জীবনযাপন

অজ্ঞাতবাসের ডায়েরি

অর্ণব মিত্র

২৮ শে এপ্রিল
“কেন, উন্মাদ করে না ভালোবাসা-
আমি শুধু, নতুন
কাগজ কিনি-খালি গায়ে
ঘুরে বেড়াই ঘরের মধ্যে-চারপাশ
থেকে, কেশে ওঠে মানুষ-চারপাশ থেকে
কতশত ব্যর্থ দিন বহে গেল-
লাল মোটরগাড়িতে, আমার
হাসা হলো না-বিয়েবাড়িতে, যথাযথ
হাসা হলো না আমার-চিহ্নহীন
বছরগুলো, ওই, পড়ে আছে পেছনে-প্রত্যেক
জানলার পর্দা সরিয়ে, আমি
বাড়িয়ে দিই মুখ-আমি দেখি
একটা দিন, আরেকটা দিনের মতো
আরেকটা দিন, আরেকটা দিনের মতো
একইরকম, অস্থিসার, ফাঁকা””

কবিতাটা কার লেখা আমি জানি না। অয়ন পাঠিয়েছে হ্যোয়াটসঅ্যাপে। পাওয়ার পর থেকেই থম মেরে বসে আছি কবিতাটার সামনে। জানি এসব আমাকে মানায় না। কবিতা অথবা অন্যমনস্কতার বিলাসিতা বেসরকারি ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের জন্য নয় । তার জন্য বরাদ্দ শুধু মেরুদণ্ডহীন দিন আর স্বপ্নহীন রাত।“ একটা দিন, আরেকটা দিনের মতো , আরেকটা দিন, আরেকটা দিনের মতো, একইরকম, অস্থিসার, ফাঁকা”” নিজেই নিজেকে জিগ্যেস করি
– তুমি কী বেঁচে আছো অর্ণব মিত্র?
– মানে?
– ধরো চোখ ,মুখ , নাক দিয়ে প্রাণ বেরিয়ে গেছে , রাইগার মর্টিস শুরু হয়ে গেছে , অথচ তুমি টেরটি পাওনি। এরকমটা নয় তো?
– ধুস! এই তো কিছুক্ষণ আগে দুটো বিয়ার খেলুম । না ,না, ওসব কিছু নয়।
– আর মন? যেটা তুমি কোল্যাটারাল সিকিউরিটি হিসেবে তোমার এমপ্লয়ারারের কাছে গচ্ছিত রেখোছো তার কী হবে?
– একটু বেশি আলবাল কথা হয়ে যাচ্ছেনা?
– আচ্ছা বেশ! শেষ কবে তুমি নিজের মতো করে সময় কাটিয়েছ ? নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছ শেষ কবে? ২০০৭ এ তোমার বাবা মারা যান। তারপর থেকে তুমি তাই হয়ে উঠেছো যেভাবে তোমার সম্পর্করা তোমায় দেখতে চেয়েছো। শেষ কবে কোমল নিখাদ থেকে ধৈবতে মীড় লাগাতে সাড়া দিয়েছে কোকিল? আর তুমি এস এম এস পাঠিয়েছো প্রাক্তন প্রেমিকাকে ? নাকি কোকিল ঘুমিয়ে পড়ায় বসন্ত চলে গেছে চুপিসারে? দারা ,পুত্র ,পরিবার , পাঁচতারা জীবন , ঘাম, কর্পোরেট মই সিঁড়ি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলে যে আসল অর্ণব কখন চলে গেছে ভেন্টিলেশনে তুমি টের পাওনি । বাবু ,মিতুল , বব , যারা তোমার ডাকনাম তাদের কী মনে পড়ে? তাদের কিন্তু বয়স বাড়েনি । তারা কি আজো পথ চেয়ে বসে নেই তোমার অপেক্ষায়? পূর্ণেন্দু পত্রীর সেই লাইন গুলো মনে পড়ে অর্ণব?
“তৃষ্ণা যেন ধূপের কাঠি গন্ধে আঁকে সুখের আদল
খাঁ খাঁ মনের সবটা খালি
মরা নদীর চড়ার বালি
অথচ ঘর দুয়ার জুড়ে তৃষ্ণা বাজায় করতালি
প্রতীক্ষা তাই প্রহরবিহীন
আজীবন ও সর্বজনীন
সরোবর তো সবার বুকেই, পদ্ম কেবল পর্দানশীন
স্বপ্নকে দেয় সর্বশরীর, সমক্ষে সে ভাসে না।

যে টেলিফোন আসার কথা সচরাচর আসে না।”

২৯ শে এপ্রিল
আর একদিন ও সময় নষ্ট করা যাবেনা। অয়ন কে ফোন করে বলে দিয়েছি যদি বাড়ি থেকে ফোন করে ,তবে বলে দেবে আমরা দুজনে পুরী যাচ্ছি। চেন্নাই মেলে উঠে পড়েছি । উইদাউট টিকিট । লাগেজ বলতে একটা জিনস , তিনটে টি – শার্ট , একটা ব্ল্যাক ডগ। প্রায় ভোররাত অবধি বাথরুমের পাশে চারটে সদ্য পরিচিত যুবকের সাথে গাল গল্প করে কেটে গেল। টিটি এলো ভোরের দিকে। ৫৭০ টাকা ফাইন দিয়ে এস ২ তে একটা শোবার জায়গা পর্যন্ত ম্যানেজ হোল। ব্রাঞ্চের ছেলে মেয়েরা এ দৃশ্য দেখলে যে ভিরমি খেতো সে আর বলে দেবার নয়।

৩০ শে এপ্রিল
-তারপর?
– না ,না , সেভাবে কোন গল্প নেই । ধরো দ্বৈপায়ন হ্রদে ছেতড়ে পড়ে আছে ভগ্নজানু দুর্যোধন । ইট ইস সো অবভিয়াস যে চরিত্রটা মারা যাচ্ছে । তুমি দর্শক , তুমি এটা লাস্ট সিন ভেবে হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই পারো, কারণ গল্প এখানেই মোটামুটি শেষ।
– যাঃ শালা ! গল্প শেষ ?
– হ্যাঁ ! তবে ব্ল্যাক ডগের এগারো পেগ ফিরে এসেছিল। এটা একটা কাহানী মে টুইস্ট বলতে পারো।
– সেকী?
– দেখো বস! সবার জীবনেই এই ফেজটা আসে। গাড়ি ,বাড়ি , সংসার, চোদ্দশ ফেসবুক ফ্রেন্ড নিয়ে সবে যখন নিজেকে অ্যাচিভার ভাবতে শুরু করেছো, হঠাৎ , মানে হঠাৎ ই , ওয়ান ফাইন মর্নিং , এই বোধ জেগে ওঠে এসব সত্যি নয়, তুমি আসলে নিজের লাশ নিজেই বয়ে বেরাচ্ছ। দ্বৈপায়ন হ্রদে ভগ্নজানু দুর্যোধন যেন আইডিয়াল মেটাফোর । নয় কী ? জীবন তোমার মাজা ভেঙ্গে দিয়েছে। পড়ে থাকার মধ্যে আছে সোম থেকে শুক্র,পাই চার্ট,বিট্রেয়াল, পাওয়ার পয়েন্ট ,ডিপ ফ্রিজে রেখে দেওয়া মরা মাছের মতো কিছু সম্পর্ক। টের পাও রক্তের মধ্যে বয়ে তিরতির বয়ে চলেছে উদাসীনতার ঢেউ । এ যেন মাইনাস ৪২ ডিগ্রীর গুলাগ বন্দীশিবির ।ক্রীতদাসের জীবন যা অভ্যাস বশত হ্যাচোর প্যাচোর করে এগিয়ে চলেছে।
এখন প্রশ্ন হোল ১১ পেগ ফিরলো কী করে? তাই তো?
ট্র্যাভেলগ লিখলে মিষ্টি ডিটেল দিতে হতো। এখানে এসব অপ্রয়োজনীয়। শুধু এটুকু জানিয়ে দেওয়া দরকার যে এখন আমি এখন রম্ভায়। সময় রাত ৯টা। টুরিস্টরা সাতটা বাজতে না বাজতেই ফিরে গেছে ওটিডিসি র সেফ জোনে। আমি মাঝিকে সঙ্গী করে একা একাই বেরিয়ে পড়েছি নৌকাবিহারে। চাঁদ ভেঙ্গে পড়েছে মাথায়। আঁশবটিতে মাছের আশের মতো ঝিলিক দিচ্ছে জল। চকোরের মতো আকণ্ঠ জ্যোৎস্না গিলে পা টলছে রে অয়ন ! এখন আমি স্ট্রেটকাট বলে দিতে পারি “ভালবাসি” । কেমন আছো মা? পেঁচি পিসি কেমন আছো? আমার খুব গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছিল জানো? আমি গাইলাম ও । প্রায় ঘণ্টা খানেক। আকাশের লক্ষ লক্ষ তারা , জলের নীল ,দূরের সবুজ ,ব্যাক ওয়াটারের মাছ ধৈর্য ধরে আমার গান শুনলো। “ও মাঝি রে” রে শুনে মিটিমিটি হাসছিল মাঝি।
ওড়িয়া মাঝি বলেছে ওর নাম “দামোদর”। আমি বললাম “ ও তো কৃষ্ণের আরেক নাম। তুমি কৃষ্ণ হলে আমি তবে বলরাম। এস তবে গোপবালিকাদের সাথে হল্লীসক নাচি। ও ঘোষসুন্দরী , ও বনমালা, চন্দ্ররেখা, মৃগাক্ষী তাড়াতাড়ি সব এসো । মৃদঙ্গ মুরলী নিয়ে এসো গো”। এই বলে আমি হো হো হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরেছিলাম দামোদরকে।
সেই রাতে এস এম এস পাঠিয়েছিলাম তোকে “ দেখতে চাই এখনো তোর সেই পেশেন্স আছে কিনা। তবে এখনো আমি স্ট্রেটকাট বলে দিতে পারি “ভালবাসি” ।
শহীদ কাদরীর সেই লেখাটা বড্ড মনে পড়ছে রে অয়ন ! ওই যে শেষের লাইন কটা
“ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান”।
১লা মে
আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নেমেছে আজ। এমন বৃষ্টি আমি কোনদিন দেখিনি। ব্যালকনি তে রাখা চেয়ারগুলো হুটোপুটি খাচ্ছে বৃষ্টির ছাটে।
আজ চলে যাচ্ছি রম্ভা।
আর আমার কোন অসুখ নেই।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Bitnami