শিল্প ও সাহিত্য

প্রাইমার থেকে হাতেখড়ি কিংবা ভাষাদিবসের একুশে আইন

সুস্নাত চৌধুরী

কলেজপাড়ার বিয়ের কার্ডের দোকানগুলোতে নাকি এক সময় হাতে-লেখার লোক থাকত। দু-আড়াই দশক আগে পর্যন্ত কায়দার ক্যালিগ্রাফি জানা পেশাদারের সন্ধান মিলত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরেও, সার্টিফিকেট লেখার প্রয়োজনে। আর মেল-মেসেজ-মেসেঞ্জারে অধরা মাধুরীর জন্য প্রথম প্রেমপত্র কাগজ-কলমে লিখতে হলে তো আজও রোমিয়োটিকে তেমন-কারো পায়ে ধরতে হয়, যার হাতের লেখাটি ঝক্কাস! মানে, ‘ঝকঝকে ছাপার মতো’! এই যে হাতের লেখাকে ছাপার সঙ্গে তুলনা করা, বাংলা হরফ নির্মাণের শুরুর যুগটা ছিল ঠিক তার উলটো। হাতের লেখার মতো সুছাঁদ হরফ তৈরি করতে পারাটাই তখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। সময়ের সঙ্গে উপমেয় আর উপমান জায়গা বদলে নিয়েছে। আজ যে ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজড’ ছাপা হরফ দেখিয়ে খুদে পড়ুয়াটির বর্ণপরিচয় করাই, যে ‘ইউনিফর্ম’ ছাপা অক্ষরের অনুকরণে তাকে লিখতে শেখাই, একদিন মুদ্রণোপযোগী সেই ধাতব হরফের জন্ম হয়েছিল ব্যক্তি-মানুষের হাতের লেখা থেকেই। শ্রীপান্থের ‘যখন ছাপাখানা এল’ বইটির আলোচনা করতে গিয়ে কমলকুমার মজুমদার ছাপা হরফের এই ‘নৈর্ব্যক্তিক’ চরিত্রটির প্রসঙ্গে বলছেন – ‘এই ষ্ট্যাণ্ডার্ডাইজেশন অর্থাৎ প্রথম দিকের চেষ্টাতে যাহা, তাহার চমৎকারিত্ব আমাদের গর্ব্বিত করে, আমরা হাতে লেখা হইতে বিশেষ কিছু এখানে বাদ দেখি না’। ওই – উপমেয় আর উপমানের স্থান পরিবর্তন। অবশ্য তার আগেই কমলকুমার একটি বেসিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে আনছেন – ‘আমাদের জানিতে ইচ্ছা করে – বিশেষত পাশ্চাত্য দেশের বাঙলা অক্ষর অনুলিপির চেষ্টা, যাহার ছবি এখানে আছে, দেখিয়া – যে আদতে কেমন ধারা হস্তলিপি ধরিয়া তাঁহারা কাজ শুরু করিলেন’। দেশে ছাপা বাংলা হরফ প্রসঙ্গে নয়, বিলেতে উইলিয়ম বোল্টস-এর কাজ নিয়ে কমলকুমার মন্তব্যটি করছেন বটে, কিন্তু তাঁর জিজ্ঞাস্যটি বাংলা হরফের যাত্রা শুরুর আগাগোড়াই প্রযোজ্য বলে মনে হয়। কমলকুমারের এই ‘ছাপাখানা আমাদের বাস্তবতা’ লেখাটি বেরোচ্ছে ১৯৭৮ সালের আগস্টে, যার ঠিক দুশো বছর আগে মুভেবল মেটাল টাইপ বা বিচল ধাতব হরফে প্রথম বাংলা ছাপা হচ্ছে, প্রকাশিত হচ্ছে ন্যাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ-এর ‘A Grammar of the Bengal Language’। ততদিনে এই প্রশ্ন জাগা তো স্বাভাবিকই যে আদতে ঠিক কেমন দেখতে ছিল সেই হাতের লেখাটি, যার থেকে তৈরি হল প্রথম বাংলা টাইপ? পরবর্তীতেই-বা হাতের লেখার কোন আদল ব্যবহার করেছিলেন শ্রীরামপুরের মিশনারিরা? উত্তর নেই। কেবল দু-জনের নাম পাওয়া যাচ্ছে। খুসমৎ মুনশি আর কালীকুমার রায়। ‘হুগলী জেলার ইতিহাস’-এ (১৯৪৮) সুধীরকুমার মিত্র বিদ্যাবিনোদ বলছেন ‘স্যার চার্লস উইলকিন্স প্রাচীন পুথির অক্ষর এবং হুগলী নিবাসী খুসমৎ মুন্সীর হস্তাক্ষর দেখিয়া অক্ষর প্রস্তুত কার্য্যে ব্রতী হন; পরে কালীকুমার রায় নামক এক ব্যক্তির সুন্দর হস্তাক্ষর দেখিয়া বর্ত্তমান মুদ্রাক্ষরের ছাঁদ সর্ব্ব প্রথম প্রস্তুত হয়।’ কালীকুমার রায় ছিলেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সেরেস্তাদার। সুধীরবাবুর মতে, উইলিয়ম কেরির শ্রীরামপুর প্রেসে তাঁর হাতের লেখার আদলে হরফ তৈরি হয়। কিন্তু সেই আদলটি কেমন ছিল, তা স্পষ্ট নয়।

১৭৭২-৭৩ নাগাদ বাংলায় লেখা বিপুল পরিমাণ দলিল-দস্তাবেজ সংগ্রহ করেছিলেন হালেদ। বাংলা ভাষাশিক্ষা বা ব্যবহারিক গদ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল। আবার এমন ভাবাও হয়তো খুব কষ্টকল্পনা হবে না যে একইসঙ্গে বাঙালির হাতের লেখা স্টাডি করার ক্ষেত্রেও সেসব তাঁরা কাজে লাগিয়ে থাকতে পারেন। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আঠেরো শতকের নানাবিধ বাংলা হস্তাক্ষর দেখলে তো মনে হয়ই আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যও আমাদের আজ যেন সেই একই পথে হাঁটতে হচ্ছে। কাছের উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে কলকাতা আইএসআই-এর ‘হ্যান্ডরিটেন ক্যারেক্টার ডেটাবেস’-এর কথা। নানা ধাঁচের হাতের লেখার নমুনা-ভাঁড়ার। ছবি থেকে বা হাতে-লেখা কাগজ থেকে কম্পিউটারের অক্ষর চিনে নেওয়ার প্রযুক্তি, অর্থাৎ কি-না বাংলা ওসিআর (অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রেকগনিশন) তৈরির জন্য আজ যা একান্ত জরুরি।

তবে মুদ্রাক্ষর ও হস্তাক্ষরের আরেকটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে যেখানে, সেটি প্রাইমার। একটি শিশু সাদা কাগজের উপরে কোন পথে কলম বুলিয়ে জন্ম দেবে একটি অক্ষরের, সেই ভেক্টরের দিকনির্দেশ লুকিয়ে আছে ছাপা হরফের ডিজাইনিং-এর মধ্যে। ‘সেই সময়’ উপন্যাসে নবীনকুমারের হাতেখড়ির প্রসঙ্গটি একবার ফিরে দেখা যেতে পারে। বিদ্যাসাগর নবীনকুমারকে কোলে বসিয়ে বলছেন –

‘তোমার মুক্তার মতন হস্তাক্ষর হোক। এসো দিকি, আমরা দুজনে মিলে একটু লিখি।

বালকের হাতে পেন্সিল ধরিয়ে দিয়ে নিজেও তার হাতটি চেপে ধরলেন। তারপর বললেন, প্রথমে ওপর থেকে নীচে এই একটা সোজা দাগ। এই, এই! তারপর বাম দিকে তেকোণা করে দুটো দাগ। এই, এই, এই! এবার কী হলো? ঘুড়ি দেখেছো তো? ছেলেরা মাঠে যে ঘুড়ি ওড়ায়? এই হলো একটা ঘুড়ির অর্ধেক, তাই না, এবার ডানদিকে একটা শুণ্ডি, এই! এবার কী হলো? এর নাম ক!

নবীনকুমার বললো, ক!

দুর্গাচরণ বললেন, ও কি, ঈশ্বর, আগে অ আ না লিখিয়ে প্রথমেই ব্যঞ্জনবর্ণ ধরালে?

ঈশ্বরচন্দ্র বললেন, ওতেই হবে। প্রথম দিন কিছু একটা লিখলেই হয়। অ-এর চেয়ে ক লেখা বালকদের পক্ষে সহজ।’

উপরের উদ্ধৃতির শেষ বাক্যটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বিদ্যাসাগরের মুখে বসাচ্ছেন বটে, কিন্তু ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ভাগের ১৮৫৮ সালের সংস্করণেও দেখছি বিদ্যাসাগর প্রথম শব্দপরিচয় করাচ্ছেন সেই ‘অ’ দিয়েই – ‘অথ’। তখনও অ-এ অজগরের তেড়ে আসতে দেরি আছে। এই প্রসঙ্গ মুদ্রণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, বরং প্রাইমারের ভাষাতাত্ত্বিক আওতায় পড়তে পারে, তবু এখানে উল্লেখ জরুরি। উপন্যাসের চরিত্র বিদ্যাসাগরের উক্তিটিকে বরং সমর্থন করছে ১৩৪৮ সনে লেখা অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেনের একটি বই – ‘বাংলা পড়ানো’। বাস্তবের বিদ্যাসাগরের শিক্ষণপদ্ধতির কিছুটা সমালোচনাই এখানে করছেন প্রিয়রঞ্জন সেন। প্রথমে বলছেন – ‘বর্ণপরিচয়ের ব্যাপারেই দেখা যাক। অজগর, ঈগল, ঋষি, উট, ৯কার প্রভৃতি শব্দে শিশুকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তাহার পরে আমরা তাহাকে শব্দ শিখাই, তাহার পর শব্দগুলি দিয়া বাক্য রচনা করি। ‘৯কার যেন ডিগ্‌বাজি খায়’, কি ‘অজগর আস্‌ছে তেড়ে’ – এসমস্ত আমাদের মুখে মুখে ছড়ার আকারে থাকে, যাহারা শিখিতে আসে তাহারা শিখিয়া যায় বটে, কিন্তু তাহাদের সঙ্গে ইহাদের জীবনে সত্যকার কোনও যোগ থাকে না।’ এরপর আরেক জায়গায় বলছেন – ‘যে সমস্ত অক্ষর দেখিতে খানিকটা একরকম, সেই সমস্ত অক্ষরই প্রথমে লিখিতে হয়। যেমন ব সর্বপ্রথমে, তাহার পরে ক, র, ধ, ঝ, চ, ছ – ইত্যাদি।’ অর্থাৎ কি-না ওই পদ্ধতি – ‘ঢ’ লিখে ফোঁটা দিলে ‘ঢ়’ তারে কয়, ‘ঢ’য়ে টিকি টেনে দিলে ‘ট’ হয়ে রয়! একই পদ্ধতি কিছুটা অনুসৃত হতে দেখি বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রথম শ্রেণির পাঠ্য, আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তিতে ছাপা সুদৃশ্য রঙিন ‘আমার বই’-তেও। নামকাওয়াস্তে শুরুতে আমাদের প্রচলিত বর্ণমালা গোটাটা থাকলেও প্রকৃত প্রস্তাবে বর্ণ চেনানো শুরু হচ্ছে ‘ব’ দিয়ে। ‘ব’-এ বক দেখিয়ে।

ছাপাছাপি থেকে সরে এসে এই প্রসঙ্গে ঢুঁ মেরে নিলাম এই কারণেই যে প্রাইমারের ক্ষেত্রে অক্ষর চেনার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। তা-ই যদি হয়, অর্থাৎ ‘কগনিশন’-ই যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তা হলে সেই মুদ্রিত হরফগুলি দেখতে কেমন বা তাদের ছাপা হচ্ছে কীভাবে, কোন পাতাটি ব্লকযোগে আর কোনগুলি টাইপ সাজিয়ে, কিংবা পরবর্তীতে কীভাবে ছবিই-বা ব্যবহার হচ্ছে – প্রাইমারের মুদ্রণ সংক্রান্ত এইসব খুঁটিনাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত নয়। জেমস লঙের তালিকা অনুযায়ী প্রথম বাংলা প্রাইমার ছাপা হচ্ছে ১৮১৬ সালে, শ্রীরামপুরে। বইটির নাম ‘লিপি ধারা’। বারো পাতার বইটিতে ক্যারেক্টার ছিল ৭৬০টি। সে প্রসঙ্গে লং লিখছেন – ‘The alphabet is given according to the shape of the letters thus, those angular are put together’। কাজেই, এটুকু বোঝা যায় – বলা নয়, দেখাই প্রাধান্য পাচ্ছে প্রথম বাংলা প্রাইমারেও। ‘বর্ণপরিচয়’-এর আগে অন্তত দু-টি বাংলা প্রাইমারের সন্ধান তো মিলছেই যেখানে ছবির ব্যবহার হয়েছিল – ‘শিশু চিত্র’ ও ‘বর্ণমালা’। বাংলা প্রাইমারের এই দেখনরূপ বাস্তবে কোন মাত্রায় মুদ্রণ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল তার সবিস্তার আলোচনার জন্য আরও গভীর গবেষণা ও বিস্তৃত পরিসর প্রয়োজন। আপাতত সংক্ষেপে বাংলা প্রাইমার সম্পর্কিত কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে –

  • ১৮৭৮ সালে তিন খণ্ডে প্রকাশ পাচ্ছে দুর্গাচরণ গুপ্তের ‘গুপ্তপ্রেস বর্ণমালা’। ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরির ১৮৮৬ সালের ক্যাটালগে এর উল্লেখ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ‘বাংলা প্রাইমার সংগ্রহ’-এ বইটির অভিনবত্বের কথা বলছেন আশিস খাস্তগীর। তিনটি খণ্ডেরই প্রতি পাতায় রয়েছে মাত্র একটি করে বর্ণ! এবং সেগুলি বিশাল আকারে ছাপা। প্রথম ভাগে স্বরধ্বনি, দ্বিতীয় ভাগে ব্যঞ্জনধ্বনি এবং তৃতীয় ভাগে সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি। বেঙ্গল লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান উইলিয়ম ললার এই ‘গুপ্তপ্রেস বর্ণমালা’ প্রসঙ্গে বলেছিলেন – ‘a novel kind issued for the first time in Bengali’!
  • কেবল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদনমোহন তর্কালঙ্কার বা রামগতি ন্যায়রত্নের মতো পণ্ডিতরাই নন, বাংলা প্রাইমার নির্মাণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ কিংবা অবনীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ কিংবা নন্দলাল। ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবে যাঁদের যোগ্যতা প্রশ্নাতীত। প্রাইমারের নান্দনিক দিকটি যে এসব ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পাবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
  • ‘বর্ণপরিচয়’ প্রকাশের দশ বছর পর, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫, খ্রিস্টান এডুকেশন সোসাইটি-র সেক্রেটারি জন মারডক একটি লম্বা চিঠি লিখছেন বিদ্যাসাগরকে। তাতে ‘বর্ণপরিচয়’ ও বাংলা ভাষা সংক্রান্ত নানা সমস্যা, সংশোধনের নানা প্রস্তাব উঠে আসছে। চিঠিটির শিরোনাম ছিল – A Letter On BENGALI PRINTING!
  • বিদ্যাসাগরের অবদান কেবল বর্ণমালার সংস্কারেই ছিল না, তিনি ছাপাখানার সংস্কারেও সচেষ্ট হয়েছিলেন। এমনকী শ্রীরামপুরে পঞ্চানন কর্মকারের ভাইপো অধরচন্দ্রের বিখ্যাত অধর টাইপ ফাউন্ড্রির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগের কথা শোনা যায়। এহেন বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ খতিয়ে দেখলেও মুদ্রণ সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন জাগতে পারে। একটি নমুনা থাক –

আমরা জানি, হালেদের বইয়ে প্রধানত দু-রকম বাংলা ‘র’ ব্যবহৃত হয়েছিল। ফুটকি-ওলা ‘র’ এবং পেটকাটা ‘ৰ’। ক্রমে পেটকাটা ‘ৰ’-এর চল উঠে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই ‘বর্ণপরিচয়’-এও দেখি বিদ্যাসাগর ফুটকি-ওলা আধুনিক ‘র’ ব্যবহার করছেন। কিন্তু ধন্দ লাগে ‘বর্ণপরিচয়’-এর ‘র’-এ হ্রস্ব-উ (রু) ও ‘র’-এ দীর্ঘ-ঊ (রূ) দেখে। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় এই রূপগুলিতে তখনও তিনি পেটকাটা ‘ৰ’-ই ব্যবহার করছেন। সেকালের কোনো-কোনো বইতে তখনও এমন নমুনা চোখে পড়ে। কিন্তু বিদ্যাসাগর পেটকাটা ‘ৰ’-এর নীচে কোথাও আবার ফুটকিও জুড়ে দিচ্ছেন! ‘বর্ণপরিচয়’-এর যে ফ্যাকসিমিলি ধরে এই কথা বলছি, তা পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত ‘বাংলা প্রাইমার সংগ্রহ’-র অন্তর্ভুক্ত। প্রথম ভাগটি ১৮৫৮ সালের একাদশ সংস্করণ ও দ্বিতীয় ভাগটি ওই বছরেই প্রকাশিত অষ্টম সংস্করণ। মজার কথা হল, এই দ্বিতীয় ভাগের শুরুতেই ‘বিজ্ঞাপন’ অংশে ‘শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা’ ব্যবহার করছেন ‘গুরু’ ও ‘সম্পূর্ণরূপে’ শব্দ দু-টি। ‘র’, ‘রু’ এবং ‘রূ’ কিন্তু সেখানে আজকের আধুনিক ফর্মেই রয়েছে!

প্রাইমারের মুদ্রণ বিষয়ক এমন ছোটোখাটো উদাহরণের তালিকা হয়তো আরও বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন গভীর নিরীক্ষণ ও সুচিন্তিত বিজ্ঞানসম্মত ধারাবাহিক গবেষণার। এতদিনে যে সেসব কিছু কিছু করে শুরু হয়েছে, এটাই আশার কথা। এক্ষেত্রে একটা বড়ো সমস্যাই তো হল কাঁচামালের অভাব। অধিকাংশ প্রাইমারেরই আজ কোনো হদিশ নেই। গত দুশো বছর ধরে কত অজস্র প্রাইমার বাংলায় ছাপা হয়েছে, কিন্তু আমাদের বিস্মৃতি আর অযত্ন আরও অনেককিছুর মতো সেসবও গিলে নিয়েছে। আমরা কেবল সাড়ম্বরে ভাষাদিবসের বাৎসরিক করে গিয়েছি, ‘মা মা’ করে বাংলা ভাষা নিয়ে নাকে-কেঁদে চলেছি। কাজের কাজ করার চেষ্টা করেছি কতজন? অথচ হিসেব কষে দেখলে গত বছরটা ছিল প্রথম বাংলা প্রাইমার ‘লিপি ধারা’-র দ্বিশতবর্ষপূর্তি। এই বছরটা মদনমোহন তর্কালঙ্কারের (১৮১৭-১৮৫৮)। ‘স্কুল বুক সোসাইটি’-রও দ্বিশতবর্ষ বটে। এমন সন্ধিক্ষণে বাংলা প্রাইমার ও তার মুদ্রণ নিয়ে আরও কাজ হোক, তাহলেই বোধ হয় ছেলেবেলা থেকে চিনতে চেষ্টা করা সেই অমর অক্ষরগুলি পুরোপুরি চেনা যাবে, ‘তাঁদের’ প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে।

***

SUSNATO CHOWDHURY

47/1 SASTITALA LANE, BHADRAKALI, HOOGHLY, PIN : 712 232, M: 93309 44442, E-mail : [email protected]

Tags
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami