চলচ্চিত্র

আসিফার পরে, যন্ত্রণার ভাষ্য

লাবণ্য দে

এ বড়ো সুখের সময় নয়, তা বোধ হয় আমরা সকলেই জানি। স্বাধীনতা পা দিল বাহাত্তরে , অথচ আমাদেরই পাশের এবং কাছের একটা দেশে সড়ক নিরাপত্তার জন্য লাখ লাখ মানুষকে রাস্তায় নেমে পুলিশের লাঠি খেতে হচ্ছে, আমাদেরই দেশের নাগরিকদের একদিনের বিধানে নিজেদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে ; আমাদেরই , এই আমাদেরই সামান্য হোস্টেল বা প্রবেশিকা পরীক্ষার দাবী নিয়ে লড়তে গিয়ে শুনতে হচ্ছে নানা কটুক্তি, হুমকি। এমন সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ভয় হয়, আতঙ্ক হয়, যন্ত্রণা হয়। আমরা যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ খুঁজতে কখনো গান করি, কখনো কবিতা লিখি, কখনো স্লোগান দি, চিৎকার করি। মুক্তি মেলে কিনা জানা নেই, তবে মুক্তি বা আশ্রয়ের সন্ধান চলে নানাভাবে।

 

বেদনা বা চারিপাশে ঘিরে থাকা অসন্তোষের বিরুদ্ধতা আজকের থেকে নয়। যুগ যুগ ধরে মানুষ যেমন ধ্বংস করেছে, তেমন আবার মানুষই সেই ধংসস্তুপের ধূলিকণায় লিখে এসেছে প্রতিবাদী ছত্র। সতেরো শতকের রোমান্টিক কবি সাহিত্যিকেরা মনে করতেন যাবতীয় বিষাদের উৎসস্থল সমাজ এবং অন্য মানুষ, তাদের কুকর্মই কবির একমাত্র অসুখের কারণ। কবিহৃদয় শুদ্ধ ও পবিত্র, বাইরের পাপ-ই তাকে কলুষিত করছে। রোমান্টিক কবিরা তাই অন্যায়ের বিপরীতে গিয়ে প্রেমের গান গাইলেন, সুন্দরবন্দনা করলেন। আধুনিক শিল্পীরা আবার বিষাদকে দেখলেন খানিক অন্যভাবে। পৃথিবী বিষাদময়, এবং তার দায় প্রত্যেকের, এমনকি সেই ব্যক্তিশিল্পীরও। আধুনিক শিল্প তাই বিষাদের নতুন ভাষ্য বয়ে আনলো, বিষাদময় পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা ও আত্মপরীক্ষাই হয়ে উঠলো মোকাবিলার হাতিয়ার। বা সবসময় মোকাবিলাও না, মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থ চেতনার আত্মদর্শনই হয়ে উঠলো শিল্পের কথন। আধুনিক শিল্পে তাই যখন যন্ত্রণাকে ব্যক্ত করা শুরু হলো, সেই যন্ত্রণার উৎসের দায় বর্তালো সেই গান গাওয়া, গল্প বলা বা কবিতা লেখা মানুষটির ওপরেও, তার অস্তিত্ব কখনোই এই সার্বিক পাপ থেকে মুক্তি পেলো না। ‘আফটার আসিফা’ ও মুক্তি পায় না, মুক্তি পেতে চায়না, মুক্তি দিতে চায়না। আসিফা বানোর পর দুমিনিটের নীরবতা পালনও অসহ্য হয়ে ওঠে, আমরা চিৎকার করতে চাই- আকাশ বিদীর্ণ করে যন্ত্রণার ছবি এঁকে দিতে চাই। আধুনিকতার নিয়ম মেনে এই অন্যায়ের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাইনা আমরা কেউ- আমি, আপনি আমাদের সবাইকে উঠে এসে দাঁড়াতে হয় কাঠগড়ায়।

 

‘আফটার আসিফা’ শুনলেই আমাদের মনে কি কিছু ছবি ভেসে ওঠে? আট বছরের ছোট্ট মেয়েটা গণধর্ষিত হয়ে মারা যাওয়ার পর ঠিক কি কি ঘটেছিলো, মনে পড়ে? ধর্ষণের প্রতিবাদ হওয়ার পরিবর্তে হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্বে মুসলমান মেয়েটির ধর্ষকদের সমর্থনে উল্লাস মিছিল বের হয়েছিলো। হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় থাকার অন্যায়ে মুসলমান মেয়েটির দেহ কবর দিতে তার বাবা মাকে পাড়ি দিতে হয়েছিলো আট মাইল। আসিফার পর আর কি কি হয়েছিলো? আরো অনেক হিন্দু আরো অনেক মুসলমানকে ধর্ষণ করেছিলো, আরো অনেক মুসলমান আরো অনেক হিন্দুকে ধর্ষণ করেছিলো। দেশের মাটিকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে প্রতিনিয়ত চলছিলো ক্ষমতার আস্ফালন, ধর্মীয় বিদ্বেষ আর নারী শরীর প্রতিটা যুদ্ধের মতোই বারবার বারবার ছিন্নভিন্ন হচ্ছিলো। আচ্ছা, কখনো ভেবে দেখেছেন, যোনিতে বলপ্রয়োগ করা একটা নারীশরীর, বা গরু চুরির দায়ে গণপিটুনিতে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আসা একটা মানুষ, দাঙ্গায় কুড়িয়ে পাওয়া রক্তাক্ত সন্তানের বাবা-মা – এদের কোনো দেশ থাকে কিনা! যে দেশ মুহুর্তের মধ্যে চল্লিশ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়, যে দেশ ঘোষণা করে মুসলমান মেয়েদের কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করা উচিত, যে দেশে বছরের পর বছর কার্ফিউ জারি করে বুলেটে ঝাঁজরা করে দেওয়া হয় দেহ, সে দেশ কার দেশ? সে বসবাসস্থল কি মানবজাতির? উগ্র জাতীয়তাবাদে ঢাকা পড়ে যায় দেশপ্রেম। ‘আফটার আসিফা’-এ ধর্ষণ থেকে জীবনে ফিরতে না পারা চরিত্রেরা তাই বলে ওঠে- “আমার কোনো দেশ নেই”।

বসনিয়ার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রোমানিয়ান নাট্যকার মাতেই ভিসনেইক ‘The Body of a Woman as a Battlefield of the Bosnian War’ নাটকে দুই নারী চরিত্রকে ফেলে দেন এক অদ্ভুত অসীমে। স্পেস টা যদিও হসপিটালের ঘর, তবুও একজন যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ষিতা নারী, ও আরেকজন সাইকোলজিস্ট নারীর কথোপকথনে, নৈঃশব্দ এক অদ্ভুত শূণ্যতা তৈরি হয়। ‘আফটার আসিফা’ ছবিটি এই নাটকটি থেকে অনুপ্রাণিত। তবে সিনেমাটির দুটি চরিত্রই ধর্ষিতা। তারা এক অসীম শূণ্যে চুপ করে থাকে, বা প্রলাপ বকতে থাকে, অথবা চিৎকার করতে থাকে। ছবিটি খুব কনশাসলি সেলফ রিফ্লেকসিভ। লুমিয়ার ব্রাদারের ১৮৯৫ এ তৈরি করা ‘Sprinkler Sprinkled’ ছবিটিতে খুব সচেতনভাবেই বাগানের মালী ছুটে গিয়ে দুষ্টু ছেলেটিকে ফ্রেমের মধ্যে টেনে নিয়ে এসে পিটুনি দেয়। তা থেকেই স্পষ্ট, যা ঘটছে, তা কেবল সিনেমাটির জন্যই- ঐ ফ্রেমের বাইরে এই ঘটনাটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই ছবি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইরানি চলচ্চিত্রকার কিয়ারোস্তামির বানিয়ে ফেলা একটি শর্ট ফিল্মে এই সেলফ রিফ্লেক্সিভিটি আরো সুস্পষ্ট। ক্যামেরার পিছনে থাকা বাচ্চাটির রেডি বলা দিয়ে আকশান শুরু হয় এবং ফ্রেমের মধ্যে চলা ঘটনা দেখে ক্যামেরার পিছন থেকে হেসে গড়িয়ে পড়তে থাকে ছেলেটি। বাচ্চা ছেলেটির ক্যামেরার ফ্রেমে থাকা দুটি চরিত্র ক্রমাগত ফ্রেমের স্পেসেই ছোটাছুটি করতে থাকে। বোঝা যায় বাগানটি অনেক বড়ো, তাও তারা ছোটাছুটি করতে গিয়ে ওই নির্দিষ্ট জায়গাটুকু ছেড়ে বেরোচ্ছে না। কারণ এই ফ্রেমের বাইরে আর সিনেমা নেই- আর এই ঘটনা ঘটছে শুধুমাত্র সিনেমাটার জন্যই। ঘটনা আছে, তাই সিনেমা হচ্ছে এমন নয়, বরং সিনেমা হচ্ছে  বলেই ঘটনাগুলি ঘটছে। ‘আফটার আসিফা’ সিনেমাটি না থাকলেও সিনেমার অভ্যন্তরের সেট, অভিনেতা কিছুরই অস্তিত্ব থাকতো না। তাই সিনেমাটি তার এই অস্তিত্ব বিষয়ে খুব সচেতন। খুব সচেতনভাবেই সিনেমার জন্যই যে সব কিছু হচ্ছে, এই আলো, ক্যামেরা, অভিনয় তা নিয়ে ওয়াকিবহাল এই কাজটি। এই শূন্যতা, এই দুটি চরিত্র, সমস্ত কিছু যে খুব তৈরি করা, সিনেমা আছে তাই সবকিছু আছে- সে বিষয়টি আমাদের ছবি গোপন করতে চায়নি। তাই ছবির  পরিচালক-ও হয়ে ওঠে ছবির আরেক চরিত্র।
 

এই সিনেমাটিতে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা কী ও কেন তা বলা বেশ জটিল। এটি আমার অভিনয় করা প্রথম সিনেমা। আমি যখন চরিত্রটি পাই, বুঝে গেছি তা কখনোই একজন আসিফা বানোর চরিত্রাভিনয় নয়, তা কখনো কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র নয়, তা ধর্ষিতার চেতনার এক অস্ফুট বলিষ্ঠ অভিব্যক্তিমাত্র ! আমি জানিনা একজন ধর্ষিত না হওয়া নারী ধর্ষণের যন্ত্রণা ব্যক্ত করতে পারে কিনা। না পারেনা, আসলে আমরা কখনোই অন্য চরিত্র হয়ে উঠতে পারিনা, কেবল অন্য চরিত্রের মতো হওয়ার চেষ্টা করি। ব্রেশটের আলিয়েনেশান থিওরি অনেকদিন  আগেই আমাদের জানিয়ে দিয়েছে চরিত্র না হয়ে উঠতে চেয়ে শুধুমাত্র তাকে ব্যক্ত করার চেষ্টার কথা। এই ছবিতে অভিনয়ের রেজিস্টারটি কিছুটা তাই, অভিনেতাদের চরিত্র হয়ে উঠতে হয় না, বরং দমবন্ধ করা বধ্যভূমিতে নিঃসাড় হয়ে পড়ে থাকতে থাকতে কিছু কথা বলতে হয়। অভিনেতা চরিত্র নন, বরং এক বিশেষ ভাবনার প্রতিভূ হয়ে ওঠেন। তার বলা কথা বধ্যভূমিতে পচতে থাকা যেকোনো মানুষের কথা হতে পারে, নিজেকে দেশের অংশ না মনে করা যেকোনো চেতনার উচ্চারণ হতে পারে। যন্ত্রণার কি কোনো ভাষা হয়? যদি হয়, সেই ভাষাতেই কথা বলতে চেয়েছে চরিত্রগুলি। তাদের উচ্চারণ তাই বলিষ্ঠ উচ্চারণ, আক্রমণাত্মক উচ্চারণ, কখনো বা উত্তর না দেওয়ার সিদ্ধান্তের উচ্চারণ। কতটা যন্ত্রণা, কতটা অভিমান থেকে একটা  চরিত্র বলতে পারে- ‘আমি আমার দেশকে ঘেন্না করি’ ?

সিনেমা তৈরির প্রক্রিয়ায় থাকাটা বেশ মজার। একধরনের যন্ত্রণা, ভাবনা, দর্শন থেকে জন্ম নেয় শিল্প, তারপর তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ার মাঝে যান্ত্রিকতায় চাপা পড়ে যায় সেই অনুভব। সিনেমা, বিশেষত সিনেমা মাধ্যমটি যেহেতু খুব যান্ত্রিক, আলো, শুটিং থেকে ডাবিং থেকে এডিটিং এর দীর্ঘ পদ্ধতিক্রম পেরিয়ে আবার সম্পূর্ণ সিনেমা তৈরি হওয়ার পর শুরুর অনুভবে ফিরতে পারা এক দীর্ঘ যাত্রার মতো। সিনেমা চলাকালীন এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে তাই আমরা কিছু মজা করি। একদম আগে থেকে ঠিক না করে রেখে পরিচালক এবং অভিনেতার তাৎক্ষনিক চিন্তাভাবনা থেকে তৈরি হয় কিছু দৃশ্য। অদ্ভুতভাবে এই  ইম্প্রোভাইজেশানে আমাদের পরিচালক বন্ধু সায়ন্তনের একইরকম প্রশ্নে আমরা দুই অভিনেত্রী সম্পূর্ণ বিপরীত দুরকম রেসপন্স করি। সায়ন্তন অবশ্য তা মূল সিনেমাটিতে না রেখে সেই সিনগুলোকে ট্রেলারে ব্যবহার করে দেয়। অভিনয়ের ধরণও আলোচনা করতে করতে আমরা তিনজন(আমি, সায়ন্তন, শ্রাবস্তী দি) মিলে ঠিক করি।  যেহেতু একটানা বড়ো বড়ো সংলাপ- আগে থেকেই আমাদের রিহার্সাল করে সবটা মুখস্ত রাখতে হয়েছিলো।

 

সিনেমা বিষয়টা বাইরে থেকে যতটা মজার, তৈরির পদ্ধতিটা মোটেই তত মজার না। একটা সামান্য আলো প্রক্ষেপণ ভুল হলে বা এক মিনিট পরে ক্যামেরা চালু হলে আবার পুরো সিন রিটেক, ডাবিং চলাকালীন সেটে বলা কথাগুলো পুনরায় একইভাবে ঠোঁট দেখে দেখে মেলানো। এই সমস্ত কিছু পেরিয়ে যখন পুরো সিনেমাটা তৈরি হয় তখন তা দেখে, শুনে এক অদ্ভুত শান্তি লাগে। যদিও এই কাজের উৎস যন্ত্রণার আস্ফালন, তাও দীর্ঘ কর্মপদ্ধতিপেরিয়ে পুরো কাজটি সম্পূর্ণ হলে অদ্ভুত এক ভালোলাগা কাজ করে। হসপিটালের বেডে নিজের সন্তানকেপ্রথমবার হাত পা ছুঁড়ে কেঁদে উঠতে দেখার মতো তৃপ্তি হয়।

 

ইমেজের পর ইমেজ সাজিয়ে, শব্দের পর শব্দের আবরণে আমরা যন্ত্রণাকে ধরতে চেয়েছিলাম। আমরা কন্সেন্ট্রেশানক্যাম্পের দেওয়ালের গায়ে কবিতা লিখতে পারিনা,আমরা যুদ্ধক্ষেত্রের শতশত কবরের ফলকে ছবি আঁকতে পারিনা জেনেও আমরা আসিফার পর সিনেমা বানিয়েছিলাম।কারণ আমরা বর্বর নই, আমরা অত্যন্ত নিরুপায়। শিথিল থেকে শিথিলতর হয়ে যাওয়ার আগেই বিষাদের খাদের নীচে দাঁড়িয়ে আমরা কিছু চিৎকার করতে চেয়েছিলাম। অবশ্য সেই চিৎকার কতটা দূর অবধি পৌঁছবে তার বেশিরভাগটাই যারা দেখছেন, শুনছেন, ভাবছেন তাদের উপর।

আফটার আসিফা –পরিচালনা-সায়ন্তন দত্ত , অভিনয়ে- শ্রাবস্তী ঘোষ, লাবণ্য দে

লাবণ্য দে ‘আফটার আসিফা’ ছবিটির দুজন মূল অভিনেতার মধ্যে একজন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক বিভাগের ছাত্রী। বই পড়তে, সিনেমা, নাটক দেখতে, অভিনয় শিল্পে উৎসাহী। পাহাড় খুব পছন্দের। মাঝেমাঝেই দৈনন্দিনের একঘেয়েমি কাটাতে দিকশূণ্যপুর পাড়ি দিতে চান।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami