স্মৃতিচারণ

গগাইয়ের গল্প বলতে আর লাইভ হবেন না প্রতীক চৌধুরী

সোহম দাস

সেএকনতুনসময়।নতুন সহস্রাব্দ, নতুন শতাব্দী, নতুন দশক-সব বিভাগেই নতুনের আবাহন। আশা-ভরসার উৎপত্তি এই নতুনকে ঘিরেই। সেই সময়টা, যখন অল্প অল্প খোলা হাওয়া এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে শৈশব-নিকেতনকে। সে এক মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাদের কিশলয়-বয়সের বিকশিত হওয়ার টাইমলাইন। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের সকালবেলা রোদ্দুর তখন শুধু মাটিতে নয়, পা ফেলত আমাদের ভাড়া-ঘরের জানলাটা দিয়েও। অনধিকার প্রবেশের তোয়াক্কা না করে চলে আসত সে। রশ্মির সরলরেখায় দেখতাম অজস্র উড়ন্ত ধুলোর ভিড়। এই ভিড়ের আবহেই অলস দুপুরে খুলে ফেলতাম টেপ রেকর্ডারের ক্যাসেট ঢোকানোর দরজাটা। খোপের ভেতরের অন্ধকারটাকে আলিবাবার গুহার থেকেও রহস্যময় মনে হতো মাঝে মাঝে। যাই হোক, সেই রহস্যের মধ্যে থেকেই গেয়ে উঠতেন অন্তরা চৌধুরী।‘ছুক ছুক রেলগাড়ি’ কিংবা ‘এক যে ছিল মাছি’।

ওই মস্ত রেকর্ডারটার সাথে আমার যেন কী এক সখ্যতা তৈরি হয়েছিল। এফএম, রেডিও, ক্যাসেট-এই ত্রিকোণপ্রেমের কমফর্ট জোন থেকে বেরনোর আশ্রয়স্থল বলতে সদ্য কেনা ফিলিপ্সের রঙীন পর্দা। আমার অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট কিংবা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের বাইরেও চ্যানেল ছিল। দূরদর্শনের প্রতি আজন্ম টান তৈরি হয়েছিল যে প্রজন্মের, তারা তখন যৌবনোত্তীর্ণ হওয়ার সরণিতে। জন্মভূমি, রূপকথা বা রঙ্গরসের দর্শকমহল তখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর এই সাবেকিয়ানার পাশেই জায়গা করে নিচ্ছিল ইটিভি বা আলফার মতো কিছু টিটোয়েন্টি ফর্ম্যাট। বিজ্ঞাপনী গ্ল্যামারের সাথে প্রথম পরিচিত হওয়ার বিস্ময়। হাঁ করে গিলতে থাকা ম্যাগি, জনসন বেবি ক্রিম, অজন্তা হাওয়াইয়ের মিষ্টি দৃশ্যগুলো। কখনও বাথরুম চেপে বা লসাগুর অঙ্ক ফেলে ছুটে আসা বিশেষ একটা দৃশ্যের অমোঘ টানে। মিস হয়ে গেলেই শূন্যতার পৃথিবী।

দৃশ্য, সাথে সাথে গান। এক-একটা গানের সুরে ঢেলে দেওয়া উত্তুঙ্গ প্রেমরস। মৌলি গ্লিসারিনের মেয়েটা দোলনায় দোল খাচ্ছে, পিছনে খোলা হাওয়ায় উড়ছে তার খোলা চুল। কোমরসমান। ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন ‘কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে’-র সুরে লাগানো অন্য একটা গান। আর এসবের মধ্যে সবথেকে বেশি আমাকে টানত কুকমীর মশলার বিজ্ঞাপনে ‘টুকরো টুকরো কত ছবি’ দেখার নেশা। ‘আঁকা হয়ে’-র পর ‘যায়’-টা গাওয়ার সময় একটা যাদুকরী টান।‘আঁকা হয়ে যা-আ-আ-য় এ জীবনে’। কচি গলায় গাইবার চেষ্টা থেকেই প্রথম বুঝেছি, কিছু জিনিসের নকল হয় না।

তারপর ক্রমে গানের অনুষ্ঠানগুলোর রমরমা বাড়ল। শূন্য দশক তখন মাঝবয়েসি ভদ্রলোক। আমার কাছে অ্যালবাম শব্দটা তখনও শুধুই ফোটোগ্রাফের জন্য। ক্যাসেট থেকে ভিসিডির রূপান্তর।বড় হওয়ার ব্যস্ততা। ধীরে ধীরে বয়ঃসন্ধির দিকে অগ্রসর হওয়ার মাঝে ‘এক যে আছে কন্যা’। অদ্ভুত আদর মেশানো ছায়াবাজি ছিল এই এক লাইন গাওয়ায়। বাকি গানটুকু আর শোনার প্রয়োজন বোধ করিনি। তখন ক্লাস টেন। ‘সায়েন্স নাকি আর্টস’-এই দ্বন্দ্বের মধ্যে দোদুল্যমান ক্লাস টেন। অনেকটাওই মৌলি গ্লিসারিনের এলোকেশী কিশোরীর মতোই। রাজসুখ, প্রিয়তম পরিবারকে ছেড়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে বেরিয়ে পড়া সিদ্ধার্থকে তার অনেক আগেই আমরা ফেংসুই মেনে ঘরের কোণায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছি। আর ভক্তকুলের অন্যায় দাবী মেনে দিব্যি ‘হ্যান্ডস আপ’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন নির্বিবাদী গৌতম। মুখে হাসি। ক্যাসেটে সেদিন বাজছিল ‘কী কথা শোনায় রে বুদ্ধ’।

যাই হোক, পরে সায়েন্সেই গেছি এবং বুদ্ধকে আমার অন্তত ফেংসুই বা বোর্ডের ছাপ্পা মারা পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার জন্য প্রয়োজন পড়েনি। জয়েন্ট দিইনি। তাই গানের লিরিক্স অনুযায়ী, ঘরের কোণায় হাসি-হাসি মহামানবকে দাঁড় করালে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে কিনা সেই এক্সপেরিমেন্ট করারও কোনও সুযোগ আসেনি। ধীরে ধীরে মননে জায়গা করেছেন বব ডিলান, অঞ্জন দত্ত, পিটার সারস্টেড। ওই ক্বচিৎ কদাচিৎ ‘কলকাতাতে কোনও মানুষ নাই/কলকাতাটা জনতা বোঝাই’। নিখাদ কণ্ঠের সরল আনন্দময়তা তখন আর দাগ কাটে না।

এই সপ্তাহখানেক আগের কথা। পড়ন্ত শীতে কবীর সুমন একক। নজরুল মঞ্চটাকে দেখে চমকে উঠেছি। সওয়া সাত বছর বাদে যাওয়া। ওপেন এয়ারের গমগমে ছড়িয়ে পড়া আওয়াজটাকে কেউ যেন আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরতে চেয়েছে। ‘হবুচন্দ্র রাজা গবুচন্দ্র মন্ত্রী’-র গান দিয়ে শুরু হল অনুষ্ঠান। চোদ্দ বছর আগে এখানেই মাথায় ফেট্টি বাঁধা বিশালবপু যে লোকটার অনুষ্ঠান শুনেছিলাম, সেই লোকটার শেষ ভেঞ্চার হল এই সিনেমাই। এরকম অদ্ভুত কোইন্সিডেন্সের মাঝে এটাও মনে পড়ছে, সেবারেও শীত ছিল ভালোই। উন্মুক্ত নজরুল মঞ্চে লেক থেকে ভেসে আসছিল হুহু ঠাণ্ডা হাওয়া। উষ্ণ আলিঙ্গনের মতো গানগুলো। গানের মাঝে মাঝে ম্যানারিজম-হীন ঠাট্টাতামাশার ফোয়ারা। মঞ্চে মাতন লাগিয়েছেন লোকটি। গানগুলো একটাও মনে নেই। মনে থাকার মধ্যে শুধু এক পশলা মজার গল্প। যুবাবয়েসের। জাস্ট একটা পাঞ্জাবি আর হাফপ্যান্ট পরে বাইক চালিয়ে যাওয়ার পাগলামি। ‘চেনা কাকু’-র চিনে নেওয়া থেকে বাবার বকুনি। দর্শকাসনে হাসিতে ফেটে পড়া জনতার লাইভ…

পাড়ার সকলের প্রিয় গগাইয়ের পাগলামির গল্প বলতেও আর কোনোদিন লাইভ হবেন না প্রতীক চৌধুরী।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami