Uncategorizedজীবনযাপন

ভীরে’র বিয়ে, স্বরা ভাস্কর, এবং………

মণিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

এদেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বিপদসীমা অতিক্রম করেছে বহুদিন আগেই। এভাবেই চলতে থাকলে (থাকবেনা, এমনটা নেহাতই দুরাশা) আমরা আর কয়েক বছরেই জনসংখ্যার নিরিখে চীন-কে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করবো। যদিও, জনসংখ্যা কেন বা কীভাবে বাড়ে তা আমরা সকলেই জানি কিন্তু তবুও ব্যাপারটা জনসমক্ষে মেনে নিতে আমাদের বড় কষ্ট। তাই সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ময়ূরের চোখের জল বা সমগোত্রীয় কিছুকে গর্ভধারণের কারণ হিসেবে প্রকাশ্যে বলে বেড়াতে একটু-ও দ্বিধাবোধ করেন না। এই সমাজে যৌন-হয়রানি হয়, যৌন-দাসত্ব হয় কিন্তু স্বাভাবিক যৌনতা, যা পুরুষ-নারীর মধ্যে থাকা উচিত, তা হয়না! হয়ত “হয়না” বলা একটু ভুল হল; হয় কিন্তু তা প্রায় অপরাধের সামিল,  চার দেওয়ালের মধ্যেই তা যেন সীমাবদ্ধ থাকে। বাইরে এই নিয়ে মুখটি বুঁজে থাকতে হবে। পুরুষরা এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে চটুল রসিকতা করতে পারেন, সহকর্মী কোন মহিলাকে চাট্টি রসের কথা কইতে পারেন কিন্তু মহিলাদের মধ্যে যৌন চেতনা বা যৌনতা বিষয়ক আলোচনা? আরে ছি ছি, সে বড় লজ্জার কথা! ভারতীয় সমাজে মহিলাদের যৌন চেতনাকে আজকের পৃথিবীতেও মেনে নেওয়া হয়নি।শুনতে আপাতভাবে অদ্ভুত লাগতে পারে, মনে হতে পারে, এখন তো দিব্যি মেয়েরা শর্ট স্কার্ট, হট প্যান্ট ইত্যাদি পরে ঘুরে বেড়ান, মদ-সিগারেট খান, সমান তালে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজকর্ম করেন, একাধিক পুরুষসঙ্গী থাকে অনেকের, তাহলে?

এই “তাহলে”-তেই গণ্ডগোল!

এই যে আমরা মেয়েরা এখন নিজেদের “স্বাধীন” বলে মনে করি অনেক ক্ষেত্রে, এই স্বাধীনতা’র গণ্ডী কিন্তু ঠিক করে দিয়েছে এই পুরুষশাসিত সমাজ। নারী কেমন পোষাক পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কীভাবে হাঁটবে– সবকিছু-ই পূর্ব নির্ধারিত। হট প্যান্ট-ও তার বাইরে নয়।  যুগ যুগ ধরে মেয়েরা এইসব বাধানিষেধ মানতে মানতে, কখন যেন ভুলেই গেছে এই বেড়াজালে’র বাইরে তার নিজস্ব অস্তিত্বের কথা। সমাজ তাকে যা পাখি-পড়া করে শিখিয়েছে, তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়ে জিন-এর চরিত্র-ই বোধহয় বদলে দিয়েছে। এই নির্ধারির লক্ষ্মণরেখা’র বাইরে গেলে কী হয়, সাম্প্রতিক একটি ফিল্ম-এ দেখানো একটি দৃশ্য-ই তার প্রমাণ।

“ভীর দি ওয়েডিং” রিলিজ হওয়া’র আগে থেকেই স্বরা ভাস্কর-কে নিয়ে ট্রোলিং শুরু হয়েছিল বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়;  তারপর ফিল্ম বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্সে চলাকালীন ট্যুইটার, ফেসবুক এবং অন্যান্য জায়গায়, ভদ্র, সভ্য ভারতীয় সমাজ স্বরা’র চরিত্র, অভিনয় তথা ব্যক্তিগত জীবনের ১০৮ করেছে।

কারণ? প্রথমতঃ, স্বরা আগে-ও এই ধরণের “সাহসী” চরিত্রে অভিনয় করেছেন “আনারকলি অভ আরা (Arrah)” ফিল্ম-এ। “সাহসী” চরিত্র বলতে ভারতীয় সমাজ বোঝে ন্যাকা-বোকা হিরোইন ব্যতীত এমন চরিত্র যা আপাতভাবে  নারীবিদ্বেষীদে’র মননে এবং পুরুষোচিত দম্ভে বেশ একটা ধাক্কা দেয়। মানে, সত্যি সত্যি মেয়েদের যেসব কিছু করতে ইচ্ছে করে বা তারা অনেকসময় করে-ও থাকে কিন্তু জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারেনা বিভিন্ন কারণে, সেইসব জিনিস পর্দা-তে যখন উন্মোচিত হয়, তখন  সমাজের ঠুন্‌কো রক্ষণশীলতা বেসিক্যালি ভয় পায়। নিজের মত করে বাঁচা, নিজের শর্তে বাঁচতে শেখা– মেয়েদের ক্ষেত্রে  এসব বাস্তবায়িত হয়ে গেলে কী ভয়ানক ব্যাপার হবে, তাই ভেবে।

 

দ্বিতীয়তঃ, যে দৃশ্যটি’র জন্য স্বরা এত সমালোচিত হচ্ছেন, তা সব দিক থেকেই, ধার্মিক, সামাজিক এবং পারিবারিক, মোটামুটি taboo বলা যায়। এমনকি, সাহিত্যে-ও হাতে গোণা কয়েকটি উদাহরণ বাদ দিলে, (তাও অত্যন্ত subtle) খুব  বেশি জায়গায় ফিমেল ম্যাস্টারবেশন বা মহিলাদের হস্তমৈথুন নিয়ে খুব বেশি উল্লেখ পাওয়া যায়না। আসলে, যে সমাজ মানতেই চায়না যে মহিলাদের যৌনসুখ বলে-ও একটি জিনিস এই ধরাধামে রয়েছে, সেখানে মহিলারা হস্তমৈথুন করছেন, মানতে যাকে বলে, “মোন মানে না, মো-ও-ন মানে না, মো-ও-ও-ন মানে না-আ-আ”।

সুতরাং, মহিলাদের প্রবৃত্তি নেই, যৌনতাবোধ যখন তার সঙ্গী পুরুষ-টি চাইবেন, তখন-ই একমাত্র থাকবে, বাকি সময় তার কামোত্তেজনা থাকতে নেই, থাকতে পারেনা। এমনকি, আমরা মেয়েরা নিজেরা-ও নিজেদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনা প্রায় করি না বললেই চলে, যেখানে পুরুষদের মধ্যে ম্যাস্টারবেশন নিয়ে অন্ততঃ কয়েক লক্ষ চালু রসিকতা আছে! কেন এই লুকোচুরি? কারণ, সমাজ এইভাবেই ভাবতে শিখিয়েছে আমাদের। হাগু-হিসি বা সর্দি-কাশি’র মত-ই আত্মরতি যে একটি অতি প্রয়োজনীয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া তা না শিখে আমরা শিখি যে এসব করলে বা বিশেষ করে, “করেছি/করি” বললে, লোকে “খারাপ মেয়ে” বলবে। আর কে-ই বা না জানে যে এ সমাজে সারা জীবনে-ও কেউ “ভাল মেয়ে” হতে পারেনা কিন্তু এক লহমায় “খারাপ মেয়ে” হয়ে যাওয়া যায়।

তাই “ভীর দি ওয়েডিং” ফিল্মে ফিল্মে স্বরা’র স্বামী তাকে ভাইব্রেটর ব্যবহার করতে দেখে রীতিমত স্ক্যান্ডালাইজড হয়ে পড়ে। স্ক্যান্ডালাইজড হচ্ছে কেন সে? এখানে সমীকরণটি আরো জটিল। আমাদের সমাজে একটি মেয়েকে কখনই মালিকানাহীন বলে ধরে নেওয়া হয়না। সে যখন নারী, তার কোন একটি পুরুষ উপরওয়ালা থাকতেই হবে। এই ক্ষেত্রে সেটি হল স্বামী। স্বামীদের সহজ, সরল সামাজিক চেতনা হল আমি ওমুককে বিয়ে করেছি, অতএব তার সবকিছু আমার-ই, এমনকী, নিজের শরীরকে নিজে আনন্দ দেওয়ার অধিকারটুকু-ও একটি মেয়ের থাকতে নেই। বেসিক্যালি, একটা বৃহত্তর লেভেলে এই পুরুষের অধিকারবোধকে এক্কেবারে স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। এটা অন্যান্য আর পাঁচটা জিনিসের মত-ই একটা মেটেরিয়ালিস্টিক পোজেশন এই ক্ষেত্রে। তার ফলে, ভাইব্রেটর ব্যবহারে লঙ্ঘিত হচ্ছে স্বামীত্ব’র অধিকার, ক্ষুণ্ণ হচ্ছে পুরুষের যৌনশক্তি। এই বোধ চারিয়ে যাচ্ছে এক-ই মনোভাবাপন্ন দর্শকের মধ্যে। সেই কারণেই, হাজার হাজার দর্শক স্বামী’র এই শোকে আকুল হয়ে, ফিল্ম দেখে বেরিয়েই অভিনেত্রীকে শুধুমাত্র এই দৃশ্যে অভিনয়, মাইন্ড ইট, অভিনয়, করা’র জন্য তার বাপান্ত করতে ছাড়েননি। অথচ, এই এরাই হয়ত রসিয়ে “সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি” দেখেছে!

আধুনিক সমাজে, কোন মেয়ে সাধারণভাবে যৌনতা’র প্রতি তার আসক্তি ব্যক্ত করলে, তাকে আমরা দাগিয়ে দিই- “নিম্‌ফোম্যানিয়াক” বলে। সেই এক-ই আসক্তি পুরুষ দেখালে হেব্বি “মাচো” ব্যাপার  হয়। মোদ্দা কথায়, ভারতীয় সমাজে “মহিলাদের যৌনসুখবোধ” বলে কোনো বাক্যবন্ধ নেই। থাকা পাপ! ফিমেল সেক্সুয়াল ডিজায়ার আটকানোর জন্য যতরকম বাধানিষেধ আরোপ করা সম্ভব, সমাজ সব করেছে। সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে মহিলাদের মনে এই বোধ ঢুকিয়ে দিতে যে গোটা ব্যাপারটাই একটা  নোংরা, জঘন্য জিনিস। চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে একবার-ও “অর্গ্যাজম” বোধ করেননি এরকম মহিলা ঘরে ঘরে মিলবে। সমাজ হয়ত বদলাচ্ছে, কিন্তু তার গতি কচ্ছপকে-ও লজ্জায় ফেলবে। আগামী পঞ্চাশ বছরে জনসংখ্যা আরো বাড়বে কিন্তু সমাজের ঠুন্‌কো, কৃত্রিম বেড়াজাল ভেঙে মেয়েরা হয়ত নিভৃতে, নির্জনে নিজেদের যৌনসুখটুকু-ও নিজেরা নিতে শিখবেনা।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami