জীবনযাপনরাজনীতি

ইয়েহ্‌ লাল রঙঃ ব্লীড বেবি ব্লীড, অসাম্‌ মেন্সট্রালা

অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

হঠাৎ নিস্তব্ধতা। টিভির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া।

অসহ্য হাঁপধরা ও আসমান-জমিন চোখ নিচু করা দমবন্ধের মাঝে হিস্‌হিসে গলার ফিস্‌ফিসে জবানীতে কিছু ড্রপ নীল রক্ত। শুষে নিচ্ছে আয়তাকার তুলোট গদি।

যে কেউ মনে করতে পারবেন। ভীষণই ক্লিশেড। ছোটবেলার স্যানিটারি ন্যাপকিনের টেলিভিশন-বিজ্ঞাপন এগুলি। পিরিয়ড শুরু না হওয়া ইস্তক জানা ছিল পিরিয়ড স্যুইমিং পুলের মত নীল হয়। মাইরী বলছি। প্রথম পিরিয়ড দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। এতো লাল। স্বভাবিক লালকে নীলের ফিল্টারে ঘাপলা করে পেশ না করা হলে আঁতকে ওঠার কোন সমস্যাই হতোনা। আর তার পর-পরই দ্বিতীয় অবৈজ্ঞানিক পেশকাশ- ইহা বদরক্ত। । তো লাগাতার অসত্য। মিথ্যে আর ম্যিথের ট্রাফিক জ্যাম। লজ্জা। লুকিয়ে রাখো। বাবা-কাকাদের জানাবেনা। তার ওপর ভারতবর্ষের মত দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নানারূপ নিদান। এইসব এইসব। ইত্যাদি ইত্যাদি। সবারই একই স্টক। যেকোনো রজঃস্বলা মানুষমাত্রেই জানেন।

গত কয়েকবছরে স্যানিটারি ন্যাপকিন সাবালিকা হয়েছেন। খবরের কাগজে মুড়িয়ে আনা প্যাকের থেকে সে খুল্লামখুল্লা মিডিয়ায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে। অক্ষয় কুমার, আমির খান, শাবানা আজমী থেকে আরও বলিউড দুনিয়া প্যাডম্যান-বিপ্লব করেছেন। সব দেশেই জোর ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে। তার মধ্যে মুখ্য একটি হল শোণিতের ট্যাবু ভাঙ্গা। স্বাভাবিককে স্বীকৃতি দিতে। তার সুস্থ, সচল সচেতনতা তৈরি করতে। রজঃ স্রাব লাল। নীল নয়। লাল গুলো সব সব নীল হল ক্যান?
সামন্ত সমাজে রঙ পালটায়, কিন্তু অশিক্ষা যায়না।

গত কয়েকদিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় লোকের ভেদবমি দেখিয়া জানিতে পারিলাম একটি যুবা নাকি শরতকালের দুর্গা-উৎসবের পরিচিত ফ্রেমে একখানি স্যানিটারি ন্যাপকিন যার ডাকনাম ‘প্যাড’, মাসিকের রক্তসহ মানে রক্তের সিমিউলেশন সহ বাঁধাইয়া তাহাতে শ্রী দুর্গা, থুড়ি ‘সত্যিরূপেণ’ লিখিয়াছেন। দ্য
শরত আসিয়াছে। দুর্গা আসিবেন। হিন্দু সম্প্রদায় উৎসবে মাতিবেন । এমত সময় ‘এই’ দেখিয়া নাকি ভেদবমি।

গত কয়েক বছর ধরিয়া বিস্তর লেখালিখি, ভিডিও, ক্যাম্পেইন, প্যাডম্যান, এসবের পরও জানিতে পারিলাম মেন্সট্রুয়াল রক্ত হইল আনহাইজিনিক। এগুলো কিছু লোক বলছেন আর কিছু লোক শুনছেন আর বেশ কিছু সহমত পোষণ করছেন। এখন ভেবে দেখুন এই তথ্য, জ্ঞানসম্ভার নিয়ে যেসব লেখা হচ্ছে তা কিন্তু অন্যে পড়েন। এর সত্যাসত্য না জেনেই সহমত পোষণ করেন। পড়িতেই পারেন । নিশ্চয়ই পড়িবেন। সমস্যা নাই । যেভাবে ভোক্তা বাক্সে-মেলোড্রামা দেখিয়া থাকেন, যেভাবে পাগলু-ডান্স দেখিয়া থাকেন, সেভাবেই এগুলিও পড়িয়া থাকিবেন। সমস্যা যেখানে আসিতেছে তা হইল তথ্যের ব্যাপারে। সত্য-মিথ্যার তফাৎ বেশীরভাগের কাছেই ধর্মের রূপকথার মতই অস্পষ্ট, গোলানো। ভিত্তিহীন ও হাস্যকর। অসৎ।

কিন্তু কথা হইল- ইহা প্রচণ্ড এক ফেক্‌-চক্কর। গিমিক আর সচেনতাকে চিহ্নিত না করতে পারা। গুলিয়ে ফেলা। বলা ভালো দেওয়া। ইহাই সচেতনতার অভাব। সচেতনতা তৈরির মুখ্য বাধা। সচেনতার ক্যাম্পেইন করিতে যদি তাহা গিমিকও বোধ হয়, তাহা হইলেও এই সামন্ততান্ত্রিক বাইগট মানসিকতার পুরুষতন্ত্রের ঘৃণাকে কার্যকর না করিতে দেওয়ার চেষ্টায় নির্মিত এই গিমিকও শ্রেয়। লজ্জা আর ঘৃণা। গোপন করো, গোপন করো। দেখিওনা। কথা বোলোনা। শব্দ কোরোনা।

গ্লোরিয়া স্টাইনাম তার সত্তরের বিখ্যাত প্রবন্ধে বলেছিলেন- পুরুষ যদি মেন্সট্রুয়েট করত তবে এই অভিজ্ঞতাকে সে গর্বের সাথে বহন করত। যেহেতু নারীরা এই অভিজ্ঞতা একান্তই নিজেরা অনুভব করেন, তাই একে ডি-ভ্যালু করা হয় এর গুরুত্ব কমাতে। একে লজ্জিত ও গোপনীয় করা হয়।

সিরিয়াস পাঠক হয়ত তাতে বিভ্রান্ত হন না। কিন্তু এই লেখাগুলির হাল্কা ফেবু-জনপ্রিয়তার কারণে প্রচুর মানুষ এই ফেক্‌-তথ্য জানলেন। ও ঘৃণা প্রদর্শন করলেন। ঘৃণাগুলি, ভুল ধারণা গুলি, যা অবৈজ্ঞানিক ও কুৎসিত, যা আগেই ছিল, তা আরও জোরদার হল আরও কিছু লোকের মধ্যে। এই রক্ত, এই দাগ, এই লাল রঙ গিমিকও না, অস্বস্তিরও না, ডিসগাস্টিং ও না। ডিসগাস্টিং হল সেইসব ধারণা যা একে ঘৃণা করতে শেখায়। সত্য প্রকাশ ও গ্রহণ করতে অসহযোগিতা করে। আবার দেখলাম পিতৃতন্ত্র মাথায় গুঁজে দিচ্ছে, শেখাচ্ছে- পিরিয়ডকে পণ্য করা হচ্ছে- সুতরাং ন্যাপকিনে লাল রঙ, এটা পিতৃতন্ত্রের দোসর। এই ‘পণ্য’ প্রসঙ্গে পরে আসছি।

যদি হাইজিন নিয়েই কথা বলতে হয়- তাহলে মেয়েকে, মেয়েদের, মেয়ের বন্ধুকে শেখান যে প্রতি চার থেকে আট ঘণ্টা অন্তর ট্যাম্পুন বা ন্যাপকিন বদল করতে হয়। কথা বলুন স্যানিটারি প্রোডাক্ট নিয়ে। স্যানিটারি প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে সচেতনতা ও তা যাদের অর্থনৈতিক সাধ্যের বাইরে ( ভারতে ৩৫৫ মিলিয়ন নারী যাদের মাসিক হয় তাদের মধ্যে মাত্র ১২ % স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন, বাকীরা হয় কিনতে লজ্জা পান নয়ত স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন এবং আরও বাকিদের কেনার সামর্থ্যই নেই ) তাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করুন।বেসিক হাইজিন প্রোডাক্টের ওপর কর চাপানোর বিরোধিতা করুন। যাতে মেন্সট্রুয়াল প্রোডাক্ট শুধুমাত্র অপ্‌শনাল না হয়ে টিকে থাকতে পারে তার চেষ্টা করুন। পানীয় জল ও অন্যান্য স্যানিটেশনের মতই ইহা বেসিক হিউম্যান রাইট্‌স। অস্বাস্থ্যকর নানা পদ্ধতি মাসিকের দিনগুলিতে ব্যবহার করা বিপজ্জনক। ইহাতে নানারূপ সংক্রমণ ঘটিয়া থাকে। ইহা বুঝাইতে ও স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি, পরিচ্ছন্নতা কার্যকর করিতে চেষ্টা করুন। যারা এই জাতীয় ক্যাম্পেইনের বিরোধিতায় ডিগ্‌নিটি নামক কোমোডে বসে হাঁক পাড়ছেন, তাদের জবানীতে সামান্য মোমবাতি ধরার জন্য UN থেকে এই কিছু তথ্য প্রচার করা হয়েছিলো, যেমন এইটি (UN-এ কিছু কাজ-টাজও হয়, ব্যক্তিগত হাতেকলম অভিজ্ঞতা) ।

Women and girls gain privacy and dignity through proper sanitation and menstrual hygiene facilities. It is now well known that poor sanitation facilities in schools prevent girls from attending school, especially during menstruation.

কথা বলুন হাইজিন কি আর কি নয় তার সম্পুর্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য নিয়ে। কথা বলুন মেন্সট্রুয়াল রক্তের উপাদান নিয়ে। দাগ দেখে বা স্যানিটারি প্যাডে লাল দেখে আঁতকে ওঠার চাইতে আঁতকে উঠুন উট্‌কো অসভ্যতা নিয়ে, যা আপনাকে বাইগট হতে শেখায়। মাসিক ‘দূষিত’ বলে প্রচার করতে শেখায়। বিজ্ঞানের তথ্যমতে, ৫০ থেকে ৬০ মিলি মাসিকের রক্তে যা থাকে-

১। রক্ত
২। এন্ডোমেট্রিয়াল ফ্লুয়িড
৩। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু
৪। সার্ভিকাল এবং ভ্যাজাইনাল মিউকোসা
৫। ভ্যজাইনাল মাইক্রোব্‌স

আর এই পরিমাণ মাসিক স্রাবে রক্ত থাকছে ৩৫ শতাংশ। মোটামুটি এই। জানাচ্ছেন বিজ্ঞান পত্রিকা আমেরিকান জার্নাল অব অবস্টেট্রিক্স অ্যান্ড গাইনিকলজি। এবং তাঁরা এও জানাচ্ছেন যে বিজ্ঞানে আজ পর্যন্ত মাসিকের রক্তে দূষণের বা অশুদ্ধির (impurity) কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হ্যাঁ ইহা বর্জ্য। যদিও এর ক্লিনিক্যাল ব্যবহার আছে। কিন্তু না জেনে ‘ও’ জিনিশ, মানে মাসিক-স্রাব সংগ্রহ না করিতে যাওয়াই শ্রেয়। কিন্তু বর্জ্য বলিয়াই অশুদ্ধ বা ছুঁৎমার্গের বিষয় নয়। গোপনতার বিষয় নয় । ঘৃণার ও ভেদবমিরও বিষয় নয়। আর তাই ‘এই বর্জ্য লইয়া কি করিব, কি করিতে হয়’ বলিয়া কেঁচো কাঁদুনিরও বিষয় নয়। কিছুই করিবেননা। স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে শোষণ করাইয়া পরিচ্ছন্ন উপায়ে ডিস্পোজ করিবেন। হিসি করার মতই সিম্পল।

নেহাতই কিছু করিতে হইলে দরকারি কথা বলিবেন। কথা বলুন PMS বা প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিন্ড্রোম নিয়ে। পিউবার্টি নিয়ে। মুড্‌-স্যুইং নিয়ে। মাসিকজনিত নিরাপত্তা নিয়ে। এবং সর্বপরি পরিচ্ছন্ন স্যানিটারি ন্যাপকিন যাতে ১২ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশের কাছে পৌছতে পারে, তার উপায় নিয়ে।

আজকাল আর ফেবুতে বেশী লিখতে একেবারেই পছন্দ হয়না। একঘণ্টা ব্যয় করে একটি পোস্টের বদলে তার বদলে একঘণ্টা কমিউনিটিতে পরিশ্রম করাতেই আমার শ্রমের সার্থকতা বলে বোধ হয়। কিন্তু লেখা গুরুত্বপুর্ন কাজ। তাই নিশ্চয়ই লিখিতে হবে। আর, আরও লিখিতে হবে এইধরনের সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন সচেতনতা নষ্ট করার চেষ্টা করা হবে। আর তা হবে সম্পুর্ন অবৈজ্ঞানিক উপায়ে। কিম্ভূত ‘জেন্ডার-নর্মের’ প্রাচীন খোলস থেকে। ঘৃণা ও লজ্জা পয়দা করতে। যাতে জামায় রক্তের দাগ দেখলে এই ২০১৮ সালেও ইশকুলের একটি মেয়েকে স্কার্ট আড়াল করে কুঁকড়ে বাড়ি ফিরতে হয়। মাসিকের রক্ত অশুদ্ধ। তাকে দেখানো মানে ঘিন্‌চক্কর। তাকে নিয়ে আর্ট !!

অশিক্ষা, কূপমণ্ডূকতা মানুষকে মায়োপিক বানাবে, এতো অবশ্যম্ভাবী।

এই মানসিকতা এক বেশুমার যাবজ্জীবন ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসী। প্যাট্রিয়ার্কির দাস-দাসী। পুরুষতন্ত্রের খণ্ডহরগুলিতে ঘুরে ঘুরে লিপস্টিক দাগিয়ে, মুছে বজায় রাখতে হয় এই ভাবধারাকে।

এইযে প্যাট্রিয়ার্কির বানানো বুলিগুলি দুর্ভাগ্যবশত আউড়াতে হয় কিছু নারীদেরও। কারণ পিতৃতন্ত্রের বিশ্বস্ত বাসিন্দা হিসেবে তাঁরা এগুলি আত্মস্থ করে ফেলেছেন।

সেগুলি আরেকবার এইভাবে সাজিয়ে ফেলাও যায়, আবার আরও যোগ করে যাওয়া যায় –

পিরিয়ড বদরক্ত মানে দূষিত
মানে গা ঘিন্‌ঘিন্‌
মানে স্যানিটারি প্রোডাক্ট নিয়ে আর্ট হওয়া মানে গিমিক
মানে ডার্টি
মানে গ্রস
মানে গেলো গেলো
মানে একেই কি বলে আধুনিকতা
মানে মানে মানে…
যোগ করে যান।

এর সঙ্গে উপড়ি আছে- তা হল একপ্রকার কিম্ভূতবুদ্ধির ‘থ্রেট’। অনেকের কাছে ফেসবুকের আলোচনা শুনিলাম- যদি লিঙ্গস্রাব বা বীর্য নিয়ে এইরূপ বাড়াবাড়ি করা হয়, (মানে যেহেতু রজঃস্রাবের সিমিউলেশন দেখানো হচ্ছে), তাহলে কি তা গ্রহণ করিতে পারিবেন? লে পাগ্‌লা!! রজঃস্রাব আর বীর্য গুলিয়ে দিতে সামন্ত-শৌর্য নিয়ে নেমে পড়েছেন। কথা হচ্ছে নারীর রজঃস্রাব নিয়ে। তার হাইজিন নিয়ে। নারীর রজঃস্রাবকে ঘৃণিত করে দেখার ট্যাবু নির্মাণের মূর্খ রাজনীতি নিয়ে, সেখানে ঝাম্পুখারাস ঝপাং করে বাইনারিতে আগমন ! পুরুষদের স্রাব নিয়ে তো কথাই হচ্ছিলনা। বাইনারি কিসের? মেয়েদের স্বাস্থ্য-শারীরবৃত্তীয় সচেতনতার আলোচনা পুরুষের শারীরবৃত্তীয়র সাথে তুলনা ছাড়া অসম্ভব কেনরে ভ্রাতা? যেন মেয়েদের রজঃস্রাবের সচেতনতার বিষয়গুলি পুরুষকে আক্রমণ করছে। অত্যন্ত বিলা বাইগট্রি এবং গাঁট পুরুষতন্ত্র ছাড়া এজিনিশ না মুমকিন!

(এই একই ‘বাড়াবাড়ি’ লব্জ কিউ এর ছবি নিয়েও বলতে শুনেছি। অনেক পরিচালক তো আমায় ব্যক্তিগত ভাবে বলেছেন। যৌনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি। করতে হয়। যতদিন রানী ভিক্টোরিয়া আপনাদের বাগানে ফুটে আছেন, ততদিন করতে হয় ।) ফলে এই সব বাক্যরচনা দেখলে একমাত্র কাজ রুখে দাঁড়ানো। এগুলি শুধু বাজে লজিকই না, এগুলি অবৈজ্ঞানিক। এগুলিকে চিহ্নিত করুন ও চ্যালেঞ্জ করুন। কারণ এগুলি ক্ষতিকর। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে সরাসরি কেউ কেউ হয়ত মাসিককে ডার্টি বা গ্রস বলছেননা। কিন্তু ক্যাম্পেইন বা আর্ট এক্সপ্রেশনগুলিকে এই তকমায় বিদ্ধ করছেন। যাতে ক্যাম্পেইন বা এই অ্যাড্‌ভোকেসি তা সে ছবি, গ্রাফিক্স বা ফোটোগ্রাফ যাই হোক সেগুলির প্রতি অসচেতন মানুষের আরও বিবমিষা জন্মায়। কথা বলার, প্রশ্ন তোলার প্ল্যাটফর্মটি যারা সাহস করে শুরু করছেন তা ভেস্তে যায়। সেক্ষেত্রে সরাসরি আরও কথা বলুন। আরও চ্যালেঞ্জ করুন। বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে এদের ভুল প্রমাণিত করুন। অশিক্ষার ভুত তাড়ানোর জন্য ডায়ালগের বিকল্প নেই।

কারণ মেন্সট্রুয়াল রক্তের মতই এই ক্যাম্পেইনগুলিও স্বাভাবিক। অন্তত এই যুবাটি, অনিকেত মিত্র তো খুব সহজ ভাবেই বলতে পেরেছেন। বার্তা তো স্পষ্টই। হিন্দু ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট কুসংস্কার যদি আপনাকে স্বাভাবিক সত্য গ্রহণ করতে ভয় পাওয়ায়, লজ্জিত বোধ করায় তাহলে উৎসবই (সে যদি হয় ধর্মের) তো উত্তম প্ল্যাটফর্ম এই কুসংস্কারজনিত ভ্রমগুলি তাড়াবার। ধর্মজনিত কুসংস্কার ও ম্যিথের চক্করে না পড়ে সত্যটা গ্রহণ করুন অক্সিজেনের মত। উই নীড ইট !! কেউ কেউ চালাকি করে এই আর্ট-ক্যাম্পেইনগুলির, ওপর আঘাত আনছেন এই মর্মে যে ইহা উচ্চশিল্প নহে। ধরে নেওয়া হল- নয়। ( মেন্সট্রুয়াল আর্ট প্রসঙ্গে পরে আসছি ) সব আর্ট, সব ক্যাম্পেইন অপুর্ব কোন শিল্পকীর্তি নাইবা হল। গোটা শতাব্দীতে ও জিনিশ কমই হয়। কিন্তু অশিক্ষার ভুত তাড়ানোর কাজটা তো করে যেতে হবে। তাই কাজ হোক। কারণ কাজ জরুরী। কারণ এই মাসিকের ট্যাবুর কারণে ভারত ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোয় নারীর প্রাথমিক স্বাস্থ্যর দাবীগুলি বিঘ্নিত হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তার অভাবে, উপযুক্ত স্যানিটারি প্রোডাক্টের অভাবে ১২ থেকে ১৮ বছর বয়েসের মেয়েরা গড়ে মাসে ৫ দিন, মানে বছরে পঞ্চাশ দিনের মত ইশকুলে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সমীক্ষা চালিয়েছিলেন প্ল্যান ইন্ডিয়া, ২০১১ সালে।

এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে প্রতিটি মেয়েদের রেস্ট্ রুমে এক রুপোলী বাক্স আবিষ্কার করি। তাতে ট্যাম্পুন রাখা থাকে। স্যামন্য পয়সা ফেলে সেগুলি কিনে ব্যবহার করা যায়। আর থাকে প্রপার ডিস্পোসাল মানে ব্যবহার করা ট্যাম্পুন বা প্যাড আলাদা বাক্সে ফেলার সুরক্ষা, যাতে ব্যাক্টিরিয়া না এসে জমে। আমার অধিক স্রাবের ধাত। একটি মাত্র কোয়ার্টার ফেলে প্রথম যেদিন শৌচালয়ে সহজে এগুলি ব্যবহার করার স্বাদ পেয়েছিলাম সেদিন সারাজীবন ধরে বহন করা সব ভার- ”সঙ্গে ন্যাপকিন আছে কিনা, যদি বেশী স্রাব হয় তো কোথায় কিনতে পাবো”, সবার ওপরে বার বার ন্যাপকিন বদল করার অতি আবশ্যক প্রয়োজন সহজ হয়ে যাওয়ায় পালকের মত স্বাধীনতা অনুভব করেছিলাম। আমাদের সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণীদেরই এই অবস্থা, ভাবুন প্রত্যন্ত অঞ্চলের কথা। সুবিধাবিহীনদের কথা । টয়লেট নেই।পানীয় জল নেই। স্যানিটারি ন্যাপকিন? ট্যাম্পুন? এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সিঙ্গাপুর আর জাপানে একশো শতাংশ মানুষ স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন। চীনে ৭৪ শতাংশ মানুষ। ভারতে ১২ শতাংশ । আর বাংলাদেশে ৫ শতাংশ মানুষ।

গত শতকের সত্তর দশক থেকেই নানান আর্ট ফর্মে এই সাবভার্সানের কাজ শুরু হয়েছিল। এই স্বভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে অস্বস্তিমুক্ত করার লক্ষ্যে। সত্তরে কাজ করেছেন জুডি শিকাগো। যেমন জুডি শিকাগো’র এই কাজ- একটি নারী হাত রক্তমাখা এক ট্যাম্পুন বের করে আনছে ভ্যাজাইনা থেকে। ২০/ ২৪ ইঞ্চির এক ফোটোলিথোগ্রাফ। মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলা হল। ঝাঁকিয়ে দেওয়াই হল উদ্দেশ্য। কালচারাল শক্‌। অনুদার, অনাধুনিক, প্রাচীন হীনমন্যতায় টান। রে রে করে উঠলেন পিউরিটান। লাল দাগকে ভয় পেয়ে গেছেন।

বছর দেড়েক আগে পার্ফর্মেন্স শিল্পী এইচ প্লুইস ( H Plewis) তার নিজের মেন্সট্রুয়াল রক্ত সংগ্রহ করতে শুরু করেন। পরে তাকে মিশ্রিত করেন জেলির সাথে, তার থেকে গড়ে তোলেন এক খরগোশের অবয়ব। আমার নিজের রক্তে তৈরি এই শিল্পকাজ- আমাকে রক্তে থাকা প্লাজমার কথা মনে করায়, বলেন প্লুইস। এই রক্ত দূষিত না, সংক্রামক না, অশুদ্ধও না।
যারা মেন্সট্রুয়াল-আর্ট দেখে বিবমিষায় ভোগেন, ‘দূষিত দূষিত’ করে কুসংস্কার ছড়ান তাদের মুখে এক সপাট তামাচা।

আরেক মেন্সট্রুয়াল অ্যাক্টিভিস্ট ও শিল্পী কার্নেস্কি বলেন- আমরা নারীরা মিসজিনিকে আত্মগত করে ফেলেছি। যা আমাদের দিয়ে বলিয়ে নেয় মাসিক এক ট্যাবু এবং এটি দূষিত ও অশুদ্ধ। অথচ শরীরের এই শক্তিশালী প্রক্রিয়াটি নিয়ে আমাদের সেলিব্রেট করার কথা ছিল।

রুপী কাউর, এক কানাডিয়ান ভারতীয়, কাজ করলেন ২০১৫ সালে। বিছানায় উল্টো মুখে, (মানে আমাদের পশ্চাৎ দেখাইয়া) শুয়ে আছেন রুপী। বিছানার চাদরে আর পায়জামায় রজঃস্রাবের দাগ। ইন্সটাগ্রামে ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি। কিন্তু সেই একই কিতাব। জুবান। প্রাচীন রুচি-পুলিশগিরি । অশ্লীলতার দায়ে ছবিটি সরিয়ে দ্যায় ইন্সটাগ্রাম। কিন্তু সে ছবি ততদিনে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। অতএব নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায় ইন্সটাগ্রাম রুপীর কাছে। ছবিটি আবার পোস্ট করা হয়।

২০১৫ তেই আমেরিকান শিল্পী জেন লুইস কাজ করলেন তার প্রোজেক্ট “বিউটি ইন ব্লাড” নিয়ে। তিনি তার মাসিকের রক্তকে ভাসিয়ে দিলেন একটি ফিশ ট্যাঙ্কে । আর তার স্বামীকে বললেন সেই ঘুর্ণন, ছড়িয়ে পড়া লোহিতকণার ভেসে বেড়ানোকে ফ্রেমে ধারণ করতে। রব লুইস, জেনের স্বামী ক্যামেরায় ধরে রাখলেন সেই সব বিমূর্ত বিস্তার।

২০০০ সালে ভেনেসা তিয়েগ মেন্সট্রুয়াল-আর্ট নিয়ে কাজ করতে এসে একটি নতুন টার্ম তৈরি করলেন। পিরিয়ড আর্টকে নাম দিয়ে বললেন- ‘মেন্সট্রালা’। তার সমস্ত পেইন্টিং, যাতে তার নিজের মাসিকের রক্তকে রঙ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলিকে তিনি ট্যাগ করলেন মেন্সট্রালায়। লজ্জাকে অপসারিত করা। দূষিত, নোংরা ইত্যাদির প্রয়োগের বিরুদ্ধে কথা বলা। স্বাভাবিককে নতুন করে ইন্ট্রোডিউস করা। মাসিকের রক্ত দেখে, এমনকি ডিজিট্যাল ছবিতে ন্যাপকিনে লাল রঙ দেখে যারা মূর্ছা যান, তাদের জন্যে স্মেলিং -সল্ট এই মেন্সট্রালা। আপনার চিরন্তন কালচারাল অভ্যাসে ঝটকা ! সাংস্কৃতিক দ্রোহ !!

প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি, বিশেষ করে ভারতে, অবৈজ্ঞানিকই রয়ে গেলো। বেসিক হাইজিন ও বৈজ্ঞানিক সচেতনতা থাকলে মেন্সট্রুয়াল রক্ত দেখে রুচি-পুলিশি করতে হতোনা। দূষিত, নোংরা বলে একঘরে করার, লজ্জায় কুঁকড়ে থাকতে বাধ্য করার পুরুষতন্ত্রের রাজনীতিটির নিয়মমাফিক পতাকা তুলতে হতোনা।

মাসিক একটি ‘শেয়ার্ড’, ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা। এই নিয়ে সচেতনতাও শেয়ার করারই বিষয়। বর্জ্য অবৈজ্ঞানিক মানসিকতা তাড়াইতে সচেতনতা ক্যাম্পেইনগুলি শেয়ার করাই আবশ্যক। তত দ্রুত আমরা বুঝিতে শিখিব ইহা ‘কমিউনিটির’ বিষয়। এই লইয়া কমিউনিটি যদি চুপ করিয়া থাকে, ভুল তথ্য ও ঘৃণা ছড়াইয়া যায়, তখন ক্যাম্পেইন আসলে ‘অত্যন্ত’ আবশ্যক। কমিউনিটি মানে আমি, আপনি ও ফেসবুকের ভোক্তারা না। এর মধ্যে আছেন অষ্টাশি শতাংশ ভারতীয় যাদের নাগালে পরিচ্ছন্ন ফেমিনিন হাইজিন প্রোডাক্ট ওরফে প্যাড পৌঁছায়না। যারা ট্যাক্স দিয়ে দামী প্রোডাক্ট খরিদ করতে পারেননা। এরা প্রান্তিক। শহরের ঘেটোতে বসে আপনি, আপনারা ভাবতেই পারেন- আমি কি দুর্মর নারীবাদী, স্বাধীন, আমি হিন্দু অনুশাসন তোয়াক্কা না করেই পিরিয়ডের সময় ঠাকুরঘরে গেছি। এইসব গ্রাহ্যই করিনি। আপনাদের সাধুবাদ! সাধ্বীবাদ! কিন্তু আপনারা ভারতবর্ষ না !! আপনাকে, আপনাদের প্রিভিলেজ নিয়ে আপনি, আপনারা, আমি কেউই এই অষ্টাশি শতাংশ না। আপনারা প্রান্তিক মানুষের অবস্থান সম্পর্কে অজ্ঞ ও তাদের প্রতিকূলতাকে সম্মান করেননা। এদেশে বাড়িতে গোরুর মাংস রাখার কারণে খুন হয়ে যেতে হয়। প্রত্যন্ত গ্রামে রেপ্‌ড হয়ে গেলে পুলিশ এফ আই আর নেয়না।
আপনি, আপনারা এদের চেনেননা।

ধর্ম আর তার নিদান এদের জীবনে যে থাবা বসায় তার বিরুদ্ধে দ্রোহ করলে এখনও জীবন হারাতে হয়। ধর্ম এটা করে। প্রান্তিকরা ভোগে। তাই ধর্মের অনুষঙ্গ টেনে বেসিক্‌ হাইজিন প্রোডাক্টের কথা বলা জরুরী। বেসিক্‌ হাইজিন। পণ্য। তবে তা মাথার সিঁদুর বা লিপস্টিক পর্যায়ের অপ্‌শনাল পণ্য নয়। বেসিক্‌ । যে বেসিকের আওতায় অষ্টাশি শতাংশ নেই। আর সেই দেশে মাথার সিঁদুরকে অগ্রাধিকার দিয়ে করমুক্ত করা হয়। আর কর বসে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর। ১২ % জি এস টি !! এই অষ্টাশি শতাংশের সবাই সিঁদুরের ভোক্তা না। কিন্তু এদের সবারই মাসিক হয়। আর পণ্য? না অধিকারের পণ্য? অতি আবশ্যকীয় পণ্য ? মাসিকের প্রয়োজনে নির্মিত পণ্যে মাসিকের রঙ লাগলে মাসিক বা নারীদেহ পণ্য হয়ে যায়না। মেল-আইডেন্টিফায়েড হয়ে যায়না। বরং ভালো যে ‘মেল’ রাও আইডেন্টিফাই করতে সক্ষম হচ্ছেন যে স্যানিটারি ন্যাপকিন সচেতনতার ক্যাম্পেইনের বিষয়। যৌন অবদমন ঘটছেনা এখানে।ঘটছে অবদমন থেকে মুক্তি। ভারতের ‘প্যাডম্যান’ খ্যাত অরুনাচলম মুরুগানাথমকে ঠিক এই যুক্তিতে একঘরে করা হয়েছিলো। তিনি মেয়েদের গোপনতাকে পণ্য করছেন।সৌভাগ্য তিনি দমে যাননি ।আজ তার তৈরি উদ্ভাবন অত্যন্ত কম টাকার বিনিময়ে অত্যাবশ্যকীয় এই পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে ভারতের গ্রামে গ্রামে। ২৯ টি আরও গরীব আর উন্নয়নশীল দেশে। আর আমাদের প্রোফাইলে আমাদের হাসি, সেল্‌ফি, রান্না, রেস্টুরেন্ট, জন্ম-পার্টি, পোস্ট, লেখালিখি, গীটার বাদন সবই তাই। পণ্য। বিনিময়ে অফুরন্ত লাইক। আমরা সবাই এর অংশীদার।

মেন্সট্রুয়াল-আর্ট শিল্প কি শিল্প না তা নিয়ে ভেদবমি না করে জানার চেষ্টা করুন- কেন বারোমাস প্রায় চল্লিশ বছরের ব্যাপ্তিতে মেয়েদের রক্তের ট্যাক্স দিতে হবে। কেন দেশের কোণে কোণে স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন থাকবেনা ?কেন এই পণ্য বায়ো-ডিগ্রেডেবল হবেনা? কেন বাকী অষ্টাশি শতাংশ এই পরিষেবা পানীয় জলের মত পাবেননা। যতদিন না হবে ততদিন আপনার দেওয়ালে, আইফোনে, শহুরে ঘেটোতে রজস্বলার ন্যপকিন লাল রঙ নিয়ে দেগে থাকবে। লাল। অনেকটা সিঁদুরের মতই লাল। তবে কারুর শখের ঘোমটার আড়ালে না। খুল্লাম্‌। খুল্লা।।

খুব সহজ কথা। যাকে বলে সিধি বাত্‌। তা’হল- যা সহজ, যা স্বাভাবিক, যা শারীরবৃত্তীয়, তাকে দূষিত বলে এইভাবে সাংস্কৃতিক দূষণ করার বর্জ্য মানসিকতাই যদি না থাকতো, বেসিক পণ্য নিয়ে অকারণ ট্যাবু বা তার পরিষেবার অভাব না থাকত তাহলে এই ক্যাম্পেইন গুলোরই কি প্রয়োজন হত?

ততদিন, এই অসচেতন আর বাইগট্‌দের মুখের ওপর চলুক মেন্সট্রুয়াল অ্যাক্টিভিজম্‌। খুলে আম্‌।

লা লা মেন্সট্রালা!!
অসাম্‌ মেন্সট্রালা !!

গান।
ভালবেসে গান।

– অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, ২৬ সেপ্টেম্বর। আমেরিকা।

ফুটনোটঃ ব্যক্তিগত মতামত- আমি ভিস্যুয়াল মাধ্যমের মানুষ। অনিকেত মিত্র’র আর্টটি আমার হয়ত অসাধারণ শিল্পকর্ম লাগেনি। কিন্তু কাজটি খুবই নান্দনিক। অসাধারণ হল তার সাহস করে কাজটি করা। ধর্মের গোড়ায় এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাসের গোড়ায়, দুটিরই ইয়েতে, মানে দুটি বিষয়কেই হাইলাইট করেছেন তিনি। এরকম সাহস অনেকেই আরও করবেন আশা রাখছি। থুড়ি, আসলে সাধারণ হবে। কারণ বিষয়টা স্বভাবিক।

লেখক বাংলা ও গুরুচণ্ডালীতে লেখেন। বাংলায় সর্বজনগ্রাহ্য তত্ত্ব-পরিভাষা না তৈরি হওয়া পর্যন্ত মূল ভাষায় সৃষ্ট টার্মিনোলজিতেই আস্থা রাখবেন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami