Carromখেলা
Trending

ক্যারামের কারিগর প্রতাপ সাহু ও আমাদের ক্লাবঘরের ভূত ভবিষ্যৎ

শিবানী দাস

ক্যারামের কারিগর প্রতাপ সাহু ও আমাদের ক্লাবঘরের ভূত ভবিষ্যৎ

শিবানী দাস

যেন ‘পিকু’ ছবির দৃশ্য। এক বয়োবৃদ্ধ বাঙালি তাঁর প্রিয় শহরের ল্যাজামুড়ো চষে ফেলছেন দুচাকার যানে সওয়ার হয়ে। আর তারপর শ্যামসম মৃত্যু। হ্যাঁ, ৭ই জানুয়ারি, ২০১৭ , ইউরোপ থেকে আনা শৌখিন রয়াল এনফিল্ডে চেপে কলকাতা সাফারি করেন ৮৯ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ। ৮ তারিখ হঠাৎ অসুস্থতার কারনে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করলে ব্রঙ্কো নিউমোনিয়ার ধরা পড়ে,  এবং ১৫ তারিখ রাত ৯:১৫ এ তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। তিনি প্রতাপ সাহু, অলিতে গলিতে ক্লাবে আখড়ায় বাঙালিকে যিনি দিয়েছেন চিরবিশ্বস্ত প্রেমিকা, নিপুণ শরীর, অক্ষতযৌবনা – আলোঝলমল ক্যারামবোর্ড।

বাংলায় প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকে ক্যারাম খেলার রেওয়াজ ছিল। ছিল না পর্যাপ্ত উপকরণ এবং স্থির কোনো নিয়মাবলী।পরবর্তীতে একজনকে পাওয়া গেল- গোপাল দত্ত, যিনি ভোলাবাবু নামে পরিচিত ছিলেন ,তিনিই প্রথম চালু করেছিলেন কোনাকুনি পকেটের। প্রথম গোলাকার পকেটের ধারণা দেন রাখাবাবু। এরপর আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে খেলার নিয়ম এবং বোর্ডের সাইজ। নিতাই মৌলিক,  শশধর ঘোষ,  অনন্ত পাল মিলে সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলী স্থির করে আধুনিক ক্যারামের প্রচলন করেন।

১৯৪৫ সালে মেদিনীপুরের বাসিন্দা প্রতাপ সাহু চাকরি সূত্রে কলকাতায় আসেন। চাকরির পাশাপাশি ক্যারাম খেলার প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল,তবে সেই সময় চকের গুড়ো বা পাউডার বোর্ডে ঢেলে কৃত্রিম মসৃণতা তৈরি করে খেলা চলত যা তাকে সন্তুষ্ট করার পরিবর্তে হতাশাই দিয়েছিল। নতুন ভাবে বোর্ড তৈরি করার ইচ্ছে নিয়ে ১৯৫০ সালে মাত্র দুজন কর্মীকে তিনি কাজ শুরু করেন প্রতাপ সাহু, সংস্থার নাম দেন কৃত্তিবাস ক্যারাম এন্টারপ্রাইজ। সময়ের সাথে অলিগলিতে ক্যারাম খেলার উৎসাহী লোকের ভিড় বেড়েছে বই কমেনি। ১৯৭৩ সালে গঠিত হয় বেঙ্গল ক্যারাম অ্যাসোসিয়েশন, সৈয়দ আবেদ আলি, ভূতনাথ মুখার্জী আর প্রতাপ সাহু এই তিনজন ছিলেন প্রত্যক্ষ উদ্যোগী। সে সময় এর রেজিস্টার্ড অফিস ছিল ৩৪/ ধর্মতলা স্ট্রিটে। বর্তমানে বেঙ্গল ক্যারাম এসোসিয়েশনের স্থায়ী অফিস প্রতাপ শাহ’র বাড়ির একতলায়, ঠিকানা ২৬ পূর্বাচল স্কুল রোড কোলকাতা  ‘৭৮-এ।

বাবার মৃত্যুর পর এসোসিয়েশনের বর্তমান সাধারণ সচিব সুচিত কুমার সাহু এখন একা হাতে ক্যারাম কারখানা কৃত্তিবাস ক্যারাম এন্টারপ্রাইজের পুরো কাজ সামলাচ্ছেন। তিনিই বললেন প্রতাপ সাহু’র ক্যারাম বোর্ডের ইউএসপি।’তেরো চোদ্দ বছর সময় লাগে পুরো বোর্ডের কাজ শেষ করতে। এমনও অনেক সময় হয়েছে এত দীর্ঘ সময় লাগে শুনে আমাদের বোর্ড অনেকেই নিতে চাননি। তবে পরে যখন সেই বোর্ডেই খেলা হয়েছে তখন তারা বুঝেছে আসলে মজাটা কোথায়।প্রথম দিকে বোর্ড বানাতে এত সময় লাগত না তবে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে গিয়ে আমাদেরও কাজের তরিকায় কিছুটা পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ২০০১ সালে আসা কাঠ থেকে আমরা এখন বোর্ড তৈরি করছি ।’

জানতে চাইলাম, বাজারের অন্যান্য বোর্ডের থেকে আপনার বোর্ড কোথায় আলাদা? বললেন,

‘ম্যাঙ্গো ভিনিয়ারের সাতটা লেয়ার দিয়ে আমরা প্লাই তৈরি করি,প্লাই জোড়া লাগানোর আঠা আসে কানাডা থেকে। জল ঢেলে পরিস্কার করলেও বোর্ডে কোনো সমস্যা হয় না। মজা হল, যত বেশি খেলা হবে বোর্ড তত মসৃণ হবে। পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় ২০১০ সাল থেকে আমরা কিছু প্লাই-র টুকরো জলে চুবিয়ে রেখেছি। এতদিনে যেকোনো প্লাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা তবে আশ্চর্যজনক ভাবে তা হয়নি। বোর্ডের চারিধারে যে কাঠটা ব্যাবহার করা হয় সেখানে আমরা লোহা কাঠ দিয়ে থাকি। ইউক্রেন থেকে -২৪°সেলসিয়াসে ঘুটি ফ্রান্সে আসে সেখান থেকে আমরা কোলকাতায় আনি, তবে ফিনিশিং এখানেই হয়। স্ট্রাকচারটা শুধুমাত্র তৈরী হয়ে আসে। আর স্ট্রাইকারের কথা বলতে গেলে বলব যে জাপানি প্লাস্টিকের যে স্ট্রাইকার সেটা আমরা নিজেরা তৈরি করি। সবথেকে বড় বিষয় কারখানার কিছু মেশিন আছে যা বাবা মাথা খাটিয়ে তৈরি করেছে, বাইরের কোনো দেশে এসব মেশিন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় না অন্য কোনো ক্যারাম ফ্যাক্টারি এইরকমভাবে এত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে কোনো বোর্ড তৈরি করতে সক্ষম।’

আমার দুষ্টাত্মা প্রশ্ন করে ফেলে ‘ বৈদ্যনাথও তো বোর্ড তৈরি করেন তাঁর বোর্ডের সাথে প্রতাপ সাহু’র বোর্ডের তফাতটা কোথায়’? হেসে ফেলেন সুচিত কুমার সাহু, তারপর বলে চলেন, ‘সাধারণত তফাত দুটি বিষয়ে,  প্রথমত বৈদ্যনাথ  লোকাল প্লাই ব্যবহার করতেন, দ্বিতীয়ত তিনি তার বোর্ডটি “চেকলেস” বানাতে পারেননি,যা আমরা পেরেছি। এমনও হয়েছে সাহেবরা ভেবেছিলেন বোর্ডে ম্যাগনেট লাগানো আছে। বুঝলেন মশাই, আমাদের সবথেকে প্রাপ্তির জায়গা উপযুক্ত সন্মান। বাড়ির মেয়ে-এর বিয়ের আগে পরিবারের লোক যেমন ছেলেপক্ষের খুঁটিনাটি সবটা জেনে মেয়ে বিদায় দেন,  আমরাও ঠিক তাই একটা বোর্ড কোথায় পাঠাবো সে বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ না জেনে তা বিক্রি  করি না। কোনো ক্লাব ঢালাই না থাকলে সেখানে বোর্ড পাঠাই না। একটা বোর্ড তৈরির পেছনে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম জড়িয়ে আছে যা কোনো ভাবেই শুধু মাত্র অর্থ মূল্য দিয়ে বিচার হয়না। তাছাড়া এমনটাও তো নয় যে একটা বোর্ড বিক্রি করে দেওয়ার পরই দায় মুক্ত হয়ে যাই। দশ বছর পরে এসেও কেউ যদি বোর্ড ফেরত দিতে চায় তবে বোর্ডটি নিয়ে তার দাম ফেরত করে দিই, যা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি ।’

প্রতাপ সাহু কৃত্তিবাস ক্যারাম এন্টারপ্রাইজের কাজ শুরু করেছিলেন দুজন কর্মচারী নিয়ে। বর্তমানে কর্মচারী আটজন। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো শুকদেব শর্মা,বয়স বর্তমানে ৭৫ বছর। গত ৫০ বছর ধরে তিনি শুধুমাত্র ক্যারামবোর্ড তৈরির কাজের সাথেই যুক্ত থেকেছেন। বাকি যারা রয়েছেন তাদেরও অভিজ্ঞতা নিছক কম নয়।

সুচিত সাহু’র থেকেই জানলাম, মহঃ ইস্তেয়াক এবং আফসার হোসেনই এই মুহূর্তে চারপকেটের সেরা মাস্তান। চমৎকার টিপ, সাধারন অ্যাঙ্গেলে দশে দশ পকেটে পাঠান। কঠিনটাও সহজ করে দেন। যদিও এখানেই শেষ নয়। এই খেলায় প্রয়োজন হয় শাণিত বুদ্ধির, কঠিন পরিস্থিতি থেকে কিভাবে বেরোতে হয়, তা এদের মত ক্যারাম তারকারা রপ্ত করেছে। আর এই কৌশলই তাদেরকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মূল পর্বে পৌছে দেয়। দুঃখের বিষয় ক্যারাম খেলা ক্রিকেট নয় ,আর পাঁচটা বাজার চলতি খেলার মত এর এক্সপোজার নেই। অধিকাংশ মানুষ জানেনই না কে প্রতাপ সাহু, কে আফসার হোসেন। জানলে হয়ত তারা অনেকে বেশি আগ্রহী হতে পারত,এছাড়া ক্যারামের কারিগররা পর্যাপ্ত সম্মান পেতেন। অপরদিকে ক্যারামখেলায় বাঙালি আন্তর্জাতিক দিক থেকে অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারত। সরকারী উদ্যোগের অনেক খামতি থেকে গেছে এই খেলার প্রচারে ও প্রসারে। তবে এখানেই সব আশা শেষ নয়, যে নিখুঁত নিষ্ঠা আর পরিপাটি ফিনিশিং এর ষ্ট্যাণ্ডার্ড প্রতাপ সাহু তৈরি করেছেন তা নির্বিকল্প। ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো ক্যারামে বাঙালি আন্তর্জাতিক স্তরে যেতে পারবে নাকি সেবিষয়ে বুক ফুলিয়ে কিছু বলা যাবে না যতদিন না পর্যন্ত ক্যারামেও স্পন্সারসিপ আসছে। কিন্তু আমাদের স্বর্গের বদলে স্যারিডন , নাকের বদলে নরুন, আইটির বদলে ভাইটি আছে যারা সন্ধ্যে হলেই সেঁধিয়ে যাবে ক্লাবঘরে,ষাট ওয়াটের আলোর নিচে জিজ্ঞাসাবাদ চলবে অপরাধীর, তারপর মর্গে চালান।

সুচিত সাহুর ছেলে অত্যান্ত মেধাবী, সে ডাক্তার হতে চায়। প্রশ্ন আসে, প্রতাপ সাহুর ৬৭ বছরের প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত কী? নটে গাছ কি মুড়োবে শেষমেশ? উত্তর খুঁজুক তারা, যাদের ব্যাপারে মাননীয় কবিবর লিখেছেন: ‘অকালপক্ক ব্যাটাচ্ছেলে/দিন কেটে যায় ক্যারাম খেলে/একটা বয়েস পেরিয়ে গেলে কিছুই আর দাঁড়ায় না’।

সহায়তা : শ্রেয়া দাশগুপ্ত

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami