চলচ্চিত্র

ডকুমেন্টারি: তিনটি তথ্যচিত্র-শৌনক মজুমদার

ফিল্মফেস্টের ফিরিস্তি ৫

প্রতুলবাবু– দেবাশিস ঘোষাল নির্দেশিত ‘প্রতুলবাবু’ একেবারেই সাবজেক্ট নির্ভর expository গোত্রের ডকুমেন্টরি, সে তার গতের বাইরে পা ফেলতে একেবারেই রাজি নয় তাই দেরি না করে বেলাবেলি সাবজেক্টের পরিচয় দিয়ে রাখি- প্রতুলবাবু প্রোজেকশানিস্ট- এই তার জীবনের কর্ম, ধর্ম এবং সাধনা। মফস্বলের এবং শহর কলকাতার নানা সিনেমা হলে কাজ করে অবশেষে ঠাঁই নেন S.R.F.T.I তে। S.R.F.T.I-এর জন্মলগ্ন থেকে তিনি এই শিক্ষায়তনের সাথে যুক্ত এবং ২০১৫ সালে অবসর নিয়েছেন কর্মজীবন থেকে।

এই ডকুমেন্টরি ছবিতে তিনি নিজের যাপনের নানা চালচিত্র তুলে ধরেছেন। একেবারে নিজের ছেলেবেলায় নিজভূমি অশোকনগরের পরিত্যক্ত এরোড্রাম দেখার অভিজ্ঞতা থেকে কৈশোরের ১৩ পয়সা কোনোমতে জমিয়ে তাঁবুতে ফিল্ম দেখা: সবই যত্নে তুলে ধরা আছে এই ছবিতে। দর্শককে বিশেষ ভাবে অবাক করবে প্রতুলবাবুর প্রোজেকশানিস্ট হয়ে ওঠার গল্প, তাঁর সংগ্রাম। আরো সমীহ উদ্রেক করে নেন তিনি যখন তাঁর কথায় উঠে আসে তাঁরই মতন আরো অনেক প্রোজেকশানিস্ট-এর কাহিনী-তাদের এবং সিনেমার মধ্যের অর্থনীতি আজ যা চাপা পরে গেছে পুরু ধুলোর তলায়। এরকম আরো অনেক আবরণ ছেড়ে আসতে আসতে বেরিয়ে আসতে থাকে নানা কথা, বেরিয়ে আসতে থাকেন মানুষটা। প্রতুলবাবু সশরীরে হাজির থাকা সত্ত্বেও ছবিটির শট নেওয়ার ধরন ভালো লাগে না। কিছুটা অযত্ন চোখে পরে। প্রতুলবাবুর আবেগের সাথে তার টেকনিকাল জ্ঞানের ভান্ডার যেমন শ্রদ্ধা জাগায়, বিরক্ত করে তার নস্টালজিয়ার প্যানপ্যানানি। তবে সমস্যা ততটা সাবজেক্ট নিয়ে নয় যতটা ফর্ম নিয়ে। তাছাড়া প্রতুলবাবুকে চেনে এরকম লোকেদের কথা (ইন্টারভিউ) তেমন ভাবে কেন রাখা হলো না বোঝা গেল না, দরকার ছিল।“কি করে একটা বোকাবাক্স একসঙ্গে এতো মানুষকে বসিয়ে রাখতে পারে তাই ভাবতে থাকি সারাক্ষন।” প্রতুলবাবুর এই ভাবনা কে কুর্নিশ জানানো ছাড়া অবশ্য উপায় নেই।

রঙ্গভূমি ভালোবাসি– এই ছবিটির নামকরণ সার্থক। গিরিশ ঘোষের লেখনী থেকে কিছু অংশ নিয়ে এই নামকরণ। সার্থক, কারণ এই তথ্যনিষ্ঠ ডকুমেন্টরিটি রঙ্গভূমির এক কান্ডারি কে নিয়ে যিনি কিনা রঙ্গমঞ্চে গত পাঁচ দশক ধরে অটল। নাটক,নাটককার আর নটদের প্রতি আপামর জনতার যে উদাসীনতা তাতে মনে হয় এরকম কাজ অনেক বেশি হওয়া উচিত। এধরনের কাজ যেমন হয় ঠিক সেভাবেই এগিয়েছে এই ছবিটি-ঘনিষ্ঠ লোকেদের দেওয়া ইন্টারভিউ এর ভিত্তিতে। অশোক মুখোপাধ্যায় যিনি এই ছবির বিষয় তাঁর মূলত নাট্যজীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত উঠে এসেছে বন্ধু পরিচালক বিভাস চক্রবর্তী, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মায়া ঘোষ, অভিনেতা চিন্ময় রায়, মেঘনাদ ভট্টাচার্য, চন্দন সেন, ব্রাত্য বসু এরকম নানা নাট্যব্যক্তিত্বের কথপোকথনে। তাঁর অজিতেশের মতন মহীরুহের সান্নিধ্যে আসা , তারপর ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা, তাঁর অধ্যাপনা জীবন, সত্তরের উত্তাল সময়ে প্রিয়জন সত্যেন মিত্রের খুন হওয়া, নিজেদের দল থিয়েটার ওয়ার্কশপের হয়ে নানান যুগান্তকারী প্রযোজনা এসবই উঠে এসেছে নানাজনের স্মৃতিচারণায়। তবে এটা প্রশংসার দাবি রাখে বিশেষ ভাবে যে পরিচালক শুধু স্মৃতির ওপর ভরসা না করে সেই সকল প্রযোজনার ফুটেজও ব্যবহার করেছেন।

প্রত্যেকের কথায় বারংবার উঠে আসে কিভাবে দীর্ঘ দিনের পড়াশুনো, অধ্যাবসায় ধীরে ধীরে অশোকবাবু নাট্যজগতের এক বলিষ্ঠ মননশীল মানুষ হয়ে উঠেছেন। ‘চাক ভাঙা মধু’-র প্রস্তুতিতে গ্রামীণ ডায়ালেক্ট রপ্ত করার জন্য ৪০টা সিটিং রিহার্সালের কথা শুনে চমকে যেতে হয়। তেমনি অবাক করে শুনি সেই সময়ে দাঁড়িয়ে ‘বেড়া’-এর মতন প্রযোজনা করার কথা।বাংলায় বর্তমানে সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিক থিয়েটারের চর্চা নেই বললেই চলে, বাংলা সিনেমার মতন এখানেও সবাই এক গোয়ালের গরু হয়ে উঠেছে। পানু পাল, উৎপল দত্তের রাজনৈতিক থিয়েটার-এর এক সার্থক extension ছিলেন অশোকবাবু , সেই কথা এখানে তুলে ধরাতে এই ছবিটি অন্য মাত্রা পায়।তবে talking heads শুট করার সময় লাইট অনেক জায়গায় ঠিক পড়েনি আরেকটু evenly lit হওয়া উচিৎ ছিল। এছাড়া ছবির প্রথম অংশে যে মন্তাজ ব্যবহার করা হয়েছে তাও নিষ্প্রোয়জন বোধ হয়। ইন্টারভিউ গুলো জোড়ার সময় যেভাবে ‘dissolve effect’ ব্যবহার করা হয়েছে তা অতীব বিরক্তিকর। তবে কারিগরী কয়েকটা বিষয় বাদ দিলে এ ছবিকে নিঃসন্দহে রসোত্তীর্ণ বলা যায়। আর কিছু না হোক অন্তত নাট্যমোদীদের দের জন্য এই ছবির ব্যপক স্ক্রিনিং করা উচিৎ।

An Engineered Dream – আই.আই.টি প্রবেশিকা পরীক্ষায় সাফল্যের হার ০.৭% , এই পরিসংখ্যান এম.আই.টি ও হার্ভাড কেও পিছনে ফলে দেয়। শুধুমাত্র এই বাক্যটাই ভীতি প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট। এই ভয় কেই পুঁজি করে ৮০-র দশকে ব্যবসায় নেমেছিল রাজস্থানের কোটা। আজ সেই কোচিং ব্যবসার বার্ষিক টার্ন ওভার ১৫০০ কোটির ওপর। প্রতিবছর ১.৫ লক্ষ্যের বেশি ছাত্র এই শহরে আসে। গড়ে ১৫ জন এই অস্বাভাবিক চাপ না নিতে পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এই সবের অনেকখানি আমাদের জানা, এই চেনা বিষয় নিয়ে ডকুমেন্টরি করেছেন হেমন্ত কুমার গাবা। তিনি বেছে নিয়েছেন সুরাজ, আলি, শুভা আর সাসওয়াত কে। এরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে উঠে এসেছে। এদের সামাজিক অবস্থান বিভিন্ন।সবচেয়ে জরুরী ভিন্নতা অন্তত এই ছবির নিরিখে হলো তাদের মেধায়। মোটামুটি ভাবে বলা যায় সুরাজ মেধাবি ছাত্র, আলি পরিশ্রমি, শুভা ও সাসওয়াত একটু দুর্বল। পরিচালক ছবিতে এদের পর্যবেক্ষণ করে গেছেন। এদের দেখতে দেখতে আমরা কোটা-র ছাত্র জীবনের রোজনামচার সাথে পরিচিত হই। শুভা আর সাসওয়াত দুর্বল ছাত্র তাই ওদের নানা বন্ধুদের সাথে আমাদের আলাপ হয়; আলি আর সুরাজ ভালো ছাত্র তাই কোটার লজিকে ওদের কোনও বন্ধু নেই -এসবের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে এগোই আমরা। বিষয়গত দিক দিয়ে দেখলে ‘Placebo’ ডকুমেন্টরির (এইসমস-এর এক ছাত্রের আত্মহ্ত্যা নিয়ে সেই ছবিটি) সাথে এর অনেক মিল পাই। তবে পরিচালক তার মাস্টারস্ট্রোক দেন সাসওয়াতের হাতে তোলা হোম ভিডিওর ফুটেজ ব্যবহার করে। এখানেই ছবিটা কিছুটা participatory গোত্রের হয়ে পরে। রাণু ঘোষের ‘Quarter No 4/11’ এবং ওয়ার্নার হারজগের ‘Grizzly Man’ এর সাথে এক আসনে বসে পরে ছবিটা। সুরাজের পরিবার কোটায় তার সাথে থাকে, এই পরিবারকে পরিচালক খুবই দক্ষতার সাথে শুট করেছেন। এই পরিবারে বাবা-ই সব কিছুর হর্তা,কর্তা,বিধাতা। বাবা ছেলেকে সকাল সকাল মিথ্যা বলতে শেখান, ছেলের ভবিষ্যত পঞ্জিকা নিক্তিতে মেপে ঠিক করেন আর মা শুধু রুটি বেলার জন্য বসে থাকেন; এখানে পরিচালক পুরুষতন্ত্রের মুখোশটা ধরে আচ্ছাসে টান মারেন। ‘আই.আই.টি-র কোচিং নিচ্ছ তাহলে বোর্ড-এর পরীক্ষার কি হলো?’ এই প্রশ্নের উত্তরে সুরাজের তোতলানো আর বাবার সামাল দেওয়া, এই অংশ দেখিয়ে পরিচালক এক বৃহত্তর জালিয়াতির ইঙ্গিতও দেন দর্শককে।ডকুমেন্টরি ছবিতে এতো নান্দনিক ড্রোনের ব্যবহার বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। এরপর একদিন একটা ধুলোর ঝড় আসে এবং সঙ্গে নিয়ে আসে প্রবেশিকা পরীক্ষা। পরীক্ষায় ৪ জনই নিজ নিজ ক্ষমতা অনুযায়ী পরফর্ম করে এবং সুরাজ ছাড়া কেউই আশানুরুপ ফল করতে পারে না।সুরাজ-এর সাফল্যে তার মাস্টারমশাই আর বাবার উল্লাস নৃত্য আর সমগ্র ব্যান্ড-বাজা’র দৃশ্যায়ন বিশেষ কৌতুক রসের সৃষ্টি করে। রেজাল্ট আর পজিশন বেরোলেই অবধারিত জাতের হিসেব বেরিয়ে পরে, এখানেও তার সুচারু ইঙ্গিত দেন পরিচালক। গোটা ছবিটাই সাবজেক্টদের না ঘেঁটে এমন এক জায়গা থেকে শুট করা যা বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে। এছাড়া ডকুমেন্টরিতে কিভাবে মিউজিক ব্যবহার করা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই ছবিটি। ভারতীয় ডকুমেন্টরি চিত্রে এরকম ছবি বস্তুতই বিরল। অবশ্যই দেখা উচিৎ। সবশেষে ছবির একদম প্রথম দৃশ্যে ফিরে যাই, বসুন্ধরা রাজে কোটার ছাত্র ছাত্রী দের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন, উপস্থিত আছেন ‘Art of living’ এর রবিশঙ্কর তিনিও ছাত্রদের নানা উপদেশ দিচ্ছেন, এমন সময় একজন প্রশ্ন করলো , “এখানে বড়ো একা লাগে কি করবো?” তার প্রশ্নের উত্তর আর শোনা হলো না তা চাপা পরে গেল হাততালির শব্দে।

 

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami