চলচ্চিত্র

মায়েস্ত্রো সেকশন: ‘থ্রি ফেসেস’-অরূপরতন সমাজদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৭

২০১০ সালের পর থেকে ইরানের গৃহবন্দী চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহী নিজের বন্দীদশা এবং তাঁর উপর বিভিন্ন আইনি বিধিনিষেধকেই তাঁর ছবির বিষয়বস্তুতে পরিণত করেন। এবং তাঁর গতিবিধির সীমাবদ্ধতার কারণে, সেইসব ছবির একটি একান্ত নিজস্ব শৈলীও তৈরি হয়। জাফর পানাহীর এই বছরের ছবি ‘থ্রি ফেসেস’, তাঁর গৃহবন্দী পরবর্তী পর্বের চতুর্থ ছবি।

পানাহীর ছবিতে তাঁর গুরু এবং ইরানী ছবির কিংবদন্তী আব্বাস কিয়ারোস্তামীর পদাঙ্ক অনুসরণেই, গল্পের উপাদান থাকে যৎসামান্যই। ছবির রসাস্বাদনের জায়গা প্লটের থেকে অনেক বেশী অভিজ্ঞতার; মানুষের সাথে, প্রকৃতির সাথে কিছুকাল সময় কাটানোর। ‘থ্রী ফেসেস’ ছবিটি শুরুতেই অবশ্য বেশ জোরালো এক ধাক্কা দেয়। মোবাইল ফোনের সেলফি মোডে তোলা একটি ভিডিওতে দেখা যায় মার্জিয়ে নামের এক যুবতী তার অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে যাওয়ায় এবং ইরানের প্রখ্যাত অভিনেত্রী বেহনাজ জাফরীর কাছে বারংবার আবেদন করেও কোন সাড়া না পেয়ে, আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তার বক্তব্যের শেষে ফোনের ক্যামেরায় গাছের ডালে ফাঁস লাগানো দড়িটি দেখা যায় এবং অচিরেই একটি অসামাল ঝাঁকুনির পরে, ফোনটি ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়। পরের দৃশ্যেই দেখা যায় অন্ধকার রাস্তা দিয়ে চলা একটি গাড়ির ভিতর বেহনাজ জাফরী এবং কথোপকথনে বোঝা যায় চালকের আসনে আছেন পানাহী; তাঁদের গন্তব্য মার্জিয়ের গ্রাম।

যথেষ্ট প্লটধর্মী শোনালেও, বাকি ছবিটি যতটা না এই ঘটনার অনুসন্ধান ও পরিসমাপ্তি নিয়ে, সেই তুলনায় অনেক বেশি এক ধরণের সাক্ষাৎ ও তার অভিজ্ঞতা নিয়ে। ছবিটি আগাগোড়াই তেহরান শহর এবং আইনি রক্তচক্ষু থেকে অনেক দূরে হওয়ায়, পরিচালকের তথা ছবির শরীরেও একধরণের মুক্তির স্বাদ লক্ষ্য করা যায়। তবে ছবির গুণগত মানে সেই মুক্তির অবদান কতখানি, সে নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। অর্থাৎ বিবিধ সীমাবদ্ধতার দরুণ এতদিনে পানাহীর যে একটি নির্দিষ্ট শৈলী তৈরি হয়েছিল, শহর থেকে দূরে পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপে, সেই শৈলীও যেমন খানিক বেমানান হয়ে পড়ে, আবার এই ছবিতে কোন নতুন শৈলীর ইঙ্গিতও পাওয়া যায়না। সমস্যাটি সবথেকে প্রকটভাবে ধরা পড়ে ক্যামেরার অবস্থান এবং চলনে। পানাহী এতদিন নিজের গতিবিধির উপর নিষেধাজ্ঞাকে ছবির ডিজাইনে বুনে দিতে সফল ছিলেন। অর্থাৎ ক্যামেরারও বিশেষ নড়াচড়ার অনুমতি ছিলনা। ফলে, ইমেজ এবং আখ্যানের মধ্যে একধরণের পরিমিতি থাকত। এই ছবিতে আচমকা প্রকৃতির সাক্ষাৎ পেয়ে, সেই পরিমিতিবোধ যেন খানিক খেই হারিয়ে ফেলেছে। গাড়ির ভিতর চেনা কথোপকথনের দৃশ্যে হঠাৎ হঠাৎ শট-কাউন্টার শট, অথবা দীর্ঘ সময়ের দৃশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে যেখানে পানাহী অনুপস্থিত। অর্থাৎ ক্যামেরার মধ্যে আচমকাই একটি সদাবিদ্যমান থাকার ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে। হতেই পারে, পরিচালক অ্যাপারেটাস থেকে একটি দুরত্ব চান, কিন্তু সেক্ষেত্রে গ্রামের বাসিন্দা প্রাক্তন চিত্রনায়িকা শেহেরজাদের বাড়ির ভিতর ক্যামেরার না যাওয়া, বিশেষ প্রভাব ফেলেনা; অনেকটাই মনে হয় ‘টেস্ট অফ চেরি’ মাথায় রেখে কিয়ারস্তামির সাথে ছায়াযুদ্ধ।

কিন্তু একইসাথে এটাও বলতে হয় যে ছবিটি দেখার অভিজ্ঞতা আদপেই খারাপ নয় এবং ছবিটিও সেই অর্থে তিরষ্কারযোগ্য নয়। ছবিতে একের পর এক দেখা মেলে মজার কিছু চরিত্রের; জনৈক প্রৌঢ় যাকে পথনির্দেশ জিজ্ঞাসা করলে তিনি উলটে পাহাড়ি রাস্তা গাড়ির হর্ন বাজানোর সংকেত বুঝিয়ে দেন অথবা গ্রামের সেই বৃদ্ধ যিনি ছোট ছেলের সুন্নৎ-এর পর সেই পরিত্যক্ত চামড়া সযত্নে রেখে দিয়েছেন এবং তাঁর ইচ্ছে কোনভাবে সে চামড়া যদি বিপ্লবের আগের যুগের এক পুরুষালি স্টারের বাড়ির কাছে পুঁতে দেওয়া যায় যাতে তাঁর ছেলের মধ্যেও সেরকম পৌরুষ দেখা যায়! অর্থাৎ আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে কিয়ারোস্তামি, মখমলবাফ বা পানাহীর মত যেসব পরিচালকের কাল্ট এবং তার মাধ্যমে ইরানের সিনেমার যে পরিচিতি তৈরি হয়েছে, এইসব প্রান্তিক মানুষদের কাছে সিনেমা তথা দেশের ইতিহাসের ধারণাই সম্পূর্ণ আলাদা। ছবির শিরোনামের তিন মুখের মধ্যে বিগত যুগের নায়িকা শেহেরজাদকে ছবিতে কখনোই সামনাসামনি দেখা যায়না। তিনি তিন দশকের বেশী সময় ধরে জমানো অভিমান নিয়ে সিনেমা ও পরিচালক নামক গোষ্ঠীর থেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে সিনেমা ও দেশের ইতিহাস আরও অন্যরকম। তার কিছু ইঙ্গিত মার্জিয়ের অভিনয় করার ইচ্ছের বিরুদ্ধে পরিবার ও গ্রামের পক্ষপাত থেকে আন্দাজ করা যায়। একইধরণের গোঁড়া রক্ষণশীল মতাদর্শের ছায়া এইসব মানুষের মধ্যে দখেই হয়তো পানাহী নিজেকে সচেতনভাবেই দুরে রাখার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্ত তার জন্য যেই নতুন নির্মানশৈলীর প্রয়োজন, সেটি ‘থ্রি ফেসেস’ ছবিতে পুরোদস্তুর তৈরি নয়।

ছবি -ইন্টারনেট

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami