রাজনীতি
Trending

ট্রিপল মার্ডার মিসট্রি এবং ছত্রপতির ঘোড়া

অভিরূপ সেন

ট্রিপল মার্ডার মিসট্রি এবং ছত্রপতির ঘোড়া

অভিরূপ সেন

বাঙালির ভূতবর্তমানভবিষ্যৎ সাধারণত প্রেডিক্টেবল হয়ে থাকে, বা বলা যায় চমক সেভাবে থাকে না। যেমন এই যে আশৈশব শুনে আসছেন নেতাজী একদিন ফিরে আসবেন এবং ধরা যাক ফিরেও এলেন, সেক্ষেত্রে আপনার প্রথম রিঅ্যাকশন হবে ‘ও আচ্ছা, শেষমেশ ফিরে এলেন তাহলে। জানতাম, এক দিন না একদিন ফিরে আসবেন’। বাঙালি ভাবতে ভালবাসে জীবন হল পাঁচের ঘরের নামতা। পাঁচ এক্কে পাঁচ , পাঁচ দুগুণে দশ ,বস, এভাবে যদি দশটা পাঁচটার বাঁধা গতে  পাঁচ ষোলং আশি কাটিয়ে  দেওয়া যায় তবে ক্ষতি কী ? তবে নেতাজীর বদলে শিবাজী ফিরে এলে খানিকটা চমকাতে হয় বইকি।

ফ্যাক্টস আর স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। ট্রাফিক সার্জেন্ট হরধনু মণ্ডলের সেদিন ডিউটি পরেছিল হাজরা মোড়ে। রাত তখন দুটো।হঠাৎ দেখলেন ঘোড়ায় চরে ক্রসিং পার হচ্ছে এক বহুরূপী। পরনে শিবাজী কস্টিউম। ইতিহাসের বই বা সিরিয়ালে যা দেখেছিলেন অবিকল সেইরকম, মানে ডিট্টো। হরধনু মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশন, ইতিহাসে ৬৮। পথ আটকে দাঁড়ালেন

– এই যো ফেক প্রোফাইল ? এত রাতে কোথায় ? কী কেস বাপ !

ডামি শিবাজী আগুনে চোখে হরধনুর দিকে তাকালেন একবার , তারপর ঘোড়ার দিকে । ঘোড়া বলে উঠলো

– দেখুন বস , ফালতু আই ডোন্ট নো এনিথিং লুক দেবেন না । পই পই করে বলেছিলুম চাইনিজ ফোন নেবেন না। তখন শুনেছিলেন কথা ? দুদিনে মাল খারাপ হয়ে গেল তো ? এখন আপনি বলুন হরধনু বাবু , জিপিএস ছাড়া কোন ঘোড়ার পক্ষে এতদূর ট্র্যাভেল করা সম্ভব ? এতক্ষণে মহারাষ্ট্রে পৌঁছে যেতাম। এখন বোঝো ঠ্যালা। ইতিহাসের পেটে বর্তমান, ভূগোলের পেটে ভূগোল, গোলপার্কের পেটে সেঁধিয়ে যাচ্ছে রামনীথি। তার ওপর চোখে আবার স্বচ্ছ ভারত ঠুলি। স্বচ্ছ দেখতে চাইলে ভারত দেখা যাচ্ছে না , আবার ভারত দেখতে চাইলে স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছে না।

হরধনু এর আগে টকিং ঘোড়া দেখেননি।  বড়লোকের ঘোড়ারোগ দেখেছেন , ঘোড়া দেখলে খোঁড়া রোগ দেখেছেন, বাট টকিং ঘোড়া ! নো , নেভার। জীবন নামক হরধনু  নিয়েই বেচারা জেরবার , শালা কবে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছেন , নট নড়নচড়ন , নো কিচ্ছু। এর উপর টকিং ঘোড়া? মধ্যরাতে ফাজলামো ? ভ্যানচো ! তবে দিন দুয়েক আগে ঘটে যাওয়া রামনবমীর কেসটা হঠাৎ মনে  পড়ায় প্রচন্ড রাগ শেষ মুহূর্তে বাউন্ডারি লাইনে ঝাপ দিয়ে সেভ করলেন। দিনকাল ভালো নয়। সেফ খেলাই ভালো।

বাড়ি কোথায় ?

ঘোড়া এক নিশ্বাসে বললে – ‘হেভেনলি অ্যাবোড’ , ফ্ল্যাট নাম্বার ৯৮৭৬৬৬৮৮৯০ , পিন কোড – ০০০০০০০ । এটা ওনার। আমি ওনার প্রাইভেট সোফার , তবে রাষ্ট্রীয় আস্তাবলে থাকি।যখন উনি বাড়ি থেকে দিনের পর দিন বেরোন না , তখন ‘ ডায়াল আ ঘোড়া সার্ভিসে’ খেপ খাটি। ফর ইউর কাইন্ড ইনফরমেশন মাই ড্রাইভিং লাইসেন্স নাম্বার ইজ…

এখানে আসার কারণ?

-( অস্ফুটে ‘ ভোঁসরি কে’ ) আপনি ট্র্যাফিক সার্জেন্ট না ইমিগ্রেশন অফিসার ?

এই যা বলছি উত্তর দাও।

বেশ। টু সলভ ট্রিপল মার্ডার মিসট্রি – ডাবোলকার, পানসারে , এবং কালবুর্গি।

মার্ডাররররর!!! এই , এই ফেক প্রোফাইল , নাম ঘোড়া থেকে্‌, নাম বলছি

শিবাজী ঘোড়া থেকে নামেন না । দু চোখে উথলে ওঠা বিষণ্ণতা সামলে নিতে নিতে বলেন

– জানো , পানসারে একটা বই লিখেছিল মারাঠিতে , ‘শিবাজী কন হোতা?’, বইটা আটটা ভাষায় অনুবাদ হয় , বহুবার রিপ্রিন্ট হয়। দক্ষিণপন্থীদের প্রচারের ঠেলায় সাধারণ মানুষের কাছে আজ আমার পরিচয় কী? একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজা, যে মুসলিম আগ্রাসনের থেকে হিন্দুদের রক্ষা করেছিল। কী, তাই তো ? যখন সত্যি হচ্ছে এই যে আমার দেহরক্ষী, প্রধান সহকারী, প্রধান সেনাপতি সহ সৈন্যদলের এক তৃতীয়াংশ ছিল মুসলিম । পানসারের বইতে এই সব তথ্য ছিল । ২০১৫ র ১৬ ই ফেব্রুয়ারি পানসারে আর ওঁর বৌ উমা যখন মর্নিং ওয়াকে বেরোয় তখন দুজন দুষ্কৃতি মোটরসাইকেল এসে প্রায় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পাঁচবার গুলি করে। নিতান্তই এলেবেলে গুন্ডা , শার্প শুটার নয়। কারণ পানসারের গায়ে তিনটে গুলি লাগে। চার দিন পরে ওনার মৃত্যু হয়।ডাবোলকার আর কালবুর্গির মার্ডার এর প্যাটার্নটাও একই রকম। সেই মর্নিং ওয়াক, মোটরসাইকেল এবং পয়েন্টব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি।

হরধনু বলে – অ , তো এদিকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? ফেলু মিত্তিরের বাড়ি?

ঘোড়া ফ্যাচ করে হেসে বলে

– না। এল কে ডি । যেখানে সব বাঙালি যাচ্ছে।

– মানে?

– আরে এল কে ডি জানো না ? খিক খিক ! (ই)লোড়া কা দকসিন , তারপরে অজন্তা সে উত্তর । উফ, মাই ইউ পি রুট ! মা মারাঠি হলেও , বাবা ছিল ইউ পি’ র। আই বেগ ইয়োর পার্ডেন , মাস্টার !

– এই ‘ডাবল মিনিং , চোওওওপ , আইডি প্রুফ দ্যাখা !

হঠাৎ শিবাজিকে বিচলিত দেখায়। খাপ থেকে তলোয়ার বের করে সাঁই সাঁই শ্যাডো প্র্যাকটিস করেন । বিড়বিড় করে বলেন – আবার , উফ আবার

ঘোড়া বলে – এই রে ! চেতন ভগত আবার নিশ্চয় কোনো হাবিজাবি টুইট করেছে ।

হরধনু বলে – এ কী ? এ কী ? প্রকাশ্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘুরছেন। আপনি কী আর এস এস নাকি মশায় ?

শিবাজী – উড় উড় কে মারনে ম্যায় সুপারম্যান হুঁ , লটক লটক কে মারনে ম্যায় স্পাইডারম্যান হুঁ , ঢুন্ড ঢুন্ড মারনে ম্যায় ব্যাটম্যান হুঁ

ঘোড়া বলে – আরে থামুন থামুন , কী কচ্চেন? এটা রজনীকান্তের শিবাজী , আপনি বরং গিরীশ ঘোষ থেকে কোট করুন

শিবাজী – অ , মিস্টেক মিস্টেক , ইসে , ষষ্ঠ , হ্যাঁ তাই হবে ,  ষষ্ঠ গর্ভাঙ্ক । এখানে আমি বলছি ‘যে স্বাধীনচেতা তার হৃদয়ে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ নাই। ভেদবুদ্ধি কাপুরুষের হৃদয়ে, কাপুরুষে হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ করে । সে ভেদাভেদ স্বাধীন মহারাষ্ট্রে নাই ।  তোমরা জনে জনে ওদের লয়ে এসো , আমি ওঁদের পুত্র সম্বোধনে সম্ভাষণ করবো’।

ঘোড়া – বুঝলুম । কিন্তু স্যার , সনাতন সংস্থার কাগজ ‘সনাতন প্রভাত’ অন্য কথা লিখছে । ওঁদের ‘কলিযুগ বর্ষ ৫১১৯’ সংখ্যায় এরা লিখছে , শুধুমাত্র ‘ক্ষাত্রতেজ ’ দিয়ে কার্যসিদ্ধি হবে না , এর জন্য  ব্রহ্মতেজ ও দরকার। এই যে সার্জেন্ট তুমি হরধনু তুলতেই পারছো না ,কারণ তোমার আধ্যাত্মিক তেজের লেভেল হচ্ছে ২০। যেদিন তুমি ৮০% লেভেলে পৌঁছে যাবে সেদিন ‘ক্ষাত্রতেজ’ আর ‘ব্রহ্মতেজ’ এর পারফেক্ট মিশেলে হরধনু তুমি পাটকাঠির মতো অনায়াসে তুলে নেবে। আর  ৮৬ শতাংশ স্পিরিচিউয়াল লেভেল পেরিয়ে গেলে হাত পায়ের নখে ফুটে উঠবে ওঁ , শরীরের থেকে ঠিকরে বেরোবে দিব্যবিভা , স্রেফ ব্রহ্মতেজের জোরে রামনাম লেখা বুলেট খুঁজে নেবে টার্গেট। এঁরা লিখছে মুসলিম জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০৫০ এ ভারতবর্ষ ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে আর তাই তাঁদের লক্ষ্য ২০২৪ এর মধ্যে হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এই রেফারেন্সে স্যার, আপনার নাম এসেছে। বলা হয়েছে শিবাজীকে দেখো, মা ভবানীর পুজো করতেন, সদা মা জগদম্বার নাম জপ করতেন , সৈন্যদলের স্লোগান ছিল ‘হর হর মহাদেব’ , সন্ত তুকারাম আর রামদাস স্বামীর আশীর্বাদ ছিল ওনার উপর , আর তাই শুধু ‘ক্ষাত্রতেজ’ নয় , আধ্যাত্মিক তেজেও বলিয়ান হয়ে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বাঘা বাঘা নৃপতিদের ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন ।

–  সেকীইইই !!! ভোঁ

–  নো ,স্যার , নেভার ! এ ভুল করবেন না  । আপনি পাবলিক ফিগার।  তারপর গণেশ জোশি আমার ঠ্যাং ভাঙ্গুক। দিনকাল ভালো নয় স্যার। দেখছেন না ,ইভোলিউশনে যারা  পিছিয়ে পড়েছিল সেই তাদেরই  দিকেদিকে পুজো আচ্চা চলেছে। জয় বজরংবলী। রামালালা তুম মত ঘবরানা হাম তুমহারে সাথ হ্যায়। হাম তুমহারে সাথ হ্যায়।

–  এখন প্রশ্ন  একটাই ‘ হোয়াট ইজ টু বি ডান”

–  নাথিং স্যার। কামুর ‘ মিথ অফ সিসিফাস’ পড়েছেন ? ডাবোলকার , অভিজিৎ ,পানসারে , কালবুর্গিরা হলেন সেই আহাম্মক যারা  পাথর ঠেলে পাহাড় চূড়ায় উঠছেন,পাথর স্রেফ স্বভাব দোষে  গড়াতে গড়াতে নিচে নেমে আসছে। কিন্তু ওনারা হাল ছাড়ছেন না। দেখুন স্যার সকাল হচ্ছে। ‘এই নভোমণ্ডল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ’। ভয়ে কুঁকড়ে থাকা হিম নীলাভ ভারতবর্ষ। সামনের রাস্তায় চাপ চাপ রক্ত। ‘আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে’। যুক্তিবাদের তুলসীমঞ্চে ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করছে স্বদেশ। কিষ্কিন্ধাকান্ডের কথা মনে করুন স্যার। বালি

একের পর এক অভিযোগ করে যাচ্ছেন , করে যাচ্ছেন । রামচন্দ্র শুধু বললেন ‘ ভুলে যাস না , এই ভারত ভূমি আমার , শুধু আমার ,এটা রাম ভূমি , চল এবার ফোট’।

আঁকিল – অর্জুন / অনুষ্টুপ

Tags
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker