রাজনীতি

বাংলাদেশ থেকে সরাসরি

আরিফ আহমেদ

আর অন্য ৫ দিনের মতই কলেজ শেষে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল আব্দুল করিম আর দিয়া বাস ধরে বাড়ি ফেরার আশায়। কিন্তু দুইটি বাসের প্রতিযোগিতায় একটা উঠে পড়ে ফুটপাতে যেখানে ঘটনাস্থলেই মারা যায় করিম আর দিয়া, আহত হয় ত্রিশের বেশি!

এই বিষয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি হাসতে হাসতে উত্তর দেন যে, বাংলাদেশীরা সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি করে, ইন্ডিয়াতে দুর্ঘটনায় একসাথে ৩৪ জন মারা গেলেও সেখানে নাকি কোনো ‘মাতামাতি’ হয়নি! বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরা ছাত্রসমাজ। রাস্তায় নেমে আসে ঢাকাসহ পুরা বাংলাদেশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা।

মন্ত্রীর গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়ে, সেনাবাহিনীর গাড়ি চেক করে, পুলিশের গাড়ি থামিয়ে, এম্বুলেন্সের জন্য আলাদা লেন করে কিশোররা তখন হিরো বাংলাদেশের। আমরা সবাই প্রশ্রয় দিলাম। উৎসাহে সারাদেশের কিশোররাই স্কুলপোশাক আর ব্যাগ নিয়ে রাস্তায় নেমে গেলো। রাস্তার দখল নিলো।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন প্রাথমিকভাবে লীগ সরকারের সুবিধাই করে দিয়েছিলো। তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন থেকে জনগনের দৃষ্টি অনেকটা সরে গিয়েছিলো বাচ্চা পোলাপানের ট্রাফিক কন্ট্রোল, রথি মহারথিদের লাইসেন্স চেক ইত্যাদি কিউট দৃশ্যে। সরকার থামাতে চেষ্টা করেনি।

সড়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ‘যদিও এটা সড়কের বিষয় না’ বললেও তাকে মনোযোগহীন করে দিলো নৌমন্ত্রী শাহজাহান খানের হাসি হাসি ছবিটা। তিনি আবার পরিবহন সেক্টরের একচ্ছত্র অধিপতি। তার পদত্যাগের দাবী উঠলো। প্রধানমন্ত্রী তাকে ভৎসর্না করলেন, তিনি ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু পদত্যাগ করবেন না জানিয়ে দিলেন সগর্বে।

বিএনপি জামাতের পেট্রোল বোমার ভয়াবহকালেও যেখানে পরিবহন শ্রমিকেরা রাস্তায় গাড়ি নামিয়েছে, সেখানে কিছু কিশোর শুধু লাইসেন্স কাগজ ইত্যাদি চেক করছে দেখেই নিরাপত্তার অজুহাতে সারাদেশের গণপরিবহন বন্ধ করে দিলো শাহজাহান বাহিনী। এটা যে জনগনকে বিপদে ফেলা, সরকারকে চাপে ফেলা আর প্রতিশোধের খেলা তা আমরা এড়িয়ে গেলাম। তাদেরকে কিচ্ছুটি বললাম না, এখনো বলছি না। মেইন ক্রিমিনাল হয়েও তারা এখনো সরকার, জনগণ সবার মনোযোগের বাইরে থেকেই দেশকে অচলাবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারছে!

হাইকোর্ট জানতে চাইলো শাহজাহান খান মন্ত্রী পদে থেকেও কীভাবে পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের কার্যকর সভাপতি! সেই প্রশ্ন আর উত্তর কোনোটাই এখন আর দৃষ্টিসীমায় নাই। কিন্তু অবস্থা একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলো স্বাভাবিকভাবেই। ব্যাপারটা আর কিউট থাকলো না। এবার থামাতে হবে। শাহজাহান খান হাসির জন্য ক্ষমা চাইলেন, দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রীর বাড়ি গিয়ে ক্ষমা চাইলেন। দুই পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলো। নিহত ছাত্রীর বাবাকে দিয়ে ছাত্রদেরকে পাঠে ফেরার অনুরোধ জানানো হলো। রমিজউদ্দিন কলেজকে বাস উপহার দেওয়া হলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। পোলাপান এবং আমরা সকলেই তখন দারুণ মজা পেয়ে গেছি। এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ভীষণ কষ্ট আর ব্যায় হলেও আমরা মেনে নিয়েছি। সরকার ফাঁপড়ে পড়লো ভীষণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম সম্পূর্ণ অপ্রাপ্তবয়ষ্কদের আন্দোলন, স্কুল কলেজের ছাত্র এরা, এরা কেউ ভোটারও না! এরা অবশ্য ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের উত্তরাধিকারী। এরা কোনো অন্যায় দাবীতেও মাঠে নামেনি। বাংলাদেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরেই দুর্ঘটনার ক্ষত আছে। ফলে সমস্ত জনসমর্থন এখানে। পরিস্থিতি ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠলো।এবং এই এতদিন পরে সরকারের টনক নড়লো যে এই আন্দোলনকে বিএনপি জামাত নিজেদের স্বার্থে ব্যাবহার করার ফন্দি আঁটছে, পাওয়া গেলো গোপন খবর। জনপ্রিয় তারকাদের দিয়ে ফেসবুকে অনুরোধ করা হলো বাচ্চাদেরকে ঘরে ফিরতে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনুরোধ করলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও ভয় ভীতি দেখিয়ে চেষ্টা করলো। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রথম এসাইনমেন্ট দিলেন ছাত্রদেরকে বুঝিয়ে ঘরে ফেরাতে! ইতোমধ্যে ব্যাপারটা আসলে অনেক বেশি রাজনৈতিক হয়ে গেছে তলে তলে। আমরা কেউ টের পাই নাই।

ফলে যা হবার তা-ই হলো। বৃহষ্পতিবার থেকে শুরু হলো মূল খেলা। প্রথমে মিরপুরে সংঘর্ষ। সেখানেই জানা গেলো কোনো একটা গ্রুপ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কানে গুজবের উস্কানী দিয়ে সটকে পড়ে। শিক্ষার্থীরা আলাদা হয়ে গেলে হামলা চালায় ছাত্রলীগ ও পুলিশ। তখন সরকার, প্রশাসন সকলে গুজব বিষয়ে সতর্ক হয়ে গেলেন। অবস্থা যে ভয়াবহ হয়ে উঠছে তা হয়তো এতদিনে টের পেলেন। কিন্তু তা থামানোর জন্য অন্তত আপাত পরিস্থিতি সামলানোর জন্যও শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবী (এখন চোদ্দ দফা) সম্পূর্ণ মেনে নিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে পারলেন না। শাহজাহান খান যথারীতি স্বপদে বহাল।

শনিবারে ব্যাপারটা ভয়াবহ রূপ নিলো। যুবলীগের কয়েক কর্মীর সঙ্গে সামান্য গোলযোগের সুযোগ নিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সত্য খবরের চেয়ে গুজবের গতি বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক। তা-ই হলো। মুহূর্তের মধ্যে তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়লো।রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লো। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রশ্ন করেছেন ‘হামলা হলে কি তাদের চুমু খাবে?’ তাঁর মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এই প্রতিক্রিয়া হতাশার। সত্যি বলতে লীগ যদি তখন একটুও বাধা না দিয়ে ছাত্রদেরকে কার্যালয়ে ঢোকার সুযোগ দিতো, প্রয়োজনে ভাংচুর হলেও মেনে নিতো, ছাত্ররা লাশ আর আটক হওয়া সহপাঠী না পেয়ে বিফলে ফিরে আসতো, সেটাই হতো আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় বিজয়। কিন্তু তারা ঠিক তা-ই করলেন যা তাদেরকে দিয়ে করাতে চেয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা! ছাত্রদেরকে বারবার ষড়যন্ত্রের ফাঁদ থেকে দূরে থাকতে বলে আওয়ামী লীগ নিজেই সযতনে পা রাখলো সেই ফাদেঁ! ছাত্রদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেলো ছাত্রলীগ। এখন আর সম্ভবত ফেরার পথ নেই… সামনে শুধুই বিপদ। মার খাচ্ছে বাচ্চাগুলো, লাশের আশায় বসে আছে শকুন!

এই ডামাডোলের মধ্যে নিভৃতে একটি ঘটনা ঘটে গেলো, যা আসলে ভীষণ আশঙ্কার। আপাত পরিস্থিতিতে দুটো ভিন্ন ইস্যু হলেও বিষয়টা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।সুজন নেতা বদিউলের বাড়িতে শনিবার রাতে ছিলো নৈশভোজ। সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্ণিকাট। ফেরার পথে প্রায় মাঝরাতে তাঁর গাড়িবহরে সশস্ত্র হামলা হয়েছে। বদিউলের বাড়িতেও হামলা হয়েছে। ছাত্র এবং ছাত্রলীগের তাণ্ডবে এই খবরটি তেমন মনোযোগ না পেলেও বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক্ষুণি, এই মুহূর্তে ভাবতে বসা আর কোন কোন পথে বিপদ আসতে পারে? ষড়যন্ত্রকারী ষড়যন্ত্রকারী বলে গলা ফাটিয়ে তো ফেলছি, কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রের ব্যাপ্তি আসলে কতদূর? ভাবতে হবে এক্ষুণি। বার্ণিকাটের বড় কোনো ক্ষতি হলে পুরো বাংলাদেশকে এর দায় শোধ করতে হতো। এখনো যে গোপনে এরকম আরো নানাবিধ নকশার আয়োজন চলছে না তা কে নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে?

প্রতিদিন হাজার হাজার কিশোর কিশোরী স্কুলব্যাগ কাঁধে জনঅরণ্যে মিশছে। এই অজস্র ব্যাগ সিকিউরিটি চেক করা সম্ভব না। আজকেই মিরপুরে এক কিশোরের পকেটে বোমা আছে সন্দেহে পেটানো হয়। যদিও পরে দেখা যায় সেটি বোমা ছিলো না। কিন্তু এই সুযোগ নিতে কেউ তৎপর না সেটা কিভাবে নিশ্চিত হতে পারছি? বার্ণিকাটের গাড়িবহরে হামলার খবরটা নানাবিধ উদ্বেগ তৈরি করছে। তৈরি করছে শঙ্কার।

এই সমস্যার শুরুতে যেমন সরকার বুঝতে পারেনি এর দায় কতদূর পর্যন্ত বইতে হবে… সম্ভবত এখনো ততটুকুই অন্ধকারে আছে। ছাত্র বনাম ছাত্রলীগ নিয়েই আমরা ভীষণ ব্যস্ত, হিমশিম। আমাদের মনোযোগের পুরোটা দখল। ওদিকে দেশ কি অরক্ষিত হয়ে পড়ছে? জানি না। বিপদ কতদিক থেকে ধেয়ে আসছে তা জানি না। কিন্তু সামনে যে ভয়াবহ বিপদ, সেটুকু কেবল আঁচ করতে পারছি। সতর্কতার এখনি সময়… প্রতি মুহূর্তেই সম্ভবত অনেক অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।

আরিফ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ফেসবুক এবং অন্যান্য আন্তর্জালিক উৎস থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে, ঘটনাস্থল থেকে যেসব তথ্য উঠে আসছে সবকিছু জড়ো করে একটি প্রতিবেদন পেশ করেছেন আন্দোলনের এই তরুন প্রত্যক্ষদর্শী!

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami