চলচ্চিত্র

অনুরাগ কাশ্যপ: মাস্টার ক্লাস ও কিছু খন্ড চিন্তা

মেঘদূত রুদ্র

বিগত অনেক দিন যাবৎ আমি সিনেমা নিয়ে আমার পিএইচডি থিসিস লিখছিলাম। কিছুদিন আগে সেটার প্রথম ড্রাফট-টা মোটামুটি শেষ হয়েছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আগামী এক বছর সিনেমা নিয়ে আমি আর কিছু লিখবো না। কারণ হাজার-হাজার লক্ষ-লক্ষ শব্দ লিখতে লিখতে আমার বদ্ধমূল ধারনা হয়েছিল যে নিউক্লিয়ার সায়েন্স নিয়েও আমি হয়ত নতুন কিছু বলে ফেললেও ফেলতে পারি কিন্তু সিনেমা নিয়ে অন্তত আমার আর নতুন কিছু বলার নেই। যদি বলতে হয় নতুন কিছু শিখে তারপর বলতে হবে। কিন্তু নিজেকে দেওয়া কথাটা আমি রাখতে পারলাম না। আগামীকালের সম্পাদক মহাশয় যখন ১০ই ফেব্রুয়ারি রাতে আমার বলল যে ১১ই ফেব্রুয়ারি কলকাতায় অনুষ্ঠিত চিত্র পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের মাস্টার ক্লাস নিয়ে আমাকে লিখতে হবে তখন এক মিনিটও চিন্তা না করে রাজি হয়ে গেলাম। মনে হল বহুদিন পর কেউ যেন আমায় আমার এক পুরনো প্রেমিকাকে নিয়ে কিছু লিখতে বলেছে। আর কে না জানে যে পুরনো প্রেম রাতে বাড়ে। তার ওপর আবার সময়টা যদি বসন্ত কাল হয় তাহলে তো নিজেকে সামলানোটা মুশকিল হয়ে পড়ে।

অনুরাগের প্রথম আমি যেই ছবিটা দেখেছিলাম সেটা ছিল তার তৃতীয় ছবি ‘নো স্মোকিং’। সালটা হবে ২০০৮-০৯। তার আগের দুটো ছবি ‘পাঁচ’ আর ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ আমি এর পরে দেখেছিলাম। এবং ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল ‘নো স্মোকিং’ আমি দেখেছিলাম অনুরাগ কাশ্যপের সঙ্গে একই হলে বসে। কারণ সেই সময় আমি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়য়ে সিনেমা সংক্রান্ত একটা প্রজেক্টে কাজ করতাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিদ্যা বিভাগ, যেটা কিনা আমার নিজেরই বিভাগ, অনুরাগকে যাদবপুরে নিয়ে এসেছিল একটা সেমিনার করবার জন্য। সেখানে বিবেকানন্দ হলে ‘নো স্মোকিং’ দেখানোর পর ছবিটা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আর সেদিন আমার যে সর্বনাশটা হয়েছিল সেই সর্বনাশের বোঝা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছি। সেই সময় ফিল্ম স্টাডিজ পড়ার দৌলতে আমার ধারনা হয়েছিল যে বলিউড মানে সেটা খারাপ জিনিস এবং সেটাকে সবসময় তির্যক চোখে দেখতে হবে। তাই সেই সময় আমি ক্লাসিক ছবি আর সমসাময়িক কঠিন বিদেশি সব ছবি দেখতাম। বলিউড প্রায় দেখতামই না। কিন্তু ‘নো স্মোকিং’ দেখার পর মনে হয়েছিল যে যে ইন্ডাস্ট্রিতে এরকম ছবি তৈরি হয় সেখানকার ছবি না দেখাটা খুবই অন্যায়। এবং এতে নিজেরই ক্ষতি হয়। যদিও এটাও ঠিক যে বলিউডে অনেক ননসেন্স ছবি সেই সময় তৈরি হয়েছিল। সেটা আগেও হয়েছে আর পরেও হবে। কিন্তু কোন কিছু একেবারেই না দেখা বা দেখার আগেই খারাপ বলে দেগে দেওয়াটা যে অনুচিত সেটা অনুরাগ আমাকে বুঝিয়েছিল। তারপর ওর থেকে অনেক ভাবে অনেক কিছু শিখেছি। কিন্তু শুরুটা হয়েছিল এভাবেই।

তারপর বহু বছর কেটে গেছে। অনুরাগ এখন অনেক বড় নাম। পৃথিবীর তাবড় তাবড় ফেস্টিভ্যালে বড় বড় পরিচালকের ছবির সঙ্গে তার ছবি দেখানো হয়। সেখানে বাঘা বাঘা সব দর্শক সমালোচকরা তার ছবির ভূয়সী প্রশংসা করেন। ২০১৩-র কান চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি ফরাসি সরকারের দেওয়া ‘নাইট অব দা অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটারস’ পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন। রেগুলার বেসিসে তিনি ভেনিস, সানডান্স, বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের সম্মানীয় জুরি হন। তাই দশ বছর পর অনুরাগ যখন আবার কলকাতায় এলেন, এবার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে, তখন আমি এটাই দেখতে চাইছিলাম যে দশ বছর আগের অনুরাগের থেকে আজকের অনুরাগের কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? হলে কি হয়েছে? দশ বছর আগে দেখেছিলাম একজন স্ট্রাগলিং তরুণ পরিচালককে আর এখন যাকে দেখবো সে হল প্রায় সবকিছু পেয়ে যাওয়া একজন পরিচালক। পরিবর্তন তো আশা করাই যায়। বিশেষ করে আমরা যারা বাংলা ছবি করার সাথে যুক্ত তাদের কাছে এটা আশা করাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা দেখেছি যে আমাদের এখানে অধিকাংশ পরিচালকরা, একটা-দুটো ছবি করা হয়ে গেলেই, তাদের হাঁটার স্টাইল, বলার ভঙ্গি ও শোয়ার স্টাইল বদলে ফেলেন। কোন ছবি গঙ্গা পেরোয় না কিন্তু পরিচালকদের বাক্যবাণ সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে যায় প্রতি মুহুর্তে। মানুষ কনফিডেন্ট হলে হাঁটার স্টাইলে পরিবর্তন আসে। কিন্তু এক্ষেত্রে স্টাইলে যে পরিবর্তনটা আসে সেটা কনফিডেন্সের নয়, সেটা ঔদ্ধত্যের, সেটা অহংকারের, সেটা পেছন পাকামির। আর শোয়া নিয়ে আমি আর কি বলব। মানুষের ব্যক্তিগত ব্যপার। ছবি করার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য যদি শোয়া হয় তাহলে টুকটাক শোয়া হয়ত হয় কিন্তু রাতে তৃপ্তির ঘুম হয়না। কারণ সৎ ভাবে শিল্প সৃষ্টি করে যে তৃপ্তিটা আসে সেটা শিল্পের দালালি করে আসেনা। যাই হোক এসব বাদ দিয়ে অনুরাগের প্রসঙ্গে আসি।

১১ই ফেব্রুয়ারি এস.আর.এফ.টি.আই এর অডিটোরিয়ামে যে অনুরাগকে দেখলাম, যে অনুরাগের কথা শুনলাম তার সাথে দশ বছর আগের অনুরাগের বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। সিনেমা নিয়ে সেই একই প্যাশন, সেই একই অধ্যবসায় এবং সেই একই তীক্ষ্ণতা তার রক্তে প্রবাহিত হচ্ছে। গত দশ বছরে তার দুবার ডিভোর্স হয়েছে। তিনি বহু সম্পর্কে জড়িয়েছেন। কিন্তু সিনেমার সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে একই রকম। ব্যক্তিগত সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্ববান নন। এই কারণে তাকে অপরাধী বানানোই যায়। তবে তিনি এমন একজন মানুষ যিনি সিনেমার প্রতি নিবেদিত। তার নিজের কথায় “I am an atheist. Cinema is the only religion I believe in”।

অনুরাগ কাশ্যপ এমন একটা সময় হিন্দি ছবি করতে আসেন যখন বিশ্বায়ন হিন্দি ছবিকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলেছে। সর্ব ক্ষেত্রেই আমরা গ্লোবাল হয়ে উঠতে চাইছি। আর বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমগুলি প্রতিনিয়ত আমাদের গ্লোবাল হওয়ার জন্য উসকোচ্ছে। বাজার আমাদের উসকোচ্ছে যোগ্য ক্রেতা হয়ে ওঠার জন্য। চারিদিকে তখন বীভৎস মজার পরিবেশ বিরাজ করছে। যে মজায় আকণ্ঠ ভোগ আছে। আছে স্রোতে গা এলিয়ে দেওয়া। আর অধিকাংশ মানুষ সেই সময় এই ভাবেই আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করছিল। এবং হিন্দি ছবি তাদেরকে গ্লোবাল বানানোর জন্য প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল। এইরূপ আবহে অনুরাগ তার ছবির মাধ্যমে এই যাবতীয় প্রতিষ্ঠান গুলিকে ‘না’ বলতে শুরু করেন। তাদেরকে প্রশ্ন করা শুরু করেন। তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করা শুরু করেন। সমাজের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ উগরে দিতে শুরু করেন। একের পর এক ডার্ক ছবি তৈরি করে তিনি দেখাতে থাকেন যে এইসব প্রলোভনের মধ্যে আধুনিকতার সত্য লুকিয়ে নেই। সত্য লুকিয়ে আছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিতে, আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে, আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যে। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বায়ন পরবর্তী প্রতিবাদী যুব সত্তার একজন প্রতিনিধি। তাকে যুগ নায়ক আমি বলব না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী অবশ্যই বলব। তাই তাকে দেখতে, যার কথা শুনতে সোমবার অর্থাৎ সপ্তাহের ব্যস্ততম দুপুরে এস.আর.এফ.টি.আই এর প্রেক্ষাগৃহে ভিড় উপচে পড়েছিল। এরকম ভিড় ওখানে শেষ কবে হয়েছিল সেটা ওখানকার শিক্ষকরাও মনে করতে পারছিলেন না। ওখানে এর কিছুদিন আগেই আরেক বিখ্যাত পরিচালক ইমতিয়াজ আলি-র টক ছিল। সেখানে এর ধারেকাছেও ভিড় হয়নি। হবে কিভাবে, ইমতিয়াজ তো বিপ্লবের সেই লিগাসি বহন করেনা যেটা অনুরাগ করেন। এর বাইরেও অনুরাগের কিছু নিজস্বতা আছে। তিনি একটি অপেক্ষাকৃত ছোট শহর থেকে মুম্বাইতে এসে কোন রেফারেন্স ছাড়া অসম্ভব স্ট্রাগল করে ফিল্ম মেকার হয়েছেন। তিনি কোন ফিল্ম স্কুল পাস আউট নন। সেলফ টট একজন ফিল্ম মেকার। বহু বছর ধরে তিনি তার ছবির বিভিন্ন কাজে নতুন ছেলে-মেয়েদের সুযোগ দিচ্ছেন। নতুন ফিল্ম মেকারদের ছবি করার ব্যপারে কখনও পরামর্শ দিয়ে, কখনও টাকা দিয়ে, কখন শ্রম দিয়ে ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে তিনি সাহায্য করে আসছেন। আজীবন তিনি কম টাকায় কষ্ট করে ছবি তৈরি করে এসেছেন (‘বম্বে ভেলভেট’ ছবিটা বাদে)। তার ছবিতে উত্তর ভারতীয় তীব্র পৌরুষকে, পুরুষতন্ত্রকে বারবার ক্রিটিসাইজ করা হয়। মেয়েদের সেক্সুয়াল ডিজায়ারকে সেলিব্রেট করা হয়। অন্যান্য অনেক ফিল্ম মেকারদের মত তার কোন নকল আভিজাত্য নেই। তাকে খুব সহজেই রিচ করা যায়। তার সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে, চায়ের দোকানে বসে কথা বলা যায়। এখনও তিনি মাঝে মাঝে অটোতে চলাফেরা করেন। সেন্সর বোর্ডকে খোলাখুলি খিস্তি করেন। তাদের অন্যায় আবদারের বিরুদ্ধে কোর্টে কেস করেন। যেকোনো রকম ঢ্যামনামির বিরুদ্ধে সোজাসুজি কথা বলেন। জাতি, রাষ্ট্র, সরকার কাউকে রেয়াত করেন না। একটা শিল্প যখন হয় তখন তাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলি অনুসারী শিল্প গড়ে ওঠে। আর যখন একজন চিত্র পরিচালককে দেখতে, তার কথা শুনতে যখন তরুণ ছেলে-মেয়েদের ভিড় উপচে পড়ে তখন তার পেছনে এই অনুসারী চলচ্চিত্র কর্ম গুলো কাজ করে। জনপ্রিয় বা হিট ছবি বানিয়ে বা বড় বড় বাতেলা দিয়ে এই আত্মার আত্মীয়তা অর্জন করা যায়না।

এবার কথা হল অনুরাগ কলকাতায় এসে বললেনটা কি? খবরের কাগজে এগুলোর ভাল রিপোর্ট বের হয়। অনেক কথার মাঝখান থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথাকে বেছে নিয়ে কাগজে সেগুলো কোট করা হয়। আমার কাছে এই কোট করা ব্যপারটা খুবই জটিল সমস্যার ব্যপার। কারণ এইসব ক্ষেত্রে আমি বুঝতেই পারিনা যে কোন কথাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কোন কথাটা কম গুরুত্বপূর্ণ । ফলে লিখতে গেলে সবই লিখতে হবে। আর যদি কারুর মনে চলচ্চিত্রের প্রতি এতটুকুও ভালবাসা থেকে থাকে, যদি কখনও মনে হয়ে থাকে যে তার সুখ-দুঃখ-আবেগ-অনুভূতিকে সিনেমা নামক এই সামান্য মাধ্যমটি কখনও এক চিলতে হলেও স্পর্শ করতে পেরেছিল, তা হলে তাকে পুরো বক্তব্যটা শুনতে হবে। নিচে ইউটিউব লিঙ্ক দেওয়া রইল। শুনতে পারেন।

সেদিনকার আলোচনায় অনুরাগ মূলত তার ছবি তৈরির অভিজ্ঞতা, কাজ করার স্টাইল, তার দর্শন, তার বিশ্ববীক্ষার কথাই শেয়ার করেছেন। উত্তর দিয়েছেন ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নের। প্রথম এবং সর্বপ্রথম যে প্রশ্নটা উঠে আসে সেটা হল আমরা সকলেই চিত্র পরিচালক হতে চাই। ফলে আমাদের মত লোকেরা কিভাবে শুরু করব। কী ধরনের ট্রেনিং নেবো? প্রথম পদক্ষেপটা কি হবে? অনুরাগ বললেন “প্রথম কথা হল ‘আমাদের মতো লোক’ বলে কিছু হয়না। প্রত্যেকেই একেক জন স্বতন্ত্র ব্যাক্তি এবং প্রত্যেকেই যা হতে চায় সেটা হতে পারে। ফলে ব্যপারটা খুবই সরল। একজন ক্যামেরাম্যান হিসেবে শুরু করো। আমার ঘরে যে প্রথম পোস্টারটা আমি লাগিয়েছিলাম সেটা হল -‘The best way to write is just write’।আমি সবাইকেই একটা কথা বলতে চাই সেটা হল সবকিছু যদি অঙ্কের মত হয়ে যায় তাহলে সেটা খুবই একঘেয়ে হয়ে যাবে। প্রত্যেকেই যদি একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন ফলো করে কাজ করতে থাকে, যেই প্যাটার্নটা তাকে শেখানো হয়েছিল, তাহলে সে কখনই নিজেকে খুঁজে পাবেনা। এটা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মত হয়ে যাবে, মেডিসিনের মত হয়ে যাবে। নিজেকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আর নিজের মত হওয়ার মধ্যে কোন লজ্জা নেই। … ফলে নিজের মত হওয়ার চেষ্টা করো। নিজে যা করতে চাইছ সেটা করো। কেউ তোমার ছবি করবে না। এই ঘরে বসে থাকা প্রত্যেকেই ছবি বানাতে চায়। এত কম্পিটিশন। সবাই যদি প্রোডিউসারের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে তাহলে এই ঘরেই তাকে তার বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। কেউ তোমায় সুযোগ দেবেনা। ফলে তুমি যদি সত্যিই তোমার ছবি বানাতে চাও তাহলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাও। গিয়ে নিজের ছবি শুট করতে শুরু কর”।

আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একটা জায়গায় তিনি বলেন যে “…অনেক সময় আমরা নিজেদের এত বড় আর্টিস্ট ভেবে ফেলি যে ফিল্ম তৈরি হওয়ার আগেই আমরা সেই আর্টের মধ্যে হারিয়ে যাই। নিজেদের মহান ভেবে ফেলি। আর সেই মহত্বের বোঝা পিঠে বয়ে নিয়ে চলতে শুরু করি। এই মানসিকতাই আমাদের অধিকাংশদের ধ্বংস করে দেয়। আমি লক্ষ করেছি যে ছোট বয়েসেই বিশেষ ভাবে এটা হয়। এটা যদি কোন ভাবে তুমি তোমার জীবন থেকে কাটিয়ে দিতে পারো তাহলে তুমি কিছু না কিছু একটা খুঁজে পাবেই। … তোমার প্রধান লক্ষ হচ্ছে ফিল্ম বানানো। ফেস্টিভ্যালে যাওয়া, হিট ফিল্ম বানানো বা টাকা রোজগার করা তোমার প্রধান লক্ষ হতে পারেনা। তোমার ছবি তৈরির আকাঙ্ক্ষাটা যদি প্রধান হয় তাহলে তুমি অটোম্যাটিক ভাবেই ফেস্টিভ্যালে যেতে পারবে, সাকসেস পাবে, ছবি বানিয়ে সবকিছুই পাবে।” এবং অনুরাগের যে কথাটা দিয়ে আমি শেষ করব সেটা হল “… আমি সবাইকে একটা কথা বলি সেটা হল যদি তুমি তোমার ছবিটা বানাতে চাও তাহলে তোমাকে অল্প হলেও কনম্যান (A con man is a man who persuades people to give him their money or property by lying to them) হতেই হবে। কারণ তুমি এমন একটা ইন্ডাস্ট্রির সাথে ডিল করছ যেখানে সবাই ভাব দেখায় যে তারা অনেক কিছু জানে কিন্তু আদতে কেউই কিছু জানেনা। আর যেহেতু তারা কিছু জানেনা ফলত তারা মূলত তোমার কনফিডেন্সের ওপরই ইনভেস্ট করে। এটা আমি অনেক আগেই ধরে ফেলেছিলাম। যেটার উদাহরণ হল ‘দেব ডি’। যেখানে ছবিটা তৈরির সময় প্রডিউসাররা আমার প্রতিনিয়ত বলত যে এটা করা যাবেনা, ওটা করা যাবেনা, সংলাপের এই ভাষা পাল্টাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বলতাম হ্যাঁ হ্যাঁ আমি পালটে দেবো। কিন্তু ফাইনালি কিছুই পালটাতাম না। কারণ তারা শুধু ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি পালটে দেবো’ কথাটাই শুনতে চাইত । আরও মজার ব্যাপার হল যখন আমি তাদের সামনেই সেইসব জিনিসগুলো শুট করতাম যেগুলো আমি পালটে দেবো বলে প্রমিস করেছিলাম, তখনও তারা সেটা দেখতে পেতো না।” এই কথাগুলো মাথায় রাখলে মনে হয় তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অনেক সাহায্য হবে। খুব বেশি মানুষ এগুলো বলেনা। বা হয়ত বলতে পারে না। হয়ত বা বলতে জানেও না।

এই মাস্টার ক্লাসটা সকলের জন্য খুলে দেওয়ার জন্য এস.আর.এফ.টি.আই কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। এমনিতে এস.আর.এফ.টি.আই একটা গম্ভীর জায়গা। উটকো এলোমেলো সিনেমার ছাত্ররা হুট করে সেখানে ঢুকে পড়তে পারেনা। সরকারি অফিসের মত গেটে আটকে দেওয়া হয়। কেউ যদি বলে আমি সিনেমাকে ভালবাসি তাই একটু ভেতরে ঢুকতে চাই তাহলে সিকিউরিটি তাকে বলে যে ‘তুমি কি ভালোবাসো সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়। ক্যাম্পাসের ভেতরে এমন কি কেউ আছে যে বা যিনি তোমাকে ভালোবাসে। যদি থাকে তাহলে নাম বল। নইলে ফোটো”। সেদিন অবশ্য শুরুর দিকে এরকম সমস্যা থাকলেও পরে এমন ভিড় হয় যে সিকিউরিটি ঘাবড়ে গিয়ে সবাইকে ঢুকতে দিয়ে দেয়। এই ব্যাপারে শ্যামলদা অর্থাৎ ওখানকার এডিটিং ডিপার্টমেন্টের হেড শ্যামল কর্মকার অনেক সাহায্য করেছিলেন। তিনি ওখানকার গম্ভীর লোকেদের মধ্যে একজন চির তরুণ ফাজিল লোক। প্রাণের মানুষ। তার পরেও শেষের দিকে অনেক মানুষ ঢুকতে পারেনি। এতে অবশ্য এস.আর.এফ.টি.আই কর্তৃপক্ষের কোন দোষ নেই। প্রেক্ষাগৃহে তিল ধারণের জায়গাও আর ছিলনা। এছাড়া এস.আর.এফ.টি.আই এর ডিন তথা চলচ্চিত্র নির্মাতা অশোক বিশ্বনাথন মডারেটর হয়ে বেশি কথা বলে ফেলছিলেন। তাকে বুঝতে হত যে ওখানে হাজার হাজার মানুষ অনুরাগের কথা শুনতে গেছে। তার কথা শুনতে কেউ যায়নি। এছাড়া বাকি বিষয়টা খুবই সুন্দর ছিল।

শেষে একজন আমায় জিজ্ঞেস করছিল যে ‘এই যে এত মানুষ এসেছে এরা সবাই কারা?’ আমি খুব বড় মুখ করে বলেছিলাম যে – এরা সিনেমা প্রেমী। সিনেমা আমদের ধর্ম। আর আমরা কাশ্যপ গোত্র। আগামীকালের সম্পাদক আমাকে অনুরাগের মাস্টার ক্লাস নিয়ে লিখতে বলেছিলেন। জানিনা তার ওপর কতটা সুবিচার করতে পারলাম। আপাত অসংলগ্ন কিছু কথা বার্তা লিখলাম। তবে যেগুলো লিখলাম সেগুলোকে মনে মনে একটা স্ট্রাকচারে সাজালে হয়ত কাশ্যপ গোত্রের বংশ ডায়রির কিছু পাতা পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

ছবি – ইন্টারনেট

Tags
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami