চলচ্চিত্র

এসো এসো হে তৃষ্ণার জল

প্রিয়ক মিত্র

অন্ধের কী বা দিন , কী বা রাত; আর পুরুষের কী বা যৌবনের জলদাপাড়া, কী বা বার্ধক্যের বারাণসী! সম্প্রতি এ আই বি বা অল ইন্ডিয়া বাকচোদ একটি ভিডিও নামিয়েছে, যেখানে একটি গাড়ির চালক এক মহিলাকে প্রশ্ন করে মহিলাদের ‘প্লেজার পয়েন্ট’ কোথায়? মহিলাটি সিডাক্টিভ ভঙ্গিতে এবং কন্ঠস্বরে ‘ভাজিনা নগর’ থেকে নানান গলিপথ ঘুরে কীকরে ‘দ্যাটস দ্য স্পট’ এ পৌঁছোনো যাবে এবং মহিলাদের ‘প্লেজার পয়েন্ট’-এ পৌঁছে কীকরে নক নক নকিং অন হেভেনস ডোর হবে তার পন্থা বাতলে দেয়। ছেলেটি গোটা বিবরণটা শুনে আত্মস্থ করে উদাসীন প্রশ্ন করে, তবে ‘ভাজিনা নগর’-এ পৌঁছে সোজা? একইভাবে এক গাড়ির চালিকা যখন এক পুরুষকে প্রশ্ন করে জানতে চায় পুরুষদের ‘প্লেজার পয়েন্ট’-এর সাকিন, তখন পুরুষটি সোজা জানিয়ে দেয়, রাণাঘাট, ডায়মন্ডহারবার পেরিয়েই তিব্বত। গো গোয়া গন। তারপর একটি ‘বুর্জ খলিফা’-র আকৃতির বিষয়ের সামনে গিয়ে পড়তে হবে। ওই বিশালাকায় ফ্যালিক থামটিই হল পুরুষের ‘প্লেজার পয়েন্ট’, ওম শান্তি!

এ আই বি-র এই ভিডিও ভারতীয় প্রেক্ষিতেই বানানো। এখানে মহিলাদের ‘প্লেজার পয়েন্ট’ দুর্গম। ‘অর্গাজম’ নামক শব্দটি এখানে সাধারণভাবে মহিলাদের জন্য বরাদ্দ নয়। পুরুষরাই বিছানায় হর্তা কর্তা বিধাতা। চরম তৃপ্তির মুহুর্তটি তারা আদায় করতে জানে , অথচ উপহার দিতে জানে না। ফলত মহিলাদের ‘প্লেজার পয়েন্ট’-এর জটিল ডায়নামিক্স ভারমে যাক, ‘বুর্জ খলিফা’ সন্তুষ্ট হলেই হল।

এখন এই নিয়ে কথা বলবে কে? যৌনসঙ্গী হিসেবে মহিলারা কী চাইছেন না চাইছেন তাই নিয়ে কোনো চর্চা নেই, মহিলাদের যৌন অতৃপ্তি নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। ফলত এ সংক্রান্ত যাবতীয় আলাপ চলে গোপনে, ষড়যন্ত্রের ঢং-এ।

 

বলিউড এ বিষয়ে তৎপর নতুন করে হয়ে ওঠেনি। ‘বি এ পাস’ জাতীয় বিবিধ সিনেমাতে জিগোলো-র মতন বিষয় ঘুরেফিরে এসেছে‌। এমনকি ‘মিস টিচার’ নামক একটি বি গ্রেড বানানোর আদ্যন্ত ব্যর্থ প্রচেষ্টাতেও (এ বিষয়ে দক্ষিণকে টেক্কা দেওয়া বলিউডের কম্ম নয়) দেখা গেছে নারীর নিজস্ব যৌনকল্প তুলে ধরার চেষ্টা, তুমুল দুর্বল এবং হাস্যকর হলেও। সুধীর কাক্কর-এর ‘ইন্টিমেট রিলেশনস’ বইতে দেখানো হয়েছিল সিনেমাহলের অন্ধকার দর্শকের ধর্ষ-মর্ষকামকে আশ্রয় দিচ্ছে।  সে বইয়ের ‘লাভার্স ইন দ্য ডার্ক’ নামক সেই বিখ্যাত অধ্যায়টির কথা অনেকেরই মনে পড়বে। জনপ্রিয় সিনেমা জনযৌনস্বপ্নের প্রতিভূ হয়ে উঠেছে , আর সেখানে নারীর যৌনভাষ্য কীভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে? মেরী অ্যান ডয়েনের ‘ম্যাসক্যারেড তত্ত্ব’ স্মর্তব্য, বিনোদন ইন্ডাস্ট্রিতে পুরুষই তৈরি করে দিচ্ছে নারীর যৌনভঙ্গি, পুরুষেরই যাবতীয় বাসনা চরিতার্থ হচ্ছে নারীর দৈহিক প্রকাশের মধ্যে দিয়ে। ভারতীয় পর্ণকমিকস দুনিয়ার রাণী সবিতা ভাবি-র রাজত্বেও পুরুষের কল্পনায় থাকা সমস্ত যৌন অঙ্ক মিলে যায়, অথচ তার চালক হয়ে ওঠে সবিতা ভাবি স্বয়ং!

এসব প্রশ্ন উঠছে কেন? কারণ নেটফ্লিক্সের সাম্প্রতিক ভারতীয় প্রোডাকশন- ‘লাস্ট স্টোরিজ’। ‘বম্বে টকিজ’-এর পর অনুরাগ কাশ্যপ, জোয়া আখতার, দিবাকর ব্যানার্জী এবং করণ জোহর-এই  চার পরিচালকের সম্মিলিত প্রয়াস, এবং ব্যর্থ প্রয়াস!

 

কেন ব্যর্থ? সে আলোচনায় ঢোকার আগে বলে রাখা যাক, এ সিনেমার শুরু থেকে শেষ তৈরি হয় নারীর ন্যারেটিভে। নারীর চোখেই এই ছবিতে পৌরুষের কাঠামোর ভাঙচুর চলতে থাকে। চারজন পরিচালকই নিশ্চয় এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সিনেমা বানাতে শুরু করেছেন। শান্তনু চক্রবর্তী, তার ‘বলিউডের জন-গণ-মন’ বইতে দেখিয়েছিলেন, কীভাবে একটি সিনেমায় বলিউডের মার্কামারা ‘দেশভক্ত’ সানি দেওল প্রবাসফেরত করিশ্মা কাপুরকে দিয়ে জোর করে গোরুর দুধ দুইয়ে প্রমাণ করাতে চান, যে ভারতীয় পৌরুষের সামনে নত এবং কমনীয় হতে হবে নারীত্বকে, তার উদ্ধত হওয়া মানা। আস্তে আস্তে এই দুর্দম পৌরুষ হয়ে উঠেছে বিশ্বায়নের আলোয় আলোকিত ‘মাচো’ পুরুষ। ফারহান আখতার যখন ‘ডন’ রিমেক করেন, তখন শাহরুখ খান সিনেমার শুরু থেকে শেষ অবধি দক্ষ নিপুণ নারীশিকারীর ভূমিকা পালন করে চলেন, প্রতিশোধকামী দুই নারী ডনের কাছে পরাজিত হন। করিনা কাপুরের অল্প আঁচে উত্তেজনা জাগিয়ে তোলা নাচ বা প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার প্রতিশোধস্পৃহা চেপে ডনের নাচের বিভঙ্গে লাস্য বজায় রেখে তাল মেলানোতে কোথাও গিয়ে একধরনের সমর্পণ ফুটে ওঠে, কিন্তু মাথায় রাখতে হবে নারীও আর সতীলক্ষ্মী ভারতীয় নববধূ সেজে নেই, সে হয়ে উঠেছে পণ্যায়নের নতুন উপাদান। ‘সেক্সি’ শব্দটি লব্জ হয়ে ঢুকে গেল বলিউড নায়িকাদের বিশেষণের তালিকায়। জিনাত আমন বা সিল্ক স্মিতাদের যুগ শেষ, আলাদা করে কেউ ‘সেক্স সিম্বল’ থাকছেন না, ‘সেক্সি’ হয়ে ‘মাচো’ পুরুষের পরিপূরক হয়ে উঠছে নারী। ‘ডার্লিং’ বলে একটি অল্প দেখা ভূতের সিনেমায় অবশ্য ‘মাচো’গিরি করতে গিয়ে নায়ক ফারদিন খানকে ইশা দেওলের ভূতের কাছে পর্যুদস্ত হতে হয়েছিল। তবে বলিউডে হরর এবং সেক্সের বিচিত্র ঘোটালা অন্যত্র আলোচনার বিষয়। ‘রেস’ , ‘কর্পোরেট’ বা ‘হেট স্টোরি’-তে অবশ্য লাস্য অটুট রেখেই নারীরা নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে গল্পের এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষের হাতে হ্যারিকেন ধরিয়ে দেয়। ‘লেডিজ ভার্সেস রিকি বহেল’ বা সাম্প্রতিকের ‘সঞ্জু’-তে আবার পুরুষের এই অনন্ত ‘মাচো’গিরি এব‌ং লাম্পট্যের নির্লজ্জ উদযাপন চলে। এই যখন পরিস্থিতি, তখন চারজন বুদ্ধিমান পরিচালক নারীর আখ্যানকে কেন্দ্রে রেখে ‘লাস্ট’ বা যৌনতৃষ্ণার গল্প বলতে চলেছেন, তখন একরকম উৎসাহ থাকে বইকি। কিন্তু সেই উৎসাহে চোনা পড়তে দেরি হয় না বিশেষ।

 

অনুরাগ কাশ্যপকে দিয়ে শুরু করা যাক। ভারতীয় সিনেমায় ব্ল্যাক হিউমারকে অন্য স্তরে নিয়ে গেছেন যারা-অনুরাগ কাশ্যপ তাদের মধ্যে অন্যতম। কুন্দন শাহ্-এর ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ আশির দশকে একটা বিরলতম ঘটনা ছিল। কিন্তু অনুরাগ ‘জানে ভি দো ইয়ারো’-র পথে না হাঁটলেও অন্য মোকামে নিজের ব্ল্যাক হিউমারের বোধকে ফুটিয়ে তুলেছেন পদে পদে। ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’-তে একটি দৃশ্যে মুম্বই পুলিশ তাড়া করছে সন্ত্রাসবাদীকে, দৌড়তে দৌড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কনস্টেবল এব‌ং সন্ত্রাসবাদী দুজনেই; পুলিশ কাতর আবেদন করছে সন্ত্রাসবাদীর কাছে, যাতে সে ধরা দিয়ে দেয়-ভারতবর্ষের উগ্রপন্থার সমস্যা নিয়ে তৈরি আপাদমস্তক একটি সিরিয়াস ছবিতে নির্লিপ্তভাবে এমন একটি দৃশ্য গুঁজে দিতে পারেন অনুরাগ কাশ্যপই। ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’-এর মতন আদ্যন্ত ভায়োলেন্সে মোড়া ছবিতে রক্তের স্রোতেই ব্ল্যাক হিউমার মিশে যায় অনায়াসে। অনুরাগের ছবিতে এই ব্ল্যাক হিউমারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ভারতীয় মাসকুলিনিটি। সেই বিপুল পৌরুষ অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে অনুরাগের ছবিতে দিনের শেষে। সেই অনুরাগ ‘লাস্ট স্টোরিজ’-এর প্রথম গল্পটির পরিচালক। এখন এখানে ব্ল্যাক হিউমারটাই অনুরাগের একমাত্র তুরুপের তাস। ভারতীয় সাবার্বান পৌরুষ নেই, রাষ্ট্র এবং ধর্মের ঘাপলা নেই, ভায়োলেন্স নেই। এই সিনেমা যে শ্রেণিকে কেন্দ্র করে নির্মিত, সেই শ্রেণি থেকেই উঠে আসে অনুরাগের দর্শকরা। তাই অনুরাগ কি কিঞ্চিৎ সাবধান? কিন্তু অনুরাগ তো চিরকাল তার দর্শকদের অস্বস্তিতে ডুবিয়ে দিয়েছেন নির্দ্বিধায়। তাহলে এক্ষেত্রে কী ঘটল?

 

কনসেন্ট-ভারতে সচেতন যৌনতার চর্যায় সবথেকে চর্চিত শব্দ এইমুহুর্তে। লাগাতার ধর্ষণ, যৌন নিগ্রহের সর্বব্যাপী অঙ্গণে এই শব্দটি নিয়ে নিরন্তর চর্চার আশু প্রয়োজন, নিঃসন্দেহে। অনুরাগ শুধুই কনসেনসুয়াল যৌনতা এবং সে সংক্রান্ত তর্ককে তার সিনেমার উপজীব্য করে তুলতে পারতেন। কিন্তু অনুরাগ সেখানেই থেমে থাকলেন না, একজাতীয় ছন্নছাড়া এলিট শ্রেণির যৌনযাপন এবং সে সংক্রান্ত যাবতীয় সংশয় দ্বন্দ্বদ্বিধাকে ধরে ফেলতে চাইলেন ক্যামেরার ফ্রেমে ; এবং সেখানেই হল গোলমাল। রাধিকা আপ্তে বা কালিন্দী একটি কলেজের একজন শিক্ষিকা, একদিন রাত্রে তেজস নামক এক সদ্যযুবক ছাত্রের সঙ্গে রাজ কাপুরের গান শুনতে শুনতে দুম করে গোটা বিষয়টা বিছানা অবধি গড়িয়ে যাওয়া-এই দিয়ে গল্পের শুরু। এরপর সাক্ষাৎকার দেওয়ার ভঙ্গিতে কালিন্দীর একটি মনোলগ চলতে থাকে। সেই মনোলগে পরিষ্কার ফুটে ওঠে কালিন্দীর মূল্যবোধ, পাপবোধের ডায়ালেক্টিক্স। ফ্রয়েড এক পুরুষ রোগীর কথা লিখেছিলেন, যে প্রতিরাত্রেই পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌনতার স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যায়। কালিন্দী ভয় না পেলেও সংশয়ে থাকে। কলেজের স্টাফরুমে একজন শিক্ষিকার সঙ্গে ছাত্রের যৌনসম্পর্ক, যা হামেশাই ঘটে থাকে, সে প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু হয়, এবং এজাতীয় সম্পর্কের অনৈতিকতা নিয়ে জোর সওয়াল করা হয়। এই কথোপকথনে অনুরাগ নিজস্ব ভঙ্গিতে ভারতীয় মরাল কাঠামোকে মক করতে থাকেন। এই কথাবার্তায় আরও প্যারানোইয়া বেড়ে যায় কালিন্দীর, সে জোর করে তেজসের বয়ান আদায় করতে চায় এই বিষয়ে যে তাদের যৌনতা ‘কনসেনসুয়াল’ ছিল। এই ‘কনসেনসুয়াল’ শব্দটি নিয়ে তেজসের তোতলামোতে অনুরাগের বুদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। ভারতীয় পুরুষের কাছে কনসেন্টের ধারণা কতটা অস্পষ্ট তা এই দৃশ্যে বোঝা যায়।

 

এত অবধি অনুরাগ নিজস্ব ছন্দে ছিলেন। এরপর গতি হারায় গল্প। সিনেমার শুরুতে তেজসের সঙ্গে সঙ্গমশেষে কালিন্দী ভয় পায় এই ভেবে যে অন্যান্য পুরুষদের মতন তেজস ‘পসেসিভ’ হয়ে পড়বে কি না। তা যখন ঘটে না তখন কালিন্দীর নিজেরই অসুস্থের মতন অধিকারবোধ জেগে ওঠে, এবং শেষমেষ সেই অধিকারবোধকে প্রতিষ্ঠা করেও নিজের মূল্যবোধকে শিয়রে তুলে সে নিজেকে ‘শাদিসুধা’ ঘোষণা করে গটগট করে ফ্রেম থেকে প্রস্থান নেয়।

 

অনুরাগের কোনো বক্তব্য দেওয়ার দায় নেই। মুক্ত যৌনতা নিয়ে বড়াই করলেও ভারতীয় মানস এখনও সম্পূর্ণত লিবারাল যৌনজীবনের জন্য প্রস্তুত নয়; আবেগ, রোমান্স, অধিকার এইসব নিয়ন্তা হয়ে উঠবেই-একথা বোঝাতে অনুরাগকে এত সময় নিতে হবে? দীর্ঘক্ষণ ধরে মোলোড্রামার মকারি চললে তা সস্তা মেলোড্রামারই সমতুল হয়ে যেতে পারে, যা খানিক ঘটেওছে এক্ষেত্রে। রাধিকা আপ্তে ‘ফোবিয়া’-র মতন সিনেমায় যে অভিনয় করতে পারেন, তাতে এই অভিনয় তার কাছে সহজপাঠ। কিন্তু চরিত্রের অস্থিরতা যদি অভিনয়কেও অস্থির করে তোলে, তাহলে তা বিরক্তি উৎপাদন করতে বাধ্য! অনুরাগ অহেতুক লম্বা একটি ‘শর্ট ফিল্ম’-এ  ন্যারেটিভহীন, সিদ্ধান্তহীন শূন্যতা তৈরি করে, দর্শকদের বিন্দুমাত্র অস্বস্তিতে না ফেলে থেমে গেলেন-এটা মানতে কষ্ট হয় বৈকি।

 

জোয়া আখতারের কাজ বোধহয় এই চারটির মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। মাপা, সংযত ট্রিটমেন্ট, সময়মতন শেষ হওয়া গল্পের শাণিত উপস্থিতি, অভিনয়ের নির্লিপ্তি, সংলাপের নির্লিপ্তি, দর্শককে অস্বস্তি দেওয়া ছোট ছোট ফ্রেম-সব নিখুঁত। সিনেমা শুরু হয় একটি সঙ্গমের দৃশ্যে, দুটি নগ্ন দেহের উপস্থিতি তখন শুধু, তখনও কোনো চরিত্র নেই। সঙ্গমশেষে মূল নারী প্রোটাগনিস্ট, যে ভূমিকায় অভিনয় করে চমকে দিয়েছেন ভূমি পেডনেকার, যখন ধীরে ধীরে জামাকাপড় পরে নিয়ে ঘর মুছতে শুরু করেন তখন চরিত্রলিপি স্পষ্ট হয়। বাড়ির মালিক এবং পরিচারিকার যৌন সম্পর্ক। এবার মনে পড়বে সঙ্গম চলাকালীন এবার ‘গার্ল অন দ্য টপ’ দেখা যায়; শ্রেণিনির্মিত যৌনতার সমীকরণ গুলিয়ে যায়। সেই মালিক যখন পরিচারিকাকে স্নানের ঘরে ডেকে নেন নগ্ন অবস্থাতেই , এবং পরিচারিকা ‘নাঙ্গা সালা’ বলে খুনসুটি করে, তখনও গল্পের শেষ জানা যায়নি, তা যদি জানা যেত, তাহলে বোঝা যেত এই ‘নাঙ্গা সালা’-র তাৎপর্য। একটা শ্রেণিচরিত্র নগ্ন হয়ে যাচ্ছে অবদমিত শ্রেণির কাছে, সেই অবদমিত শ্রেণি এমনকি বিছানায় নিয়ন্ত্রণ কব্জা করে নিচ্ছে অনায়াসে।

 

কিন্তু এরপর দর্শকদের প্রেডিক্টেবলিটিকে মান্যতা দিয়ে প্রায় দু শতকের বাসি একটি গল্প বলেন জোয়া। বাড়ির মালিক পুরুষটির বাবা মা এসে পড়া, বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হওয়া, পরিচারিকার অক্ষম ঈর্ষা, এবং শেষত নিজের শ্রেণির পরিচয়ের চটি পায়ে গলিয়েই মুম্বইয়ের আবাসনদুনিয়ার আরও অজস্র কাজের লোকের সঙ্গে মিলে যাওয়া-এই ধরাবাঁধা ছকে গল্প এগোয়। জেন অস্টেনের কোনো অপ্রকাশিত গল্প থেকে এটি অনুপ্রাণিত -এটা জানতে পারলেও আশ্চর্য হতাম না। অথচ ছবির মেকিং-এ জোয়া চমকে দিতে থাকেন। পরিচারিকাটির চটি পায়ে গলানো এবং বাড়ির থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রতিটি দৃশ্যের অদ্ভুত সাবলীল সম্পাদনা অসামান্য। শেষ দৃশ্যে যখন দুই ফ্ল্যাটের দুই পরিচারিকা মণিবের বশংবদ হয়ে থাকার দক্ষিণাস্বরূপ ছেঁড়া শাড়ি এবং পরিত্যক্ত মিষ্টি নিয়ে লিফ্টে ওঠে, এবং সেই লিফ্ট মুম্বইয়ের বহুতল থেকে হয়তোবা নেমে চলে ধারাভি বস্তির দিকে, তখন চলচ্চিত্রের ভাষার প্রশংসা করতেই হয়, কিন্তু সেই ভাষা যে আখ্যান তুলে ধরে তাতে কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো সমস্যা নেই, একটি সর্বজনবিদিত বস্তাপচা বাস্তবকে এত নিপুণভাবে তুলে ধরে লাভ কী হল?

 

দিবাকর ব্যানার্জী; ভারতীয় সিনেমাকে যিনি উপহার দিয়েছেন ‘লাভ সেক্স অর ধোঁকা’-র মতন মারকাটারি অ্যান্থোলজি, তিনি এভাবে ছড়াবেন তা আশাতীত! ‘লাভ সেক্স অর ধোঁকা’-তে সমাজের জটিল ডায়নামিক্সের বিভিন্ন টুকরোকে দিবাকর মালার মতন গেঁথেছিলেন শুধু কিছু ব্যক্তিগত ভিডিও ফুটেজের সূত্রে। ফুকোর প্যানপটিকনের দৈত্যের মতন কতগুলো ক্যামেরা আমাদের সব গতিবিধি মাপছে দিনরাত, তা অসম্ভব দক্ষতায় সিনেমায় নিয়ে এসেছিলেন দিবাকর তার এই ম্যাগনাম ওপাস-এ।

 

সেই দিবাকর একটি ত্রিকোণ সম্পর্ক, সেই সম্পর্ক ঘিরে দুই পুরুষ টাইকুনের চাপানউতোর , কেন্দ্রের মহিলাটি কীভাবে এই দুই বন্ধুর সমস্ত ইনসিকিওরিটি চিহ্নিত করে দিচ্ছেন সে নিয়ে একটি কুড়ি মিনিটের সিনেমা বানালেন, যে সিনেমায় সব চরিত্র ফিসফিস করে কথা বলে। পরকীয়া বা পরকীয়ার সম্ভাবনা ভারতীয় পুরুষকে কতটা ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ত এবং বিরক্তিকর করে তোলে তার অসাধারণ নমুনা পাওয়া যায় ‘ম্যায়, মেরি পত্নী আউর ও’-তে। রাজপাল যাদবের অনবদ্য অভিনয় তাকে আরও স্পষ্ট করেছিল। এই সিনেমায় মণীষা কৈরালা , সঞ্জয় কাপুর এবং তার পাশাপাশি জয়দীপ আহলওয়াত-এর মতন রীতিমত ভালো অভিনেতা প্রায় অস্ফুটে সংলাপ এবং শূন্যগর্ভ এক্সপ্রেসন দিয়ে যান শেষাবধি। কেমন যেন অকারণ কুড়ি মিনিট সময় নষ্ট হয়ে যায়। সঞ্জয় কাপুর অভিনীত চরিত্রটি বিভিন্ন ব্যক্তিকে চেনে তারা কোন কোম্পানিতে চাকরি করে-এই পরিচয়ের ভিত্তিতে। বন্ধু এবং টাইকুন এবং বউয়ের পরকীয়া প্রেমিকের বিচ হাউস থেকে সে বেরোয় মুখে কাগজ চাপা দিয়ে। অর্থাৎ আর্থসামাজিকভাবে উচ্চবর্গ হলেও , তাদের কেচ্ছা নিয়ে ভয় পেতে হয়, নিজেদের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে সর্বক্ষণ চাপা স্বরে আলোচনা করতে হয়। বুদ্ধিমান দর্শক একথা জানেন, এই বিষয়টিকে চিহ্নিত করাই যে ছবির উদ্দেশ্য তা ছবির প্রথম পাঁচমিনিট দেখলেই বোঝা যাবে। কিন্তু কুড়ি মিনিটের একটা অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স শেষে কোথায় গিয়ে পৌঁছয়? আদৌ পৌঁছয় কি?

 

এরপর আসেন করণ জোহর। যে বিশ্বকাপে বড়বড় টিম কুপোকাত হয়ে ফিরে যাচ্ছে, সেখানে হেরো টিম কী করবে সবাই জানে! কতকটা এমনই মানসিকতা নিয়ে কয়েকবছর আগে যিনি ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ বানিয়েছেন তার ছবি দেখতে বসতে হয়। কিন্তু অঙ্ক খুবই কঠিন। জাপান বেলজিয়াম ম্যাচের জাপানের মতন না হলেও করণ জোহর খানিক চমকে দিতে থাকেন। তার স্বভাবসিদ্ধ তারিকায় ননভেজ জোকের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দিতে থাকেন শুরু থেকেই। কিন্তু এই সিনেমায় মূল বিষয় হয়ে ওঠে নারীর যৌন প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির মতন গোলমেলে বিষয়। খানিক নড়েচড়ে বসতে হয়। অসম্ভব সুন্দরী অভিনেত্রী কিয়ারা আদবানির শরীর প্রথম থেকেই চাপা যৌন বহিঃপ্রকাশকে জমিয়ে রাখে। আর তার পরিপূরক হয়ে ওঠে নেহা ধূপিয়া অভিনীত চরিত্রটি, একটি স্কুলের এক ডিভোর্সী লাইব্রেরিয়ান, যার যৌনসুখের জন্য সে কোনো পুরুষকে তোয়াক্কা করে না, তাহলে হাতে রইল সেক্স টয়।

 

বাকি পরিচালকদের মতন করণ জোহর সূক্ষ্মভাবে কোনো সমস্যাকে তুলে ধরতে চাননা। প্রথম থেকেই তার ছবির অ্যাজেন্ডা নিয়ে তিনি স্পষ্টবাদী, কোনো রাখঢাক বা ধূসরতা নেই। এক স্কুলছাত্রীকে নিয়ে তার অভিভাবক এসে অভিযোগ জানান ছাত্রীটি ছেলেদের সঙ্গে আইসক্রীম খাচ্ছে, এর ভেতর লুকোনো হালকা যৌন ইঙ্গিত সকলেই ধরে ফেলেন। এরপরই সেই অভিভাবক ছাত্রীটির হাঁটুর ওপর স্কার্ট উঁচিয়ে পরা নিয়ে অভিযোগ জানাতে যায়, সে মুহুর্তে কিয়ারা আদবানি অভিনীত চরিত্রটির আঁচল খসে যায় অচিরেই‌‌। তবে সবথেকে হাস্যকর মুহুর্ত তৈরি হয় যখন ছাত্রীটি লুকিয়ে নবোকভের ‘লোলিটা’ পড়ছে, এই অভিযোগ নিয়ে অভিভাবকটি সোজা প্রিন্সিপালের কাছে দরবার করেন। করণ জোহর নিশ্চিতভাবেই বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ পড়েন নি, সেখানে এক স্কুলছাত্র ‘লোলিটা’ পড়ার দরুণ শিক্ষক সীতানাথের রোষানলে পড়ে, তার পেছনে অনেক জটিল কিসসা ছিল। কিন্তু এই সিনেমাতে কামুক প্রিন্সিপাল, যে সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিয়ানকে ঘরে আসার আহ্বান জানায়; সে লোলিটা-র প্রথম লাইনে উপস্থিত লয়েন-এর মতন একটি আদ্যন্ত যৌন শব্দকে পাল্টে লায়ন করে দেয়, এবং অভিভাবককে জানায় বইটি জন্তুজানোয়ার সম্পর্কে।

 

লাইব্রেরির কোণে যৌনতা সিনেম্যাটিক মুহুর্ত হিসেবে বেশ পুরনো। এই সিনেমায় নেহা ধূপিয়া যখন লাইব্রেরির কোণকে বেছে নেন ভাইব্রেটর ব্যবহার করার জন্য, তখন তা খানিক কৌতুহল উদ্রেক করে অবশ্যই। নেহা তার ঘাড়ের ওপর থেকে চুল সরিয়ে নেন যে বিভঙ্গে তাতে বোঝা যায়, প্রাপ্য রতিসুখ নিজেই আদায় করে নিচ্ছেন তিনি, তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে না কোনো পুরুষের ওপর।

 

এই ঘটনা থেকে অনুপ্রেরণা পায় কিয়ারা আদবানির চরিত্রটি। তার স্বামী অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট দেখে কুমীরের মেটিং কল আয়ত্ত করতে শিখেছে, কিন্তু বিছানায় তার পৌরুষের মেয়াদ হাতে গোণা কয়েক সেকেন্ড। প্রতিরাতে কিয়ারা আদবানি হাতের আঙুল দিয়ে গুণতে থাকেন ঠিক কতক্ষণ তার স্বামী সচল থাকছেন বিছানায়। ‘মোটরসাইকেল চলে ডমাডমডম’ গানটির ব্যবহারও যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত এক্ষেত্রে। স্বামীর এই দুর্বল পারফরমেন্সে হতাশ হয়ে ভাইব্রেটর দিয়ে যৌনসুখ পাওয়ার চেষ্টা করতে যায় কিয়ারা আদবানির চরিত্রটি, এবং তার মধ্যে নানাবিধ ক্যাওস বিষয়টিকে নাটকীয় করে তোলে। বাড়ির সকলের সামনে বাড়ির সবথেকে বৃদ্ধা সদস্যটির রিমোটকন্ট্রোলেই চরম যৌনসুখ পেয়ে যায় কিয়ারা। পরিবারতন্ত্র, বিবাহের প্রতিষ্ঠানের মুখে চুনকালি পড়ে, আর ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন বাজছে করণেরই সুপারহিট পারিবারিক ড্রামা ‘কভি খুশি কভি গম’-এর গান।

এরপর করণসুলভ ন্যাকামো ও মেলোড্রামা বাদ।পড়ে না, কিন্তু এই ক্লাইম্যাক্স অবধি ‘বম্বে টকিজ’-এ চারজনের মধ্যে সবচেয়ে নিম্নমানের কাজ প্রোডিউস করা করণ, ‘লাস্ট স্টোরিজ’-এর বাকি ডিরেক্টরদের খানিক টেক্কা দিয়ে দেন। খুবই চটুল এবং লঘু মেকিং, অথচ গোলপোস্টের জালে বলটুকু জড়িয়ে দেন করণ। ভিকি কৌশলের ওজনের একজন অভিনেতাও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিয়ারা আদবানির চাপা শরীরী আবেদনের পাশে প্রায় জোকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন এব‌ং নিজের চরিত্রটির প্রতি পরিশ্রমী হয়ে ওঠার জন্য সমস্ত অভিনয়ক্ষমতা কাজে লাগান।

কিন্তু এমন একটি বিষয় নিয়ে বানানো অ্যান্থোলজি, ওজনদার সব পরিচালক, সব মিলিয়ে যাবতীয় যা প্রত্যাশা ছিল সব মাঠে মারা যায়। ‘শোর সে শুরুয়াত’ বা ‘আইল্যান্ড সিটি’-র মতন অসামান্য অ্যান্থোলজির খবর ভারতীয় দর্শকরা পানই না; অথচ নেটফ্লিক্সের কল্যাণে এমন একটি ব্যর্থ প্রয়াস ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় শুধু যৌনতা ঘুঁটি হয়ে থাকে বলে, এ সত্যিই ভাগ্যের পরিহাস!

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami