গল্প

কাজের মানুষ

মণিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

Story Highlights

  • একই জিনিস রোজ ভাল লাগে নাকি! স্বর্গের অপ্সরাও আলুনি মনে হয় রোজ বিছানায় পেলে। আর এ তো সেই একই খুনজখম--- ধর্মের নামে, অনুশাসনের নামে, লোভের নামে। আজকাল অন্যরকম কিছু করতে ইচ্ছে হয়। যা ঘটলে রাগ,ঘেন্না,ভয়, সব প্রবৃত্তি-ই নয়া পয়সা সমান ফালতু মনে হবে, এরকম খল্‌বলে কিছু।

প্রতিদিন বিভিন্ন খবর কাগজ খুঁটিয়ে পড়াই তার অভ্যাস। আজকাল বেশিরভাগ সময়েই কাগজে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, দুর্ঘটনার খবর ছাড়া বিশেষ কিছু থাকেনা। রসিয়ে রসিয়ে সকালের চা খেতে খেতে, খবরগুলো আরামসে পড়ে তারপর নিজেই মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ে ঘুরে দেখতে। তবে ঘুরে দেখার বিশেষ সময়টা হল রাত্রিবেলা। মানুষের বিভিন্ন পাশবিক প্রবৃত্তি গুলো জাগিয়ে তোলার জন্য ওই সময়টাই সবচেয়ে ভাল। দু-একটা ফাঁকা দুপুরও অবশ্য ভালই আমোদ দেয়। এই তো সেদিন দেখল দুটো স্টেশনের মধ্যেকার জঙ্গুলে নির্জন জায়গাটায় একটা ডব্‌কা মেয়েছেলেকে তিনটে লোক মিলে পুরো ন্যাংটো করে মাটিতে শুইয়ে কি কাণ্ডটা-ই না করছে! বগ্‌বগিয়ে হাসি পেয়ে গেল। মেয়েটা মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল ফাঁক পেলেই। একটা লোকের কানে কানে সে ওড়নাটা গলা অব্দি গুঁজে দিতে বলল। লোকটা দিলোও বটে। মেয়েটা মরেছে, পরদিন কাগজে দেখেছিল সে। সেদিন চারটে ডিমসেদ্ধ খেয়ে নিয়েছিল আনন্দে… ভুল করে…প্রেশার বেড়ে গেছিল সন্ধ্যায়।

তবে এসব দেখে দেখে আর করে করে আজকাল বেশ ক্লান্তি এসেছে। একই জিনিস রোজ ভাল লাগে নাকি! স্বর্গের অপ্সরাও আলুনি মনে হয় রোজ বিছানায় পেলে। আর এ তো সেই একই খুনজখম— ধর্মের নামে, অনুশাসনের নামে, লোভের নামে। আজকাল অন্যরকম কিছু করতে ইচ্ছে হয়। যা  ঘটলে রাগ,ঘেন্না,ভয়, সব প্রবৃত্তি-ই নয়া পয়সা সমান ফালতু মনে হবে, এরকম খল্‌বলে কিছু।

অন্যরকম কিছু করার ভাবনাটা মনের মধ্যে চারিয়ে নিয়ে ফাঁকা একটা মাঠে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সে। দূরে একটা টিলা মতন, বেশ উঁচু। হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে চট্‌কা ভেঙ্গে দেখে সামনেই দুটো বাচ্চা ছেলে মেয়ে খেলতে খেলতে চলে এসেছে মাঠে। ছেলেটা আচমকা পা হড়কে মাটিতে পড়ে গেল না? বাচ্চা মেয়েটা হাত ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে…জিজ্ঞেস করছে লেগেছে নাকি। বিবমিষা। বিরক্তি। উফ!

সেইসময়েই বুদ্ধিটা এল মাথায়।

বাচ্চা ছেলেটা ততক্ষণে মেয়েটার হাত ধরে উঠে পড়েছে। আর দেরি করলে চলেনা।

—– “ওকে ওই দূরের উঁচু টিলাটায় খেলতে নিয়ে যা”

হয়েছে। ছেলেটা জিজ্ঞেস করছে মেয়েটাকে ওদিকে যাবে কিনা।

“কিন্তু মা যে বারণ করেছে যেতে। আন্টিও তো তোকে কতবার বলল একদম ওদিকে যাবিনা” মেয়েটার গলায় সন্দেহ।

——“বল, মা-রা ইচ্ছে করে ওসব বলে। যাতে আমরা মজা না করতে পারি। ওখানে গেলে অনেক মজা করে খেলতে পারবো”

বলল। বলছে।

মেয়েটা তবু একটু কিন্তু কিন্তু করছে। কিন্তু মজা করে খেলতে পারার লোভ ওর পক্ষে এড়ানো অসম্ভব।

ছেলেটা এবার  জোরে হাঁটতে শুরু করল টিলার দিকে। মেয়েটাও দৌড়ে সঙ্গ নিয়েছে।

হাঁপাচ্ছে দুজনেই একেবারে চূড়ায় উঠে। সামনে বিস্তৃত খোলা আকাশ। আর অ-নে-ক নিচে সবুজ জমি। শন্‌শনিয়ে হাওয়া বইছে। কেউ আশেপাশে নেই বিশেষ।  সে নিজে অনেক আগেই উঠে চলে এসেছে মজা দেখার জন্য।

—– “ওকে বল একেবারে ধারে চলে আসতে”

ছেলেটা পায়ে পায়ে একেবারে কিনারায় গিয়ে মেয়েটাকে হাতছানি দিয়ে ডাকল, “এই এখানে আয়, দ্যাখ কী সুন্দর।”

মেয়েটা এবার স্পষ্টতই ভয় পেয়েছে। মুখে-চোখে সংশয়। আসলে ওর এমনিতেও অ্যাক্রোফোবিয়া আছে, একটু উঁচুতে উঠলেই ভয় পেয়ে যায়। হি হিহিহি ডব্‌ল মজা। চোখ চকচক করে ওঠে তার।

মেয়েটা মাথা নাড়ছে। যাবে না।

—— “ওকে বল, না আসলে বাড়িতে বলে দিবি যে এখানে এসেছিলিস”

বাচ্চা ছেলেটার কচি স্বরটা কেমন রুক্ষ হয়ে যায় এই কথাগুলো বলবার সময়।

কাঁদো কাঁদো মুখে মেয়েটা এগিয়ে আসে।

“আমি নিচের দিকে তাকাতে পারিনা রে, আমার মাথা ঘোরে”- কাতর কন্ঠস্বর মেয়েটার।

এইত্তো। আস্‌লি মজা।

——“এবার তুই একটু পেছনে সরে গিয়ে ওকে জোরে ধাক্কা দে। যখন পড়বে গড়িয়ে দেখবি কী মজা”

হাত তুলছে ছেলেটা।

মেয়েটা নীচের দিকে তাকাচ্ছেনা। চোখ বন্ধ। ঠোঁট কাঁপছে।

সে হাততালি দেওয়ার জন্য রেডি হয়।

হঠাৎ যেন কী একটা হয় ছেলেটার। কে যেন বুকের মধ্যে প্রবল জোরে “না না না” বলতে থাকে। ঝিম্‌লি তার জন্য লুকিয়ে দিদার বোয়াম থেকে আচার চুরি করে নিয়ে আসে। দুদিন তার হোমওয়ার্ক করে দিয়েছে… জন্মদিনে তাকে একটা ছবির বই দিয়েছিল না? সব কেমন মনে পড়তে থাকে।

ওদিকে তার আর ধৈর্য ধরছেনা।

—–“দে বলছি ধাক্কা”

ঝিম্‌লি গড়িয়ে পড়লে কেমন লাগবে সেটা দেখার উত্তেজনাও প্রবল হচ্ছে। বলের মতন গড়াবে নাকি অন্যরকম? দেবে নাকি ধাক্কা একবার? অনেক রক্ত বেরোবে? দুম ফট্‌ আওয়াজ হবে নাকি?

“না না না” শব্দটা মাথার মধ্যে জোর হচ্ছে। হাতুড়ি ঠুকছে যেন কেউ।

নিজের মাথাটা  ধরে ঝাঁকাতে থাকে ছেলেটা।

অদৃশ্য কিছু একটা যেন ভেতর থেকে এসে নরম করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়। মনে করিয়ে দিচ্ছে, ঝিম্‌লি তার বন্ধু।

আচমকা মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, “না”!!

চমকে উঠেছে ঝিম্‌লি। আরেকটু হলে নিজেই পা ফস্কে পড়তো নিচে!

“কী না??”

“কিছু না, এই জায়গাটা ভাল না রে। মা ঠিকই বলে। চ পালাই”

দুজনে হাত ধরে দৌড়ে নীচে নামছে।

দৃশ্যটা দেখে সকালের খাবারটা পুরো উঠে এল তার। ওয়াক ওয়াক ওয়াক…

নাঃ, নিজের ওপর বিশ্বাসটাই মাটি হতে বসেছে। একটা সাফল্য চাই, শিওর শট একটা কিছু… যেখানে পরস্পরের দিকে ছুরি চালাতে, অবিশ্বাসের চারা-তে জল দিতে, বিশ্বাস-ভালবাসা’র মা-মাসি করতে, দু-বার কেউ ভাববে না।

গনগনে রাগ নিয়ে পার্লামেন্টের দিকে হাঁটতে শুরু করে শয়তান সিং।

মণিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার
Show More

One Comment

  1. Aapnaar lekhaa emnite khub bhaalo laage. Kintu ei galpotaate asaadhaaran kichhu pelaam naa. Mane halo, erakam haajaaro galpo lekhaa hayechhe. Etaa naa likhleo kaarur kichhu aasto jeto naa.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami