জীবনযাপনমত-মতান্তর

#মিটু: মুভমেন্ট ২.০

সেঁজুতি দত্ত

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ইউ সি ডেভিস স্কুল অফ ল-এর ছাত্রী রায়া সরকার একটি লিস্ট বার করেন। সেই লিস্টে ভারতবর্ষ, ইউ.কে এবং আমেরিকার শিক্ষক গোষ্ঠীদের মধ্যে তাবড় তাবড় লোকেদের নাম যৌন হিংসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭৫টি নাম উঠে আসে। এই ঘটনার পর সোশাল মিডিয়ায় ঝড় উঠে যায়। প্রশ্ন ওঠে এই লিস্ট নির্মানের প্রক্রিয়া নিয়ে। এই লিস্টের পক্ষে যারা ছিলেন তাদের যুক্তি ছিল আইনি প্রক্রিয়ায় যৌন হিংসা মোকাবিলার সীমাবদ্ধতা আছে, আর বিপক্ষে উঠে আসে দোষ প্রমাণিত হবার আগেই কাউকে অহেতুক কালিমালিপ্ত করে ফেলার প্রতিযুক্তি। এই একটি লিস্টে এক লহমায় আপাত সংহতিতে অবস্থিত তাবৎ নারীবাদীদের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি হয়।

আমি এই লেখায় #মিটু-র ইতিহাস লিখতে চাইছি না। ২০১৭র অক্টোবরে যখন প্রথম এই লিস্ট বেরোয় তখন আমিও এই প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য অভিঘাত নিয়ে সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু এর বিপক্ষে কোন প্রকার নিদান দেবার কথা সেই মুহুর্তে ভাবতে পারিনি। এতগুলো মেয়ে যখন নিজের নাম গোপন রেখে তাদের শিক্ষক, মেন্টর, প্রোজেক্ট সুপারভাইসরের নাম নিচ্ছেন তখন তা নিয়ে প্রশ্ন করায় আমার রাজনৈতিক আপত্তি ছিল এবং আছে। আমি নিজে হলে কী করতাম সেইরকম উপদেশ দিতেও অসুবিধে হয় এই ভেবে যে আমার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানের নিরিখে আরেকজনের সমস্যা বোঝা ঠিক হবে না। তবে আজ প্রায় দেড় বছর পর এই আন্দোলনকে খানিক দূর থেকে বোঝার এবং এর প্রতিটি সমালোচনাকে ব্যক্তিগত অবস্থানের বাইরে থেকে আলোচনা করবার একটি চেষ্টা করছি মাত্র।

কী ঘটেছিল…

একেবারেই সোশাল মিডিয়া থেকে উঠে আসা এই #মিটু কে অনেকেই আন্দোলনের পর্যায়ে ফেলতে নারাজ। এই আন্দোলনের জন্য এক লহমায় পর হয়ে গেলেন অনেক মানুষ। এবং এর অভিঘাত এতটাই বেশি যে একদা মতাদর্শগতভাবে পাশে থাকা বন্ধুদের অনেকেই এই #মিটু পরবর্তী সময়ে নারীবাদী দাবী এবং ভাবনাগুলো থেকেও সরে গেলেন। রাষ্ট্র, আইন এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি খুবই কন্টেক্সট স্পেসিফিক সমর্থন তারা দিতে শুরু করলেন। এই সবকিছুরই আভাস পাওয়া যায় সেই সময়ের এবং এখনও চলতে থাকা অনলাইন খবরের পাতাগুলোয়, সেই খবরের কমেন্ট সেকশনে এবং যে ধরণের খবর #মিটু-কে ঘিরে তৈরি হচ্ছে তার শেয়ার হিস্টরি থেকে। ‘কাফিলা’, ‘দ্য ওয়্যার’, ‘ইয়ুথ কি আওয়াজ’, ‘ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলি’ এবং অন্যান্য জার্নালের সঙ্গে সঙ্গে মূলধারার খবরের কাগজের অনলাইন এডিশনগুলি #মিটু নিয়ে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় রিপোর্ট করতে থাকে।
ওদিকে অন্যান্য নারীবাদী আন্দোলনের চেয়ে #মিটু আলাদা হয়ে যায় এর গতিশক্তিসংক্রান্ত বিষয়ে। একে ঘিরে প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকা কন্টেন্টের ফলে এর প্রভাব এবং বিস্তার ছড়িয়ে পরে আপাতভাবে নারীবাদ থেকে দূরে থাকা এবং মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী প্রচুর মানুষের কাছে। প্রশ্ন ওঠে এই মুভমেন্টের অস্থিরতা এবং স্বতঃস্ফুর্ততা নিয়ে। মিনিটে মিনিটে বাড়তে থাকা এই কমেন্ট, খবর এবং অভিযোগের ধাক্কায় এত ইনফরমেশন প্রসেস করে ওঠা সম্ভব হয় না কারো কাছেই, আর এরই সাথে বাড়তে থাকে পরস্পর বিরোধী মতামত। সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সমালোচনা, যে তাৎক্ষিকতার দায়ে এই পরিসরে ভাবনা এবং অভিপ্রায়ের কোন তালমিল থাকে না, এই মুভমেন্টেরও সবচেয়ে বড় সমালোচনা হয়ে ওঠে। তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার দাবীতে ক্রমাগত চাপ পড়তে থাকে সেইসব মানুষের ওপর যারা হয়ত আরেকটু সময় নিয়ে সব বুঝে নিতে চাইছিলেন।
কিন্তু সমস্যা হল, এই বুঝে নেবার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিৎ ছিল আমাদের। ওই একই বছরে, ২০১৭ তে, হলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক হার্ভে ওয়াইন্সটাইন এর বিরুদ্ধে একাধিক যৌন হিংসার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের ফলে উঠে আসে ‘মিরাম্যাক্স’ এবং ‘দ্য ওয়াইন্সটাইন’ কম্পানির মতো স্টুডিয়োর আড়ালে চলতে থাকা ক্ষমতার আস্ফালন। এখানে বলে রাখা যাক যে এই দুই সংস্থা এবং হার্ভে ওয়াইন্সটাইন ও তার ভাই রবার্ট ওয়াইন্সটাইন মূলধারার চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জরুরী হয়ে থাকবেন। ভিন্নধর্মী ছবির অক্লান্ত পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাদের হাত ধরে উঠে এসেছেন উডি অ্যালেন, কুয়েন্টিন তারান্তিনোর মত অনেক নির্মাতার ছবি। ওয়াইন্সটাইনের সাথে সাথেই উঠে আসতে থাকে উডি অ্যালেনের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ বছর পুরনো সাত বছরের ডিলান ফারও কে যৌননিপীড়নের অভিযোগ। কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন ধরণের হেনস্থা, হয়রানি এবং অপমানের ন্যারেটিভ নিয়ে #মিটু-র পক্ষে সরব হন চলচ্চিত্র জগতের প্রচুর নারীকর্মীরা।

#মিটু, আগ্রাসন এবং ফলস অ্যাকিউজেশন

এই আন্দোলনের শুরুর সময় থেকেই যে কথাগুলো ঘুরে ফিরে আসছিল তা হল নৈতিকতার প্রশ্ন। প্রশ্ন উঠছিল এই লিস্ট তৈরির পেছনে কোন কায়েমী স্বার্থ থেকে যাচ্ছে কিনা সেটা বুঝতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে প্রসঙ্গ-বহির্ভূত এই নামের তালিকা কেউ যদি নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করেন তখন কী হবে? ভাবা হচ্ছিল যে এই পদ্ধতিতে ভবিষ্যতের পুরুষ-সাথীদের দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখা প্রয়োজন। এই সব প্রশ্ন দিয়ে তৈরি হওয়া চিন্তার ভাঁজ যখন সকলের কপালে তখন এই আন্দোলনের সমর্থনে যে সব সব মেয়েরা ছিলেন তারা পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে। তাদের অনেকেরই মতে, যেখানে নৈমিত্তিক হয়রানি রোজকার সমস্যা সেখানে কার্যত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে যাওয়া আইনি পদ্ধতি মেনে এবং তুলনামূলক শক্তিশালী অপরাধীর ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত হলে যে আক্রোশের সম্মুখীন হবার সম্ভাবনা সেগুলো মাথায় রেখে তারা সামনাসামনি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেতে চান না।

এই লিস্ট যদি খুঁটিয়ে দেখা যায় তাহলে বুঝব যে এই বিভিন্ন পুরুষের নাম বিভিন্ন কারণে উঠে এসেছে। সকলের অপরাধের ধরণ এক নয়, পদ্ধতি এক নয় এবং যদি সত্যিই যৌন হিংসার প্রবলতা মাপার কোন স্কেল থেকে থাকে তাহলে সব অপরাধের ধরণও এক নয়। তাই বিপক্ষের যুক্তি আরও শাণিত হয় কারণ তারা সমস্ত যৌন হিংসাকে এক মাপকাঠিতে মাপতে নারাজ। যেখানে আইনের চোখেও সব অপরাধের শাস্তি এক নয়, সেখানে প্রাথমিক শাস্তি স্বরূপ একই পদ্ধতিতে সকলের নাম নিয়ে তাদের একই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অনৈতিক।
ওদিকে আরও বড় সমস্যা দাঁড়ালো রায়া সরকারকে নিয়েই। এই লিস্ট প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই ভারতবর্ষের সামনের সারিতে থাকা নারীবাদীরা রায়াকে একটি খোলা চিঠি লিখে বসেন। সেই চিঠির পর্যালোচনায় যাচ্ছি না কিন্তু দেড় বছর আগেও সেই চিঠি নিয়ে আমার যা মত ছিল এখনও তাই। আমার মতে, সেই চিঠিকে “statement by feminists” নাম দিয়ে ভারতবর্ষের প্রথম সারির ১৪ জন নারীবাদী যখন সই করে বসলেন তখন অবধারিত ভাবে তারা হয় শুধু নিজেদের মতকেই নারীবাদী মত বলে মনে করলেন অথবা এই লিস্ট যিনি তৈরি করেছেন বা যারা এই লিস্ট তৈরি করতে সাহায্য করেছেন তাদেরকে নারীবাদ থেকে চ্যুত করলেন। সেই চিঠির বক্তব্য খুবই পরিষ্কার – তারা জানেন আইনি প্রক্রিয়ায় ঝক্কি অনেক কিন্তু একই সঙ্গে তারা এ-ও বলেন যে “abiding by the principles of natural justice, we remain committed to due process, which is fair and just.”
কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়ে যায় এর পরে যখন রায়ার লিস্টকে ‘হিট লিস্ট’ এবং তার সহযোগীদের ‘ফিঙ্গার টিপস ফেমিনিস্ট’ এইধরনের শব্দবন্ধ দিয়ে তকমা দেওয়া হয় এই প্রবীণ নারীবাদীদের জবানে। পুরো প্রক্রিয়াটিকে খুঁটিয়ে না দেখে, একদিনের মাথায় এতটা তড়িঘড়ি স্টেটমেন্ট দিয়ে ফেলে তারা অ-নারীবাদী, নারীবাদ বিরোধী এবং নারী-বিদ্বেষী মানুষদের হাতে যুক্তি তুলে দিলেন। সেই যুক্তি দিয়ে এইসব মানুষেরা আজও লড়ে যাচ্ছেন।

ন্যাচারাল জাস্টিস এবং ডিউ প্রসেস

ন্যাচারাল জাস্টিস অথবা ডিউ প্রসেসের একটা বড় সুবিধে হল প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সাহায্য পাওয়া। যদি না কেউ রাজনৈতিক ভাবে নৈরাজ্য এবং অনাবস্থাকে রাষ্ট্রের অন্তিম লক্ষ্য হিসেবে ভেবে থাকেন, আইন এবং বিচার ব্যবস্থার বাইরে হিংসাকে প্রশমিত করবার আর কোন রাস্তা খোলা থাকে না। কিন্তু সমস্যা হল আইন এবং এথিক্স সবসময় একে অপরের পরিপূরক নয়। উলটে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে আইন রাষ্ট্রের প্রাধান্যকামী মরাল এথিক্স দ্বারা চালিত হতে থাকে। যে কারনে বৈবাহিক ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো এখনও আইনের চোখে অপরাধের পর্যায় পড়ে না।
#মিটু আর কিছু না হলেও অন্তত একটি দিক সামনে নিয়ে আসে, সেটা হল আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং জটিলতা। ঠিক যেমন বিপক্ষের যুক্তি অত্যন্ত ধারালো তেমনি এই আন্দোলনের পক্ষেও অনেক সমর্থন জুটে যায়। কেন এত মেয়েরা থানায় না গিয়ে, পরিচিতি গোপন রেখে, অপরাধীদের মুখোশ খুলে দিতে চাইছে সেটা নিয়ে প্রবল আলোচনা এবং তর্ক চলতে থাকে। কথা ওঠে থানায় রিপোর্ট লেখাতে যাবার জটিলতা নিয়ে। কথা ওঠে কীভাবে বিচারব্যবস্থা তার রাষ্ট্রপ্রদত্ত দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে মরাল পুলিসিং চালিয়ে যায়, অভিযুক্তদের আড়াল করে যায় প্রতিনিয়ত। কথা ওঠে নৈমিত্তিক হয়রানি যেখানে স্বাভাবিক সেখানে গুরুতর আক্রমণের শিকার না হওয়া অব্দি কেন চুপ করে থাকতে হবে। তথ্য দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে কর্মক্ষেত্রে দৈনন্দিন যৌন হয়রানি আকছার ঘটছে। আর যতবার ডিউ প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাবার চেষ্টা করা হয়েছে, সেখানে ভিক্টিমের পরিচয় জানাজানি হবার পরেই তাকে বিভিন্ন রকম হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি জায়গায় যে ক্ষমতার থাকবন্দিকরণ চরমে পৌঁছে যায় সেখানে গোপনীয়তা বজায় রেখে অপরাধীকে চিহ্নিত করা বেশি সহজ বলে মনে করছেন বয়সে ছোট, ক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা নবীন নারীবাদীরা।

রাষ্ট্র, পুঁজি এবং দায়বদ্ধতা

#মিটু মুভমেন্টের দায়িত্বহীনতা নিয়ে যত প্রশ্ন উঠছে ততই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে কর্মক্ষেত্রে সেফ স্পেস প্রদানের দায়বদ্ধতা কার সেটা খতিয়ে দেখার। অন্তত ভারবর্ষের ক্ষেত্রে এই মুভমেন্টের বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন ধরণের কর্মক্ষেত্রে। চলচ্চিত্র, নাট্যজগত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট সংস্থা, মিডিয়া ও সংবাদমাধ্যম কিছুই বাদ যায়নি। এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে যৌন হিংসার সঙ্গে মিশে থাকছে ক্ষমতাবানের আনুকূল্যের আখ্যান। সেখানেই প্রশ্ন করবার প্রয়োজন যে এই পুঁজিবাদী সমাজে, যেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সংস্থার বেসরকারিকরণ চলছে সেখানে সাধারণ ওয়েলফেয়ারের যুক্তিতেই বা কতটা সাহায্য পাওয়া সম্ভব। ফিল্ম স্টুডিও, কর্পোরেট মিডিয়া, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সংস্থায় যেখানে কর্মীদের সংগঠিত আন্দোলনেরই অধিকার থাকে না, সেখানে ডিউ প্রসেস কতটা চাকরি এবং বেতনের নিরাপত্তা দিতে পারে সেটা ভাবতে হবে। ভাবতে হবে যে কম বয়েসি, সদ্য কাজে করতে শুরু করেছে অথবা উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে থাকা মেয়েরা এইসব বেসরকারি সংস্থাগুলোতে কতটা নিজের কথা বলার সাহস পাবে।

কিন্তু রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা থাকে। সে শুধুই বাজারের নিয়মে এবং পুঁজির জোরে সংবিধান বিরোধী অবস্থান নিতে পারে না, তা বিশ্বাসের জায়গা থেকে সে যতই পিতৃতান্ত্রিক হোক না কেন। শ্রমিক শ্রেণীকে, ছাত্রী সমাজকে, এমনকি ব্যক্তি মানুষকেও রক্ষা করতে সে দায়বদ্ধ। এর ব্যতিক্রম হলেই আন্দোলনের কথা উঠবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হবার আহ্বান আসবে। প্রয়োজন পড়বে এমন এক গোষ্ঠী নির্মাণের যেখানে একের জন্য সবাই আওয়াজ তুলবে। অসংগঠিত মহিলা কর্মীদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা নিপীড়নের বিরুদ্ধে #মিটু হয়ত সেই সলিডারিটির রাস্তা খুলে দেয়।

বন্ধু, প্রিয়জন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং #মিটু

এই আন্দোলনের সব থেকে বড় সমালোচনার দিক হচ্ছে প্রকাশ্যে নাম নেওয়া। মানবাধিকার এর প্রশ্নে, প্রকাশ্যে হেনস্থা করবার প্রশ্নে, সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ভার্চুয়াল মব লিঞ্চিং এবং সম্মানহানির প্রশ্নে এই আন্দোলনকে ধিক্কার জানিয়েছেন অনেকে। চেনা, পরিচিত, প্রিয়জন অথবা বন্ধুস্থানীয় কারো নাম যৌন হেনস্থার সাথে যুক্ত হয়ে পড়লে নারীবাদীদের পাশে থাকা বন্ধুরাও পিছিয়ে এসেছেন অনেকে। অনেক ক্ষেত্রেই শোনা গেছে “ও এরকম করতে পারে না”, “ভেতরে আরও গল্প আছে”, “সবটা সবাই জানেনা” গোছের মন্তব্যও। অনেকেই মনে করছেন যে এই ধরণের ভার্চুয়াল যুদ্ধে শুধুই ক্ষতি। ন্যাচারাল জাস্টিসে যে নিষ্পত্তি পাবার সম্ভাবনা এখানে তা নেই। আছে শুধুই সম্মানহানি এবং অনৈতিকভাবে অপরকে কালিমালিপ্ত করার প্রবণতা।

কিন্তু আমরা যদি আরেকটু গভীরে ভাবি তাহলে হয়ত বুঝতে পারব যে সকল মেয়েরা এই আন্দোলনের পথ ধরে নাম উল্লেখ করে তাদের আক্রমণকারীর পর্দা ফাঁস করছেন তাদের অনেকেই হয়ত চাইলেই পুলিশের সাহায্য নিতে পারতেন। কিন্তু ভারতবর্ষের মত একটা দেশে বাস করে আমাদের এটা বুঝতেও অসুবিধে হয় না যে পুলিশি সহায়তা নিতে গেলে (সেখানে পুলিশ সংবেদনশীল হলেও) পরিবার থেকেই প্রাথমিক বাধা আসতে থাকে। যৌন হেনস্থা, যৌন হয়রানি, যৌন হিংসা অথবা ধর্ষণের মত অপরাধের সঙ্গে যে পারিবারিক মান, সম্মান এবং অপমানবোধ জড়িয়ে থাকে তা অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগকারিণীকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে। আর অপরাধী যদি বন্ধুমহলের কেউ হন অথবা কর্মক্ষেত্রের/শিক্ষাক্ষেত্রের উচ্চপদস্থ কেউ তখন কাছের বন্ধুদের সাহায্য পাওয়াও মুশকিল। এহেন অবস্থায় নিজের ঘরের ‘সেফ স্পেসে’ বসে আঙ্গুলের ডগায় পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে চাওয়া হয়ত যৌক্তিক নয় কিন্তু মেলোড্রামাটিকালি সম্ভাব্য পন্থা।

পরিশেষে…

কিছু ভাবনা থাকে যা নিয়ে আলোচনা করলে নিজেকে সেই ভাবনাগুলো থেকে ক্রিটিকাল দূরত্বে রাখা সম্ভব আর কিছু ভাবনা থাকে যেখানে এই দূরত্ব বজায় রাখা রাজনৈতিক চ্যুতি। আমার কাছে নারীবাদী ভাবনার প্রথম দিকের শিক্ষাগুলোর মধ্যে যাপিত অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে নৈর্ব্যক্তিক না থাকার শিক্ষাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সে সূত্রেই হয়ত এই লেখার শেষে নিজের দুটি কথা বলতে চাই। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই আন্দোলনের একটা বড় প্রাপ্তি হল এর সমালোচনা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই সমালোচনার জন্য বন্ধুবিচ্ছেদ যেমন হচ্ছে তেমনি বাড়ছে নতুন বন্ধুও। #মিটু এর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন অনেক পুরুষও। বাকি যে কোন রকমের অপরাধ এবং তার শাস্তির প্রক্রিয়ার মতই #মিটু’র ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির অপব্যবহার অবশ্যম্ভাবী। তার মানে আবার এ-ও নয় যে কিছু মানুষের সম্মানহানির মূল্যে কোন বৃহত্তর কার্যসিদ্ধির কথা এখানে বলছি। যে কোন শাস্তির প্রক্রিয়াতেই অপমান, অন্যায় আরোপ এবং মানসিক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সুবিচার চাইলে শাস্তির প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আবার সমাজসংস্কারক কাজের দায়িত্ব শুধু ভিক্টিমের ওপরেও বর্তায় না। যেদিন যৌন হেনস্থা এবং ক্যাসুয়াল সেক্সিজম তার স্বাভাবিকত্ব হারাবে তখন হয়ত মানবতামূলক, আবেগস্পর্শী আবেদনগুলো রাখা সম্ভব হবে। তখন নাহয় শাস্তির পরিবর্তে সংস্কারের রাস্তা খুলে দেওয়া যাবে। কিন্তু আপাতত, এই নতুন আন্দোলনের সমস্ত সমালোচনার পরিসর খোলা রেখেও এর থেকে সমর্থন তুলে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে নারীবাদী হিসেবে আমরা যারাই এই মুভমেন্টের পক্ষে বা বিপক্ষে আছি, তারা একটি ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে পারি। অন্তত #মিটু পরবর্তী সময়ে ভিক্টিমের ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভকে নিঃশর্ত সমর্থন জানাবার যে দাবি নারীবাদের ছিল তা পাবলিক ডিসকোর্সে এখন উঠে এসেছে। নারীর অভিজ্ঞতা এবং যাপনকে বুদ্ধিজীবী পুরুষের বোধ এবং এবং ডিউ প্রসেসের মাধ্যমে বুঝে ফেলার যে প্রবণতা ছিল, সেটা বন্ধ না হলেও তার সমস্যাগুলো এখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবার অভ্যেস তৈরি হচ্ছে। সমালোচনায় যখন কথা উঠছে যে দলিত, অসংগঠিত শ্রমিক এবং আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মহিলাদের কথা #মিটু বলতে পারছে না তখন নারীবাদীর একাধিকত্বের প্রশ্নও উঠে আসছে বৈকি। আবার এই মুভমেন্টের হাত ধরে যেন নির্দোষকে কাঠগড়ায় দাড় করানো না হয় বলে আবেদন রাখা হয় তখন সেই সমালোচনা অবশ্যই ইতিবাচক।

ওয়েব টু পয়েন্ট জিরো যে ডাইনামিক ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্টের কথা বলে এবং তার ফলস্বরূপ যে সোশ্যাল মিডিয়া- তার অনেক সমস্যার মধ্যে একটি হল সমস্তরকম ঘটনার ক্ষেত্রে একইরকম এবং তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার দাবী। আর সেই দাবি থেকেই তৈরি হয় তক্ষুনি কিছু করে ফেলার তাগিদ। #মিটু-র পক্ষে বিপক্ষে যারাই ছিলেন বা আছেন তারা কেউই এই সমস্যাগুলোর বাইরে নয়। লিস্টে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তির নামই হোক অথবা নানা পাটেকর এর মত প্রভাবশালী অভিনেতা, শাস্তি সকলের হয়না এবং হয়নি। কিন্তু এটাও ভুললে চলবে না যে যারা নাম পাঠিয়েছিলেন তারাও জানতেন এটা আইনি প্রক্রিয়া নয়। আবার আমাদেরও মনে রাখতে হবে যে এতদিন যে ফিসফিসে গসিপে আমরা মগ্ন ছিলাম সেখানে ক্যাজুয়াল সেক্সিজম ঠাট্টার বস্তু ছিল। আমরা সবাই জানতাম সেটা বেঠিক কিন্তু বলতাম না। আগে শুনতাম আমরা নারীবাদীরা নাকি ভীষণ গম্ভীর, ঠাট্টা ইয়ার্কি বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু এখন আমারই বন্ধু মহলে শুনতে পাই যে আমার প্রশ্রয়েও যদি আমাকে কেউ জড়িয়ে ধরে তাতেও নাকি তার #মিটু ‘খেয়ে যাবার’ ভয় থাকবে। তা ভয় থাকা ভালো। এই লেখার যখন মাঝামাঝি পর্যায় পৌঁছেছি তখন আমার ফেসবুক টাইমলাইনে একটা ভিডিও ভেসে উঠল। স্বনামধন্য বাঙালি নাট্যকর্মী রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত নাটকের ওপর নেমে আসা পুঁজিবাদী আগ্রাসনকে মোকাবিলা করবার প্রেক্ষিতে যা বলছেন তার সারমর্ম হল ‘ধর্ষণ যখন অবশ্যম্ভাবি তখন সেটা উপভোগ করাই শ্রেয়’।

লেখক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে মাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড ভিডিওগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক। সিনেমা, রাজনীতি বিষয়ে নিয়মিত লেখালিখি করেন‌।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami