহোল্ড। এত কিছুর পরও কেন ইতিহাস অন্য কথা বলে!

অতীত নিশ্চিহ্ন ইতিহাসের আবর্জনা ঘেঁটে আমরা আজ কিছু সূত্র বার করতে পারি যার থেকে মেয়ারহোল্ডকে চিনতে সুবিধা হতে পারে, সুবিধা হতে পারে সেই সময়কার বিশ্ব জাগতিক ভাষা যুদ্ধের সৃষ্টিশীল ক্রিয়াকর্মকে বুঝতে। এ দুনিয়ায় আপামর মানুষের সঙ্গে, সবসময়েই শিল্পের গহন সংযোগ ব্যবস্থার অন্তরায় হয়েছে রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্র, সেই প্রতিষ্ঠান, সৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে একটি সুনির্দিষ্ট ধরতাইতে শাসন করতে চায়, গলায় ফাঁস পরিয়ে তাঁর ক্রমবিকাশে লাগাম পরাতে চায়। জনতার চাহিদা ও শিল্পের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্তারকে পৃথক করে জব্দ রাখতে চায়। তাতে শাসন তোষণের পথ মসৃণ হয়। যে কারণে তৎকালীন সময় (স্তালিন জমানায়) মুক্তকণ্ঠ বহু শিল্পীকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয়, কেউ গৃহবন্দী হন, কেউ কারাবাস করেন, কারুর স্থান হয় সাইবেরিয়ার লেবার ক্যাম্পে। মেয়ারহোল্ডের ক্ষেত্রে এর কোনওটাতেই স্বস্তি পেতেন না রুশ প্রশাসকরা। তাই তাঁকে খুন করাটা হয়ে পড়েছিল অনিবার্য। কেননা তিনি ছিলেন আপাদমস্তক প্রতিষ্ঠান বিরোধী। প্রকরণে, আঙ্গিকে, উপস্থাপনায়, ভাষায়, বিষয়ে, রাজনৈতিক অবস্থানে ও সর্বোপরি মননে, যাপনে।

মেয়ারহোল্ড তাঁর নাটক ট্রটস্কিকে উৎসর্গ করে যেমন প্রশাসকের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন তেমনই ‘সোশালিস্ট রিয়ালিজম’ এর ঘোর বিরোধী ছিলেন। যেহেতু রুশ বিপ্লবের পর সেখানকার নাট্য উন্নয়নের, সরকারীভাবে দায়িত্বে ছিলেন তাই তিনি চেয়েছিলেন এক আমুল পরিবর্তন। রুশ নাটকের বস্তাপচা আঙ্গিককে পাল্টে এক নতুন ভাষাকে স্থাপিত করতে চেয়েছিলেন রুশী রঙ্গমঞ্চে। কিন্তু এটা তো ছিল মেয়ারহোল্ডের রাজনৈতিক পরিকল্পিত এক গবেষণাধর্মী বিশ্লিষ্টায়ন ও নাটকে নিয়ে আসা ঘন ভবিষ্যবাদ।

আরেকটু পরিস্কার করে বলতে গেলে মেয়ারহোল্ড ছিলেন শরীরী নাট্যভাষা (ফিজিকাল থিয়েটার) এর জনক। যাকে তিনি বলেছেন বায়োমেকানিক্স। শরীরের কারিগরি ব্যবহারের মধ্যে তিনি জুড়ে দিয়েছিলেন জিমন্যাস্টিক বা অ্যাক্রোব্যাটিক ছন্দের তুরঙ্গগতি, রাশান ফোকলোর থেকে তুলে এনেছিলেন জ্ঞানমার্গের ছায়া সঞ্চরণ, মার্কাস আর অপেরাকে তিনি প্রয়োগ করেছিলেন সক্রিয় অনুধাবনাময় এক নাট্যধর্মী অবস্থানে, কখনো কাবুকির প্রয়োগ রীতিকে, আবার কখনো নেহাতই ট্র্যাভেল শো কে ব্যবহার করেছেন দর্শকের একাকীত্ব ও পারস্পারিক দূরত্বের সেতু হিসেবে। নাদস্বরের দুরন্ত ব্যবহারে, কখনও বা চমকে দিয়েছেন দর্শককে। মঞ্চ নির্মাণ ও সঙ্গীত তাঁর নাটকে শিরা ধমনীর কাজ করেছে। মেয়ারহোল্ড মনে করেছেন দর্শককে শেষতক কিছুটা বিনোদন দিতেই হবে। কিন্তু এ সমস্ত হল রঙ্গমঞ্চের ধারাবাহিক গতানুগতিকতার বিপ্রতীপে সম্পূর্ণ এক অনন্য নাট্যধারার গতিবন্দনা, নাটককে কবিতার আধারে প্রতিস্থাপন করা। ফলে এখান থেকেই বিরোধ, এখান থেকেই বিরোধিতার সূত্রপাত।

মেয়ারহোল্ড সম্পর্কে জানতে গিয়ে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি যে অত্যন্ত কম বয়স থেকেই তিনি ছিলেন গড্ডালিকার বাইরে। তথাকথিত সরলরৈখিক জীবন তাঁকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। মোটামুটি অর্থবান রক্ষণশীল পরিবারে জন্মেও নিজের পারিবারিক নাম কার্ল কাসিমির থিওডর মেয়ারহোল্ড নামটি তিনি পরিবর্তন করেন।

তিনি তাঁর প্রিয় রুশী গদ্যকার সেভেলদ গারসিনের নামটি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করেন। শুরু করেছিলেন আইন পড়া, কিন্তু শেষ করেননি। ভেবে উঠতে পারছিলেন না শেষ পর্যন্ত একজন বেহালাবাদক হবেন না নাটকই হবে তাঁর জীবন। এর থেকে বোঝা যায় যে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানও তাঁকে তাঁর কর্মজীবনকে নিয়ন্ত্রন করতে পারেনি। সুরক্ষিত জীবনের চেনা ছকে তাঁকে দেখা যায়নি। ফলে সেই অর্থে সম্ভ্রম পরিবারের সন্তান হয়েও রুশ বিপ্লব তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল সমাজ পরিবর্তনের ক্রান্তিকারী ইশারায়। তিনি চেয়েছিলেন বিপ্লবোত্তর রাশিয়ার মঞ্চে সম্পূর্ণ এক নতুন এমন এক ভাষার জন্ম হোক যা সমাজকে শক্তিশালী করবে। কেননা ‘আ নেশন ইজ নোন বাই ইটস থিয়েটার’। শিল্পের এই ফলিত সম্প্রসারণের তাৎপর্য অনুধাবন করা খুব কঠিন আর রুশ প্রশাসন তো তখন ঢালাও তন্ত্রে (রিভিশনিজমও পড়তে পারেন) জ্ঞান অপজ্ঞানের বাইরে চলে গেছে। এক নির্যাতন থেকে আরেক নির্যাতন, এক শোষণ থেকে আরেক শোষণ, এক আমলাতন্ত্র থেকে আরেক আমলাতন্ত্রে প্রতীয়মান তাঁর কর্মকাণ্ড।

মেয়ারহোল্ড থিয়েটার (যাকে রুশীরা বলে ‘সেন্টার’) সেখানে গিয়েছিলাম সম্পূর্ণ অন্য গোত্রের এক নাটক দেখতে। একটি চৈনিক দলের মঞ্চাভিনয় ছিল সেদিন। অভিনয় শেষে আলাপ করতে গিয়েছিলাম সেই দলের পরিচালকের সাথে। সে আমায় বলে ‘আমি গর্বিত যে মেয়ারহোল্ডের নামাঙ্কিত থিয়েটার হলে আমি নাটক মঞ্চস্থ করতে পেরে’। তাঁর কাছেই শুনি চিনেও মেয়ারহোল্ড নিয়ে নানাবিধ চর্চার কথা। শুধু চিন নয়, বা রাশিয়া নয় সারা বিশ্বের নাট্য কৌশলে মেয়ারহোল্ডের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। জের্সি গ্রোটভস্কি থেকে বারবা প্রত্যেকেই বারবার স্মরণ করেছেন মেয়ারহোল্ডের নাট্যকৃতিকে।

এক কাপ কফি খেয়ে সেই চৈনিক দলের থেকে বিদায় নিয়ে হলের বাইরে আসি। বাইরে তখন শীতের কামড় টের পাওয়া যাচ্ছে। মায়াকভস্কি স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে নাভস্লোবোডস্কায়া ষ্ট্রীটের ২৩ নং বাড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। মনে হয় এও যেন ইতিহাসের অন্তরালবর্তী এক হাহাকার – রুশ প্রশাসনের কাছে তা কত দিনে পৌঁছাল? সে রাস্তায় তখন বেশ ভিড়, সবে শো ভেঙেছে। আমি এগিয়ে চলি মেট্রো ষ্টেশনের উদ্দেশ্যে। পরের দিন আবার মায়াকভস্কি মিউজিয়াম যাওয়ার কথা। মায়াকভস্কির কথা মনে পড়তেই আমার মগজে যেন দাগ কেটে গেল ছুরিভর্তি মেঘ। এই মায়াকভস্কিরই একটার পর একটা নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন মেয়ারহোল্ড। তাঁদের ছিল চন্দ্রহাসতুল্য সখ্য। মায়াকভস্কি তাঁর অত্যন্ত বিতর্কিত স্যাটায়ার ‘দ্য বেডবাগ’ নাটকটি লিখেছিলেন মেয়ারহোল্ডের জন্য। নাটকটি মঞ্চস্থ তিনি করেন। মাঝপথে মায়াকভস্কির মৃত্যু হয়। ‘দ্য বেডবাগ’ নাটকটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত চমকপ্রদ। একজন বলশেভিক এই নাটকের নায়ক। যে তাঁর বিয়ের রাত্রে বাড়ি চাপা পড়ে হিমায়িত হয়ে যায়। পঞ্চাশ বছর পর এক কমিউনিস্ট স্বর্গে সে জেগে উঠে দেখে একটি ছারপোকা ছাড়া তাঁর আর কোনও সঙ্গী নেই। অতঃপর তাঁকে ‘বুর্জোয়া ভালগার হিসাবে চিড়িয়াখানায় রেখে দেওয়া’ হয়। এও এক তাৎপর্যপূর্ণ সূত্র।

শেষ করি আবার সেই মেয়ারহোল্ডের জীবনে। চৌত্রিশ সাল থেকেই আস্তে আস্তে মেয়ার হোল্ড নির্বান্ধব হতে শুরু করেন। প্রাভদায় লেখা হয় যে মেয়ারহোল্ডের নাটক হল বিযুক্তির নাটক। কেননা সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজম-কে (পার্টি লাইন) তিনি মানতে পারেননি। ফলে অল ইউনিয়ান কনফারেন্স ফোর ষ্টেজ ডিরেক্টার্স- এ, যেখানে তাঁর বক্তব্য রাখার কথা ছিল, সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন কিনা তাঁর কোন নথি পাওয়া গেল না। এক মাসের মধ্যে তিনি গ্রেফতার হন। সেই মেয়ারহোল্ড যিনি মনে করতেন শরীরী ভাষা হল প্রতিরোধ শক্তির অন্যতম অবলম্বন। আপাত নিরীহ শীতল স্নিগ্ধ কর্ম নামক অনুভেজক প্রকৌশলকে তিনি ইতিহাসের জাঙ্ক ইয়ার্ডে পাঠাতে চেয়েছিলেন। কোনও রাষ্ট্রক্ষমতাই এই স্পর্ধাকে সহ্য করতে পারে না। তাঁকেও পারেনি। মেয়ারহোল্ডের মৃত্যুর ৭৫ বছর পর মাঝে মাঝে মনে হয় তাঁর প্রকাণ্ড সুহৃদ কবি ও নাট্যকার মায়াকভস্কি যদি তাঁর গ্রেফতারের এক দশক আগে আত্মহত্যা না করতেন তবে কি তাঁর অবস্থাও এমন হত? সে উত্তর ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই।

নিদারুণ ঠাণ্ডায় আমি তখন আস্তানার পথে।

Tags
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami