চলচ্চিত্র

মৃণাল সেনের তিরোধান এবং স্মরণের বদলে

অনিন্দ্য সেনগুপ্ত

মৃণাল সেন আমার প্রিয় পরিচালক ছিলেন না; যদিও তার কয়েকটি ছবি আমার প্রিয়। শিল্পকর্মের মৃত্যু হয়না, শিল্পীর হয়। আমার প্রথম বাক্য অনুযায়ী যিনি শিল্পী হিসেবে আমার ততটা প্রিয় ছিলেন না, তার তিরোধানে আমি কি তাকে স্মরণ করতে পারি? পারলে কীভাবে?
শিল্পীর – বিশেষ করে তিনি যশস্বী হলে – আমাদের সুযোগ দেয় তার কাজের মূল্যায়ণ শুরু করার। কিছুক্ষেত্রে শিল্পীর আবিষ্কার ঘটে তার মৃত্যুর পর, যেমন গদ্যকার হিসেবে জীবনানন্দ দাশ, চিত্রকর হিসেবে ভ্যান গগ; কিন্তু চলচ্চিত্রে তেমনটি ঘটার সুযোগ হয় কম। ৩০শে ডিসেম্বর ২০১৮-র পর যেটুকু সময় গেছে তাতে মৃণাল সেনের কাজের মূল্যায়ণ ও তার দীর্ঘজীবনের স্মরণ করার সুযোগ আমাদের এসেছে, সে কাজ শুরু করার কথা আমাদের। এই স্মরণ ঠিক তার সঙ্গে কার কিরকম খোশগল্প হয়েছিল তা নয়, এই স্মরণের অর্থ, তিনি যে জীবিত ছিলেন-এর অর্থ কী ছিল আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে।
তিনি নেই; তার তিরোধানের দ্যোতনা কী সেটা ভাবা এখন আমাদের কর্তব্য; কারণ তিনি হয়তো বাংলার শেষতম পরিচালক যার তিরোধান আন্তর্জাতিক খবর হবে, এবং তর্কসাপেক্ষে বলা যায় এই মানুষটির মৃত্যু বাংলা সিনেমাকে পৃথিবীর কাছে আপাতত গুরুত্বহীন করে দিলো। অর্থাৎ মৃণাল সেন আমাদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বসিনেমার কাছে বাংলার শেষতম ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীবিত পরিচালক হিসেবে, তার শেষ ছবি ২০০২-এ মুক্তিপ্রাপ্ত হলেও।
এই স্মরণ, এই মূল্যায়ণ কীভাবে হবে? আমাদের স্মরণের, মূল্যায়ণের পন্থা-পদ্ধতিগুলি কি ঠিকঠাক, সিনেমা নামক শিল্পমাধ্যমটির ইতিহাসের নিরিখে? আমি কিছু তর্ক উপস্থাপিত করবো মাত্র – স্মরণ বা মূল্যায়ণের আগে।
শিল্পীর কর্মজীবন কোনো সমসত্ত্ব ধারাবাহিক ব্যক্তি-পরিচিতি নয়।
আমাদের শিল্পী সম্পর্কিত ধারণাগুলি শৈল্পিক ব্যক্তিত্বের কনসিস্টেনসি চায়, যেন শিল্পী হল কিছু বৈশিষ্ট্যর ছেদহীন ধারাবাহিকতা, যার সারমর্ম এখন অবিচুয়ারির পর অবিচুয়ারিতে লিখিত হবে। মৃণাল সেনের শিল্পীজীবন সেই ধারণাকেই আঘাত করে সজোরে। ১৯৫৫-র বিস্মৃত ‘রাতভোর’ থেকে ১৯৬৬-র ‘মাটির মনিষ’-র যে মৃণাল সেন, সেই মৃণাল সেনকে ‘ভুবন সোম’ (১৯৬৯) থেকে সত্তর দশকের ছবিগুলির মধ্যে পাওয়া সহজ নয়। পেতে পারেন, তাহলে শৈলী আর আঙ্গিকের দিক থেকে তাকে পাঠ করছেন না, করছেন কনটেন্ট হিসেবে। আবার ‘খারিজ’ (১৯৮২) থেকে ‘আমার ভুবন’ (২০০২) অব্দি যে মৃণাল সেন, তাকেও আগের দুটি পর্যায়ে সাথে ধারাবাহিক রাখা সহজ নয় যদি শৈলী এবং আঙ্গিক ধর্তব্যের মধ্যে রাখেন। বস্তুত মৃণাল সেন হলেন সেই চলচ্চিত্রকার যিনি নিজেকে আমূল পালটে ফেলতে পারেন, কখনো ‘ভুবন সোম’-এর মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে, কখনো ‘একদিন প্রতিদিন’ (১৯৭৯) থেকে ‘খারিজ’ অব্দি প্রায় চুপিসাড়ে। আমরা যেভাবে তাকে স্মরণ করি তা ১৯৬৯-এর আগের শিল্পীকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলতে বাধ্য, কারণ আমাদের কাছে সত্তর দশকের মৃণাল সেনই প্রধান মৃণাল সেন।
তাকে পড়তে গেলে তার শৈলী পড়তেই হবে। আমাদের বুঝতে হবে যে তার মধ্য-পর্যায়ে তিনি আমূল শৈলীবদল কেন করেছিলেন এবং কেন তার সত্তর দশকের পরের ছবি সেই শৈলীতে ধারাবাহিক থাকতে পারলোনা।
শিল্পীর সমসত্ত্ব ‘বিশ্ববীক্ষা’ সন্ধান করাটা বুনো হাঁসের সন্ধান হতে পারে।
যে দুজন সমসাময়িকের সঙ্গে মৃণাল সেনের নাম নেওয়া হয় – ঋত্বিক ঘটক এবং সত্যজিৎ রায় – তাদের ‘বিশ্ববীক্ষা’ আমরা বড় সহজে গড়ে নিয়েছি, ঋত্বিক র‍্যাডিকাল মার্ক্সবাদী, সত্যজিৎ উনিশ শতকীয় রেঁনেসাপন্থী মানবতাবাদী ইত্যাদি। এই তকমাগুলি দিয়ে এই দুজনকে সহজে পড়ে ফেলা যায়না। সেভাবেই মৃণাল সেনকে কোনো বিশ্ববীক্ষা দিয়ে বুঝে ফেলা যায়না। তিনি মার্ক্সিস্ট ছিলেন, এই ‘তথ্য’টি আমাদের আর কতটা বলে? কীভাবে তাকে আরেকজন মার্ক্সবাদী চলচ্চিত্রকার থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে? নাকি আসলে করেনা? ঋত্বিক অন্যান্য বামপন্থীদের থেকে কীভাবে ভিন্ন তা আমরা বুঝতে আরম্ভ করেছি; কিন্তু মৃণাল সেন?
বরং আমি বলবো যে আমাদের যে সত্যজিৎ বা ঋত্বিককে তাদের ব্যক্তিপরিচিতি দিয়ে বুঝে ফেলার শর্ট কার্ট, মৃণাল সেন সেরকম কোনো সহজপাঠ আমাদের দিয়ে যাননি। তার ব্যক্তিপরিচিতিকে অনায়াসে তার শিল্পীসত্তার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ফাঁদটিকেও তিনি কঠিন করে দিয়েছেন, সত্যজিৎ বা ঋত্বিকের ক্ষেত্রে যে সহজ ফাঁদটিতে আমরা পড়তে ভালোবাসি। মৃণাল সেনের কাজ তার সমসত্ত্ব ‘শিল্পী-ব্যক্তিত্ব‘ নির্মাণ করতে দেয়না। আমার কাছে এই প্রক্রিয়াটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই ক্ষেত্রে ‘টেক্সট’ ছাড়া আমাদের হাতে আর কিছু থাকেনা।
আমাদের একমাত্র ‘জাতীয়’ চলচ্চিত্রকার?
ব্যক্তি ছিলেন আটপৌরে বাঙালি – কিন্তু ১৯৫৫ থেকে ‘৬৬-র মধ্যে ৮টি ছবির মধ্যে একটি ওড়িয়া ছবি, ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৯ অব্দি তিনটি ছবি বাংলায় নয়, ১৯৮০ থেকে ২০০২ অব্দি তিনটি ছবি (দুরদর্শনের জন্য নির্মিত সিরিজটি উহ্য রাখলে)। বাংলা থেকে অন্যান্য ভাষায় এই বারংবার যাতায়াতটি আর কজনের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পেয়েছি বিকল্প সিনেমার ক্ষেত্রে?
মনে রাখতে হবে – জাতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তার সবচাইতে অভিঘাতপূর্ণ ছবিটি – ‘ভুবন সোম’ – একধরণের বাঙালিয়ানার ওপর তীব্র শ্লেষ দিয়ে শুরু হয়েছিল। ভাষিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতির গন্ডি থেকে বেশ কয়েক পা বাইরে চলে যাওয়ার সাহসটি মৃণাল সেন ছাড়া সবাই অহরহ দেখাতে পারতেন না। ভুবন সোম কিন্তু ঝাড়্গ্রাম বা মেদিনীপুরের কোনো স্টেশনেও কর্তব্যরত থাকতে পারতেন; কিন্তু মৃণাল তাকে ফেললেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আঞ্চলিকতায়। এর ফলে এই ছবিতে উনিশ শতকীয় ধ্যানধারণার বাঙালিয়ানাকে যে ডাইনোসর করে তোলা, তাতে তিনি নিজেই ভুবন সোমের পাশাপাশি থাকেন ‘বাঙালি’ হিসেবে, অর্থাৎ শ্লেষের লক্ষ্যের পাশেই।
মৃণাল সেন ‘সত্তর দশক’-কে অভিব্যক্ত করেননি।
এটা স্রেফ তথ্য; কিন্তু একটু স্মরণে রাখা যে যখন তিনি ‘ইন্টারভিউ’ বানাচ্ছেন তখন তিনি প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে। অর্থাৎ তিনি সত্তর দশকের বিদ্রোহী যৌবনকে ‘বাইরে’ থেকে দেখছেন, তার সমসাময়িক ঋত্বিক ঘটক যেভাবে এই দেখাটিকে আন্ডারলাইন করেন ‘যুক্তি তক্কো’-তে নিজে উপস্থিত থেকে। কিন্তু সত্যজিতের সত্তর দশকের ছবিতে যে দূরত্ব থেকে দেখা, মৃণালেরও যে তাই এটা আমরা ভুলে যাই। ভারতবর্ষে বামপন্থার ইতিহাসের প্রথম যে গুরুত্বপূর্ণ দশক, সেই চল্লিশের দশকে যৌবন অতিবাহিত করেছেন এমন একজন দেখছেন বামপন্থার ইতিহাসের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের যুবসম্প্রদায়কে। সত্যজিতের ক্ষেত্রে আমরা বলে থাকি যে তিনি বুঝতে পারছেন না, ঋত্বিক সরাসরি নিজেকে পর্দার মধ্যে এনে সংলাপে নিয়োজিত হন এই যুবকদের সঙ্গে – মৃণালের ক্ষেত্রে কী ঘটছে?
আমার মতে, মৃণাল চাইছেন পর্দায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নিজের উপস্থিতিকে মুছে ফেলতে – যা ঋত্বিক করতে চাননি, যা সত্যজিৎ করতে চাননি বা পারেননি। ‘কলকাতা ৭১’-এ যে এমবেডেড এপিসোড-গুলি, দেখুন তা ‘বিগত’ বাস্তববাদী ঢং-এই বানানো; শুধু ফ্রেমিং কাঠামোটি (এবং ১৯৭১-এর কলকাতার এপিসোডটি) ব্রেখটিয় রীতিতে নির্মিত, এবং এই ফ্রেমিং কাঠামোটির কথককে তিনি নামাঙ্কিত করছেন ‘৭১-এর মৃত যুবক’ হিসেবে। আমি বলবো যে ‘ইন্টারভিউ’-এ করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘পদাতিক’-এ বিজন ভট্টাচার্যের সচেতন উপস্থিতি মৃণালের প্রজন্মকেই ছবির কথক নয়, অবজেক্ট হিসেবে পেশ করে।
মৃণাল সেন ‘সত্তর দশক’-কে অভিব্যক্ত করেননি। বরং তিনি একটি মঞ্চ তৈরি করতে চেয়েছেন যাতে সেই দশক নিজেকে ব্যক্ত করতে পারে। আবার বলছি, তার ছবিগুলি একটি করে মঞ্চ যেখানে সত্তর দশকের তরুণের নিজেকে দৃশ্যবস্তু মনে হয়না। কে সেই তরুণ? পর্দায় থাকা রঞ্জিত, দেবরাজ, ধৃতিমান? না, তারা নেহাতই প্রতিনিধি। সেই যুবক হলেন দর্শক নিজে। অর্থাৎ মৃণাল সেনের নিকোনো উঠোন দর্শককেই নিজেকে ব্যক্ত করতে আহ্বান করেন। ব্রেখটিয় নিয়মেই তর্ক ছবি শেষ হওয়ার পরে দর্শকের মধ্যে ধারাবাহিক হয়ে যায়।
‘যুবক’ বললাম; সত্তর দশকের। আমাদের কল্পনায় তো সত্তর দশকের রোমান্টিসাইজড আহত-নিহত-আক্রান্ত তরুণ প্রায় সবসময়েই পুরুষ। অতএব সত্তরের নিকোনো মঞ্চের কাঠামোর সূত্র ধরেই ‘পদাতিক’-এ আচমকা চলে আসে বামপন্থী আন্দোলনের নিহিত কনফ্লিক্ট হিসেবে লিঙ্গ-রাজনীতির প্রসঙ্গটি, এবং নেহাতই প্লট ধরে নয়, প্রবন্ধোপম ফর্মের যুক্তিতে নন-ফিকশন হিসেবে। আমার মতে ‘পদাতিক’ এই দশকে মৃণালের শ্রেষ্ঠতম, সবচাইতে পরিণত ছবি; আশা রাখি স্মরণের এই মূহুর্তে, যখন লিঙ্গ-রাজনীতি তার প্রাপ্য গুরুত্ব পেতে আরম্ভ করেছে, ‘পদাতিক’-এর নবমূল্যায়ণ হবে।
প্রসঙ্গত, এই সময়ের অনেক ছবিতেই তার সহনির্মাতা ছিলেন মোহিত চট্টোপাধ্যায়। আমরা সিনেমার ইতিহাসে মৃণাল সেনকে রেখেছি। সিনেমা এবং সমসাময়িক নাট্যশিল্পের আদানপ্রদানের ইতিহাসে তাকে পড়া বাকি আছে বোধহয়।
শিল্পীর ইতিহাসে তার ‘সংকট’-এর মূল্যায়ণ গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের ধারণায় শিল্পী ধারাবাহিকভাবে সফল থাকেন। অতএব সত্যজিতের সত্তর দশকের ছবি ‘অপর্যাপ্ত’, এমন নিদান দিয়ে ছেড়ে দিই আমরা। শিল্পীর সংকটকেও যে পাঠ করতে হয়, এমনটা আমরা ভাবিনা; এটা তো ভাবিইনা যে শিল্পী নিজের সংকটকে আহ্বান করতে পারেন শৈল্পিক প্রক্রিয়ার অন্তর্গত যুক্তিতেই। সত্যজিতের যে সমালোচকনির্মিত সত্তা – তিনি বাংলার ভদ্রলোকীয় নবজাগরণের শেষ প্রতিভূ – এই (আমার মতে ভ্রান্ত) ধারণাটিকে যে ‘জন অরণ্য’-এ তিনি নিজহাতে ধ্বংস করছেন, এবং করছেন রসিয়ে রসিয়ে, ছায়াঘনায়িত বঙ্কিম শ্লেষে, তা আমরা দেখিনা।
এভাবেই ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০) মৃণালের সত্তর দশকীয় ছবির পরিকল্পকে একধরণের আত্মসচেতন সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। আমার মতে এই সংকটের আরো শৈল্পিক প্রকাশ ঘটে ‘খান্ডাহার’-এ। ‘খান্ডাহার’ (১৯৮৩) আমার কাছে ‘ভুবন সোম’-এর পরেই মৃণাল সেনের প্রিয়তম ছবি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ দ্বিতীয় পুরুষে লেখা, অর্থাৎ নায়ক সেখানে পাঠক নিজেই, তার লিঙ্গ-পরিচিতি ছাড়া আর কোনো পরিচিতি সেই গল্পে ছিলনা। মৃণাল সেন তাকে করে ফেললেন আলোকচিত্রী। সেই শহুরে আলোকচিত্রী ক্যামেরা নিয়ে যায় গ্রামের খান্ডাহারে, সেখানে এক অন্ধ নারীকে আচমকা দিয়ে দেয় একটি প্রতিশ্রুতি, তারপর যাকে কেন্দ্র করে এই প্রতিশ্রুতি, সেই নারীর (এবং সেই নারীর পরিসরের) আলোকচিত্র নিয়ে ফিরে আসে। যারা ছবিটি দেখেছেন তারা জানেন গল্পটি কী।
মৃণালের তুরুপের তাস হল মাইকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির ‘ব্লো আপ’-এর মত তার ছবির নায়ককে আলোকচিত্রী করে ফেলা; অর্থাৎ নায়ক চলচ্চিত্রকারের পরোক্ষ অল্টার-ইগো হয়ে যায়। এবং এই দ্যোতনায় যদি ছবিটিকে পাঠ করে ফেলি তাহলে দেখা যাবে ‘আকালের সন্ধানে’-তে তিনি যে প্রবন্ধধর্মী তর্কটি রাখছেন সেই তর্ক আরো সুতীব্র হয়ে উঠছে। ক্যামেরা নিয়ে নাগরিক (পুরুষ) শিল্পী তার অপরকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসে? সেই প্রতিশ্রুতি কি সে আদৌ বাস্তবায়িত করতে সক্ষম? রাজনৈতিক সিনেমা বাস্তবের ছবি তোলা ভিন্ন কী করতে পারে? সেই ছবির রাজনৈতিক-নন্দনতাত্ত্বিক মূল্য কতটা? ‘ভুবন সোম’-এর চাইতে এই দুটি ছবির নায়ক কতটাই বা (রাজ)নৈতিক দূরত্বে আছে? এই প্রশ্নগুলি কয়েকটা শুরুর প্রশ্ন মাত্র।
‘জন অরণ্য’ এবং ‘খান্ডাহার’-এ শিল্পীরা নিজেদের শিল্প-পরিকল্পকে সংকটের দিকে ঠেলে, সীমানার কাছে দাঁড় করিয়ে শিল্পোত্তীর্ণ করেন, যার পর তাদের কাছে আর উত্তর থাকেনা। অতঃপর এই দুই পরিচালকের ছবিই দেখবো একধরণের আঙ্গিকগত সংকটের মধ্যে আটকে পড়ে যায় – বহির্বিশ্বের সঙ্গে চ্যুতি ঘটে, সেই বিশ্বের সঙ্গে হাত মেলাতে আকুল ক্যামেরা আটকে যায় অন্দরে, অনন্ত কথা-কথা-কথা আর অবসাদ-অন্তর্মুখিনতা-গ্লানির মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে, রাজনৈতিকতা থেকে শুধুই নৈতিকতায় বাঁধা পড়ে যায় এদের ছবি, এভাবে আমার অগ্রজ শিক্ষকরা এদের সংকটকে চিহ্নিত করেছেন। এবং দেখিয়েছেন এই সংকট কীভাবে পরবর্তী বাংলা মধ্যবিত্ত ছবিরই সংকট হয়ে ওঠে; যদিও এই লেখায় আলোচিত শিল্পীরা এই সংকটের ব্যাপারে যতটা সচেতন, অসহায় ও পীড়িত, পরবর্তীর চলচ্চিত্রকারেরা ততটাই অসচেতন, complacent ও প্রশ্নহীন।
মনে রাখতে হবে, মধ্যবিত্তের অন্দরে আটকে পড়ে যাওয়ার এই যে ক্রাইসিস, সেটা থেকে উত্তরণের পথ মৃণাল ও সত্যজিৎ দুজনেই জানতেন। ‘চারুলতা’ একইভাবে ইন্ডোরে সীমাবদ্ধ চেম্বার ড্রামা হয়েও ইতিহাসের সঙ্গে সংলাপ রচনা করেছিল। সেভাবেই এই অন্দরে বন্দী হওয়াটাই ‘পদাতিক’-এর কন্টেন্ট ছিল। সেখানেও মৃণালের ব্রেখটিয় ফর্মই নায়ককে অন্দরে বন্দী করলেও ছবিকে আবিশ্বের ইমেজের সন্দর্ভের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। প্রসঙ্গত, মৃণালের এই সময়ের আঙ্গিককে গোদারীয় বলাটা কিন্তু তাকে অপমান করা হয়। এই ফর্মের অন্যতম পুরোধা জঁ-লুক গোদার হলেও এই আঙ্গিক তখন বিশ্বময় নবতরঙ্গের ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে গৃহীত হচ্ছে; এই ফর্মকে ব্রেখটিয় বলাটাই কাম্য, যেহেতু গোদারও ফর্মটি ব্রেখট থেকে আহরণ করছেন।
মৃণাল সেনের শেষ পর্যায়ের ছবির প্রধান সংকট হল তার সত্তর দশকের এই ব্রেখটিয় ফর্মে স্থিত থাকতে না পারা, বা স্থিত থাকার ভরসা হারিয়ে ফেলা। কিন্তু এটাকে ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে পাঠ করাটা ফলপ্রসূ হবেনা। ব্যর্থতা ব্যক্তির হয়, সংকট নিহিত থাকে সময়ে এবং ইতিহাসে। মূলত ‘একদিন প্রতিদিন’ থেকে মৃণালের ছবির যে অন্তর্মুখী মোড়, সেখানে একটি অস্থির সন্ধান আছে অভীষ্ট ফর্মের, যে ফর্মটি তিনি পাচ্ছেন না। এই অভীষ্ট ফর্মটি কী করতে পারতো? মনে হয় – বিগত ব্রেখটিয় ফর্মের যে বিষয়ী-অবস্থান, তার প্রশ্নাতীত কনফিডেন্সকেই তিনি সন্দেহ করতে আরম্ভ করেছিলেন। তিনি খুঁজছিলেন এমন একটি ফর্ম যেখানে শিল্পী/কথকের অবস্থানটিই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। ‘খান্ডাহার’-এ, আমার মতে, এটি সফল হয়েছিল। ‘খান্ডাহার’-এ তিনি তো ‘দেখা’-কেই প্রশ্ন করে ফেলেছেন। কিন্তু মৃণাল এই কথাগুলি রূপকের মাধ্যমে বলতে চাইছেন না, অথবা শুধু রূপকে থাকতে চাইছেন না সেই সময়ে।
আজ পয়লা জানুয়ারি ২০১৯। ৪৮ ঘন্টা হতে চললো একজন আন্তর্জাতিক বাঙালি ৯৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। তার দ্বিতীয় ছবিতে তিনি একজন অভারতীয় চরিত্রকে একটি বাংলা ছবির প্রধান চরিত্র করে তুলেছিলেন। ‘আকাশকুসুম’ প্রথম সদর্থে ‘নিউ ওয়েভ’ বাংলা ছবি, ফ্রিজ ফ্রেমের ব্যবহারের জন্য নয়, রোমান্টিক ছবির genre-bending ঘটানোর জন্য ও একটি সদর্থে নতুন নাগরিক নায়কচরিত্র পেশ করার জন্য। তার প্রথম দিকের ছবি বাস্তববাদী মেলোড্রামাধর্মী হওয়া সত্ত্বেও যিনি সেই ফর্মকে পরিহার করে নতুন ভারতীয় ছবির জন্ম দেন ১৯৬৯-এ। সত্যজিৎ যখন সেই ছবিকে শ্লেষে তাচ্ছিল্য করেন তিনি বোঝেননি যে ছবির নায়ক যেভাবে ভিন্ন ভারতের পরিসরে বিপন্ন এবং হাস্যউদ্রেককারী রকমের অসমর্থ, ছবির ব্যাকরণও সেই বিভ্রাটকে শরীরে ধরে। এই ছবি ফরাসী ছবির অনুকরণ নয়; এই ছবি সেই বাংলা ছবি যেখানে বাংলা বলার মানে হয়না। (কী সমাপতন! সত্যজিৎ ‘ব্লো আপ’-ও বোঝেননি!) মৃণাল সেনের ছবির গুন এবং দোষ একই – তার অস্থিরতা ও উত্তেজনা। যেজন্য তার আশির দশকের ছবির হঠাৎ সুরবদল ও স্তিমিত হয়ে যাওয়া আমাকে ভাবায়।
কিন্তু আজকের যুগে দাঁড়িয়ে একধরণের রাজনৈতিক শিল্পকে স্থগিত রেখে অন্য ফর্মের সন্ধানে সেই অন্তর্মুখী মোড়টিকে পাঠ করা জরুরী – এটি ব্যক্তিশিল্পীর সংকট নয়, একটি জাতির শিল্পের সংকট। এই ফর্মটি, যা কিনা জাতির (নাকি বামপন্থার? নাকি রাজনৈতিক শিল্পের? নাকি মধ্যবিত্তের?) সংকটকে আকার দেবে, বিশ্লেষণ করবে, বা অন্তত চিহ্নিত করবে, সংযুক্ত করবে বিশ্বের সংকটের সঙ্গে অথচ উচ্চারণের ভাষিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারাবেনা – তা হয়তো আগামী বাংলা সিনেমারও সন্ধান, অগ্রজ যেদিকে ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন সেই দিকে যাত্রা করা হয়তো আগামীর দায়িত্ব।
কিন্তু সেই আগামীর লালনের পরিবেশ ও পরিকাঠামো বাংলা সিনেমায় আর নেই; বা, সে আমার ভ্রম। এই লেখার লেখক বর্তমানে কোনো সোশাল মিডিয়া, বৈদ্যুতিন মাধ্যম, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনা। আমি নিশ্চিত মৃণাল সেনের স্মরণে বাঙালি স্মৃতির ধারাবাহিকতার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত পেশ করছেন; বলছেন তারা কীভাবে তার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন, কীভাবে আমরা তার আন্তর্জাতিকতার ধারাবাহিকতায় আছি। সেখানে বিযুক্তির, বিচ্ছিন্নতার, বিস্মরণের কোনো সংকট নেই। সংকট নেই উচ্চারণেরও। তিনি হয়তো আমাদের মধ্যে ছিলেন এবং আছেন, সুগ্রন্থিত।
ছবি – ইন্টারনেট
Tags
Show More

Related Articles

One Comment

  1. Nice article. After Mrinal Sen’s death, obituaries flooded the eloctronic media. I thought this was one of the best that I came across. Look forward to see more articles from the author.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami