চলচ্চিত্র

মায়েস্ত্রো সেকশন: ‘সিজন অফ দ্য ডেভিল’-অরূপরতন সমাজদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৪

ইতিহাস রাষ্ট্রের হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের কৃতিত্বের স্তুতিগান গাওয়া হয়। পাতার পর পাতা জুড়ে সেসব কীর্তির জয়জয়কারে মানুষের ঠাঁই মেলেনা। রাষ্ট্রের স্বৈরশাসনে পীড়িত মানুষের দুঃখ দুর্দশার কথা গান হয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার করে মুখে মুখে ফেরা সেসব গান থেক জন্ম নেয় লোককথা – ব্যক্তিগত স্মৃতি টক্কর দেয় মূলধারার ইতিহাসের ধারণাকে। লাভ ডিয়াজের নতুন ছবি ‘সিজন অফ দ্য ডেভিল’-এর মূল আখ্যান ফিলিপাইনসের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের অবলম্বনে, যখন ৭০-এর দশকে রাষ্ট্রপতি ফার্দিনান্দ মার্কোস দেশে জরুরী অবস্থা জারি করে একনায়কতন্ত্র স্থাপন করেন। সিভিলিয়ানদের মধ্যে বাছাই করা কিছু মানুষকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি হয় তার নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী, যে বাহিনী প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব করে এক ডিস্টোপিক আতংকের পরিবেশ তৈরি করে রাখে।

এই ইতিহাসকে সরাসরি বিষয়বস্তু না করে, পরিচালক এই ছবিতে রচনা করেন স্মৃতিনির্ভর এক লোকগান। শুরুতেই পর্দার নেপথ্যে এক নারীকন্ঠ ছবির উপক্রমণিকা উপস্থাপন করেন – দর্শকদের নিয়ে যান ‘চেয়ারম্যান নার্সিসো’-র স্বৈরাচারী শাসনকালে। ছবির ন্যারেটিভের মূল সুত্রে আছেন রাষ্ট্রশাসনবিরোধী কবি হুগো এবং তাঁর স্ত্রী লোরেনা, যিনি পেশায় চিকিৎসক। দাতব্য চিকিৎসালয়ে কাজ করার জন্য লোরেনা, গিন্টো নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে পাড়ি দেন। সেখানে এই তথাকথিত আধাসামরিক বাহিনীর অত্যাচারে অঞ্চলের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন এক দুঃস্বপ্নতে পরিণত হয়েছে। স্বরমাধুর্যবিহীন ও বাদ্যযন্ত্রের সহায়তা ছাড়াই কিছু গা-ছমছমে গানের সুত্রে বাঁধা হয়েছে ছবির অ্যাবসার্ড ন্যারেটিভ।

ইদানীংকালের আর্টহাউস সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় পরিচালক লাভ ডিয়াজ মূলত খ্যাতি অর্জন করেছেন লং টেক এবং মন্থর গতির সম্মিলিত একান্ত তাঁর নিজস্ব স্টাইলের জন্য। অসম্ভব দীর্ঘ সময়সীমার ছবির জন্য তিনি অনুরাগীদের কাছে সমাদৃত এবং নিন্দুকদের মধ্যে কুখ্যাত। ৩ ঘন্টা ৫৪ মিনিট ধরে চলা ‘সিজন অফ দ্য ডেভিল’ লাভ ডিয়াজের ছবির দৈর্ঘের মাপকাঠির নিরিখে কিঞ্চিৎ ছোটই বলা চলে, তবে ফর্মের দিক থেকে বিশেষ ব্যতিক্রমী নয়। আজকের বাজারি আধুনিকতায়, দৈনন্দিনতা বা সিনেমা, সবকিছুরই যে আরোপিত ক্ষিপ্র গতি, সেখানে ন্যারেটিভের এই বিলম্বিত লয়ের চলন যথেষ্ট উপভোগ্য। আরও বিশেষ করে চোখে পরে ছবির প্রায় প্রতিটা শট ওয়াইড অ্যাঙ্গেল ডীপ ফোকাসে তোলার সচেতন সিদ্ধান্ত। অধুনা ডিজিটাল নান্দনিকতায় শ্যালো ফোকাসের আধিক্যের মাঝে এই ধরণের ধ্রুপদী ইমেজ নতুন করে সিনেমার ভাষার উপর আস্থা ফিরিয়ে আনে। ডীপ ফোকাসে চরিত্র এবং তাঁর পরিবেশ, সবই স্পষ্টত দৃশ্যমান থাকে; চরিত্র এবং স্পেস, একই গুরুত্ব পায়। অর্থাৎ চরিত্ররা যে একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্থান ও কালে অবস্থিত, এই ধারণাটি একটি সিনেম্যাটিক ভাষা পায়। তদুপরি লাভ ডিয়াজের ক্যামেরা প্রায় গোটা ছবি জুড়েই স্থির, নিষ্পলক সাক্ষীর মতো। ক্যামেরার এই দূরত্ব বজায় রেখে দেখে যাওয়ার মধ্যে নিঃসন্দেহে বাস্তববাদের একটি বড় জায়গা আছে; সেই কারনেই হয়তো হঠাৎ করে আসা দুঃস্বপ্নের মতো কিছু দৃশ্যের ফ্রেমিং, সাউন্ড বা আলোর অতিরিক্ত নাটকীয়তা বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে।


তবে ছবিতে তারিফ করার মতো বেশ কিছু উপাদান সত্ত্বেও, কয়েকটি অপরিহার্য প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রথমত ছবির আখ্যানগত জায়গা থেকে, যেই নিরন্তর ভায়োলেন্সের ইতিহাসের গল্প বলা হচ্ছে, সেখান থেকে একটি ছবির ন্যারেটিভ রচনা করার মধ্যে বেশ কিছু সচেতন নান্দনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিহিত থাকে। ছবিটির ফর্মে যেখানে এতটা ঐতিহাসিক সত্যের দায়ের বোঝা, সেখানে স্থান, চরিত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে ফিকশনের আশ্রয় নেওয়াটা খানিক অসঙ্গত। এছাড়া ছবিটির হুগোর মৃত্যুকালে পরিসমাপ্তি, চরিত্রটিকে একটি অহতুক গুরুত্ব দেয় যা গোটা ছবিতে তাঁর কার্যকলাপে বিশেষ পরিষ্কার নয়; সেই তুলনায় অনেক পার্শ্বচরিত্র বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে। এবং এখান থেকেই প্রশ্ন থেকে যায় ছবিটির এই দীর্ঘ সময়সীমা নিয়ে। পরিচালকের নিজস্বতার দোহাই এবং তাঁর অনুরাগীদের ব্যাক্তিগত পছন্দের উর্দ্ধে, এই ছবিটি চার ঘন্টার মাথায় এসে ফর্মের দিক থেকে অথবা রাজনৈতিক ভাবনার দিক থেকে দর্শককে অতিরিক্ত কিছু দেয়না যেটা এর থেকে কম সময়সীমাতে সম্ভব।

পরিশেষে, যদি নিতান্তই ভুল না হয়ে থাকে, ছবির প্রায় সবকটি শট যেখানে স্থির, সেখানে ক্যামেরার চলন চোখে পড়ে তিন কি চারবার। অর্থাৎ ক্যামেরা তার সামনের ঘটনার নিরীক্ষক থেকে অংশগ্রাহী হয়ে ওঠে। কিন্তু আগাগোড়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এই ছবিতে ক্যামেরা সচল হয়ে অংশগ্রহণ করে অত্যন্ত দুর্বল কিছু রাজনৈতিক টোকেনিজমের মুহুর্তে যেখানে কেন্দ্রে পুরুষ চরিত্র, যেমন হুগোর ভাষ্যপাঠের দৃশ্যে বা রাষ্ট্রনায়কের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্যে। কিন্তু সত্যিকারের রুখে দাঁড়ানোর মুহুর্ত, যেমন স্বামী-সন্তান হারা ‘পাগলী’ কোয়াগো যখন নিরস্ত্র অবস্থাতেও সৈন্যদের বন্দুকের সামনে অবলীলাক্রমে মানুষের সম্মান ও অধিকারের কথা বলে, ক্যামেরা তার নান্দনিক শৈলী মাথায় রেখে আবার সেই স্থির নিরাপদ দুরত্বে সরে যায়। লিঙ্গ রাজনীতি ও সিনেম্যাটিক ফর্মের আদানপ্রদানে এই ধরণের দুর্বলতা বেশ দৃষ্টিকটু লাগে।

ছবি:ইন্টারনেট
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami