জীবনযাপন

ভাষাহীনতার ভাষা

শ্রাবস্তী ঘোষ

অনেকদিন থেকেই আমার হোয়াটস অ্যাপের স্ট্যাটাস “শব্দ খেলায় কেবল ফাঁকি/ কথার পিঠে কথা সাজাই/ আমরা এখন একলা থাকি”। শব্দে শব্দে ঠোকাঠুকি লেগে আগুন জ্বলে, কখনও সেই আগুন জলে নেবে, বা কখনও ছড়িয়ে গিয়ে পুড়িয়ে। তখন, একলা ঘরে শব্দহীনতার প্রয়োজন হয়, স্তব্ধতা কাঙ্ক্ষিত হয়ে পড়ে। শব্দের ভিড়ে, কথার পাহাড়ে হারিয়ে যেতে যেতে নীরবতা বেশি অর্থবহ হয় তখন। নৈঃশব্দ আর শব্দ মিলেমিশে জুড়ে গিয়ে আমাদের ভাষা তৈরি হয়। বাংলা ব্যাকরণ বইতে যেমন থাকে, মনের ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হল ভাষা।
শব্দের সঙ্গে খেলা আমাদের রোজের কাজ। এই যেমন, লিখতে লিখতে মনে করছি কী শব্দ এরপরে বসালে ঠিকঠাক শুনতে লাগবে, ঠিকঠাক বোঝা যাবে। আমাদের আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্কুল অব লেটার্স’ ডিপার্টমেন্টে প্রথমদিন ছিল ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭। তার আগের আগেরদিন গৌরী লঙ্কেশকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমাদের ভাইস চ্যান্সেলর শুরুতেই বলেছিলেন, এই  শব্দ বর্ণ মিলিয়ে যে লেখা তাই ছিল গৌরীর প্রতিবাদের মাধ্যম। আমি তখন নতুন করে, হয়তো বা সেই প্রথমবার বুঝলাম, আমাদের চারপাশটা ঘিরে আছে শুধুই প্রতি মুহূর্তের বলা বা না- বলা কথা, আমাদের প্রতিটা সতর্ক শব্দ নির্বাচন, শব্দচয়ন।
যদিও আমার কাছে ভাষা আসে অন্যভাবে, আমার শব্দ গড়ে ওঠে অন্যমাধ্যমে। ছোট থেকেই কথা কম বলতাম। ফলে কাউকেই খুব একটা বুঝিয়ে উঠতে পারতাম না, কী চাই। আর, কথার ভিড়ে কেউ চুপ করে থাকলে, তা খানিক হারিয়েই যায়। আমার ক্ষেত্রেও তার থেকে আলাদা কিছু ঘটেনি। তবে, এর মাঝেই আমি নাচ শিখতে শুরু করি, থিয়েটার করতে শুরু করি। তখন থেকে আমার কাছে ভাষা পরিচিত হয় অন্যভাবে। ভাষার মাধ্যম, তার প্রকাশভঙ্গি বদলে যেতে থাকে আমার কাছে। এতদিন ধরে যে শব্দের ভাষার সঙ্গে পরিচয় ছিল আমার, সেখান থেকে এক শিল্পের ভাষাকে আমি চিনতে শিখি। শরীরের ভঙ্গিমা, মুদ্রা সেই ভাষার বাগযন্ত্র। শরীরের প্রতি অঙ্গের সঞ্চালনে সে ভাষার জন্ম হয়। সে ভাষা একসঙ্গে অনেকের কাছে পৌঁছে যায়। সেখানে শব্দের প্রয়োগ আবশ্যক নয়। কখনও সে ভাষা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতায় গড়ে ওঠে। একজন শিল্পী ও তার উল্টোদিকে বা তাকে ঘিরে যাঁরা বসে থাকেন, সেই দুপক্ষের মধ্যে অনুভূতির যে আদান-প্রদান হয়, তাই আমার ভাষা।
একটা সময় প্রসেনিয়াম থিয়েটারে কাজ করতে করতে মনে হয়েছিল, কোথাও আমার ভাষা তৈরি হচ্ছে না, কোথাও যেন আমি আমার কথা বলতে পারছি না। অন্যের কথার মাঝে আবারও আমার কথাকে চাপা পড়তে দেখছিলাম। খানিকটা সেই ছেলেবেলার মতন। তার ওপর উল্টোদিকে অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা মানুষ, যাদের মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি না, তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে কই? তখন মঞ্চ থেকে বেরিয়ে অন্য ভাষার পারফর্মেন্স করার কথা ভাবলাম। ভাষান্তর ঘটল। এখন আমার কাজে আমার সামনে আমাকে ঘিরে সকলে বসেন, আমি তাঁদের আমার কথা বলি। সেই কথা বেশিরভাগ সময়েই সংলাপহীন হয়। আসলে ছোটবেলা থেকেই চুপ করে থাকতে থাকতে আমি নীরবতার ভাষাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ পাই হয়তো বা। তবে যতবারই নতুন এরকম কোনো ভাষার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে, ততবার একটু একটু করে নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগ পেয়েছি। ভাষার ওপর ভর দিয়ে আমি বারবার নিজের কথা বলেছি। আমার কাছে শিল্পের নানান ভাষার দরজা খুলেছে এক এক করে।

এই ভাষা থেকে ভাষা বদলের মধ্যেই প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্ত তৈরি হয়। ভোরবেলার রাস্তা পরিষ্কারের শব্দ, গাছের পাতার খসখস, হাওয়া লেগে উড়ে যাওয়া পর্দা সবার কোনো কোনো শব্দ আছে। সেই শব্দের মধ্যেই কেউ কারোর ভাষা খুঁজে পায়। পারফর্মেন্সের মজা হলো, এই প্রত্যেকটা শব্দ দিয়ে গল্প তৈরি হয়, থিয়েটার হয়ে ওঠে, যে কোন শিল্প হয়। সংলাপহীন এইসব শব্দের মধ্যে কত ভাব থাকে। কত অনুভূতি থাকে। যারা ভাষা পায় আমাদের প্রচলিত, চেনা ছকের বাইরে। আমার কাছে থিয়েটারের ভাষাও খানিক তাই। বারবার সে তার আদল ভাঙে, নতুন রূপ পায়। আর, আমার কথারাও নানান মাত্রা পেতে থাকে, নানান ভঙ্গিমায় বিকশিত হয়। তাই এখন আর ভিড়ের মাঝে শুধু চুপ করে থাকতে হয় না। নতুন ভাষার এক নিরন্তর খোঁজ চলতে থাকে।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami