চলচ্চিত্র

মায়েস্ত্রো সেকশন: ‘দ্য ইমেজ বুক’-অরূপরতন সমাজদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৩

প্রায় দেড় ঘন্টা চলার পর ছবি যখন শেষের দিকে, ৮৭ বছরের পরিচালকের চুরুটে পোড়া খসখসে কণ্ঠস্বরে শোনা যায় তাঁর যৌবনকালের ইউটোপিয়ার কথা, যে ধারণার ছায়ায় তাঁদের বেড়ে ওঠা; শোনা যায় সেই ইউটোপিয়াকে লালন করার আবেদন কারণ তার মধ্যে বিপ্লব ও পরিবর্তনের রাস্তার ইঙ্গিত আছে। জঁ লুক গোদারের ‘দ্য ইমেজ বুক’, যা আদতে প্রায় এক স্কিৎজোফ্রেনিক অভিজ্ঞতার সামিল, এভাবেই একান্ত নিজস্ব ও চেনা একটি আগামীর স্বপ্নে তার যতিচিহ্ন দেয়। একটু একরৈখিক শোনালেও, জঁ লুক গোদারের কাজের দিকে চোখ দিলেই, বিশেষ করে ফরাসী নবতরঙ্গের পরবর্তী পর্বে, বোঝা যায় যে তাঁর ছবি যতটাই নাশকতামূলক, ততটাই আন্তরিক। আর সিনেমা মাধ্যমের প্রেমে তিনি ফানা হয়ে আছেন; দৃশ্য-শব্দ-ক্যামেরা-আলো-রং আজও তাঁকে ততটাই উত্তেজিত করে তোলে যতটা হয়তো কৈশোরে করত।

দীর্ঘদিন ধরেই গোদার সিনেমাপ্রেমীদের কাছে পরিচিত বা কুখ্যাত তাঁর দর্শককে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করার জন্য এবং এই চ্যালেঞ্জ অবধারিতভাবে ছড়িয়ে থাকে ছবির শরীর জুড়ে, ছবির বিষয়বস্তুর অন্তর্গত হয়ে নয়। ফর্মকেই কন্টেন্ট করে তোলার যে পরিচিত ধারণাটি আছে, তা বোধহয় গোদারের মতো আর কারোর বেলায় খাটেনা। ‘দ্য ইমেজ বুক’ গোটাটাই জুড়ে আছে তাঁর ইমেজ সংক্রান্ত চর্চা ও ভাবনা এবং তাঁর ঐতিহাসিক আর দার্শনিক অভিঘাত। গোদারের ইদানীংকালের কাজের মতোই এই ছবিরও বিশ্লেষণ বা সমালোচনা অসম্ভব কারণ ছবির ভাষাকে ঠেলতে ঠেলতে তিনি এমন এক অ্যাবস্ট্রাকশনের দিকে নিয়ে গেছেন, যে সেখান থেকে স্রেফ কিছু চিন্তা আর অনুভূতি উদ্রেক হওয়া সম্ভব, কোন পরিষ্কার ব্যাখা নয়। এধরণের ছবির পোষাকি নাম Film/Video Essay হলেও, গোদারের ছবি এখন প্রবন্ধর বিশ্লেষণমূলক ফর্ম থেকে বেরিয়ে পুরোপুরি কবিতায় রূপান্তরিত।

‘দ্য ইমেজ বুক’ ছবিটিকে এক কথায় বর্ণনা করতে হলে, বলা যায় ইমেজের মহাফেজখানা ঘেঁটে বিগত এক শতাব্দীর ইমেজের ইতিহাসকে ফিরে দেখা – স্থির চিত্র, চলচ্চিত্র, ফিকশন, খবরের ফুটেজ, আসল ইমেজ, নকল ইমেজ, সবকিছু। এই গোটা কর্মকান্ডে গোদার খানিক নিজের ভূমিকাও যেন স্পষ্ট করে দিচ্ছেন; চিত্র পরিচালক থেকে চলচ্চিত্র প্রবন্ধকার, ইতিহাসবিদ হয়ে আজ তিনি ইমেজের ভান্ডারের জিমেদার। নতুন ইমেজ তৈরির ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করেনা। বিগত ইমেজের দিকে অপলক দৃষ্টি ফেলে গোদার তাঁর নিজস্ব সত্যান্বেষণে লিপ্ত। এই ইমেজ ভান্ডার থেকে তুলে আনা দৃশ্যাবলীর অনেকটাই জুড়ে আছে সিনেমা – বুনুয়েল, রেনোয়াঁ, রোসেলিনি, হিচকক, ভিগো, ফোর্ড, মিজোগুচি, এরকম আরও অজস্র নাম। বেদনা, বিরহ, হিংসা, যুদ্ধ, ইত্যাদির এইসব ‘কল্পিত’ দৃশ্যের পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যম, ডকুমেন্টারি বা ইউটিউব কিছু ‘সত্যি’ দৃশ্য গোদার বুনে চলেছেন। যেন আইজেনস্টাইন, কুলেশভদের দেখানো পথে, এই দু’রকম দৃশ্যের তুলনা ও তাদের বৈসাদৃশ্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করাই ছবির উদ্দেশ্য। কিন্তু তিনি শুধু এখানেই থেমে নেই; এই ছবি প্রশ্ন করে গত এক শতাব্দীর সভ্যতার ইতিহাসে ইমেজের ভূমিকা নিয়ে। সেখানে ইমেজের প্রযুক্তিগত ও নান্দনিক গৌরবের উপর রক্তের দাগ এসে লাগে আউশভিৎসের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প বা হিরোশিমার পরমাণু বিস্ফোরণ অথবা আইসিসের জঙ্গিশিবিরে নিরস্ত্র মানুষের শিরচ্ছেদের ঘটনা থেকে। পৃথিবী এইসব ইতিহাসের সাক্ষী ইমেজের মাধ্যমে। ইমেজ এই সকল পাপের অংশীদার।

এই ছবির একটি বড় অংশ জুড়ে আছে আরব দুনিয়া বা সদর্থে পরিচিত সাংস্কৃতিক পরিসরে আরব দুনিয়ার প্রতিরূপায়ণ। জোসেফ কনরাডের Under Western Eyes উপন্যাস থেকে শিরোনাম ধার করা এই পরিচ্ছেদে আরবদের বাস্তব এবং সেই বাস্তবের ইমেজে প্রতিরূপায়ণ নিয়ে গোদার দীর্ঘ সন্দর্ভ রচনা করেন; অর্থাৎ ইমেজের প্রযুক্তির পিছনে যে পশ্চিমী দুনিয়ার পুঁজির ভূমিকা, গোদার সরাসরি আঙুল তুলছেন সেই আর্থ-সামাজিক শোষণমূলক ব্যবস্থার দিকে। ছবির প্রথম শটেই ফ্রেম জুড়ে ছিল সেই তর্জনী এবং দর্শকও সেখানে হয়তো সমানভাবে অভিযুক্ত। বলতে গেলে এই ছবির শরীর প্রায় ছিন্নভিন্ন; দৃশ্য, শব্দ, সংলাপ, ভাষ্যপাঠ, সাবটাইটেল সবকিছুকে একে অপরের থেকে আলাদা করে সিনেমার আড়ালের এই নির্মাণের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে গেছেন। আর আসক্তের মতো আবারও ফিরে গেছেন ‘জনি গীটার’ (নিকোলাস রে, ১৯৫৪) ছবির সেই সংলাপে, যেখানে জনি সত্যিকে উপেক্ষা করে সবকিছু জেনেও তার প্রেমিকার থেকে সুন্দর মিথ্যেগুলোই আবার শুনতে চায়। গোদারের এই ইতিহাসদর্শনে ইমেজ কলঙ্কিত। এবং পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সেই কলঙ্কের ভাগ ইমেজের উৎপাদক থেকে ইমেজের ভোক্তা, সকলের। শিল্প যখন বাজার নিয়ন্ত্রিত পণ্য, তখন ইমেজ দেখা, অনুভব করা বা উপলব্ধি করা হয়না, স্রেফ ভোগ করা হয়।

ছবি:ইন্টারনেট
Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami