শিল্প ও সাহিত্য

ডাক্তারবাবু আপনারা কিন্তু পড়েননি

সৌগত রায়বর্মণ

একবার এক ডাকসাইটে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আমার লিঙ্গ পরিচয়টাই প্রায় বদলে দিয়েছিল। ঘটনাটি কিন্তু সামান্য। বিশেষ কারণে আমার স্ত্রীর ইউএসজি করাতে বলেছিলেন এই ডাক্তারবাবু। বলেছিলেন পেশেন্টকে নিয়ে আসতে হবে না। রিপোর্ট নিয়ে আসলেই চলবে। আমি তাই করেছিলাম মাত্র। নির্দিষ্ট সময়ে তার চেম্বারের সামনে গিয়ে দেখি সিপিএমের ডাকা ব্রিগেডের প্রায় ৩ গুণ লোক, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ ত্রিভুজ হয়ে, কেউ ভুজঙ্গাসনে, কেউ বা বৃত্তাকারে শুয়ে বসে আছে। আমি এই দৃশ্য দেখে অতীব চমৎকৃত হয়ে পাশের এক গোমুখাসনে দণ্ডায়মান ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই কত নম্বর চলছে? তিনি আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন যেন তাকে গোপন কোনো রাষ্ট্রীয় তথ্য ভুল করে ফাঁস করতে অনুরোধ করে ফেলেছি। যাইহোক টাইম এন্ড স্পেসের জটিল ধাঁধাঁ কাটিয়ে শবাসনে একসময় ডাক্তারবাবুর মুখোমুখি হতে পারলাম। তারপর শুরু হল এক অলৌকিক কথোপকথন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি সটান বললেন, আপনার ইউটেরাস একটু ভারি, রাইট ওভারি লেফটের থেকে বড়। অপারেশন কিন্তু করতেই হবে। আমি বলতে গেলাম, স্যার তার আগে আমার স্ত্রীর সঙ্গে একটু কথা বলে নিলে ভালো হতো না?ডাক্তারবাবু তার কম্পাউন্ডারের দিকে তাকিয়ে বললেন, পেশেন্টকে একটা টিটেনাস দিয়ে দে আর ডেটটা বলে দে। নেক্সট?

সেদিন বিনা কারণে টিটেনাস নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল।

ডাক্তারবাবুদের নিয়ে এহেন কিছু লেখার আগে কাণ্ডজ্ঞানী তারাপদ রায় কে একবার স্মরণ করে নেওয়া উচিত। তার ডাক্তারবাবু সিরিজ বাংলা রসসাহিত্যের এক-একটি হীরকখণ্ড। মাতাল বা পাগলের কথা তো বাদই দেওয়া হল। তার ডাক্তারবাবু সংক্রান্ত একটি গল্প এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে।

পেশেন্টকে দেখেই ডাক্তারবাবু বলে উঠলেন, হার্টের অবস্থা খুব খারাপ। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করবেন না। এই ওষুধগুলো খাবেন আর এক মাস পর দেখিয়ে যাবেন। পেশেন্ট ঠিক এক মাস পর ডাক্তারের চেম্বারে এসে দেখা করলেন। ডাক্তারবাবু তাকে দেখে বলে উঠলেন, বাহ, চমৎকার আছেন দেখছি। ওষুধগুলো খেয়ে যান আর পরের মাসে এসে দেখিয়ে যাবেন। পেশেন্ট কাঁচুমাচু মুখে জিজ্ঞেস করল, স্যার এবার সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নামা করতে পারবো? তিনি বললেন, নিশ্চয়।পেশেন্ট হাঁফ ছেড়ে বলে উঠল, বাঁচালেন স্যার, এতদিন পাইপ বেয়ে উঠতে উঠতে জান বেরিয়ে যাচ্ছিল!

তারাপদ রায়ের আরেকটি গল্প বললে বোধহয় মন্দ হবে না। পেশেন্ট খুব স্থুলকায়। রোগা হতে চান। ডাক্তারবাবু খাওয়ার লিস্টি লিখে বললেন, রোজ দশ কিলোমিটার হাঁটবেন। এক মাস বাদে যোগাযোগ করবেন। পেশেন্ট মাথা নেড়ে সায় দিয়ে চলে গেলেন। ঠিক এক মাস বাদে একটা চিঠি এল ডাক্তারবাবুর কাছে। সেই পেশেন্ট লিখেছেন, স্যার আপনার কথা মতো রোজ দশ কিলোমিটার হাঁটতে হাঁটতে আজ আমি এলাহাবাদ এসে পৌঁছেছি, এবার বলে দিন কোনদিকে যাবো?

এসবই নির্মল গল্প। স্রেফ হাসির। কিন্তু বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে নানা রকমের ক্ষোভ-বিক্ষোভ আমাদের আছে। ডাক্তারের দেখা পাওয়া আর ভগবানের ইন্টারভিউ নেওয়া একই ব্যপার। আমার এক বন্ধুর ছেলে বাইক অ্যাক্সিডেন্টে বাঁ কানের শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে। বড় ইএনটি ডাক্তারের সাক্ষাৎকার পাওয়ার জন্য তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে ফোন করা হল। উত্তর এলো তিন মাসের আগে ডেট পাওয়া যাবে না। পেশেন্টের বাবা প্রায় কাঁদোকাঁদো গলায় বললেন, তাহলে? অ্যাসিস্টেন্ট ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলেন তাও তো এক কানে শুনছে! কতজন মাথার ঘিলু হাতে নিয়ে বসে আছে, ডাক্তারের দেখা পায় নি, তারা কি খারাপ আছে?

মুশকিলটা এখানেই। এমন সময় আসছে যখন ভিডিও কনফারেন্সে রুগী দেখা হবে। ক্যামেরায় জিভ ভ্যাংচাবে, চোখ মারবে। অনলাইন রুগী, অনলাইন ওষুধ। সেরকম দিন যে এসে গেছে তার একটা নমুনা পাওয়া গেল কদিন আগেই। আমার প্রতিবেশী এক লেডি সাইক্রিয়াট্রিস্ট একটা ভয়ংকর গল্প শুনিয়ে গেল। এক মহিলা‌ গেছেন তার চেম্বারে স্বামী কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। বেশ কিছুক্ষন চুপ করে মহিলার কথা শোনার পর সাইক্রিয়াট্রিস্ট জিজ্ঞেস করলেন, পেশেন্ট কোথায়? মহিলা ব্যাগ থেকে স্বামীর একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি বার করে বললেন, নিয়ে আসতে লজ্জা করছিল, লোকে যদি পাগল ভাবে, তাই একটা ছবি নিয়ে এসেছি, চোখের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন, কত বড় শয়তান লোকটা।

শেষ করার আগে গত শতাব্দীর একটা গল্প শুনিয়ে দিই। গ্রামের ডাক্তারবাবুর কাছে একটা লোক কাঁপতে কাঁপতে এসে হাজির। ডাক্তারবাবু বললেন, টাইফয়েড হয়েছে। লোকটি ভয়ে ভয়ে বলল, ডাক্তারবাবু আমার মাসতুতো ভাই নাদুকেও ওপাড়ার ডাক্তারবাবু টাইফয়েডের ওষুধ দিয়েছিল, আসলে হয়েছিল ম্যালেরিয়া, নাদু তো মরে গেল স্যার! ডাক্তারবাবু গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, আমি যদি টাইফয়েডের ওষুধ দিই, তুমি টাইফয়েডেই মরবে, ম্যালেরিয়ায় নয়।

দীর্ঘ ৪০ বছর গনমাধ্যমে কর্ম জীবন কাটিয়েছেন। সংবাদপত্র থেকে তথ্যচিত্র। তারপর বিজ্ঞাপন, সেখান থেকে টেলিভিশন। গোটা তিনেক বড় পর্দার ছবি বানিয়েছেন, ‘তবে তাই হোক’ তার সাম্প্রতিকতম ছবি। একটা উপন্যাস, একটা কবিতার বই আছে। এখন লেখালেখি এবং বই পড়ে সময় কাটানোতে মনোনিবেশ করেছেন।
Show More

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami