চলচ্চিত্র

সুব্রত মিত্রের চৌহদ্দির মধ্যে কেউ নেই – অনির্বাণ লাহিড়ী

সুব্রত মিত্র-র কাছে অনেক কিছু শিখেছি। সুব্রত মিত্র কখনো আমার মাস্টারমশাই ছিলেন না। এই দুই পরস্পরবিরোধী লাইন পড়ে যদি কারো ধন্ধ লাগে তো জানিয়ে রাখি শুধু আমি না, গোটা ভারতে প্রায় যেকোন চিত্রগ্রাহক/ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র-র কাছে আজন্ম ঋণী। এখন প্রশ্ন কে সুব্রত মিত্র ? সত্যজিতের ক্যামেরাম্যান, মার্চেন্ট-আইভরির ভারতীয় ছবির চিত্রগ্রাহক, কে কে মহাজন, সানি জোসেফ, সন্তোষ শিবন, রাফে মাহমুদ, আর এস্‌আর্‌এফ্‌টিআই-এর প্রথম দিকের সব ছাত্রের গুরু, বেঁচে থাকাকালীন এক অবহেলিত, পাগলাটে প্রতিভা নাকি ভারতের একমাত্র কোড্যাক পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমাটোগ্রাফার, যাঁর কাজ দেখে ভিত্তোরিও স্তোরারো তাঁকে জড়িয়ে ধরেছিলেন? উইকিপিডিয়ার রুখাশুখা তথ্য গুলো দূরে সরিয়ে একটু তলিয়ে দেখা যাক।

কর্মসূত্রে নানা চিত্রগ্রাহকদের সাথে গত এক দশকের আমার কথোপকথনে বরাবর প্রশ্ন ছিল, পূর্বসূরীদের মধ্যে কারা সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন গত তিরিশ বছরের ভারতীয় চিত্রগ্রহণে। খুব প্রত্যাশিতভাবেই দুটো নাম উঠে এসেছে – সুব্রত মিত্র আর ভি কে মূর্তি। প্রায় উল্টো দুই ধারার প্রতিভূ এই দুজন আগামী পাঁচ-ছয় প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলেছেন। গোবিন্দ নিহালনি মূর্তির সহকারী ছিলেন। তিনিও “সহজ কথা বলতে পারা সহজে” প্রসঙ্গে সুব্রত মিত্রকেই চিহ্নিত করেছেন। রবি কে চন্দ্রনের প্রিয় ছবি চারুলতা (১৯৬৪)। গত তিরিশ বছর ধরে প্রতি মাসেই তিনি এই ছবি দেখেন। ঘরের মধ্যে ছন্দের তালে তালে ঘুরতে থাকা চারুর প্রায় ছায়াহীন ফ্রেম দেখে তাঁর ভারমের মনে পড়ে যায়। সুদীপ চট্টোপাধ্যায় এই মুহূর্তে ব্যস্ততম চিত্রগ্রাহকদের একজন। বনশালির নতুন ছবির সেটে তাঁর সাথে কথা বলতে গিয়ে জানতে পারলাম তিনি মনে করেন সবে তিনি সিনেমাটোগ্রাফির ব্যাপারটা বুঝতে শুরু করেছেন!
তার চোখে সত্যিকারের বড়ো সিনেমাটোগ্রাফারের উদাহরণ – সেই সুব্রত মিত্র।

আমি যে ফিল্মস্কুলে পড়াতাম, সেখানে অশোক মেহতা এসেছিলেন গেস্ট-লেকচর দিতে। সেই অশোক মেহতা, থার্টি সিক্স চৌরঙ্গি লেন-য়ের (১৯৮১) মায়াময় ইউরোপিয়ান ঘরানার কম্পোজিশন থেকে ত্রিকাল-য়ের (১৯৮৫) মতো নস্টালজিয়া বা খলনায়ক-য়ের (১৯৯৩) মতো মূলধারায় যাঁর ছিল অনায়াস যাতায়াত। ঠিক কে কে মহাজনের ধাঁচেই। সুব্রত মিত্রকে তিনিও গুরু বলে মানতেন।

সুব্রত মিত্র-র শুরু, আমরা জানি, রনোয়ার সেটে। তাঁর তখন একটা ফটোগ্রাফির স্টুডিও ছিল। অবসার্ভারের ভূমিকায় তাঁকে দেখে সত্যজিত তাঁর ছবির ক্যামেরা অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের প্রতিশ্রুতি দেন। সেই ছবি করার কথা ছিল নিমাই ঘোষের। ছিন্নমূল (১৯৫০) খ্যাত নিমাই ঘোষ। কিন্তু, ঘটনাচক্রে তিনি তখন দেশছাড়া। মাদ্রাজে। আর ফিরবেননা কলকাতায়। অগত্যা কোনদিন মুভি-ক্যামেরায় হাত না লাগানো এক সদ্য-যুবক ফটোগ্রাফারকে নিয়ে শুরু হল পথের পাঁচালী (১৯৫৫) তাও আবার এক ভাঙা ক্যামেরায়।

সেযুগে মিচেল-এন.সি ছিল রেঞ্জ-ফাইন্ডার মোশন পিক্‌চর্‌ ক্যামেরা। ভিউইং লেন্স আর রেকর্ডিং লেন্স আলাদা থাকতো। স্নাইপার রাইফ্‌ল্‌-য়ের কায়দায়। দু-ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করে অপারেটিভ ক্যামেরাম্যান বুঝতে পারতো ঠিক কী ফ্রেম রেকর্ড হচ্ছে। সুব্রত মিত্রকে যে ক্যামেরা নিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছিল তার রেঞ্জ-ফাইন্ডার পদ্ধতিতে সমস্যা ছিল। প্রথমদিন রেকর্ডিং-য়ের পরেই ধরা পড়ল ফোরগ্রাউন্ডের (মানে মিডিয়ম ক্লোস আপ দূরত্ব অবধি) ভিউয়িং ফ্রেম আর রেকর্ডিং ফ্রেম এক হচ্ছেনা। সোজা কথায় ক্যামেরাম্যান যা দেখছে তা ক্যামেরায় উঠছেনা। ফ্রেম বদলে যাচ্ছে। ক্যামেরা নিশ্চল থাকলে তাও এক রকম। ক্যামেরা চলতে থাকলে, বিশেষত ট্র্যাকে, আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে শ্যুট চালিয়ে যেতে হবে। পথের পাঁচালী-র এক তৃতীয়াংশ এভাবেই তোলা হয়েছিল।

মণি কউল নজর (১৯৯১) শ্যুট করার সময় ভিউ-ফাইন্ডার না দেখে অনেক শট নিয়েছিলেন জানি। সেখানে ক্যামেরা এক অদৃশ্য চরিত্র। কিন্তু, নজর-এর চিন্তাভাবনা আলাদা। পথের পাঁচালী সেখানে নিছক বাস্তব। লিরিক্যাল, মোহময় বাস্তব। কিন্তু, বহিরঙ্গ বাস্তব। নজরের মতো অন্তর্বাস্তব নয়। গত বছর বলোনিয়ায় নবজন্ম নেয়া অপু-ত্রয়ীর 4K প্রিন্ট দেখার সুযোগ হয়েছিল। সুব্রত মিত্র কেন নন্দনের অন্ধকার প্রজেকশনের ওপর হাড়ে হাড়ে চটে ছিলেন তা স্পষ্ট হয়ে যায় এই রেস্টর্‌ড্‌ প্রিন্ট থেকেই।

সুব্রত মিত্র-র নিজের লেখা থেকেই পাচ্ছি পথের পাঁচালী-র বহির্দৃশ্য আর ভিতর-বাহির দৃশ্য পুরোই তৈরি হয়েছিল স্টুডিয়োর বাইরে। সত্যিকার লোকেশনে। সে যুগে সাদা-কালো কোড্যাক স্টকে ৫০ আর ৬৪ স্পিডের ফিল্মের বাইরে বিশেষ কিছু পাওয়া যেতনা। পথের পাঁচালী থেকেই এই সীমিত ক্ষমতার ইমল্‌শনে গল্পের নক্‌শা অনুযায়ী কন্ট্রাস্ট তৈরির খেলা শুরু করেছিলেন সুব্রত মিত্র। আলো ক্রমশ বাড়াতে থাকলে ছবিও ফর্সা হতে শুরু করে। ধূসর বর্ণ দেখায় সাদা। যে কোন রং শেষ পর্যন্ত সাদাতে পরিণত হয় পর্দায় প্রক্ষেপণে। তার পর আলো আরো বাড়ালেও তা সাদাই থাকে। কারণ সাদার চেয়ে বেশি ফর্সা কিছু হয়না। কালোর ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টোটা ঘটে।
এই সাদা আর কালোকে যদি একটা স্কেলের দুই বিন্দু ধরি, তবে সেই স্কেলের মাঝের বিন্দু হবে মাঝধূসর। এই মধ্যবিন্দু আর সাদার মাঝখানে আরো একটা বিন্দু নেয়া যায়, ঠিক যেমন তার আর কালোর মধ্যে নেয়া যায় এক বিন্দু। ব্যাপারটা অনেকটা সুরের সপ্তকের মতো। ষড়জ থেকে সুর শুরু হয়, ঠিক যেমন কালো থেকে ধীরে ধীরে ছবির brightness বেড়ে এক এক পরত করে ধূসর থেকে সাদার দিকে যেতে শুরু করে।

সঙ্গীতে দুই ষড়জের মাঝে কতগুলো স্বর থাকবে, আর তারা কার পরে কে কীভাবে আসবে তা রাগরূপ তৈরি করে। রস থেকে ভাবে যাতায়াতেরএকমাত্র রাস্তা বানায়। আলোকচিত্রে (যে কোনচিত্রেই, আসলে) বিভিন্ন ধূসরের permutation-combination, আর কতোগুলো ধূসর নেয়া হচ্ছে, তা, এইএকই কাজ করে থাকে। পুরোনো চিত্রশিল্পীরা সবাই এই ব্যাপারটা জানতেন। আর জানতেন ফটোগ্রাফার অ্যানসেল অ্যাডাম্‌স্‌, সুব্রত মিত্র-র ওপর যাঁর প্রভাব পুরো মাত্রায় ছিল। ফটোগ্রাফার অ্যান্‌সেল্‌ অ্যাডাম্‌স্‌ ফটোগ্রাফের সীমিত মাধ্যমের মধ্যে খুব ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাওয়া, মীড়ের মতো, কনট্রাস্ট তৈরি করতেন। দেখতে লাগতো বাস্তবের চেয়েও বেশী বাস্তব, দারুণ একটা ব্যাপার। সঙ্গীতের যেমন সপ্তক, তেমনি ঔজ্জ্বল্যের দশক বা দশ ধাপ মাণদণ্ড হিসেবে রেখেছিলেন অ্যাডাম্‌স্‌। তাঁর দ্য নেগেটিভ বা দ্য প্রিন্ট বইয়ে এই নিয়ে রীতিমতো ক্লাস নিয়েছেন তিনি। সুব্রত মিত্র, সিনেমার আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে, এই ব্যাপারটাকে আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছিলেন।

তাঁর কাজের বিবরণে যাওয়ার আগে দেখা যাক কী ভাবে ব্যাপারটা ঘটে।

যদি শুধু দুই উজ্বলতা দিয়ে ছবি তৈরি করা হয়, তবে তা দেখতে কেমন লাগবে? দেখা যাক।

এটা একটা ফটোগ্রাফ। কিন্তু, দেখতে লাগছে ঠিক চায়না কালিতে বানানো লাইন ড্রইং-য়ের মতো।

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে সাদা আর কালোর মধ্যে অন্য কোন টোন না থাকায় তুমুল কনট্রাস্ট তৈরি হয়েছে। একেবারেই বাস্তবিক না।

সাদা আর কালোর মধ্যে যদি আরো দুটো টোন রাখা হয়, তবে?

এখানে মাঝে আরো দুটো ধূসর রয়েছে। গাঢ় আর হাল্কা – দুরকম ধূসর। বাস্তবের আরো একধাপ কাছে এসে গেল না কি? কিন্তু, এখনো খুব একটা বাস্তবঘেঁষা না।

এবার রাখা হল চোদ্দ রকম ধূসর, গাঢ় থেকে ক্রমশ হাল্কা, কালো আর সাদার মাঝে।

অনেক বেশি বাস্তব লাগছে। ঠিক কি না? কিন্তু, এখনো হাতের অনেকটা জায়গা জ্বলে গেছে মনে হচ্ছে। ফিল্মের যুগে একে বলতো পোস্টারাইজেশন।

ব্যাপারটা মা আর পা-র মধ্যে অনেকগুলো শ্রুতির বদলে একটা সোজা লাফ দেয়ার মতো। বা ভৈরবী, ভয়রোঁ আর পূর্বীর কোমল রে একই ভাবে গাওয়ার মতো। কোমল রে বললেও এগুলো এক স্বর নয় মোটেই। যেমন পোলাওয়ের ঘি আর পান্তাভাতের ঘি দুইই ঘি হলেও তাদের স্বাদ এক নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরণের মুড বা আবেগ দেখানোর জন্য সুব্রত মিত্র খুব ধীরে ধীরে, পরতের পর পরত সাজিয়ে ধূসরের সমারোহ তৈরি করবেন।

হাতের ফটোগ্রাফে দেখতে পাচ্ছি যখন সাদা আর কালোর মধ্যে ২৫৪ বা তারও বেশি ধূসর বর্ণ ক্রমিকভাবে চলে আসছে।

অত্যন্ত বাস্তব, সন্দেহ নেই।

পথের পাঁচালী-তে এই বিষয়ে হাত পাকাতে শুরু করলেও, এর ওপর মুন্সীয়ানার পরীক্ষা এল পরের ছবি অপরাজিত-য় (১৯৫৫)। বেনারসের উঠোন সত্যিকার কোন লোকেশন বেছে করার কথা হয়েছিল প্রথমে। কিন্তু, আর্ট ডিরেক্টর বংশী চন্দ্রগুপ্ত আর পরিচালক সত্যজিত স্বয়ং আসন্ন বর্ষার কথা ভেবে প্ল্যান বদলান। সেট তৈরি হবে টালিগঞ্জের স্টুডিওয়। সুব্রত মিত্রর ডাক পড়লো। কাশীর উঠোনের চারপাশে বড়ো বড়ো বাড়ি। সূর্যের আলো সোজাসুজি ঢোকার প্রশ্নই নেই। হয়তো এক চিলতে আকাশ দেখা যায়। সেখান থেকেই আলো আসে উঠোনে। সেই আলো এতই ছড়ানো যে তাতে গাঢ় ছায়া পড়েনা। খুব স্তিমিত, অনেকটা বর্ষার মেঘে ঢাকা আকাশের আলোয় যেরকম ছায়া পড়ে, সেরকম।সুব্রত মিত্র আকাশ থেকে পড়লেন। এরকম আলো আবার করা যায় নাকি? সারা পৃথিবীতে কেউ কখনো শোনেনি। তখন আলো দেয়া হত সোজা নায়ক নায়িকার মুখে। বড়ো বড়ো বাটার পেপার, ডিফিউসার, মেয়েদের স্টকিং লাগিয়ে একটু ছড়িয়ে দেয়া হতো। স্টকিং লেন্সেও লাগানো হত, একটু বেবি-ফেস করার জন্য। কিন্তু ছায়াহীন আলো তা বলে? মুম্বাইয়ে ফলি মিস্ত্রি, জাল মিস্ত্রি-রা আলো বাউন্স করতেন বটে। কিন্তু, সেই বাউন্সের পেছনে খুব নির্দিষ্ট কোন যুক্তি ছিলনা। সেই আলো-ও কোন এক দিক থেকেই আসতো। ছায়াহীন আলো তখনই হতে পারে যখন বোঝা যাচ্ছেনা আলো কোন দিক থেকে আসছে। মানে সব দিক থেকে একই রকম আলো আসছে আর কি।একটু আগেই বলেছি বর্ষাকালে, এদেশে, মেঘে ঢাকা আকাশের আলো এরকম। আর সূর্য ওঠার আগে, বা অস্ত যাওয়ার সময় শুধু আকাশের আলোও, বিশেষ করে ইউরোপের উত্তরের দেশগুলোতে অনেকটা এরকমই। সুব্রত মিত্র ভাবতে শুরু করলেন কেন বর্ষায় এরকম ছায়াহীন আলো আসে। প্রশ্নটা তোলা জরুরী ছিল। উত্তরটা অত্যন্ত সোজা। ছায়া তৈরি হয় আলোর গতিপথে কোনও অস্বচ্ছ জিনিস রাখলে। সেই ছায়া মিলিয়ে যায় পাশ থেকে সমান জোড়ালো আলো দিলে। কিন্তু সেই সমান জোড়ালো আলো নিজের জোরে এক দ্বিতীয় ছায়া তৈরি করবে। তাকে মিলিয়ে দিতে লাগাতে হবে তিন নম্বর আলো। তৈরি হবে তিন নম্বর ছায়া। আসবে চার নম্বর আলো আর তার নিজের ছায়া। এভাবে আলোর সংখ্যা বেড়েই চলবে। সেযুগে আলো দিয়ে ছায়া কাটার এই আলোর সিরিজকে বলতো ওয়শ লাইট। আর এই ধরণের আলো করাকে বলতো ওয়শ লাইটিং। সুব্রত মিত্রর সমস্যার সমাধান এই পদ্ধতিতে সম্ভব ছিলনা। তিনি ভাবলেন ছায়া তৈরি হয় যদি আলোর উৎস ছবির সাব্‌জেক্টের চেয়ে ছোট হয়। কিন্তু, যদি তা বড়ো হয়, তা হলে? আকাশের আলোয় ছায়া পড়েনা কারণ সব দিক থেকেই সমান আলো আসছে। সূর্যের আলোয় ছায়া পড়ে কারণ ওই রকম জোরালো আলো শুধু এক দিক থেকেই আসছে। সুব্রত মিত্র স্টুডিওতে অল্প খরচে কৃত্রিম আকাশ তৈরির সিদ্ধান্ত নিলেন। সে যুগে ব্ল্যাক-এন্ড-হোয়াইট ফিল্মে কালো থেকে সাদা খুব বেশি স্তরে স্তরে যাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু, সুব্রত ল্যাব টেকনিশিয়ন আর কেমিস্ট-দের সাথে কথা বলা শুরু করলেন। কারণ তিনি তৈরি করতে যাচ্ছেন ভৈরবী, বিভিন ঔজ্জ্বল্যের ধূসর দিয়ে।

সৌম্যেন্দু রায়কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম ঠিক কী হয়েছিল সেদিন। তরুণ সৌম্যেন্দু সেদিন ক্যামেরা অ্যাটেন্ডেন্ট থেকে এক ধাপ ওপরে উঠে সুব্রত মিত্র-র সহকারী। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন তিনি।প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার জন্য সুব্রত বেছে নিলেন একটা চওড়া একটু বিবর্ণ (যাকে চলতি ভাষায় অফ্‌-হোয়াইট বলে) পেইন্টার ফ্রেম। তার ওপর থেকে ফেললেন বড়ো বড়ো টাংস্টেন ল্যাম্পের আলো। কিছুটা ছড়িয়ে গেলো। কিন্তু, এখানেই শেষ হলোনা। আকাশ হল এক ১৮০°  বিস্তীর্ণ প্রায় সম-ঔজ্জ্বল্যের চাঁদোয়া যা সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটায়।সুব্রত ঠিক এরকমই এক চাঁদোয়া তৈরি করলেন যা নিচে থেকে আসা মাল্টি টোয়েন্টি আর সোলার লাইটের প্রতিফলন ঘটাবে। ওপর আর নিচের আলোর এই ছড়িয়ে যাওয়া আর প্রতিফলনের ফলে তৈরি হল এক ছায়াহীন আলো।বেনারসের সরু গলির আর উঠোনের স্তিমিত বিবর্ণতার সাথে দিব্যি মিলে গেল এই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা কনট্রাস্ট।

সত্যজিতের বয়ানে, এর কয়েক বছর পরের আমেরিকান সিনেমাটোগ্রাফার ম্যাগাজিনে সুইডিশ সিনেমাটোগ্রাফার স্বেন নিক্‌ভিস্ট-য়ের কৃত্রিম বাউন্সলাইটিং উদ্ভাবনের দাবী ভিত্তিহীন ছিল। থ্রু এ গ্লাস ডার্ক্‌লি (১৯৬১), যার জন্য নিক্‌ভিস্ট-য়ের এই উদ্ভাবন, অপরাজিত-র পাঁচ বছর পরে তৈরি। গেঁয়ো যোগীর ভিখ পেতে সময় লেগেছিল। কিন্তু, স্বীকৃতি এসেছিল শেষ পর্যন্ত।

১৯৬২-তে প্রথম বাংলা রঙিন ছবি, কাঞ্চনজঙ্ঘা, আরেক বড়ো মাইলস্টোন। এর আগে জলসাঘর আর পরশপাথর-য়ে কন্‌ট্রাস্ট নিয়ে খেলার পাশাপাশি সুব্রত মিত্র কম্পোজিশন, হাতে-ধরা ক্যামেরা, এমনকি ট্যারা ফ্রেম নিয়ে খেলা হয়ে গেছে। অপুর সংসার (১৯৫৯) খুব ক্লাসিকাল কিছু ফ্রেম নিয়ে এলো যা কন্‌ট্রাস্টের খেলায় অদ্ভুত কিছু মুহূর্ত তৈরি করলো।

খুব সূক্ষ্ম ডলি শটের ব্যবহার জলসাঘর-এ কিছু ছিল।আলোর সামনে বিভিন্ন মাত্রার ডিফিউশন বিভিন্ন দূরত্বে রেখে শ্যুট করা সম্ভবত এই সময় থেকেই সুব্রত মিত্র শুরু করেন। এর ফলে যা হয়,চরিত্রের মুখের উপর খুব দক্ষতার সাথে আলোছায়া তৈরি করা যায়। এই কিয়ারোস্কিউরো অবন ঠাকুর,গগন ঠাকুর,রবীন্দ্রনাথের আগেভারতে খুব একটা ছিলনা। সুব্রত মিত্র জলসাঘর (১৯৫৮) আরপরশপাথর (১৯৫৮)– দুই ছবিতেই চরিত্রের নিজের ভেতরের দ্বন্দ্ব তুলে ধরার জন্য এটা আনলেন।

অপুর সংসার (১৯৫৯) ছবিতে খুব ক্লাসিক কিছু কম্পোজিশনের মাধ্যমে প্রথমে অপুর নিঃসঙ্গ লড়াই, তারপর অপর্ণার সাথে একান্ত মুহূর্ত, আবার অপরিসীম নিঃসঙ্গতা, আর শেষে কাজলকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া (যেখানে ঠিক আইজেন্‌স্টাইনের ওভারটোনালমন্তাজের ধাঁচে দুর্গা মারা যাওয়ার পরের তারসানাই ফিরেআসে – একটা আবর্ত সম্পূর্ণ হয়; বালক অপু আবার নিশ্চিন্দিপুরে ফিরেআসে) উঠে আসে। এইসব কম্পোজিশনের কতটা সত্যজিত আর কতটা সুব্রত মিত্র তা বিচার্য বিষয়।

ইন্ডিয়ারির সম্পাদক দেবাঞ্জন দাসের সাথে এই নিয়ে অনেকবার কথা হয়েছে। দেবাঞ্জন ফিল্মস্টাডিজে আমার সতীর্থ, আর আমার প্রথম তথ্যচিত্রের পরিচালক। তার মতে সুব্রত মিত্র চলে যাওয়ার পর সত্যজিতের ফ্রেমিং অনেকটাই বদলে যায়।বর্ষাকালে অপুর চিলেকোঠার ঘর, ছায়াহীন স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, সেই ঘরে টিমটিমে আলো জ্বেলে অপুর দিনযাপন, সেই ঘরেই অপর্ণার আসা এবং ইমোশনালি ঘরের সাজবদল – কাজটা খুব সহজ ছিলনা। বিভূতিভূষণের কথনে সাংঘাতিক কোন ঘটনা খুব একটা ঘটেনা কখনোই (ব্যতিক্রম, দুর্গার মারা যাওয়া)। রোজকার দিনযাপনের ম্যাজিক, অসহনীয়তা আর কোন এক গন্তব্যের আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া – এই ছিল বিভূতিভূষণের প্রথম দুই উপন্যাসের মূল সুর। জীবনকে প্রশ্ন করতে করতে এগিয়ে চলা এই বর্ণনায় ঠিক সঙ্গীতের মীড়ের মতোই এক ধূসর থেকে পরের ধূসরে খুব মসৃণভাবে গড়িয়ে যায় এর ফ্রেম। সেখানে অনেকসময়েই একটু হলিউডের ধাঁচে হিরো চলে আসে ফ্রেমের মাঝখানে। কিন্তু, এর উদ্দেশ্য অন্য। হিরো তার চারপাশের সবকিছুতে বন্দী হয়ে পড়েছে। এর থেকে বেরোনো দরকার।তাই আসে অপর্ণা, আর তারমৃত্যু। তারপরেই আসে আপাতমুক্তি।

অপর্ণা এলে ফ্রেম ক্রমশ ক্লাসিক্যাল হয়ে পড়ে।ঠিক ফটোগ্রাফের মতো।

লক্ষণীয় এখানে অপুর মুখ ফোকাসে নেই, ফোকাস অপর্ণার মুখে। কার কম্পোজিশন এসব?নায়ক (১৯৬৬) সত্যজিত-সুব্রত-র শেষ কাজ একসাথে। এরপর সত্যজিতের ছবিতে আর এধরণের ফ্রেম আসবেনা বিশেষ। আসবেনা জৈবিক ছন্দে তোলা ক্যামেরা-ক্যারেক্টার মুভমেন্ট। আর সুব্রত মিত্র মার্চেন্ট-আইভরি, মুম্বাই আর হংকং-য়ে ফিল্ম তুলতে থাকবেন। কিন্তু, কোন ছবিই তাঁর কাজকে আর পূর্ণতা দেবেনা। ব্যাতিক্রম হয়তো ভিক্টর ব্যানার্জির দ্য অগাস্ট রিকুইয়েম (১৯৮১) আর রমেশ শর্মার নিউ দিল্লী টাইম্‌স্‌ (১৯৮৬)। প্রথম ছবিটা আমি দেখিনি। কিন্তু, এর কাজের প্রশংসা শুনেছি ধ্রুবজ্যোতি বসু, সানি জোসেফের কাছে। দ্বিতীয় ছবিটা বার তিনেক দেখেছি, খারাপ প্রিন্টে। কিন্তু, এদের শট-টেকিং, আলোর ব্যবহার, ক্যামেরার চলন কাঞ্চনজঙ্ঘা-র সুব্রত মিত্র-কে মনে করিয়ে দেয়। মহানগর-য়ের (১৯৬৩) সেই চলন্ত শটে ফ্রেমের হঠাৎ বেঁকে যাওয়া (যেখানে আরতি (মাধবী মুখোপাধ্যায়) চাকরি ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসে) নিউ দিল্লী টাইম্‌স্‌-য়ের শুরুর এক ফ্রেমে উপস্থিত।

সুব্রত মিত্রর কাজ নিয়ে লিখতে গেলে একটা বই দরকার। কোনো প্রবন্ধ-ই যথেষ্ট নয়। কয়েক বছর আগে সৌম্যেন্দু রায়কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এখনকার আলোকচিত্রীদের মধ্যে কার কাজ তাঁর ভালো লাগে। না ভেবেই তিনি বলেছিলেন, “অভীক, ইন্দ্র, শীর্ষ সবাই ভালো। সবাই তাদের কাজ এনে দেখায়। কিন্তু, আমি বলবো, সুব্রত মিত্র আর একটাও পেলাম না। ওর চৌহদ্দির মধ্যে কেউ নেই।“
বিষয়টা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু, ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পোস্ট-প্রডাকশন বিশেষজ্ঞ, কালারিস্ট, নীল স্যাডওয়ল্‌করেরও তাই মত। সুব্রত মিত্র না থাকলে দেবী (১৯৬০) হতনা। হতনা চারুলতা (১৯৬৪) বা নায়ক (১৯৬৬)। কেন? তার খোঁজে বেরোতে হলে লিখতে হবে আর এক দীর্ঘ প্রবন্ধ।

 

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami