চলচ্চিত্র

মাস্টার ক্লাস : ফিলিপ নয়েস : শিশুসুলভ উন্মত্ততা ও বাণিজ্যিক হলিউডের এক আশ্চর্য মিশ্রণ – মেঘদূত রুদ্র

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৬

কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল চলাকালীন প্রতিবছরই যেকোন একটা দিন নন্দন ৩ এ একটা মাস্টার ক্লাস হয়। যে ক্লাসে সেবছর যে পরিচালকের রেট্রোস্পেক্টিভ হচ্ছে তিনি ২-৩ ঘণ্টার একটা ক্লাস নেন। অনেক বিখ্যাত পরিচালক এই ক্লাস নিয়েছেন। যার মধ্যে চাই মিং লিয়াং ও পেন এক রাতানারুয়াং-এর ক্লাস আমি করেছি। স্বভাবতই এই ক্লাসে খুব বেশি লোক হয়না। ছবি দেখা ছেড়ে কে আর ক্লাস করতে আসবে। আর আমাদের অধিকাংশ পরিচালকরা ফিল্ম মেকিং ব্যপারটা এত ভাল করে জানেন যে এদের ক্লাস করার প্রয়োজন তারা অনুভব করেন না। যাই হোক এবছর ক্লাস নিলেন অস্ট্রেলিয়ায় জন্মানো বিখ্যাত হলিউড পরিচালক ফিলিপ নয়েস। এত বড় একজন হিট পরিচালক এর আগে কখনো ফেস্টিভ্যালে ক্লাস নিয়েছে কিনা মনে করতে পারছিলাম না। নিজেদের সময়ের হলিউডের টপ টপ অভিনেতা যেমন হ্যারিসন ফোর্ড, ডেঞ্জিল ওয়াশিংটন, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, মেল গিবসন, নিকোল কিডম্যান ইত্যাদিদের নিয়ে যিনি কাজ করেছেন তিনি কলকাতায় এসে কিছু বাঙালিদের (ক্লাসে অবাঙালি কেউ ছিলনা, দুজন অস্ট্রেলিয়ান ছিলেন- যার মধ্যে একজনের নাম গার্থ ডেভিস যিনি ২০১৬ ‘লায়ন’ বলে একটা ছবি বানিয়েছিলেন যা ৬ টা বিভাগে অস্কার নমিনেশন পেয়েছিল) ক্লাস নেবেন এটা ভাবতেই কেমন লাগছিল। এর আগে যারা ক্লাস নিয়েছে তাদের কারুর ছবি আমি ছোটবেলায় দেখিনি। চলচ্চিত্র বিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করতে ঢোকার পর দেখেছি। কিন্তু ফিলিপের ছবি ‘দ্য বোন কালেক্টর’ আমি ছোটবেলায় দেখেছিলাম। ভাল কি খারাপ না ভেবেই দেখেছিলাম। ফলে তার ক্লাস করবো এটা ভেবে একটা আলাদা অনুভূতি হচ্ছিল।

ক্লাসে ঢুকেই ফিলিপ আশ্চর্য কাজ করলেন। অতিথিদের বসার জন্য যে সব চেয়ার টেবিল পাতা ছিল সেগুলো সব সরিয়ে দিতে বললেন। সবাই তাতে হাত লাগালো। তিনি নিজেও হাত লাগালেন। বললেন এত সুন্দর ভাবে আরাম করে বসে ফিল্ম শেখা যায়না। সবাইকে চেয়ার ছেড়ে উঠে ওই ফাঁকা জায়গায় এসে গোল হয়ে দাঁড়াতে বললেন। মজার ব্যপার তার মধ্যে ফেস্টিভ্যালের ডিরেক্টর মহুয়া ব্যানার্জী ও ফেস্টিভ্যালের কনভেইনার ঋতব্রত ভট্টাচার্যও ছিলেন। তারাও বাধ্য ছাত্রের মত গোল হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর ফিলিপ সবাইকে একে অপরের হাত ধরে গোল হয়ে ঘুরতে বললেন। তারপর বললেন একজন আরেক জনকে ধরো। ডান দিকের জন চোখ বন্ধ কর আর বাম দিকের জন চোখ খুলে রাখ। আর যে চোখ খুলে আছো সে অন্যজনকে ঘুরিয়ে নিয়ে এস। ফিলিপ চললেন সবার আগে। আর পেছনে পেছনে অনেকেই অন্যজনকে নিয়ে ঘোরাতে চললেন। নন্দন তিন ঘুরে নিচে নন্দন এক-এর সামনে দিয়ে ঘুরে লিফটে করে আবার উপরে উঠে নন্দন তিন অবধি চলল সেই জার্নি। আমি চোখ খোলার দলে ছিলাম। ফলে দেখতে পেলাম নন্দনের অফিশিয়াল স্টাফ আর কর্তা ব্যক্তিরা ব্যপার স্যাপার দেখে ঘাবড়ে ঘ হয়ে গেছে। কী করবে বুঝতে পারছেনা। কারণ ফেস্টিভ্যাল ডিরেক্টরও হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ান পরিচালক গার্থ ডেভিসকে। এরকম বিচিত্র ঘটনা তারা আগে দেখেছে বলে মনে হলোনা। যাই হোক এসব শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন যে এটাই সিনেমা। প্রথমে একতা (গোল হয়ে একসাথে দাঁড়ানো)। কারণ ছবি বানানো একটা যৌথ শিল্প। তারপর আসে বিশ্বাস (চোখ বন্ধ করে অন্যকে ভরসা করা)। অর্থাৎ ছবি তৈরির সময় গোটা দলে এমন অনেক লোক থাকে যারা একে অপরকে চেনেনা কিন্তু একে অপরের প্রতি বিশ্বাস রেখে চলতে হয়। নইলে ভাল ছবি হয়না। আর বললেন যে শুটিং-এর সময় এই একই এক্সারসাইজ অ্যাঞ্জেলিনা জোলি সহ সবাইকেই করতে হত। বিউটিফুল। প্রথম দর্শনেই ফিলিপের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

এরপর তিনি দেড় ঘণ্টার একটা লেকচার দিলেন। তার ছবির কিছু অংশ দেখালেন। ছবির মিউজিক শোনালেন। আর দেখালেন তার সবথেকে ক্রিটিক্যালি এক্লেইমড ছবি ‘র‍্যাবিট-প্রুফ ফেন্স’-এর মেকিং ভিডিও। মেকিং ঠিক নয়, সেটা ছিল সেই ছবির জন্য তিনজন অস্ট্রেলিয়ান নন অ্যাক্টর বাচ্চা মেয়ের সিলেকশনের কিছু দৃশ্য। শয়ে শয়ে মেয়ের থেকে কীভাবে ফাইলানি তিন জন সিলেক্ট হল। তারপর তাদের গ্রুমিং, ট্রেনিং ইত্যাদি। ব্যপারগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং কিন্তু এক্সপেন্সিভ। হলিউড পারে এবং বর্তমানে বলিউডও পারে। আমাদের পোড়া বাংলা ছবি এসব অ্যাফোর্ড করতে পারেনা। ফলে ছবি করার জন্য আমাদের অন্যভাবে ভাবতে হয়। অনেকে হলিউড স্টাইলে ভাবেন এবং ব্যর্থ হন। একমাত্র মানস মুকুল পাল তার সহজ পাঠের গপ্পো ছবির জন্য অনেকটা এইভাবেই বাচ্চা ছেলে দুটোকে তৈরি করেছিল এবং সফল হয়েছিল।

ফিলিপ বললেন ছবির সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল ইমোশন। একদম ঠিক। কিন্তু তারপরে বললেন যে ছবির মিউজিক দিয়ে সবথেকে ভাল ইমোশন তৈরি করা যায়। কারণ ইমেজ সোজা ব্রেনে যায় কিন্তু মিউজিক গোটা শরীরের নার্ভাস সিস্টেমে ছড়িয়ে পরে গোটা শরীরে এফেক্ট তৈরি করে। অনেক এটা মানলেন না। অনেকের মতে ছবিতে দৃশ্যই আসল। শব্দ কাজ হল দৃশ্যকে সাপোর্ট করে যাওয়া। আমার মতে দুটোরই গুরুত্ব সমান। উনি ব্যবসায়ী যুক্তিতে ভাবেন তাই ওনার কাছে মিউজিক আসল। কারণ এতে করে ওনার মতে ছবির ব্যবসা ভাল হয়। উনি দুটো উদাহরণ দিলেন। ওনার প্রথম ছবি ‘ব্যাকরোডস’ বানানোর পর ওনার মনে হয়েছিল এটা একটা ডিজাস্টার হয়েছে। ছবিটা ভাল চলছিলও না। তারপর উনি একটা কাজ করলেন। মিউজিক স্টোর থেকে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন মিউজিক সংগ্রহ করে সেগুলো নতুন ভাবে ছবির আবহ সংগীত হিসেবে ব্যবহার করলেন। এবং তারপরই ছবির ব্যবসা বেড়ে গেল এবং ছবিটা বক্স অফিস হিট হল। পরের উদাহরণটা আরও ইন্টারেস্টিং। ‘কোয়াইট অ্যামেরিকান’ ছবির উনি একটা ট্রেলার বানিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে কানের ফিল্ম মার্কেটে গেছিলেন ছবিটা বেচতে। কিন্তু কেউ কেনেনি। তারপর উনি সেই একই ট্রেলারে নতুন করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিলেন। এবং তারপরেই সেটা দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়ে গেল। এবার এই যুক্তি অস্বীকার করা যায়না। ওনার কাছে মিউজিক মানে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। কারণ হলিউডের ছবিতে সচরাচর গান থাকেনা। মিউজিক্যাল গোত্রের ছবি হলে থাকে। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ ছবিতেই গান থাকে। ছবি হিট হবে এই আশাতেই থাকে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা হয়েও যায়। ‘গান হিট মানে ছবি হিট’ এই ধারনাটা বরাবরই কাজ করে এসেছে। বাংলা ছবিতে আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্ম এরকম বিভেদ আছে। কিন্তু বলিউডে এরকম বিভেদের যায়গাটা প্রায় মুছে গেছে। আমার মতে সব ছবিই কমার্শিয়াল ছবি। টার্গেট অডিয়েন্স হয়ত আলাদা। কিন্তু সিনেমা ইন্ড্রাস্টিকে বাঁচাতে গেলে ছবিকে ব্যবসাযোগ্য করতেই হবে। ছবি বানানোটা ফালতু আঁতলামি বা আপন খেয়াল খুশি চরিতার্থ করার জায়গা নয়। তুমি অন্য একজনের অনেকটা টাকা নিয়ে ছবিটা বানাচ্ছো। তাকে সেটা ফেরত দেওয়াটা পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যে পরে। অনন্ত চেষ্টা করাটা। তার মানে আবার এই নয় যে দর্শকের কথা মাথায় রাখতে গিয়ে ছবির গুণমানকে বিসর্জন দিতে হবে। যেটা বাংলার হিট ডিরেক্টর ডুয়ো শিবু-নন্দিতা জুটি করে থাকেন। ছবির নামে মেগা সিরিয়ালের একটা এক্সটেন্ডেড ভার্সন বানান। এটা একটা জটিল পরিমিতি বোধের ব্যপার। যার কিছুটা ফিলিপের থেকে শেখা গেল। আর দেখা গেল ৬৮ বছর বয়েসেও ছবির প্রতি কি মারাত্বক তার প্যাশন। তার ছবি ভাল-খারাপ লাগতে পারে। সেটা আলাদা কথা। কিন্তু তার মডেলকে অস্বীকার করা যায়না। এছাড়াও ছবি তৈরির বিভিন্ন ছোটোখাটো টিপস উনি দিলেন। সেগুলো খুবই কাজের ছিল। সব বলব না। কারণ সবকিছু অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শেখা যায়না।

সবশেষে তিনি হ্যারিসন ফোর্ডের একটা ঘটনার কথা বললেন। ফোর্ডকে নিয়ে উনি যখন ‘প্যাট্রিয়ট গেমস’ ছবিটা বানাচ্ছেন তখন ফোর্ড হঠাৎ একদিন তাকে বলেন যে ‘শোনো ফিলিপ, তোমাকে ছাড়াও এই ছবিটা আমি আরামসে বানিয়ে ফেলবো। কিন্তু আমাকে ছাড়া ছবিটা তুমি বানাতে পারবেনা’। ফিলিপ বললেন আমি সেটা মেনে নিলাম। কারণ কথাটা সত্যি। ছবি বানাতে গেলে কিছু কিছু জিনিস মেনে নিতে হয়। কারণ ছবি বিপ্লব তখনই হয়ে উঠবে যখন সেটা ঠিকঠাক ভাবে বানানো হবে। বানাতে গিয়ে সবক্ষেত্রে বিপ্লব করলে আর যাই হোক ছবিটা বানানো হবেনা।

ছবি- সন্দীপ দত্ত

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami