নাটক

ইঁদুর -মানুষ খেলা: অনুভবের স্বরলিপি ~ প্রিয়ক মিত্র

নাটকের সমালোচনা

 জন স্টেইনবাকের উপন্যাস ‘অফ মাইস অ্যান্ড মেন’ -এর নামটি নেওয়া হয়েছিল রবার্ট বার্নসের ‘টু আ মাউস’ কবিতার পংক্তি থেকে। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট আমেরিকার মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশন। যে যুগকে ইতিহাসের পরিভাষায় বলা হয় নিকেলেডিয়ান যুগ। এই মহামন্দা, রাষ্ট্রীয় অচলাবস্থার সময় আমেরিকার গ্রামাঞ্চলের একটি ফার্মে কিছু মানুষের স্বপ্ন দেখা এবং স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আখ্যান ‘অফ মাইস অ্যান্ড মেন’! এই উপন্যাসের মঞ্চায়ন যখন ‘হাওড়া ব্রাত্যজন’ করল সাম্প্রতিকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের আগ্রহ ছিল, কী হতে পারে এই উপন্যাসের নাট্যভাবনার স্বরূপ?

বিশ শতকের আমেরিকার খামারবাড়ির প্রেক্ষাপটে স্টেইনবাকের নির্লিপ্ত এবং নিষ্ঠুর লেখনী যে গল্প বলেছিল, তাকে নাট্যরূপ দিতে গিয়ে প্রথমেই নাট্যকারকে মমত্ববোধ রাখতে হবে চরিত্রগুলির প্রতি, নইলে নাটকটি হয়ে যেতে পারে একটি আদ্যন্ত সাসপেন্স থ্রিলার, সমস্ত দার্শনিক সম্ভাবনা খুইয়ে। নাট্যকার দেবাশিষ বিশ্বাস কোথাও বিচ্যুত হননি সেই সংবেদন থেকে। নিজের জায়গা ছেড়ে উদ্বাস্তু জর্জ আর লেনি এগিয়ে চলেছে কাজের সন্ধানে, সেই মহামন্দার সময় যেমনভাবে শেকড়হীন হয়ে পড়তে হয়েছে বহু মানুষকে। রবিরঞ্জন মৈত্রর সংগীত এবং শেখর সমাদ্দারের আলো সহযাত্রী হয় লেনি এবং জর্জের। লেনি স্মল একটি মরা ইঁদুর বুকে আগলে রাখে, নরম কোমল যেকোনো কিছুকে সে প্রবল ভালবাসে; তার ভালবাসা মাত্রাছাড়া হয়ে নরম জীবন্ত প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার ভালবাসা নির্দ্বিধায় শ্বাসরোধ করে-এতই তীব্র সে ভালোবাসা। ব্রাউনিং-এর ‘পরফিরিয়াস লাভার’ কবিতার প্রেমিক যে অধিকারবোধ থেকে পরফিরিয়ার দীর্ঘ চুল দিয়ে তার শ্বাসরোধ করে, তেমন কোনো অধিকারবোধ নেই উদ্বাস্তু, কর্মহীন , অপরিণত লেনির। এর বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকে জর্জের ভালবাসা; সংযত, পরিণত, মাপা। জর্জকে লেনির দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তার সঙ্গেই তাকে ভাবতে হয় গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য, তাকে কাজ জোগাড় করার কথা ভাবতে হয়। উইড নামক একটি জায়গা থেকে তারা বিতাড়িত। লেনির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে একজন মহিলার শ্লীলতাহানির, কিন্তু লেনির মনে কোনো ধর্ষকাম নেই। সে শুধুই কোমল যা কিছু, তার প্রতি আকৃষ্ট হয়, শিশুর মতন অবুঝ মন নিয়ে ধেয়ে যায় তার দিকে। তাকে জর্জ গল্প শোনায়, স্বপ্নালু এক খামারবাড়ির গল্প, যা তাদের একান্ত নিজেদের। যেখানে তাদের নিজস্ব ক্ষেত, খামার, লেনির জন্য যেখানে অজস্র খরগোশের বন্দোবস্ত থাকবে। এই মায়াবী স্বপ্নে বিভোর হয়ে লেনি শান্ত হয়ে ঘুমোয়‌। জর্জ তার মাতৃসত্তায় লালন করে লেনিকে।তারা হাজির হয় এক খামারবাড়িতে কাজের সন্ধানে। কাজ পেয়েও যায়। তারপর শুরু হয় আখ্যানের আরেক অধ্যায়। তাদের সঙ্গে দেখা হয় খামারবাড়ির প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ক্যান্ডির, তাদের সঙ্গে দেখা হয় স্লিমের। মালিকপুত্র দোর্দন্ডপ্রতাপ কার্লি এবং তার স্ত্রী-ও হাজির হয় কাহিনীতে। নাটকের আখ্যানের শরীরে উপস্থিত থাকে নিগ্রো ক্রুকস।দেখা যায় কয়েকজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন একা মানুষ একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করে চলে, গানে, স্বপ্নে। কার্লিকে কখনও মনে হয় খলনায়ক, বিশেষত লেনির প্রতি তার বর্বরোচিত আচরণ দেখে। কিন্তু তার প্রবল পৌরুষ নগ্ন, অসহায় হয়ে পড়ে তার স্ত্রী-এর সামনে। তার স্ত্রী ব্যাভিচারী, এই ইঙ্গিত ছড়িয়ে থাকে নাটকে; কিন্তু এও বোঝা যায় কার্লির স্ত্রী স্বাধীনচেতা, কার্লির সামন্ততান্ত্রিক পৌরুষকে সে পরোয়া করে না। স্টেইনবাক এই চরিত্রটির ক্ষেত্রে কোনো সহানুভূতি দেখান নি, স্পষ্টত বলেছিলেন, কার্লি এবং কার্লির স্ত্রী-এর চরিত্র শোষকের আইডিয়ামাত্র। নাট্যকার এত নির্দয় হননি, মানবচরিত্রের ধূসরতা কীভাবে দেশকালের এই ধ্বংসমুখিনতাতেও বেঁচে থাকে তা দেখিয়েছেন নাট্যকার। ক্রুকসকে কেন্দ্র করে বর্ণবিদ্বেষের যে আবহ তৈরি হয়, তাও খুব তীক্ষ্ণ নয়। বৃদ্ধ ক্যান্ডির অচল কুকুরকে গুলি করে মারা হয় খামারবাড়ির স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য। বেদনাতুর ক্যান্ডি প্রতিশোধস্পৃহ হয়ে ওঠেনা লহমার জন্যেও। বরং লেনি এবং ক্যান্ডিকে স্লিম দিয়ে দেয় তার আদরের কুকুরছানা। নানান রং-এর মানুষ এবং অবলা পশু সংকটের মধ্যে একসঙ্গে বাঁচে। নাটকের মধ্যান্তর যে  উদ্বেগ তৈরি করে দর্শকের মধ্যে তেমন উদ্বেগ নিয়েই এই সংকটাপন্ন মানুষরা বেঁচে। কিন্তু সে উদ্বেগ কেটেও যায়। আবার নাচে গানে উল্লাসে ভরপুর হয়ে ওঠে মানুষগুলির জীবন। কারণ, তাদের স্বপ্ন আছে।

 

আর জর্জ লেনির এই খামারবাড়ির স্বপ্নই নিষিদ্ধ ইস্তেহারের মতন লেনি মারফৎ পাচার হয় ক্যান্ডি, ক্রুকস এবং শেষত কার্লির স্ত্রী-এর কাছে। ক্যান্ডি জর্জ আর লেনির স্বপ্নের শরিক হতে চায়। কার্লির স্ত্রী তার সুললিত কোমলতা নিয়ে লেনির কাছে আসে। কিন্তু লেনির অসংযত তীব্র ভালবাসার স্পর্শ তারও শ্বাসরুদ্ধ করে। কার্লির স্ত্রী-এর মৃতদেহ সামনে রেখে বৃদ্ধ ক্যান্ডি জর্জকে জিজ্ঞেস করে তাদের নিজেদের জমির কথা। জর্জ জানায় আদতে লেনিকে ভুলিয়ে রাখতেই এই স্বপ্নের জাল বোনা‌। বিশ শতকের আমেরিকান বৃদ্ধ বিশ্বস্ত ভৃত্য জর্জ ততদিনে স্বপ্নপিয়াসী। তার স্বপ্নভঙ্গ তাকে চরম বেদনা দেয়। আর এই অপার্থিব ভালবাসা নিয়ে এমন যান্ত্রিক সময়ে বেঁচে থাকা লেনিকে মুক্তি দেয় জর্জ। লেনির ভালোবাসা।আসলে সহ্য করতে পারবে না এই যন্ত্রসভ্যতায় বেঁচে থাকা কোনো প্রাণী। তাই জর্জের সংহত মাতৃসুলভ ভালোবাসাও শেষমেষ লেনির ভালোবাসার মতই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। জর্জ লেনিকে স্বপ্ন দেখানোর ছলে গুলিবিদ্ধ করে। ভালবাসা, স্বপ্নভঙ্গ, একাকীত্ব, যন্ত্রণা নিয়ে প্রতিটি মানুষ স্তব্ধ হয়ে যায়।

 

লেনির ভূমিকায় শঙ্কর দেবনাথ ভয় পাওয়ান, কাঁদান, স্বপ্ন দেখান। বাংলা নাটকের মঞ্চে এত জীবন্ত অভিনয় সাম্প্রতিকে আর দেখা গেছে কি না জানা নেই। শেখ‍র সমাদ্দারের সহমর্মী আলো যখন খেলছে লেনির মুখে, আর লেনিরূপী শঙ্কর দেবনাথ যখন স্বপ্নে কথোপকথন চালাচ্ছেন ক্লারা আন্টিরূপী কল্যানী বিশ্বাসের সঙ্গে, তখন দর্শক বাক্যহারা হয়ে যান। কৌশিক করের নিস্পৃহ অথচ গভীর সংবেদনশীল অভিনয় তীব্র হয়ে ওঠে মাঝেমধ্যেই। শেষে, লেনিকে হত্যা করার পরে জর্জের সব অব্যক্ত যন্ত্রণা যখন জেগে ওঠে, তখন কৌশিক কর অনন্য হয়ে ওঠেন মঞ্চের ওপর। অহংকারী, দাম্ভিক অথচ ভীরু কার্লির ভূমিকায় সুমিতকুমার রায় যথাযথ, তার শারীরিক বিভঙ্গ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে দর্শকের চোখে, মাঝে মাঝেই। তন্নিষ্ঠা বিশ্বাসের অভিনয়ে কার্লির স্ত্রী-এর প্রগলভতার তলায় চাপা পড়ে থাকা বেদনা, একাকীত্ববোধ স্পষ্ট হয়। দেবাশিষ বিশ্বাস বৃদ্ধ ক্যান্ডির ভূমিকায় অসাধারণ। তার প্রতিটি অনুভূতি আলাদাভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার কষ্টের শরিক হয় দর্শকও। রবিরঞ্জন মৈত্র‍র সংগীত ধরে রাখে কান্ট্রি মিউজিকের আবহ‍, আর পদে পদে চমৎকৃত করে শেখর সমাদ্দারের আলো। দেবাশিষ বিশ্বাসের সংলাপ কোথাও ভুলে যেতে দেয়না নাটকের স্থানকালপাত্র। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখদের ইংরেজি সাহিত্যের অনুবাদের যে ধারা, তার ছাপ আমরা পাই এই নাটকের লেখনীতে।

 

মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তার অন্তরের শূন্যতা ছুঁতে পারেনা। দেশে যখন অর্থনৈতিক ঘাটতি, তখন মানুষের অন্তরও কোনো ঘাটতিপূরণে ব্যস্ত। উদ্বাস্তু, মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজা মানুষের মাঝে লেনি যেন হয়ে থাকে আরেক উদ্বাস্তু। তার শেকড় ছিঁড়ে গেছে এমন কোথাও থেকে, যার নাগাল পায়না তার আশেপাশের মানুষ।’সুবর্ণরেখা’-র বালক বিনুর মতন নতুন বাড়ির স্বপ্ন দেখে সে, যে নতুন বাড়ি অলীক অথচ বাস্তব।

প্রিয়ক মিত্র
Tags
Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami