গল্প

বাওরি….এক প্রেমকথা

মিনতি ঘোষ

মুন্না সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বারান্দায় বসে বসে মাকে দেখছিল।  বড়িমাই রান্নাঘরে – বোধহয় চা করছে,  বাবুজি খাটিয়ায় উপুর হয়ে শুয়ে,  থুতনিতে হাত রেখে শরীর কাঁপিয়ে হেসেই যাচ্ছে,  চম্পা – মুন্নার মা বড় ঘরের দরজায় বসে কেঁদে চলেছে….  বিলাপ করে চলেছে – কেন তাকে বাবুজির শরীর খারাপের কথা জানানো হয়নি ।  বাবুজি হেসে বলছে “ একদম বাওরী  – আরে মুন্না সম্ভাল আপনী মাঈ কো… “  মুন্নারও হাসি পেয়ে যায়,  সত‌্যি মা একদম ছোট্ট বাচ্চা মেয়ের মতো উঁ… উঁ…  করে কেঁদে চলেছে ।  মাকে এসে জড়িয়ে ধরে সে  –  “ মাঈ শুন…. বাবুজির বুখার হয়েছিল – এদিকে ডেঙ্গু হচ্ছে,  তাই হসপিটালে দিই… এখন তো পুরা ঠিকঠাক ।  তুই কার সঙ্গে
এলি ? “  মার সাথে এভাবেই মুন্নারা কথা বলে ।  মুন্নাকে ঠেলে সরিয়ে দেয় চম্পা – “ দেশ গাঁওয়ে থাকি বলে সব সময় আমার কথা ইয়াদ থাকেনা জানি – আমি তো গাঁওয়ার… “  বড়িমাঈ চা এনে চম্পার মুখের কাছে ধরে “ লে বহন,  পী লে.. মেরী প‌্যারী
বহন “ একটু- আধটু আদর সোহাগ হ’লো !  চম্পা চা বিস্কুট খেল ।  বড়িমাঈ কয়েক মাসের জন‌্য কলকাতায় এসেছে,  তার ছোটমেয়ের বাচ্চা-কাচ্চা হবে,  জামাই মিলিটারি ম‌্যান, কলকাতার বাইরে পোস্টিং।   আলিপুরের মিলিটারি হাসপাতালে ব‌্যবস্থা আছে ।  তবে এখানে খিদিরপুরে জামাইয়ের ভাড়াবাড়িতে তার বাবা মা থাকে,  সেখানেই আছে রেশমী । বড়িমাঈ এইখানে,  তাদের এই বহুত পুরানা মকানেই থাকে ওদের সঙ্গে।  মাঝেমধ‌্যেই মেয়ের কাছে ঐ বাড়িতে যায় ।  মুন্নার বাবুজিকে কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল । চম্পাকে জানানো হয়নি,  এখানকার কেউ দেশে গিয়ে জানিয়েছে হয়তো !  মাঈ সত‌্যি সত‌্যি একদম বাওরি । একা একা কি ভাবে চলে এলো!
শামশের সিং চম্পাকে দেখতে দেখতে ভাবছিল বেচারী কোনদিন বড় হবেনা ।  সেই পঁচিশ বছর আগে শিবরাত্রির দিন যেমন দেখেছিল এখোনো ঠিক তেমনি আছে – মাঝখানে শুধু বয়স সামান‌্য আঁচড় ফেলেছে শরীরের এখানে সেখানে,  কিন্তু চোখ তেমনি মায়াবী,  তেমনি টানছে এখোনো –  তাকে  – এই এত বয়সেও ও পাগল করে দিতে পারে ! চম্পার দিকে চেয়ে চেয়ে সেই দিনের কথাই ভাবছিল শামশের সিং । সেদিন গার্ডেনরীচের এই সামনের রাস্তায় শিবরাত্রির গানা বাজানা হচ্ছিল ।  শামশের সিং এর তখন কী নাম ডাক এ অঞ্চলে ! গজল…. কাওয়ালির মাস্টার !  বাবার চায়ের দোকানের দেখভালে তার একদম মন নেই।  বাবা বুধন সিং বলে বলে একেবারে থকে গেছেন ।  বিয়ের বয়সও চলে গেছে, ওদের দেশ-গাঁওয়ে তো অঠরা-বিশ বারিসেই  বিহাসাদি হয়ে যায়। শামশের সিং‌এর তখন তিশ পেরিয়ে গেছে ।  তার এককথা শাদিউদি করবেনা – ও দেশের সবচেয়ে বড় কাওয়াল হতে চায় !
সেই শিবরাত্রির‌ সন্ধ্যায় বিরাজ প্রসাদ মা-বাপ মরা মাসতুতো বোন চম্পাকে নিয়ে দোস্ত শামশেরের গান শুনতে এসেছিলো – মেয়েটা বড্ড গান ভালোবাসে যে । খোলা স্টেজ –  হারমোনিয়ামে গজ্জুমিঞা, ঢোলক অওধ সিং আর আছে তালি পিটনেবালা চার বন্ধু ।  মেয়েরা খুব একটা এই সমস্ত ফাংশানে তখন আসতো না  ।  অল্প আলোর পথ ধরে এগিয়ে আসছে অষ্টাদশী চম্পা …..উপোস করা শুকনো , সহজ, সরল সুন্দর মুখে মৃদু হাসি, কোমর ছাপানো এক ঢাল কালো চুল …মুখের চারপাশে কুচো চুলের কিছু , বসন্তের পাগল করা হাওয়ায় উড়ছে…শামশের সিং তখন গাইছে
“ অপনি সুরত কো সবঁরনে কী জরুরত কেয়া হ্যায়….সাদগীমেঁ কয়ামতকী অদা হোতী হ্যায় …” ঘোরের মতো বারবার একই লাইন গাইতে থাকে সে
“সাদগীমেঁ কয়ামতকী অদা হোতী হ্যায় …” অবাক হওয়ার কিছু নেই …বারবার কোন একটি বিশেষ লাইনকে বিভিন্ন ভাবে সুরের কালোয়াতিতে পেশ করা কাওয়ালি ,গজলের দস্তুর  ।  সেদিন কিন্তু কোনভাবেই চম্পাকে মন থেকে সরাতে পারে নি শামশের  । পরদিন প্রায় যেচেই বিরাজ প্রসাদের বাড়িতে আসে , বাড়ির সবাইকে গানে ঘায়েলও করে ফেলে একেবারে  । পরদিন…তার পরদিন…একই …জানতে পারে চম্পাকে তার চাচারা এখানে দিয়ে গেছে, মেয়ে সয়ানা হয়ে গেছে …বাপ-মা নেই, সাদি দিবে কৌন ?
চম্পা লুকিয়ে লুকিয়ে শামশের কে দেখে – মাঝে মাঝেই চোখে চোখ ….ধড়াস করে ওঠে বুকের মধ্যে ….শামশেরের পাগল করা কন্ঠমাধুরীতে সে একেবারে ডুবে থাকে   “ ম্যায়নে মাসুম বহারোঁ মে তুম্হে দেখা….যব চাঁহু তুম্হে মিল নহীঁ সকতা হুঁ….যব চাহুঁ য়াদ তো কর সকতা হুঁ …”
চম্পাকে বিয়ে করতে কোন অসুবিধা হয়নি – দেশ থেকে বাবা, দাদা এসেছে, আত্মীয় স্বজন এসেছে, মেয়েদের আসার নিয়ম নেই । কিন্তু দেশে নিয়ে গেলে শামশেরের মা বুকে জড়িয়ে ধরেছে – এতদিন পর ছেলের ঘর বসানোর ইচ্ছা তো হয়েছে আর হবে নাই বা কেন… এমন চাঁদের মতো মুখ, এমন মিঠি কন্ঠস্বর…!  শ্বশুর ঘরের সবাইকে মুগ্ধ করলেও শামকে বাঁধতে পারেনা চম্পা । দুজন দুজনকে ভালভাবে চেনা জানার আগেই হঠাৎ উধাও সে – এ তার পুরনো অভ‍্যাস । হঠাৎ হঠাৎ ঘর ছেড়ে পালানো  । কোথায় পঞ্জাব, কোথায় ইলাহাবাদ, এমনকি নিজের আংটি, ঘড়ি বেচে ব্ল‍্যাকে পাকিস্তানে অব্দি চলে গেছে …নুসরত ফতেহ আলির কাছে তালিম নেবে বলে  ।  ফতেহ আলি তো দূরস্থান – করাচি পৌঁছাতে পারে নি, সর্বস্বান্ত হয়ে কোনরকমে দেশে ফিরে এসেছে । একটা বাঙলা গান তার খুব প্রিয় ছিল, ঐ গানটা গাইতোও খুব ভালো  “ খেয়াল পোকা যখন আমার মাথায় নড়ে চড়ে – আমার তাসের ঘরের বসতি হে অমনি ভেঙে পড়ে….”  বলতো গানটা ওরই জন্য লেখা – সিনেমার নায়কের জন্য নয় ।
চম্পার শামশেরের এই ঘর পালানোর ব‍্যাপারটা জানা ছিলনা  ।  ও কেঁদে কেঁদে অস্থির । মাস বছর হয়ে গেলো – ফেরেনা শাম  ।  চোখের জলও শুকোয় একদিন  ।  চম্পা এখন এ বাড়ির মেয়ে হয়ে গেছে – শ্বশুর, ভাসুর, শাশুড়ির বেটি – বড় জার আদরের ছোটি বহন আর বাড়ির বাচ্চাদের কাছে ছোটি মাঈ  ।  সারাদিন ভুলে থাকে …কিন্তু মাঝে মাঝেই চোখ উপচিয়ে জল – বিশেষ করে জা যখন ওর চুল বেঁধে, আলতা কাজল পরিয়ে ওকে সাজাতে বসে….হঠাৎই বড় বড় গভীর চোখওয়ালা মানুষটার দর্দ ভরী আওয়াজ মনের মধ্যে পরিস্কার শুনতে পায় যেন
“ অপনী সুরত কো সবঁরনে কী জরুরত ক‍্যায়া হ‍্যায় …সাদগীমেঁ কয়ামত কী অদা হোতী হ‍্যায় ….”
এবার যেন লম্বা উড়ান  ।  বছর দুয়েক বাদে হঠাৎই এক প্রায়ান্ধকার ভোরে এক উদাত্ত কন্ঠের গান চম্পা শুদ্ধু বাড়ির সবাইকে হতচকিত করে দেয় …শামশের না ? “ভোর ভয়ি সুমিরণ কর হরি কো ….ভোর ভয়ি..…” শামশেরই  । কাঁধ ছাপানো লম্বা চুল, বুক অব্দি লম্বা দাড়ি হলেও ঘরের ছেলেকে চিনতে অসুবিধা হলো না – সেই যে পলাশ পদ্মলোচন,  কপালের মাঝখানে লম্বা কাটা দাগ !
সারাদিন চম্পা লুকিয়ে বেড়ালো, কিছুতেই সামনে আসবে না সে…কিছুতেই না  । লোকটা হজামত করে পরিচ্ছন্ন হয়ে বাড়ি এসে তার বাওরি কে খুঁজে বেড়ালো … ঘরে খুঁজলো, চৌকায় খুঁজলো , পিছওয়ারি বাগেও খুঁজে এলো …না: কোথ্থাও নেই।  রসোইয়ে এসে ফিসফিস করে ভৌজিকে জিজ্ঞেস করে “ কলকত্তাওয়ালি কোথায় গেল – খুঁজে পাচ্ছিনা তো “  বড় বৌ কপট রাগ দেখিয়ে বলে ঠিক করেছে সে,  নিরুদ্দেশ হওয়ার সময় কি সে জানিয়ে গেছিলো!
প্রায় ধরে বেঁধে বড় জা চম্পাকে দেওরের ঘরে ঢুকিয়ে চলে আসে । আজ কিছুতেই তাকে সাজানো যায়নি । তার রুক্ষ কেশ, বেশবাস যেমন তেমন, ল‍্যাপটানো সিঁদুর । ভৌজি চলে যেতেই দরজা বন্ধ করে শাম  ।  হাত ধরে চম্পার । বৃথাই চেস্টা – কিছুতেই সে বাঁধন ছাড়াতে পারেনা চম্পা । শাম জোর করে বুকে টেনে নেয় চম্পাকে । খুব মৃদু কন্ঠে, আদর মাখা স্বরে বলে
 “ শোন বাওরি…তোর জন্যই তো ফিরে এলাম  ।  কলকত্তা যাচ্ছিলাম – দুকানে বসতে হবে তো !  এখন সাদি করেছি, তোর কথা ভাবতে হবে … ট্রেনে এক আদমীর সঙ্গে মুলাকাত হ’লো, বললো জলান্ধরে এক মাস্টার কাওয়াল আছে, তার কাছে নাড়া বাঁধলে আর ফিরে তাকাতে হবেনা ।  সঙ্গে টাকা ছিল, বাবুজি কলকাতার দোকানের জন্য দিয়েছিলেন ….চলে গেলাম জলান্ধর । জানলাম ওস্তাদজির নাম আবু বকর আলি  ।  উঠলাম হোটেলে তার সঙ্গে ।  রাতে খানা হলো, পিনাও হলো । পরদিন সব ফাঁকা । বেশ দেরিতে ঘুম ভাঙলে দেখলাম আমার সব টাকা পয়সা নিয়ে বন্ধু হাওয়া ! দয়া করে হোটেলের দেনা মিটিয়ে গেছে । বাইরে বেরোলাম,  হোটেল ম্যানেজারের সাহায্যে ঘড়ি আংটি বিক্রি করলাম । বড় শহর জলান্ধর । এই পঞ্জাবের আরেক শহর পাতিয়ালা ছিল আমার ঈশ্বর নুসরত ফতেহ আলির বংশের ঘরানা । আমি তা জানতাম না, কিন্তু ট্রেনের বন্ধু ভেবেছিল জানি, তাই টেনে নিয়ে এলো জলান্ধর – এখান থেকে ট্রেনেই পৌঁছানো যায় পাতিয়ালা । খুঁজতে লাগলাম আবু বকরকে –  কেউ নামই শোনেনি । “  এতক্ষণ কুঁ কুঁ করে কাঁদতে কাঁদতে চোখ বড় করে শামশেরের কথা শুনছিল চম্পা। এখন কান্না থেমে গেল । কোন রকমে ঢোঁক গিলে বললো “ ফিন ?”
“ জিদ এসে গেলো, খালি হাতে ফিরবো না  । ঐ হোটেলের ম‍্যানেজার আমার সখ বুঝে একটা বাজনা তৈরির দুকানে কামে লাগিয়ে দিল ,  সিতার, বীণা, ভায়োলিন কি না তৈরি হয় সেখানে । বড় বড় পন্ডিত, শিল্পীরা আসেন – তাঁদের চেহারা, শান-শৌকত দেখে ভয় লাগে, কাছে যেতে পারিনা  ।  মনের দু:খ মনে চেপে কাজ করি, কোন কোন দিন দুকান ফাঁকা থাকলে হারমোনিয়মে হাত দিই, ঐ যন্ত্রটা তো বাজাতে জানি …তবে কাওয়ালির হারমোনিয়ম তো সিঙ্গল রিডের, পুরো উপরের ঢাকনা খুলে বাজানো, টিউনিং ভী খুব চড়া…একদিন দুপুরে রিক্স করে একজন বৃদ্ধ মানুষ তাঁর ছাত্রের সাথে এলেন বীণা কিনতে…আমি খেয়ালই করিনি, আপন মনে হারমোনিয়ম বাজিয়ে যাচ্ছি…হঠাৎ কাঁধে হাত..দোকানের এক কর্মচারী, বললো গুরুজী ডাকছেন তোমায়…শান্ত, সৌম‍্য চেহারা, অতি সাধারণ পোষাক । প্রণাম করতেই বুকে জড়িয়ে ধরলেন “ “বেটা তুম তো বহোৎ বঢ়িয়া বজাতে হো …আগে তো কোনদিন দেখিনি তোমায় …কোথা থেকে এসেছো ?” চোখে জল এসে গেল .. ঐ অল্প সময়ে সব বলে ফেললাম… আমার ইচ্ছা আকাঙ্খা …আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন “ আমি কাওয়ালি জানিনা – তবে থোড়া বহুৎ হিন্দুস্তানী ক্লাসিক্যাল জানি, ইচ্ছে হলে এসো । “  গেলাম তাঁর কাছে… বছর গড়িয়ে গেল শুধু ‘সা’ তে গলা বসাতে… একটু একটু করে ভজন, ছোটা মোটা খেয়াল … মীরার ভজন গাইতে গাইতে তোর কথা মনে আসে শুধু, উদাস হয়ে যাই …গুরুজী কদিন লক্ষ‍্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, বলতে বাধ‍্য হলাম তোর কথা, আমাদের সাদির কথা ।  গুরুজী সেদিন কোন কথা বললেন না, পরদিন ট্রেনের টিকিট কেটে আমায় ধরিয়ে দিয়ে বললেন – এখানে মীরার ভজন গাইছো আর ঘরে যে আর এক মীরা কেঁদে কেঁদে সারা হচ্ছে… যাও ঘরে ফিরে যাও …গান ভালবাস মনের আনন্দে গাও…ওখানেও গুরু পাবে” তোর কথা ভেবেই তো ফিরে আসা …” আবার সেই পাগল করা কন্ঠ অনেকদিন বাদে চম্পার কানে যেন সুধা বর্ষণ করতে থাকে , আবার সেই দর্দ ভরী আওয়াজ -“ জানে ক‍্যায় সে বাঁধে তু নে আঁখিয়োঁ কে ডোর…মন মেরা খিঁচা চলা আয়া তেরী ওর…” এতদিনে চম্পার মুখেও দেশের বুলি …শামশেরের বন্ধন থেকে মুক্তি পাবার জন্য ছটফট করতে করতে, ফুঁপিয়ে বললো “ হম তো তোহার সাথ বাত ন করব …ঝুটা ঝুটা কঁহিকা …”
অনেক রাতে বড় বউ দেওরের ঘরে কান পাতে, চম্পা আজ  শামশের কে গান শোনাচ্ছে,  “ মানিক মোতি সব হম ছোড়ে, গল মে পহনী সেলী…ভোজন ভবন ভলো নহীঁ লাগে… পিয়া কারণ ভইরে অকেলী  …..কিনু সঙ খেলুঁ হোলি ….”
আজ সেইসব কথা মনে পড়ে হাসি পাচ্ছে, ভালোও লাগছে  শামশেরের ।   মুন্নারও মা কে দেখে হাসি পাচ্ছে । একদম পগলী ,  বাবুজির বাওরি ! খাওয়া দাওয়ার পর বড়িমাঈকে দিদির বাড়ি নিয়ে যাবে বলে তৈরি হচ্ছিল মুন্না – বাবুজি বারণ করলো, বললো তুই মার আদর খা সারা দুপুর, আমি ভৌজিকে দিয়ে আসছি । সত্যি সত্যি সারা দুপুর মা তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিলো, সারা দুপুর মার কোলে মাথা দিয়ে এই বিশ বছরের কলেজে পড়া ছেলেটা ভোঁসভোঁস করে ঘূমালো । বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দোকানে বসতে হলো – আজ বাবুজি নেই কিনা  !  রাতে বাড়ি ফিরে দেখে মাঈ রসোই ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে, চোখে মুখে হাসির রোশনাই …. বাবুজি বারান্দার খাটিয়ায় বসে অনেক দিন পর তার প্রিয় কাওয়ালি গাইছে।  আজকাল কে আর শোনে এ সব গান – শুধু দু একটা হিন্দি ছবিতে নামকরা গাইয়ে দিয়ে গাওয়ালে, কিছু কিছু গান জনপ্রিয় হয়, তবে তার কাওয়ালি সুবাস আর থাকেনা । আজ বাবুজি গাইছে “ আ্যয় সা দেখা নহীঁ খুবসুরত কোই … জিস্ম যৈসে অজন্তা কী মুরত কোঈ…জিস্ম যৈসে মহকতী হুয়ী চাঁদনী…”.বাবুজি রঈস – ধনী নয়, কোন রকমে দিন গুজরান হয়, কিন্তু হৃদয় তার দরিদ্র হয়ে যায় নি, এত রকম ঠোকর খাওয়া জীবনে কাওয়ালির জন্য তার ভালবাসা এতটুকু কমেনি …এখোনো  !! মাঝে মাঝে, খুব বর্ষার দিনে কারখানায় কামকাজ না থাকলে বা কখোনো কোন কারণে কোন মজদুরের কাম না মিললে দোকানে কেউ কেউ বসে যায় -উস্তাদজিকে গানা গাইত অনুরোধ করে..তখন মুন্নাও ঢোলক নিয়ে বসে পড়ে , বাবুজি একের পর এক গান শুনিয়ে যায়  ।
 আজ তার আর বাবুজির মনপসন্দ খানা বানিয়েছে মাঈ – আড়হড় দাল ঘীউঁ আর হিং ছৌঁক দিয়ে, দহি কড়ি, নরম গরমা গরম ঘীউঁ মাখানো রোটি  । মাঈকে আজ এতো সুন্দর দেখাচ্ছে  ! বাপ বেটা বারান্দায় খেতে বসেছে, মা রসোই ঘরে – বাবুজি কে জোর করছে, ওকে জোর করছে…. ঠিকঠাক না খাওয়ার জন্য বকাবকিও করছে দুজনকে  । মা মাথায় অনেকখানি ঘোমটা টেনে রেখেছে, খাবার দিতে কাছে আসলেই কী অপূর্ব সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে । মাঈ বোধহয় আতর মেখেছে – জিজ্ঞেস করলে হয়তো লজ্জা পাবে, তাই এ নিয়ে কোন কথা বললো না মুন্না।
অনেক সকালে ঘুম ভাঙে মুন্নার । বাবুজি অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সকাল বেলায় দোকানটা ও-ই খোলে । সাড়ে পাঁচটা থেকেই আশেপাশের কল কারখানায় ছটার শিফটে কাজ করতে আসা মানুষরা  ওদের দোকানে ভীড় জমায়  ।  ও দোকান খোলার আগেই নাথ্থু চাচা এসে যায়, দোকানের ঝাঁপ খুললে বড় কেটলিটা জল ভর্তি করে গ‍্যাসে বসিয়ে দিয়েই সাফ সুতরোর কাজে লেগে যায় নাথ্থু চাচা – কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় ঢোকার আগেই চা পেয়ে যায়  ।  অন‍্যদিন তো বড়িমাঈ কে বলে বেরোয়, আজ নিজের মাকে বলবে বলে আলতো করে বাবুজির ঘরের দরজায় ঠেলা দেয় …
দীর্ঘদেহী সুঠাম বাবুজি চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে – বাঁ হাত মেলা – সেই হাতকে বালিশ করে মাঈ গভীর নিদ্রায়, মাঈর একটা হাত বাবুজির বুকে আশ্রয় নিয়েছে, ঘোমটা সরে গেছে ….মাঈর খোঁপায় জুঁইয়ের মালা… কপালে নানা রঙের দাগ টানা কাঁচ টিপ…আর মুখে লেগে আছে গভীর তৃপ্তির আলো । ও…! এই ফুলমালা আর কাঁচটিপের জন‍্যই বড়ীমাঈকে পৌঁছানো  ! সত্যি বাবুজি এখোনো কি রোমান্টিক – হেসে ফেলে মুন্না  !   মুন্না মনে করতে পারলো এই সেদিনও,  বাবুজি যখন কলকাতায় থাকতো ,  ও-ও মাঈর পাশে অমনি করে ঘুমিয়ে থাকতো …ওই ভাবে মাঈর হাতে মাথা,একটা হাত জড়িয় থাকতো মাঈর গলা … ওকে ছুঁয়ে থাকতো মাঈর মাতৃত্ব, মাঈর স্নেহ ভালবাসা.. আর ঠিক এই মুহুর্তের ভোরের কোমল আলোয় ও দেখলো মাঈকে ঘিরে রেখেছে বাবুজির স্নেহ,ভালবাসা, নির্ভরতা আর বাবুজির গভীর প্রেম তার বাওরির জন্য  !!
“জিস্ম যৈসে কী খিলতা হুয়া ইক চমন…জিস্ম যৈসে কী সুরজ কী পহলী কিরণ ….সন্দালীন …সন্দালীন…..”   চন্দন ….চন্দন….চন্দন …..!!!
বারাসাতের বাসিন্দা, ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী। আপাতত সাহিত্যচর্চায় ব্যস্ত থাকেন। রামকিঙ্কর বেইজ-এর জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস লিখছেন।
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami