চলচ্চিত্র

মায়েস্ত্রো সেকশন: ‘হোটেল বাই দ্য রিভার’ – অরূপরতন সমাজদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ১

কোরিয়ান পরিচালক হং-স্যাংসুর নতুন ছবি ‘হোটেল বাই দ্য রিভার’ নামকরনের দিক থেকে খুবই আক্ষরিক। ছবির ঘটনাবলির অধিকাংশই ঘটে হান নদীর ধারে অবস্থিত একটি হোটেলে। হোটেলকে ঘিরে কাহিনী বা ন্যারেটিভে হোটেলের একটি চরিত্র হয়ে ওঠা, কোনটাই সিনেমায় নতুন নয়; উদাহরণ ছড়িয়ে আছে বিশ্বজুড়ে। বাঙালির একান্ত কাছের পিনাকী ভূষণ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে ‘চৌরঙ্গী’ (১৯৬৮) থেকে শুরু করে স্ট্যানলি কিউব্রিকের হরর ক্লাসিক স্টিফেন কিং-এর উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য শাইনিং’ (১৯৮০) অথবা হালের ওয়েস অ্যান্ডারসনের ছবি ‘দ্য গ্র্যান্ড বুদাপেস্ট হোটেল’ (২০১৪)। হং-এর ছবিতে হোটেলের ভূমিকা সে তুলনায় অনেকটাই অনুচ্চারিত। আপাতদৃষ্টিতে হয়তো ন্যারেটিভে হোটেলের সেরকম কোন ভূমিকা চোখে নাও পড়তে পারে। হোটেল এখানে কিঞ্চিৎ রূপকের মতো; অস্থায়ীর রূপক, আরামের রূপক।

ছবির প্লটের উপকরণ যৎসামান্য। ইয়ুং ওয়ান নামক মধ্যবয়স পার হয়ে আসা ও নিজের পরিবার থকে বহুকাল বিচ্ছিন্ন এক কবি কোন অজ্ঞাত কারণে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন উপরোক্ত হোটেলে। নিজের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা গোপন রেখেই তিনি তাঁর দুই ছেলের সাথে দেখা করতে চেয়ে এই হোটেলে ডেকে পাঠান। অন্যদিকে সাং-হি নামের এক যুবতী ওই হোটেলেরই আরেক ঘরে তার প্রেমিকের সাথে বিচ্ছেদ আর হাত পুড়ে যাওয়ার ক্ষত-র যন্ত্রণা থেকে আরোগ্যলাভের অপেক্ষায়। ন্যারেটিভের এই দুটি ভিন্ন সূত্রের সংযোগ এবং পার্থক্য আপন আপন ছন্দে এগোয়। বহির্দৃশ্যের ক্রমাগত তুষারপাত সব ধরণের আকার আকৃতি বা রঙের উপর সাদার প্রলেপ ফেলে দেয়। এই মানসিক অবসাদ এবং প্রাকৃতিক বিষণ্ণতা ধরা পড়ে মৃদু-লো কনট্রাস্ট সাদা কালো সিনেম্যাটোগ্রাফিতে। হোটেলের মধ্যে সহজাত যে ক্ষণস্থায়ীর ধারণা, তা যেন মনে করিয়ে দেয় জাপানী দর্শন তথা শিল্প ও সিনেমায় প্রচলিত যে ‘মোনো নো আওয়ারে’ বা অস্থায়িত্বের সচেতনতার অনুভূতি, যা সিনেমাপ্রেমী মানুষের কাছে সবথেকে পরিচিত ওজুর ছবির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসাবে।

এখানে উল্লেখ্য যে পরিচালক হং-এর হাতে এহেন ছবি নতুন নয়। আদতে, হং-স্যাংসু সেই চিত্রকর যিনি বারেবারে একই ছবি এঁকে চলেন। যৌবন পার করে আসা পুরুষ আর্টিস্টদের (লেখক, কবি, চিত্রপরিচালক) শিল্প, পৌরুষ ও সম্পর্কের বিবিধ সমস্যাকে গবেষকের মত হং রীতিমত নিরীক্ষণ করে চলেন ছবির পর ছবি জুড়ে। তাঁর ছবিজুড়ে থাকে প্রলম্বিত কথোপকথনের দৃশ্য; থাকেনা শট-কাউন্টার শটের মতো প্রচলিত ব্যাকরণ। ক্যামেরা দূর থেকে চরিত্রদের দেখে, তাদের কথা শোনে। কখনো প্রয়োজন হলে সামান্য প্যান করে চরিত্রকে স্বতন্ত্রভাবে ফ্রেমবন্দী করে অথবা বলতে হয় তাঁর বিখ্যাত জুমের ব্যবহারের কথা যাতে ইমেজের আয়তন ফ্রেমের মধ্যে বাড়ে বা কমে; ক্যামেরা চরিত্রের কাছে যায়না। ‘হোটেল বাই দ্য রিভার’ ভাষাগতভাবে ব্যাতিক্রম নয়। কিন্তু এই ছবির মৃত্যুচেতনা যেভাবে অস্তিত্বের সংকটের দিকে ইঙ্গিত দেয়, তাতে হং-এর ছবির পরিচিত মুহুর্তগুলোও কিছু আলাদা অর্থবহন করে। এক্ষেত্রে খুবই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে ইয়ুং ওয়ানের ফোনে ছেলের সাথে কথোপকথন এবং পরে লাউঞ্জে ওয়েট্রেসের সাথে বাক্যালাপ। উভয় ক্ষেত্রেই মূল তথ্য আদান প্রদানের পরে অনেকক্ষণ সময় অবধি কেমন যেন ঘূর্ণাবতের ফাঁদে পরে কথোপকথনের দৃশ্য চলতেই থাকে। দৃশ্য চলাকালীন হাসি পায়। শেষে মনে হয় কবি হয়তো মৃত্যুর থেকে কিছু অতিরিক্ত সময় চুরি করে নিচ্ছিলেন, কথা ও শব্দকে অবলম্বন করে। শব্দ শেষ হয়ে গেলে কবির মৃত্যু হবে।

এরকম ছোট ছোট মুহুর্তে কৌতুক আর বিষাদের সফল সহাবস্থানই সম্ভবত হং-এর ছবির ভাষা ও ফর্মের তুরুপের তাস। নিঃসন্দেহে এই ছবির আরেকটি বড় জায়গা হল যেভাবে ন্যারেটিভের দুটি সুত্র ধরে পরিচালক নারী ও পুরুষ হিসাবে দুটি মননের জগৎ রচনা করেছেন। ইয়ুং ওয়ান ও তাঁর ছেলেদের সাক্ষাতের পর তাদের কথোপকথনের অধিকাংশই জুড়ে থাকে ইয়ুং-এর অনুপস্থিত স্ত্রী আর তাদের পারস্পরিক বিদ্বেষ। সমান পরিমাপে সুরা ও আত্মকরুণাতে ডুবে থাকা কবি ক্যামেরার সামনে নিজের সাফাই গেয়ে যান। স্ত্রী অনুপস্থিত থাকলেও ক্যামেরা সামান্য প্যান করে পাশের টেবিলে সাং-হি ও তার বন্ধুকে ধরে; দুজনেই খাওয়াদাওয়ায় মগ্ন। সাং-হির হাতে তখনও পুড়ে যাওয়া ক্ষত। তিক্ত সম্পর্ক অবসানের বাহ্যিক চিহ্ন। কিন্তু সাং-হি ও তার বন্ধু একে অপরের হাত ধরে ভবিষ্যৎএর দিকে অগ্রসর হতে প্রস্তুত। অন্যদিকে, বা আক্ষরিক অর্থেই অন্য টেবিলে পিতা-পুত্রের ত্রয়ী নিজদের অতীতের কারাগারে চিরবন্দী। পরিচালক হিসাবে হং-স্যাংসুর পুরুষ শিল্পী স্বত্বা সম্বন্ধে আত্মসচেতনতা, এই ছবির ভাষা, ভাবনা ও ক্রাফট, সবদিক থেকেই লক্ষণীয়। শেষ দৃশ্যের মৃত্যু খানিক বিষাদের রং আনলেও, সেখানে ছিটেফোঁটাও গরিমা নেই।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র। পছন্দের তালিকায় মূলত সাদা-কালো যুগের সিনেমা এবং বিংশ শতাব্দীর মার্কিনী সাহিত্য। চার বছর ছবির সমালোচনা লেখার পেশায় যুক্ত থাকার পর, এখন ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক।
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami